ঈদ মানে আনন্দময় তারপরও হয় বিষাদময়
সারা বছর পর এই একটি মাস সমগ্র বিশ্বে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে পবিত্র, কাক্সিক্ষত, সিয়াম সাধনার মাস পবিত্র মাহে রমজান মাস। মুসলিম জাহান এই মাসটি রহমত, মাগফেরাত ও নাজাত এর আশায় অত্যন্ত ভক্তি সহকারে পালন করে থাকে। রমজান মানে সিয়াম সাধনার মাস, আত্মশুদ্ধি ও সংযমের মাস, বরকত ও ইবাদতের মাস, সকল মুসলিমদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার মাস, প্রত্যেক মুসলিমের ঈমানী শক্তি বৃদ্ধি করার মাস। শুধু মহান আল্লাহ তায়ালা কে সন্তুষ্টি রাখার জন্য রোজা রাখে মুসলমানগণ। আল্লাহ তায়ালার কাছে রোজদারের সম্মান অত্যন্ত বেশী এবং এর প্রতিদান উনি নিজে প্রদান করবেন বলে অঙ্গীকার করেছেন। একমাস রোজা রাখার পর সবচেয়ে খুশী ও আনন্দঘন পরিবেশে পরিবারের সবাইকে নিয়ে পালন করা হয় পবিত্র ঈদুল ফিতর এর দিন। প্রতিটি মুসলিম নিজেদের সাধ্যমতো তার সামর্থ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে থাকে রোজা এবং ঈদে ব্যয়ের খাতটা বড় করতে।
পবিত্র রমজান মাস এতোটা মর্যাদাপূর্ণ মাস যার উপলব্ধি শুধু মুসলমানরাই করে না বিশ্বব্যাপী রোজাদারদের সম্মানার্থে শুধু মুসলিম দেশগুলোই নয় মুসলিম সংখ্যালঘু ভিন্ন ধর্মের সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশসমূহেও দেখা যায় রমজান মাস কে সম্মান করে। ঐ সব দেশে রমজান মাসে কে কতোটা কম দামে এবং ভালো মানের পণ্য রোজাদারদের হাতে তুলে দিতে পারে সেই বিষয়ে চলে অলিখিত এবং অঘোষিত সুন্দর ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা। মধ্যপ্রাচ্যের বেশীরভাগ দেশ থেকে শুরু করে ইউরোপ, আফ্রিকার অনেক দেশেই মুসলিমদের সুবিধার্থে রোজা ও ঈদ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় প্রায় সকল পণ্যের উপর ছাড় দেয়, ভালো মানের পণ্য ক্রেতাদের হাতে তুলে দেয়, লাভ যৎসামান্য কিংবা কখনোবা সেটাও করে না। শুধু মুসলিম নয় খৃষ্টীয় ধর্মাবলম্বীদের বড়দিনের উৎসব এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও দুর্গাপূজা ও কালীপূজার উৎসবের সময় ঠিক ঐ একই চিত্রই দেখা যায়। সুন্দর মানবিকতা ও মনুষ্যত্ববোধ প্রমাণ করতে লাগে না কোনো ধর্ম, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, প্রচার ও জোরজবস্তি। দরকার ইচ্ছাশক্তি ও সুন্দর একটা মনের। যে মনের মনোমন্দিরে স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করে লেখা আছে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ।
মুসলিম ধর্ম সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। অথচ নির্মম হলেও সত্য আমরা সেই মুসলিম হয়ে অন্য মুসলিমদের জন্য কি করছি, এই প্রশ্নটা যদি নিজেই নিজেকে করি খুঁজে পাইনা আমরা কোনো উত্তর, বরং লজ্জা ও অপরাধবোধ আমাদের কে পশুর চাইতেও নিকৃষ্ট জাতি হিসেবেই প্রমাণ করে। জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও কৃষিজাত পণ্য উৎপাদনের সূচনালগ্ন থেকেই মরণঘাতী রাসায়নিক সার, কীটনাশক এককথায় বিষ অপরিকল্পিত ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে আর আমরা ভোক্তারা সেগুলো ক্রয় করতে বাধ্য হচ্ছি। মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্য, ওজনে কম