দিনাজপুরের ছোট যমুনা নদী এখন অস্তিত্ব সংকটে

দিনাজপুরের ছোট যমুনা নদী এখন অস্তিত্ব সংকটে

শেখ সাবীর আলী, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) :  এক সময়ের খরস্রোতা দিনাজপুরের ফুলবাড়ী দিয়ে প্রবাহিত ছোট যমুনা নদী এখন মৃতপ্রায়। বছরের অধিকাংশ সময় নদীতে পানি থাকে না, আর যেখানে সামান্য পানি আছে সেখানেও জমছে ময়লা-আবর্জনা। ফুলবাড়ীর সচেতন নাগরিকদের দাবি-ছোট যমুনা নদী বাঁচাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ফুলবাড়ী পৌরসভার স্থায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় প্রতিদিনের ময়লা নদীর বিভিন্ন স্থানে ফেলা হচ্ছে। এতে নদীর তলদেশে আবর্জনার স্তুপ জমে ভরে উঠছে, এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

স্থানীয় প্রবীণদের মতে, কয়েক দশক আগেও ছোট যমুনা নদী ছিল এ অঞ্চলের প্রাণ। বর্ষা মৌসুমে নদী ভরে উঠত পানিতে, শুষ্ক মৌসুমেও নদীতে নৌকা চলাচল করত। নদীর পানি ব্যবহার হতো কৃষিকাজ, মাছ ধরা ও গৃহস্থালির নানা কাজে। নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল এলাকার অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদীর নাব্য কমে গেছে। পলি জমে নদীর অনেকাংশ ভরাট হয়ে গেছে এবং বিভিন্ন স্থানে অবৈধ দখল ও অব্যবস্থাপনার কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

একসময় খরস্রোতা হিসেবে পরিচিত এই নদী বর্তমানে অনেকাংশেই মরা খালে পরিণত হয়েছে। নদীর নাব্য কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে নদীর তীর দখল করে অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠায় নদী দিন দিন সরু হয়ে যাচ্ছে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে দূষণের সমস্যা।

সরেজমিনে দেখা যায়, দিনাজপুর-ফুলবাড়ী-ঢাকা আঞ্চলিক মহাসড়কের ফুলবাড়ী পৌর এলাকার বড় ব্রিজ (জোড়া ব্রিজ) এর নিচে এবং পৌর বাজারসংলগ্ন ফুটওভার ব্রিজের পাশে নিয়মিতভাবে পৌরসভার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা প্রতিদিন দুবার এসব বর্জ্য নদীতে ফেলেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, তিন-চার বছর আগে স্বল্প পরিসরে বর্জ্য ফেলা শুরু হলেও বর্তমানে পৌরসভার অধিকাংশ বর্জ্য এখানেই ফেলা হচ্ছে। গৃহস্থালি বর্জ্যরে পাশাপাশি কাঁচাবাজারের ময়লাও নিয়মিত নদীতে ফেলা হচ্ছে। এসব ময়লা-আবর্জনা সরাসরি নদীতে জমে থেকে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করছে এবং নদীর পানিকে আরও দূষিত করে তুলছে। এতে নদীর পরিবেশ যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি আশপাশের বাসিন্দারাও নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।

পরিবেশবীদদের মতে, নদী শুধু একটি জলধারা নয়; এটি একটি অঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই ছোট যমুনা নদীকে বাঁচাতে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় অবহেলা ও দূষণের কারণে একসময় এই নদী পুরোপুরি বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

ফুলবাড়ী সম্মিলিত সচেতন নাগরিক সমাজের সভাপতি হামিদুল হক বলেন, নদী দ্রুত খনন করে নদীর নব্য ফিরিয়ে আনতে হবে। নইলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে হারিয়ে যাবে এই নদীর অস্তিত্ব। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা রাশেদা আক্তার জানান, দেশের মিঠাপানির জলাশয়ে প্রায় ২৬০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়।

এর মধ্যে ৬৪ প্রজাতি বর্তমানে হুমকির মুখে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া, জলাশয় শুকিয়ে যাওয়া এবং পানি দূষণ এসবের অন্যতম কারণ। নদী-নালা ও জলাশয়ে বর্জ্য ফেলার ফলে জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে এবং প্রাকৃতিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে।

ফুলবাড়ী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী লুৎফুল হুদা চৌধুরী বলেন, জাইকা প্রকল্পের মাধ্যমে পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রায় দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ এসেছিল। তবে জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলাতার কারণে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বরাদ্দ ফেরত চলে যায়। তিনি বলেন, নদীতে পৌরসভা থেকে কোন ধরণের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে না। তবে জনসাধারণ ফেলতে পারে তা আমার জানা নেই।

ফুলবাড়ী পৌর প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) সামিউল ইসলাম বলেন, নদীতে পৌরসভার বর্জ্য ফেলার বিষয়টি তার জানা নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে। দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বিভাগ এর নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক আহমেদ জানান, নদী দূষণ কোনভাবেই কাম্য নয়। ফুলবাড়ী ছোট যমুনা দূষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রয়োজনে ফুলবাড়ী পৌরসভাকে অবহিত করা হবে। তা না হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/161799