ঈদের আনন্দ পথে মৃত্যুর ওপারে ২৪৭ জন মানুষ!

ঈদের আনন্দ পথে মৃত্যুর ওপারে ২৪৭ জন মানুষ!

ঈদুল ফিতরের আনন্দযাত্রা এবার রঞ্জিত হয়েছে অসংখ্য তাজা প্রাণের রক্তে। ঈদের ছুটি শুরু হয়েছিল লঞ্চের ধাক্কায় পা হারিয়ে অতিরিক্ত রক্তপাতে প্রাণ হারানো ২২ বছরের যুবক সোহেল ফকিরের হতবাক দৃষ্টি নিয়ে । ছুটির শেষ যতিচিহ্ন হয়ে থাকলো সাত মাসের শিশু আরশানসহ পদ্মা নদীতে ডুবে এত মানুষের প্রাণহানির ঘটনা।

ঈদের পূর্বের নজরদারি ও নিয়ম শৃঙ্খলা ঈদের পর ঝিমিয়ে পড়ার কারণেই কি এই সব দুর্ঘটনা? অথচ এই উৎসবে যে উদ্দেশ্যে  নির্বাহী আদেশে ছুটির দিনের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছিল এবং জনমানুষ আশাবাদ ব্যক্ত করেছিল ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক হবে। সেই ‘স্বস্তি’ যে সদরঘাটে লঞ্চ দুর্ঘটনা, কুমিল্লায় ট্রেন-বাস সংঘর্ষ, সর্বশেষ ২৫ মার্চ গোয়ালন্দ ঘাটে যাত্রীবাহী বাস পদ্মায় নিমজ্জিত হবার ন্যায় মর্মান্তিক দৃশ্যসমূহে মাথা কুটিয়া মরবে, কে জানত! ঈদের ছুটি বৃদ্ধি দুর্ঘটনার কারণ হবে। ১৮ মার্চ সদরঘাটের দুর্ঘটনায় ঘাটে লঞ্চ ভিড়বার প্রতিযোগিতা, চালকের দক্ষতার অভাবকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২২ মার্চ কুমিল্লার বাস-ট্রেন সংঘর্ষে লেভেল ক্রসিংয়ে গেট সময়মতো বন্ধ করতে না পারার অভিযোগ ওঠেছে। বগুড়ায় সান্তাহার জংশনের কাছে আন্তঃনগর ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হবার ঘটনায় সিগন্যাল বিভ্রাট ও অবকাঠামোগত দুর্বলতার বিষয়টি উঠে এসেছে । ২৫ মার্চ যাত্রীবাহী বাস পদ্মা নদীতে নিমজ্জিত হবার ঘটনায় আরেক ফেরির নিয়ন্ত্রণহীন ধাক্কা, নিয়ম লঙ্ঘন করে ফেরিতে উঠবারকালে বাসে যাত্রীগণের অবস্থানকে দায়ী করা হচ্ছে। এই সব দুর্ঘঘটনা আর বিপুল সংখ্যক প্রাণহানি দেশের পরিবহন খাতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে থাকলো। চমকপ্রদ উদ্যোগের তুলনায় ব্যবস্থাপনা ও নজরদারির ধারাবাহিকতা যে অধিক প্রয়োজনীয়- তা প্রমাণ করে।

এই প্রসঙ্গে আমরা স্মরণ করে দিতে চাই, নিজের  ব্যর্থতা  মেনে নিয়া দুর্ঘটনার দায় গ্রহণ ও জবাবদিহির প্রতীক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পদত্যাগের দৃষ্টান্ত আছে। ভারতের তামিলনাড়ুতে ট্রেন দুর্ঘটনায় দেড় শত মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় ১৯৫৬ সালে পদত্যাগ করেছিলেন তৎকালীন রেলমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। ২০২৩ সালেও গ্রিসে ট্রেন দুর্ঘটনায় ৩৮ জনের প্রাণহানির ঘটনায় ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন দেশটির অবকাঠামো ও পরিবহনমন্ত্রী কোস্টাস কারামানলিস। দেশের সড়কে দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর নীতি গ্রহণ, আইনের প্রয়োগ, উচ্চ দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা চিহ্নিতকরণ, চালকের দক্ষতা নিশ্চিতকরণ, কঠোর নজরদারি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব।  সেই সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যা নিয়েই তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। সরকারি সংস্থা এক হিসাব দিচ্ছে, বেসরকারি সংস্থা দিচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। 