দেওয়া, অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ভাবে ভোগ্যপণ্য লুকিয়ে রেখে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সুবিধাজনক সময়ে সেগুলো বাজারজাত করে অধিক লাভবান হওয়ার মানসিকতা প্রায় সকল ব্যবসায়ীদের মাঝে লক্ষ্য করা যায়। পৃথিবীতে যতো মূর্খ ও বর্বর জাতিই হোক না কেনো খাদ্যে ভেজাল বিশেষ করে শিশু খাদ্যে ভেজাল দেওয়া যা তাদের কল্পনারও অতীত। আমাদের দেশে সারা বছরই চলে এই ভেজাল ও বিষ মিশ্রিত খাদ্যের রমরমা ব্যবসা, কিন্তু পবিত্র রমজান মাস এলেই এই ভেজালের মাত্রা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এই সুযোগে আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা সারা বছরের রোজগার যদি এই একমাস অর্থাৎ রমজান মাসে করা সম্ভব হয় তবে তারা নিজেকে বড্ড ভাগ্যবান মনে করে। মহান সৃষ্টিকর্তার বিশেষ রহমত আছে আমাদের উপর, তা না হলে এতো ভেজাল ও বিষ খেয়েও আমরা বেঁচে আছি কি ভাবে। ভেজাল ও বিষ মিশ্রিত খাবার খেয়ে দিনদিন বাড়ছে রোগীর সংখ্যা আর শোনা যাচ্ছে নতুন নতুন রোগের নাম। এই কাজগুলো যে করছে আসলে সে কি মানুষ নাকি পশুর চাইতেও নিকৃষ্ট কোনো প্রাণী। অথচ দেখবেন একদিকে এই অপরাধ করছে আর ঐ দিকে খেয়াল রাখছে মসজিদে ফরজ নামাজ যেনো কাজা না যায় আর পাশাপাশি অন্য কে নামাজ আদায় ও হেদায়েতের কথা শোনাচ্ছে। কি বিচিত্র আমরা বাংলাদেশী মুসলিম স¤প্রদায়, এমন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য মনে হয় বিশ্বে একমাত্র আমাদেরই আছে।
ঈদ মানে আনন্দ আর এই আনন্দ কে আরো সুন্দর করতে প্রয়োজন নতুন পোশাক, জুতা সেন্ডেল ও প্রসাধনী সামগ্রী। সামর্থ্যের সাথে তাল মিলিয়ে সবাই চেষ্টা করে উপরোক্ত পণ্য গুলো ক্রয় করতে। এখানেও মহা বিপত্তি, দামী মার্কেট ও বড় বড় শো—রুম অনুযায়ী পণ্যের মূল্য ৪০/৫০ গুন বাড়িয়ে দিয়েও সন্তোষ প্রকাশ করছে না। প্রসাধনী সামগ্রীর ঐ একই অবস্থা, অলিগলিতে যা ইচ্ছে তাই দিয়ে প্রসাধনী সামগ্রী তৈরি করে বিক্রি হচ্ছে কিন্তু দেখার কেউ নেই। ঈদে বাবা মা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন পরিবারের সবার সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে ঘরমুখো মানুষের সংখ্যা হাজার গুন বেড়ে যায়। আর এই সুযোগের অপেক্ষায় থাকে পরিবহন ব্যবসার সাথে জড়িত বাস, লঞ্চ সহ নানাধরনের পরিবহন মালিক, শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠন গুলো। গাড়ির টিকিট বিক্রি শুরুর আগেই শেষ হয়ে যায় অথচ কালোবাজারি দের হাতে দুইতিন গুণ বেশি দামে পাওয়া যায় সব ধরনের গাড়ির টিকিট। শেষ মুহূর্তে যাদের সামর্থ্য নেই তারা কোথাও টিকিট না পেয়ে বাধ্য হয়ে ট্রাক, বাস ও রেলের ছাদে উঠে গন্তব্যে পৌছাতে গিয়ে ঘটে অসংখ্য দুর্ঘটনা অসময়ে ঝরে যায় বহু প্রাণ। এছাড়াও ঈদ সালামির নামে চাঁদাবাজি দখলবাজী সন্ত্রাসী কার্যকলাপ যথাযথভাবে চলছে দেশের আনাচেকানাচে। আইন করে এই অন্যায়ের সমাধান কোনোদিন হবে না। দেশের সকল মানুষ নিজেকে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নিজের বিবেক কে প্রসারিত করে, মনুষ্যত্ব বোধ ও মানবিকতা কে প্রধান্য দিয়ে পরিচয় দিবে সৃষ্টির সেরা জীব আমরা এবং আমরাই মানুষ।
লেখক :
শাব্বীর পল্লব
প্রাবন্ধিক ও গবেষক
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/161737