ডিম উৎপাদনে উঠছে না খরচ, সর্বস্বান্ত প্রান্তিক খামারিরা
স্টাফ রিপোর্টার : টানা পাঁচ মাস ধরে ডিম বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না প্রান্তিক পর্যায়ের পোল্ট্রি খামারিরা। প্রতিটি ডিমে উৎপাদন খরচ সাড়ে ৮ টাকার ওপর, অথচ খামার থেকে বাজারে প্রতিটি ডিম বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র সাড়ে ৬ টাকা থেকে ৭ টাকা ৩০ পয়সায়। দীর্ঘদিনের লোকসান ও ঋণের চাপে অনেক ছোট ছোট খামারি উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন।
বগুড়া শহরসহ আশেপাশের খামারিদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। এ চিত্র শুধু বগুড়াসহ দেশজুড়েই। খামারিরা বলছেন, ডিমের উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর অনেক কম। এতে চরম লোকসানের মুখে পড়ে অনেক ছোট ছোট খামার বন্ধের পথে।
ধারাবাহিক এমন বাজার দরে খামারিরা প্রতিটি ডিমে কমপক্ষে ২ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুণছেন। মুরগির খাবারের উচ্চমূল্য এবং সিন্ডিকেটের প্রভাবে তাদের মতো প্রান্তিক খামারিরা সর্বস্বান্ত বলে অভিযোগ তাদের। ডিম উৎপাদনের খরচের তুলনায় বাজারদর কম থাকায় পথে বসার উপক্রম অনেক খামারির। অনেকেই নিঃস্ব হয়ে গেছেন।
বগুড়া সদরের রবিবাড়িয়া এলাকার খামারি সোহাইনুর রহমান বলেন, টানা পাঁচ মাস ধরে লোকসানে ডিম বিক্রি করতে করতে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। যেখানে ডিমের উৎপাদন খরচ সাড়ে ৮ টাকার ওপর, সেখানে বিক্রি করতে হচ্ছে সাড়ে ৬ টাকায়। এখন এই লোকসান বহন করার মতো শক্তিও আর নেই।
একই এলাকার মেহরাব আলী অভিযোগ করে বলেন, ডিমের সরকারি দর ১০ টাকা ৫৮ পয়সা। দাম বেশি হলেই সরকারের নানা পর্যায়ে তোরজোর শুরু হয়। অথচ টানা পাঁচ মাস ধরে খামারিরা সরকারি দরেও ডিম বিক্রি করতে পারছেন না, এটা নিয়ে কারাও কোন কথা নেই। অথচ তাদের পথে বসাতে সিন্ডিকেট চক্র বাজারে এসএমএস কারসাজি করছে।
দুই যুগ ধরে খামার পরিচালনা করছেন মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ডিমের বাজারে উত্থান-পতন হয়। কিন্তু এবারের সিন্ডিকেট সম্পূর্ণ আলাদা। প্রান্তিক খামারিদের ধ্বংস করতেই এবার দীর্ঘ সময় ধরে বাজার এভাবে রাখা হয়েছে। এসএমএস মাধ্যমে ডিমের বাজারে নিয়ন্ত্রণকারীদের সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খামারিরা যেমন ধ্বংস হয়ে যাবেন, তেমনি উচ্চ মূল্যে সাধারণ মানুষকে ডিম কিনে খেতে হবে।
খামারি আবুল খন্দকার বলেন, ন্যায্যমূল্য না পেয়ে অনেক খামারি ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। কেউ দেশের বাইরে গেছেন, কেউ ঋণের বোঝা নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে আমাদেরও একই পরিণতি হবে। তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে একের পর এক খামার বন্ধ হয়ে যাবে, যা দেশিয় ডিম উৎপাদনে প্রভাব ফেলবে।
এদিকে খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রান্তিক খামারিদের লোকসান এবং দিশাহীনতার মূল কারণ হিসেবে বিপণন কাঠামোর দুর্বলতা দায়ী। অথচ প্রান্তিক খামারিদের মাধ্যমেই দেশ মুরগি ও ডিম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে, একে ধরে রাখা সরকারের দায়িত্ব। গ্রামীণ অর্থনীতির একটি বড় অংশ এ খাতের সঙ্গে জড়িত। এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে প্রান্তিক খামারিদের টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না, আর তখন গ্রামীণ অর্থনীতিও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হবে।
তারা আরও বলছেন, খামারিদের এমন পরিস্থিতিতে মূল্য ক্ষতিপূরণের জন্য সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হবে। কৃষি খাতে যেখানে সার, বীজ বা অন্যান্য খাতে ভর্তুকি দেওয়া হয়, পোলট্রি খাতে সেই ধরনের সহায়তা নেই। যদি কিছুটা হলেও তাদের সাপোর্ট দেওয়া যায় তবে প্রান্তিক খামারিরা টিকে থাকবেন। আর প্রান্তিক খামারিরা টিকে থাকলেও দেশের সাধারণ মানুষ তাদের সাধ্যের মধ্যে আমিষের চাহিদা পূরণ করতে পারবেন।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/162867