তলোয়ারের ধার আর কবিতার মাধুর্য  এই দুইয়ের এক অপূর্ব সংমিশ্রণই হলো ইরানি জাতি

তলোয়ারের ধার আর কবিতার মাধুর্য  এই দুইয়ের এক অপূর্ব সংমিশ্রণই হলো ইরানি জাতি

১. প্রাচীন পারস্যের প্রতাপ (হাখমানেশি ও সাসানীয় যুগ) : ইরানি বীরত্বের যাত্রা শুরু হয় সম্রাট সাইরাসের হাত ধরে। তিনি বিশ্বের প্রথম সুপারপাওয়ার সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। পরবর্তীকালে সাসানীয় সম্রাটরা তৎকালীন বিশ্বশক্তি রোমান সাম্রাজ্যকে বারবার পরাজিত করে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছিলেন। শাহপুর—১ এর হাতে রোমান সম্রাট ভ্যালেরিয়ানের বন্দি হওয়া পারস্যের সামরিক ইতিহাসের অন্যতম বড় সাফল্য।

২. তলোয়ার ও কলমের সংগ্রাম (ইসলামিক যুগ) : সপ্তম শতাব্দীতে ইসলাম গ্রহণের পর ইরানিরা কেবল যোদ্ধা হিসেবে নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক বীর হিসেবেও আবির্ভূত হয়। তারা আব্বাসীয় খেলাফতের মূল শক্তিতে পরিণত হয়। মঙ্গোল ও তুর্কি আক্রমণের সময় যখন চারিদিকে ধ্বংসলীলা চলছিল, তখন ইরানিরা তাদের মেধা দিয়ে আক্রমণকারীদেরই পারস্য সংস্কৃতিতে দীক্ষিত করে ফেলেছিল—এটি ছিল তাদের সাংস্কৃতিক বীরত্ব।

৩. আধুনিক যুগের বীরত্ব ও প্রতিরোধ :  আধুনিক যুগে ইরানি জাতির বীরত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল ১৯৮০—এর দশকের ইরান—ইরাক যুদ্ধ। সারা বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ইরাককে সমর্থন দিলেও, ইরান একক শক্তিতে ৮ বছর লড়াই করে নিজেদের এক ইঞ্চি জমিও হাতছাড়া হতে দেয়নি। সা¤প্রতিক সময়ে ভূ—রাজনৈতিক নানা সংকট ও অবরোধের মুখেও তাদের টিকে থাকার লড়াই সারা বিশ্বকে বিস্মিত করে। 


ইরানি জাতি বীরত্বের এক অনন্য সংজ্ঞা তৈরি করেছে। তাদের ইতিহাস কেবল যুদ্ধের ময়দানে জয়ী হওয়ার ইতিহাস নয়, বরং পরাজয়ের ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো বারবার জেগে ওঠার ইতিহাস। তলোয়ারের ধার আর কবিতার মাধুর্য এই দুইয়ের এক অপূর্ব সংমিশ্রণই হলো ইরানি জাতি।

একটি ঐতিহাসিক তথ্য: গ্রিক বীর আলেকজান্ডার যখন পারস্য জয় করেছিলেন, তখন তিনি পারস্যের বীরত্বে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি নিজেই পারসিক পোশাক পরা শুরু করেছিলেন এবং তার সেনাপতিদের পারসিক নারীদের বিয়ে করতে উৎসাহিত করেছিলে। গত কয়েক দশক ধরে ইতিহাসের ভয়াবহতম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে থেকেও ইরানি জাতি যেভাবে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে, তা তাদের ‘লড়াকু মনোভাব’ এবং ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’র এক জীবন্ত দলিল।

১. ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ : নিষেধাজ্ঞার কারণে তেল রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা (SWIFT) থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর ইরানিরা দমে যায়নি। তারা তাদের অর্থনীতিকে আমদানিনির্ভর থেকে উৎপাদনমুখী করে তুলেছে। 

স্বনির্ভরতা: নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে ভারী শিল্প সবকিছুই তারা নিজেদের দেশে তৈরি করতে শুরু করেছে।

ক্ষুদ্র শিল্প: হাজার হাজার স্টার্টআপ এবং স্থানীয় প্রযুক্তির মাধ্যমে তারা বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এনেছে।

২. সামরিক ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ অস্ত্র ক্রয়ের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ইরান আজ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সামরিক শক্তি। 

ড্রোন ও মিসাইল প্রযুক্তি: সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ইরানি ড্রোন এবং ব্যালেস্টিক মিসাইল আজ বিশ্বের বড় বড় সামরিক শক্তিকেও ভাবিয়ে তুলছে। 

মহাকাশ গবেষণা: নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই তারা নিজস্ব স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠাতে সক্ষম হয়েছে, যা তাদের অদম্য মানসিকতার পরিচয় দেয়। 

৩. চিকিৎসা ও বিজ্ঞান গবেষণা : করোনা মহামারীর সময় যখন ইরানকে ভ্যাকসিন আমদানিতে বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল, তখন তারা নিজেরাই ‘কোভ—ইরান বারাকাত’ নামক ভ্যাকসিন তৈরি করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়। এ ছাড়া ন্যানো—টেকনোলজি এবং স্টেম সেল গবেষণায় ইরান বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি।

৪. মনস্তাত্ত্বিক দৃঢ়তা ও জীবনযাত্রা : নিষেধাজ্ঞার ফলে মুদ্রাস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার মান নিয়ে সংকট থাকলেও ইরানিদের সাধারণ জীবনযাত্রায় স্থবিরতা আসেনি। 

সাংস্কৃতিক উৎসব: তারা তাদের নওরোজ (নববর্ষ) থেকে শুরু করে সকল জাতীয় উৎসব অত্যন্ত জাঁকজমকভাবে পালন করে, যা তাদের মানসিক জয়ের প্রতীক। 

ক্রীড়া ও শিল্প: আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গন এবং অস্কারের মতো চলচ্চিত্র মঞ্চে ইরানিদের সরব উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, দেয়াল তুলে তাদের মেধাকে বন্দি করা সম্ভব নয়।

৫. ভূ—রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখা : নিষেধাজ্ঞার চাপে কোণঠাসা হওয়া তো দূরের কথা, ইরান মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে (সিরিয়া,লেবানন, ইয়েমেন, ইরাক) তাদের প্রভাব আরও বিস্তার করেছে। এটি তাদের কৌশলগত বীরত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদী লড়াইয়ের ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ। “নিষেধাজ্ঞা আমাদের জন্য অভিশাপ নয়, বরং এটি আমাদের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।” — এই দর্শনই আধুনিক ইরানিদের লড়াইয়ের মূল শক্তি।

 

সাজিদ ওয়াসিক বাঁধন

লেখক : প্রাবন্ধিক ও আইনজীবী 
বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্ট

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/161617