জ্বালানি সংকটের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পথ কোথায়

জ্বালানি সংকটের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পথ কোথায়

কথায় আছে, নগরীতে আগুন ধরলে দেবালয়ও রক্ষা পায় না। বাংলাদেশ যেন সেই কথারই তীব্র প্রতিফলন। সংঘাতে সরাসরি জড়িত না থেকেও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের খেলায় ভুক্তভোগী হয়ে উঠছে বাংলাদেশ। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখন আর কেবল কূটনীতির মেঘ নেই; সেখানে যুদ্ধের সাইরেন বাজছে। ইরান ও  ইসরায়েল দীর্ঘদিনের ছায়াযুদ্ধ যখন সরাসরি সংঘাতে রূপ নেওয়ার উপক্রম হয়, তখন তার কম্পন কেবল তেহরান বা তেল আবিবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সেই কম্পনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ তথা হরমুজ প্রণালী।এই সরু জলপথটি এখন কেবল তেলের বাণিজ্যপথ নয়; বরং বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করার এক শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার। একদিকে যুদ্ধের সাইরেন, অন্যদিকে প্রতিশোধ ও প্রতিরোধের স্নায়ুযুদ্ধ। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চলছে নানামুখী শক্তিপ্রদর্শনের আয়োজন। সা¤প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের ইরান—ইসরায়েল উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরান কৌশলগত শক্তির প্রতিচ্ছবি দেখাতে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার পদক্ষেপ নেয়। বিশ্ব মানচিত্রে তাকালে ওমান উপসাগর ও পারস্য উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই প্রণালীটিকে হয়তো একটি সরু জলপথ মনে হতে পারে। কিন্তু ভূরাজনীতি ও বিশ্ব অর্থনীতির সমীকরণে ২১ মাইলের এই পথটি মূলত বিশ্বের “ক্যারোটিড আর্টারি” অর্থাৎ প্রধান ধমনী। এটি বিশ্বের অন্যতম স্পর্শকাতর পরিবহন পথ। মধ্যপ্রাচ্যের খনিজ তেল ও গ্যাস বিশ্ববাজারে পেঁৗছানোর প্রধান রুট এটিই। সারা বিশ্বের উৎপাদিত খনিজ তেলের প্রায় ২০—২৫ শতাংশ এই সরু পথ দিয়ে পরিবাহিত হয় অর্থাৎ পৃথিবীর প্রায় এক—পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল এখান দিয়ে চলাচল করে। প্রণালীটির একপাশে ইরান, অন্য পাশে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। সংকীর্ণতম স্থানে এর প্রস্থ মাত্র ৩৩ কিলোমিটার। এই জলপথ বন্ধ হওয়ার বড় ধরনের ভুক্তভোগী বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলো। কারণ বাংলাদেশ তার জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশ বহুমুখী অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে পারে যদিও তার দৃশ্যমান প্রভাব এখনো পুরোপুরি প্রকাশ পায়নি। তবে অদূর ভবিষ্যতে এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলেই ধারণা করা যায়। বাংলাদেশ মূলত এই রুট ব্যবহার করে ইরান, ইরাক, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব  সাতটি দেশের সঙ্গে পণ্য আমদানি—রপ্তানি করে।


মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে সেখানে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিরাও কর্মসংস্থান বা আয়ের সংকটে পড়তে পারেন। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে, আমদানি ব্যয় বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়বে এবং দেশে তীব্র মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক অস্থিরতা ও ডলার সংকটে অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে। এর ওপর জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি হলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে এবং রপ্তানি খাত বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়লে শিল্পখাতে হয় লোডশেডিং, নয়তো উচ্চ ট্যারিফ কিংবা উভয় ধরনের ঝুঁকিই তৈরি হতে পারে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য আগাম কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশের একটি বড় কাঠামোগত সমস্যা হলো—এখানে অধিকাংশ পণ্যের মজুদ দুই থেকে তিন সপ্তাহের বেশি রাখা হয় না।


এ পরিস্থিতিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, দেশে জ্বালানির কৌশলগত মজুদ বাড়াতে হবে, যাতে সাময়িক সংকটেও কয়েক মাস টিকে থাকা সম্ভব হয়। দ্বিতীয়ত, শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর না করে রাশিয়া, মধ্য এশিয়া বা আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি আমদানির দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করতে হবে। তৃতীয়ত, দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে, যাতে আমদানিনির্ভরতা কমে। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক ফোরামে এই রুট সচল রাখার পক্ষে কূটনৈতিক অবস্থান জোরালো করতে হবে এবং বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা বিষয়ে সমন্বয় বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, রাষ্ট্রীয়ভাবে জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করতে হবে, যাতে সংকটকালে সিন্ডিকেট বা বাজারচাপের কারণে সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে না পড়ে। 


বাংলাদেশের সামনে যেমন ঝুঁকি রয়েছে, তেমনি রয়েছে সম্ভাবনাও। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়া বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ নয় বরং এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্নও। ভৌগোলিক দূরত্ব থাকলেও অর্থনৈতিকভাবে আমরা এই জলপথের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই এই সংকট মোকাবিলায় পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক নীতিতে বুদ্ধিবৃত্তিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিকল্প নেই। আগাম সতর্কতা, কৌশলগত পরিকল্পনা ও সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতাই হতে পারে আমাদের একমাত্র ঢাল। সরকার যদি সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলায় এগিয়ে আসে, তবে আশঙ্কার মেঘ কিছুটা হলেও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

লেখক :

ফারজানা চৌধুরী

শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/161189