একাত্তরের এই দিনে কঠোর সামরিক নিরাপত্তায় ঢাকায় আসেন ইয়াহিয়া খান
স্টাফ রিপোর্টার : একাত্তরের ১৫ মার্চ ছিল সোমবার। লাগাতার অসহযোগ আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ের অষ্টম দিবস। এই দিনটিতেও শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ, শোভাযাত্রা ও সরকারি, আধা-সরকারি অফিস-আদালত বর্জনের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছিল। এছাড়া আন্দোলনে নিহত বীর শহিদদের উদ্দেশ্যে শোক এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের আশা-আকাঙ্খাকে তোয়াক্কা না করে এক তরফাভাবে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে কালো পতাকা উড়তে থাকে।
১৩ মার্চ জারিকৃত ১১৫নং সামরিক আইন আদেশে সরকারি কর্মচারীদের কাজে যোগদানের নির্দেশ প্রদান করা হলেও কোন বিভাগের কোন সরকারি কর্মচারী এদিন কাজে যোগ দেননি। বরং তারা সামরিক আদেশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করেন এবং ঢাকার নাখালপাড়ায় এক প্রতিবাদ সভা করে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত অসহযোগ কর্মসূচীর প্রতি পুনর্বার একাত্মতা ঘোষণা করেন।
শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করতে একাত্তরের এইদিনে প্রচন্ড বিক্ষোভের মুখে সেনাবাহিনীর প্রায় সব জেনারেলকে সাথে নিয়ে বিকেলে কঠোর সামরিক নিরাপত্তায় ঢাকায় আসেন ইয়াহিয়া খান। বিমানবন্দরে তাকে অভ্যর্থনা জানান নবনিযুক্ত সামরিক গভর্নর ‘বাংলার কসাই’খ্যাত লেফটেনেন্ট জেনারেল টিক্কা খান। এসময় কোনো সাংবাদিক ও বাঙালিকে বিমানবন্দরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। শেখ মুজিবুর রহমান সাদা রঙ্গের গাড়িতে কালো পতাকা উড়িয়ে ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে দেখা করতে যান। ১৬ মার্চ শুরু হবে শেখ মুজিব-ইয়াহিয়া খানের পূর্বনির্ধারিত বৈঠক।
সমঝোতার নাটক করতে ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানে আসলেও মুক্তিকামী বাঙালি তাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি অব্যাহত রাখেন। দেশবাসীকে তাদের অধিকার বঞ্চিত করার প্রতিবাদস্বরূপ শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরা তাদের খেতাব বর্জন করেন। শিল্পাচার্য জয়নুলের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে সাংবাদিক-সাহিত্যিক আবুল কালাম শামসুদ্দীন এবং অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী তাদের রাষ্ট্রীয় খেতাব বর্জন করেন। বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এ খেতাব বর্জনের বিষয়টি ব্যাপক সাড়া ফেলে। বুদ্ধিজীবীদের পাশাপাশি টেলিভিশন নাট্যশিল্পী সংসদ এদিন স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। তাদের সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন আবদুল মজিদ। বক্তব্য রাখেন-সৈয়দ হাসান ইমাম, ফরিদ আলী, শওকত আকবর, আলতাফ হোসেন, রওশন জামিল, আলেয়া ফেরদৌস প্রমুখ।
বিকেলে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আয়োজনে নতুন সামরিক ফরমান জারির প্রতিবাদে বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে সভা হয়। সেখানে বাংলাদেশ রক্ষায় সব নাগরিককে অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানানো হয়। সভা শেষে বিক্ষুব্ধ জনতার মিছিল ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। সংগ্রাম পরিষদের মিছিলটি কাকরাইল, বেইলি রোড হয়ে প্রেসিডেন্ট ভবনের সামনে দিয়ে অতিক্রম করে। ইয়াহিয়া খান তখন ওই ভবনেই অবস্থান করছিলেন। ভবনের সামনে সামরিক বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য উপস্থিতি ছিল। পরে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে গিয়ে মিছিলটি শেষ হয়।
কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে ঢাকার চেকপোস্টগুলো তুলে নেয়। এদিন কবি সুফিয়া কামালের সভাপতিত্বে তোপখানা রোডে নারীদের এক সভা হয়। কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে বেতার ও টিভিশিল্পীরা দেশাত্মবোধক গান করেন।
চিকিৎসকরা কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে আয়োজিত সভা থেকে অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে একাত্মতা প্রকাশ করেন এবং মুক্তি আন্দোলনের লক্ষ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামে প্রস্তুত হওয়ার জন্য জনতার প্রতি আহ্বান জানান।
জেনারেল ইয়াহিয়া খানের এমএলআর অর্থাৎ মার্শাল ল’ রেগুলেশনস অমান্য করে সামরিক বিভাগের অধীনে অর্ডিন্যান্স ডিপোর প্রায় ১১ হাজার কর্মচারীর কেউই এইদিন কাজে যোগদান করেননি। সরকারি কর্মচারীগণ এএলআর অর্থাৎ আওয়ামী লীগ রেগুলেশনস অনুযায়ী তাদের কর্মসূচি পালন করে। বস্তুত বাংলাদেশ তখন এমএলআর-এর বিপরীতে এএলআর দিয়ে পরিচালিত হতে থাকে।
এদিন চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হয় শিল্পী, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকদের বিশাল সমাবেশ। অধ্যাপক আবুল ফজলের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন-অধ্যাপক মমতাজউদ্দিন, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান, সাংবাদিক নূর ইসলাম প্রমুখ।
নেত্রকোনায় সুইপার ও ঝাড়ুদাররা ঝাড়ু, দা, লাঠি ও কোদাল নিয়ে মিছিল করে। বগুড়া, খুলনা, রংপুর, লাকসাম, কুমিল্লা ও কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে স্বাধীনতার পক্ষে মিছিল-সমাবেশ হয়।
খুলনার হাদীস পার্কে এক সমাবেশে জাতীয় লীগ প্রধান আতাউর রহমান খান বলেন, ‘বাংলার প্রতিটি মানুষ আজ বঙ্গবন্ধুর পেছনে একতাবদ্ধ। রেডিও, টিভি, ইপিআর, পুলিশ বাহিনী, সেক্রেটারিয়েট প্রভৃতি আজ আওয়ামী লীগ প্রধানের আজ্ঞাবাহী।’
রাতে ঢাকায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ এক বিবৃতির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত অসহযোগ আন্দোলনের ব্যাখ্যা করেন এবং বলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের এই আহ্বানে জনগণের নিরঙ্কুশ সাড়া পাওয়া গেছে।’
এদিন ১৪ মার্চ করাচির সভায় পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টোর দুই দলের অধীনে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তাবের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ হয়। পশ্চিম পাকিস্তানে জমিয়তে উলামায়ে পাকিস্তান, ন্যাপ (ওয়ালী), মুসলীম লীগ (কাউন্সিল) এবং পিডিপির নেতারা এক বিবৃতিতে ভুট্টোর ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেন এবং উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্যে তাকেই দায়ী করেন।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/161274