ঈদের ছুটিতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির চিত্র উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। ঈদের দশদিনের (১৭-২৬ মার্চ) ছুটিতে দেশে ৩৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৪জন নিহত এবং ৬১৭ জন আহত হয়েছেন বেসরকারি সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী এই তথ্য, একই সময় সরকারি তথ্যের বাইরে অনেক দুর্ঘটনা ঘটলেও তা অন্তর্ভুক্ত হয়নি। উদাহরণ হিসেবে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে সংঘটিত ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনায় ১২ জন নিহত হলেও তা সরকারি তালিকায় নেই। বিআরটিএর ২১ মার্চের ২৪ ঘণ্টার রেকর্ডে কুমিল্লার কোনো ঘটনা ধরা হয়নি। এর আগে গত বছরে ঈদের ছুটিতে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে ১১ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪৯ জন নিহত হয়েছিল। সে হিসেবে গত বারের তুলনায় এবার সড়কে মৃত্যু বেশি। বিভিন্ন  হাসপাতালে দুর্ঘটনায় আহতদের চাপ বেড়েছিল। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ঈদযাত্রা সাধারণত ১৫ দিন ধরে গণনা করা হয় ঈদের আগে সাত দিন, ঈদের দিন এবং পরবর্তী সাত দিন। গত বছর একই সময় ৩১৫টি দুর্ঘটনায় ৩২২ জন নিহত হন। ২০২৪ সালে এই সময়ে ৩৭২টি দুর্ঘটনায় ৪১৬ জন প্রাণ হারান, যা এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এবারের ঈদযাত্রা ১৭ মার্চ থেকে শুরু হয়ে ২৩ মার্চ পর্যন্ত সাতদিন চলেছে। তবে অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো ছুটিতে থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিনের পরিস্থিতি ছিল এভাবে: ১৭ মার্চ: ১২টি দুর্ঘটনায় ১৫ জন নিহত, ১৫ জন আহত; ১৮ মার্চ: ১৮টি দুর্ঘটনায় ১৩ জন নিহত, ৬২ জন আহত; ১৯ মার্চ: ১১টি দুর্ঘটনায় ৮ জন নিহত, ৭ জন আহত; ২০ মার্চ: ৬টি দুর্ঘটনায় ৮ জন নিহত, ৩৬ জন আহত; ২১ মার্চ: ১৭টি দুর্ঘটনায় ১৫ জন নিহত, ২৫ জন আহত, ২২ মার্চ: ১৯টি দুর্ঘটনায় ৩২ জন নিহত, ৬০ জন আহত; ২৩ মার্চ: ৯টি দুর্ঘটনায় ৯ জন নিহত, ১২ জন আহত;২৫ মার্চ: ৩২ জন নিহত রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে যাত্রীবাহী বাস পড়ে যাওয়ার ঘটনায় সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৫ থেকে ২৭ জনে দাঁড়িয়েছে ।  কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে আসা ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’ নামের বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে। ২৬ মার্চ কুমিল্লায় কারগাড়ি ও বাস মুখোমুখি সংঘর্ষে ৫ জন নিহত।  সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান জানিয়েছেন, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী মৃত্যুর সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। তিনি আশঙ্কা করছেন, এবারের ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনায় নতুন রেকর্ড হতে পারে।

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে পুলিশের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে।  ঈদের সময় সড়কে গাড়ির বাড়তি চাপ থাকে, এতে দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যায়। তাই ঈদের সময় সড়ক ব্যবস্থাপনায় কর্তৃপক্ষকে বাড়তি নজর দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ মারা যান। আহত হন প্রায় ১০ হাজার মানুষ। শুধু গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এই হিসাব করে দেশীয় সংস্থাগুলো। হাসপাতালে কিংবা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু এই হিসাবে আসে না। কিন্তু সড়কগুলোতে শৃঙ্খলা ফেরাতে জোরালো উদ্যোগ নেই। মাঝেমধ্যে কিছু ভ্রাম্যমাণ আদালত চালানো হয়, কিছু জরিমানা হয়; কিন্তু পরিকল্পিত ও সমন্বিত কোনো কার্যক্রম চালানো হয় না কিন্তু ব্যবস্থাপনাগত উদ্যোগের বদলে অবকাঠামো নির্মাণ ও নানা ধরনের প্রকল্প নেওয়ার আগ্রহ অতীতে বেশি দেখা গেছে। ফিটনেসবিহীন ও লক্কড়ঝক্কড় যান চলাচল বন্ধ এবং যথাযথ লাইসেন্স ছাড়া যানবাহন চালানো বন্ধে প্রয়োজন সমন্বিত ও নিয়মিত অভিযান। এসব ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়েছে। আমরা প্রত্যেকেই দোষী ২৪৭ জন মানুষের দুর্ঘটনায় মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। আমরা কত আর শব বইবো কাঁধে নিয়ে  ঈদের আনন্দে। পরম করুণাময় ক্ষমা করুন আমাদের।

লেখক

মাহমুদ হোসেন পিন্টু

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/162693