পাবনার বেড়ায় বন্ধ প্রায় তাঁতশিল্প পেশা ছাড়ছেন কারিগরা

পাবনার বেড়ায় বন্ধ প্রায় তাঁতশিল্প পেশা ছাড়ছেন কারিগরা

বেড়া (পাবনা) প্রতিনিধি : পাবনার বেড়া উপজেলা বহুদিন ধরেই তাঁতশিল্পের জন্য সুপরিচিত। একসময় তাঁতের টুং-টাং শব্দ ছিল এখানকার গ্রামীণ জীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির প্রাণ। তবে সময়ের সাথে সাথে সেই ঐতিহ্যবাহী শিল্পে নেমে এসেছে স্থবিরতা। দিনভর কঠোর পরিশ্রম করেও ন্যায্য মজুরি না পাওয়ায় অনেকেই ঝুঁকছেন অন্য পেশায়। ফলে ঐতিহ্যের ধারক বেড়ার তাঁতশিল্প আজ ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তার অভিজ্ঞ ও দক্ষ কারিগর।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বেড়া পৌরসভার হাতিগাড়া, মোহনগঞ্জ, বনগ্রাম, সান্যালপাড়াসহ উপজেলার হাটুরিয়া-নাকালিয়া, নতুনভারেঙ্গা, রাকশা, চাকলা, আমিনপুনসহ বিভিন্ন এলাকায় এখনও ছোট-বড় অনেক তাঁতঘর চালু আছে। এসব তাঁতে মূলত লুঙ্গি, গামছা, কাপড়সহ বিভিন্ন বস্ত্র তৈরি হয়। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি তৈরি হয় লুঙ্গি।

অনেক কারিগর জানান, এক থান (চার পিচ) লুঙ্গি তৈরি করে তারা পান মাত্র ১০০ টাকা। একজন দক্ষ কারিগর সারাদিনে ৮ থেকে ১০ পিস লুঙ্গি তৈরি করতে পারেন। সে হিসাবে তাদের দৈনিক আয় ২শ’ থেকে ৩শ’ টাকা। যা দিয়ে সংসারের খরচ চালানো প্রায় অসম্ভব।

কারিগরদের অভিযোগ, চাল-ডাল, তেল, সবজি, ওষুধ, সন্তানদের লেখাপড়া সবকিছুতে খরচ বেড়েছে। কিন্তু তাদের মজুরি বাড়েনি। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে পেশা বদল করছেন। তাদের অনেকেই রিকশা চালাচ্ছেন, কেউবা রাজমিস্ত্রি, ইটভাটা বা দিনমজুরির কাজে চলে যাচ্ছেন।

পৌর এলাকার হাতিগাড়া মহল্লার তাঁত কারিগর মো. আক্তার হোসেন(৫৫) বলেন, ছোটবেলা থেকে এই কাজ করি। এখন বয়স হয়েছে, অন্য কাজও পারি না। কিন্তু সারাদিন খেটে ২০০-২৫০ টাকা পেলে সংসার চলে না। আগে তাঁতের কাজ করে ভালোই চলতাম। এখন সবকিছুর দাম বাড়ছে, কিন্তু আমাদের আয় বাড়ে না।

উপজেলার হাটুরিয়া গ্রামের তাঁত মালিক বাদশা মোল্লা বলেন, দক্ষ কারিগর না পাওয়ায় তিনি ও তার স্ত্রী মিলে দুটি তাঁত চালান। এসব তাঁতে লুঙ্গি তৈরি করে বিভিন্ন হাট-বাজারে বিক্রি করেন। তবে সুতা ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় তেমন লাভ থাকে না।

উপজেলার নতুনভারেঙ্গা গ্রামের তাঁত মালিক মো. হালিম বলেন, আমরা চাই কারিগরদের একটু ভালো মজুরি দিতে, যেন তারা পরিবার নিয়ে স্বাচ্ছন্দে চলতে পারে। কিন্তু বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সবসময় সেটা সম্ভব হয়ে ওঠে না। সুতা, রং ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম বাড়ায় খরচ বেড়ে গেছে। তারপরও চেষ্টা করি তাঁতশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে।

বেড়া উপজেলার নতুনভারেঙ্গা তাঁত সমিতির সভাপতি শাহ আলম বলেন, ক্রমেই দক্ষ কারিগরের সংখ্যা কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারে টিকে থাকার প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ায় এ শিল্প এখন গভীর সংকটে পড়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে তাঁতীদের জন্য সরকারি প্রণোদনা ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/162960