ফুটপাতের বেহাল দশা : দুর্ভোগে পথচারী

ফুটপাতের বেহাল দশা : দুর্ভোগে পথচারী

ফুটপাত মূলত পায়ে হাঁটার পথ হলেও সেগুলোতে স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটার সুযোগ এখন বড় কম। অবৈধ দখল, হকারদের আধিপত্য, ভাঙাচোরা দশা আর অপরিচ্ছন্নতার কারণে ঢাকাসহ ছোট বড় শহরগুলোর ফুটপাতে পথচারীদের হাঁটাই কঠিন। একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বলছে—রাজধানী ঢাকার ১ হাজার ৮৪০ কিলোমিটার ফুটপাতের মধ্যে অন্তত ১০৮ কিলোমিটার অংশ ব্যাপকভাবে অবৈধ দখলের কবলে রয়েছে। এই অবৈধ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন প্রতিরোধ বা আইনগত কঠোর ব্যবস্থা আজো গড়ে ওঠেনি।  ঢাকার অনেকগুলো ফুটপাতে ভাঙা টাইলস,ইট উঠে গিয়ে বড় গর্ত হয়ে যাওয়া চোখে পড়ে অনেকেরই। একটি ফুটপাতের আদর্শ প্রশস্ততা ধরা হয় অন্তত দুই মিটার। ঢাকা মহানগর এলাকায় যত ফুটপাত আছে,তার প্রায় ৬৮ শতাংশেই এই ন্যূনতম প্রশস্ততা নেই। শহরগুলোর পথচারীরা ভুলতেই বসেছেন যে—ফুটপাত মূলত তাদের জন্যই তৈরি, তাদেরই রয়েছে স্বাচ্ছন্দ্যে হেঁটে চলার অধিকার। অথচ তারা হাঁটতে গিয়ে দেখেন—অনেক জায়গায় দোকানপাটের পসরা। সেখানে পা ফেলার জায়গা পর্যন্ত থাকে না। ফলে তারা অনেক সময় মূল সড়কে নেমে হাঁটতে বাধ্য হন। এতে যানজট আরো বাড়ে। অন্যান্য শহরের মতো বগুড়া শহরের ফুটপাতগুলোর অবস্থাও অত্যন্ত শোচনীয়। বেশিরভাগই ভাসমান দোকানদার ও অবৈধ দখলে। শহরের মূল কেন্দ্র সাতমাথা, কাঁাঠালতলাসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে ফুটপাত ভাড়া দিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে, যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। কিন্তু সেই উচ্ছেদ কখনও স্থায়ী হয় না। কিছুদিনের মধ্যে তা আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে। ফুটপাতকে ঘিরে সারাদেশে এ অবস্থাই চলছে যুগ যুগ ধরে। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তর্ৃপক্ষের(ডিটিসিএ) একটি তথ্য বলছে—বর্তমানে ঢাকা মহানগর এলাকার ৩৮ শতাংশ মানুষ হেঁটে গন্তব্যে যান। ২০০৯ সালে এর পরিমাণ ছিল ২০ শতাংশ। অথার্ৎ গত দেড় দশকে হেঁটে গন্তব্যে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান একটি জাতীয় দৈনিককে জানান—ঢাকা শহরে যানজটের কারণে অনেকে কর্মস্থলের আশপাশে বসবাসের চেষ্টা করেন। এ শ্রেণির মানুষ হেঁটে কর্মস্থলে যাতায়াত করেন। আবার মহানগরীতে গণপরিবহনের সংকট থাকায় অনেকে বাধ্য হয়ে ব্যবহার অনুপযোগী ফুটপাত দিয়ে হাঁটেন। কিন্তু ফুটপাতগুলোর বড় সমস্যা হলো অবৈধ দখল। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, পুলিশ প্রশাসনসহ ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় থেকে বিভিন্ন সময় ফুটপাত হকারমুক্ত রাখার চেষ্টা করা হলেও সেগুলো কোন সুফল বয়ে আনেনি। ফুটপাথে বসে ব্যবসা করা বা দোকান করার সুযোগ দেওয়ার নামে অবৈধভাবে টাকা আদায় করে একটি চক্র। হকার বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জীবিকার তাগিদে ফুটপাতে দোকান বসান। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি তাদের ভয় দেখিয়ে উচ্ছেদ করার হুমকি দিয়ে কিংবা নিরাপত্তা দেওয়ার কথা বলে নিয়মিত টাকা আদায় করে। এটি মূলত চাঁদাবাজি। এই চাঁদাবাজি নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই সুস্পষ্ট করে। অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক প্রশ্রয়ও চাঁদাবাজদের প্রভাব বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া গ্রামে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় গ্রাম থেকে আসা দরিদ্র মানুষ অল্প পুঁজি নিয়ে ব্যবসার উদ্দেশ্যে ফুটপাতকেই জীবিকা অর্জনের স্থান হিসেবে বেছে নেয়। তখন তৈরি হয় এক শ্রেণির দুর্বৃত্তদের চাঁদাবাজির সুযোগ। এই বাধাহীন সুযোগ আর কতকাল চলবে? এটি বন্ধ করতে সাধারণ নাগরিকের প্রথম দায়িত্ব হলো ফুটপাত দখলের  বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। আর হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও ঐক্যবদ্ধ হয়ে চাঁদা না দেওয়ার মানসিকতা থাকা দরকার। সরকারের দায়িত্ব হলো—ফুটপাত ব্যবস্থাপনায় সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, হকারদের নির্দিষ্ট এলাকায় পুনবার্সন করা ও বৈধ লাইসেন্স দেওয়া। একই সঙ্গে প্রয়োজন প্রশাসনের ভেতরে দুনীর্তি ও প্রশ্রয়ের প্রমাণ পাওয়া গেলে তা কঠোরভাবে দমন করা। দারিদ্র্য বিমোচনমূলক কর্মসূচি জোরদার করাও সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, যেন মানুষ বাধ্য হয়ে ফুটপাতে বসে অবৈধভাবে জীবিকা নিবার্হের পথে না নামে। 

রাজধানীসহ শহরবাসীর ফুটপাতে হাঁটার প্রবণতাকে উৎসাহিত করতে এবং যানজট নিরসনের টেকসই সমাধানের অংশ হিসেবে ফুটপাত উন্নয়নসহ পথচারীবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলার পরামর্শ দিচ্ছেন যোগাযোগ অবকাঠামো বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা। তবে আশু প্রয়োজন হলো— হকারদের পুনবার্সনের মাধ্যমে ফুটপাতগুলোকে অবিলম্বে দখলমুক্ত করা। সেই দখলমুক্তি যেন টেকসই হয়, যেন সেগুলো পুনরায় দখলকারীদের কবলে  না চলে যায়। এটি নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। কাজটি কঠিন তবে সরকারের জন্য অসম্ভব নিশ্চয়ই নয়। পথচারীবান্ধব ফুটপাতের জন্য প্রয়োজন কমপক্ষে ৫ ফুট চওড়া পায়ে হাঁটা পথ, যাতে মানুষ সহজে পাশাপাশি হাঁটতে পারে বা একে অপরকে অতিক্রম করতে পারে এবং যা হুইল চেয়ার চলাচলের জন্যও উপযোগী হবে। একই সাথে রাতে পথচারীদের নিরাপত্তা বাড়াতে পযার্প্ত ও কার্যকর আলোর ব্যবস্থা করার পাশাপাশি ফুটপাতগুলো নিয়মিত পরিষ্কার  পরিচ্ছন্ন রাখাও নিশ্চিত করতে হবে। আধুনিক শহরে ফুটপাত শুধু হাঁটার জায়গা নয়, এটি শহরের সৌন্দর্যেরও  একটি অংশ। সংশ্লিষ্ট সকলের সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগেই কেবল সম্ভব ফুটপাতগলোকে পথচারীদের জন্য নির্বিঘ্ন ও আরামদায়ক চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।   

লেখকঃ

রাহমান ওয়াহিদ

কবি, কথাশিল্পী ও কলামিষ্ট

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/161464