নদী মানবজীবন ও প্রকৃতির জন্য আশীর্বাদস্বরূপ

নদী মানবজীবন ও প্রকৃতির জন্য আশীর্বাদস্বরূপ

নদী শব্দের বেশ কিছু সুন্দর ও অর্থবহ সমার্থক শব্দ বা অপর নাম রয়েছে। নদীকে সাধারণত তটিনী, তরঙ্গিনি, সরিৎ, ে¯্রাতস্বিনী, নির্ঝরিণী, শৈবলিনী, গাঙ, প্রবাহিনী, কলোলিনী বা সিন্ধু বলা হয়ে থাকে। এই নামগুলো নদীর প্রবহমানতা, জলের শব্দ এবং তীরের বর্ণনা নির্দেশ করে। যেমন তটিনী: নদীর তট বা পাড় আছে বলে, তরঙ্গিনী: ঢেউ বা তরঙ্গ আছে যাতে, সরিৎ: প্রবহমান জলধারা, ে¯্রাতঃস্বিনী: ে¯্রাত বা ধারা আছে যা, নির্ঝরিণী: নির্ঝর বা ঝর্না থেকে উৎপন্ন, শৈবলিনী: শৈবাল বা উদ্ভিদযুক্ত নদী, গাঙ: সাধারণ বা আঞ্চলিক ব্যবহার, প্রবাহিনী: অনবরত বয়ে চলে যা, কল্লোলিনী: কল্লোল বা জলের শব্দপূর্ণ, সিন্ধু: নদী বা সমুদ্র। 

সাধারণত পর্বত, উঁচু ভূমি, পাহাড়ের গিরিখাত থেকে সৃষ্ট ঝর্নাধারা, বরফগলিত ে¯্রাত কিংবা প্রাকৃতিক পরিবর্তন থেকে নদীর জন্ম। হাজার হাজার ফুট উঁচু পাহাড় থেকে তীব্র বেগে ধেয়ে আসা জলরাশিতে এক ধরনের প্রচন্ড গতি সঞ্চারিত হয়। ছুটে আসা এই দ্রুত গতিসম্পন্ন জলে¯্রাত স্থলভাগ অতিক্রম করার সময় নদী নামে পরিচিত হয়। নদী যখন পাহাড়ি এলাকায় ঢালু পথ বেয়ে প্রবাহিত হয় তখন তার যৌবনাবস্থা। এ সময় নদী ব্যাপক খননকাজ চালায় বা ভূমিক্ষয় করে এবং উৎপত্তিস্থল থেকে নুড়ি, পাথর, বালি, খনিজ, পলি প্রভৃতি ে¯্রাতের ধারায় অতি সহজে সমুদ্রে নিক্ষেপের উদ্দেশ্যে ধাবিত করে। নদী এভাবেই আবহমানকাল ধরে পৃথিবীর পর্বত, পাহাড় ও উচু ভূমি ক্ষয় করে চলেছে। নদীকে তার গঠন অনুযায়ী শাখানদী, উপনদী, প্রধান নদী, নদ ইত্যাদি নামে অভিহিত করা যায়।

নদী মানবজীবন ও প্রকৃতির জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। এটি সুপেয় পানি সরবরাহ, উর্বর পলিমাটি তৈরির মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন, মাছের প্রধান উৎস, এবং সহজ ও সস্তা পানিপথের জন্য যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। এছাড়াও, নদী জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে, বাস্তুতন্ত্র ভারসাম্যপূর্ণ রাখে এবং নদীর অববাহিকায় প্রাচীন ও আধুনিক সভ্যতা বিকাশে মূল ভূমিকা পালন করে। বিশ্বের বিভিন্ন সভ্যতার সূত্রপাত হয় নদীকে কেন্দ্র করে। জীবন ও জীবিকায় প্রাচীন যুগ থেকেই মানুষ নদ নদীর তীরবর্তী সমতলভূমিতে বসবাস শুরু করে। নদীকে ঘিরেই বিশ্বের প্রতিটি শহর, বন্দর, বাজার প্রভৃতি গড়ে উঠেছে। নদ—নদীই মানুষের খাদ্য ও রোজগার এর প্রধান উৎস হিসেবে ভূমিকা পালন করে। মালামাল পরিবহন ও যোগাযোগের সহজ উপায় হলো নৌকা। মালামাল পরিবহনে খুবই স্বল্প খরচে নৌকার জুড়ি মেলা ভার। সময়ের বিবর্তনে এর স্থান দখল করেছে ইঞ্জিন চালিত নৌকা, স্টিমার। মাঝ নদীতে জেলেরা উত্তাল তরঙ্গের সাথে যুদ্ধ করে মাছ আহরণ করে। নদী পারাপারে ইজারাদার কর্তৃক কর হিসেবে অর্থ আদায় করতে দেখা যায়।

 সুজলা—সুফলা শস্য শ্যামল এই দেশকে বলা হয় নদী—মাতৃক দেশ। এ দেশে মানুষের সঙ্গে নদীর গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। গ্রাম থেকে শহরের কূল ঘেঁষে বয়ে গেছে অসংখ্য নদ—নদী। বাংলাদেশের নদ—নদীর সংখ্যায় বলা হয়ে থাকে হাজার নদীর দেশ বাংলাদেশ। তবে বাংলাদেশে ঠিক কত নদী আছে তার সঠিক পরিসংখ্যান বাংলাদেশ নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের কাছে নেই। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন যে নদীর সংখ্যা প্রকাশ করেছিল, সেখানেও ভুলে ভরা তথ্য। কোন নদী কোথা থেকে উৎপত্তি হয়ে কোথায় শেষ হয়েছে কিংবা একটি নদী আরেকটি নদীকে কোথায় অতিক্রম করেছে এসব যাবতীয় তথ্য—প্রমাণ এখনো মানুষের অজানা। অনেক গবেষকদের মতে বাংলাদেশে উপনদী ও শাখানদীর মোট সংখ্যা ২২৫। তবে নদী, উপনদী ও শাখানদীর সর্বমোট সংখ্যা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে যথেষ্ট মতদ্বৈততা আছে। আর বাংলাদেশের উপর দিয়ে বয়ে গেছে আন্তর্জাতিক ৫৭টি নদী। 

নদী—মাতৃক বাংলাদেশে মানুষের জীবনের সঙ্গে নদী অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে এবং নদী বাঁচলে পরিবেশ ও জীবন বাঁচবে। নদী অনেক কারণে পৃথিবীতে জীবনের জন্য অত্যাবশ্যক। নদীর প্রধান উপকারিতাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নদী মানুষ, প্রাণী ও উদ্ভিদের জন্য বিশুদ্ধ পানির প্রধান উৎস। নদী অববাহিকার মাটি খুব উর্বর হয়, যা কৃষিকাজের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। নদী হাজার হাজার প্রজাতির মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর বাসস্থান, যা থেকে মাছ শিকারের মাধ্যমে মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয় । নদী থেকে আসা পলিমাটি জমির উর্বরতা বাড়ায়। যাতায়াত ও মালামাল পরিবহন ক্ষেত্রে নৌপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নৌপথের কারণে সাশ্রয়ী মূল্যে মালামাল বহন করা যায়। যা আমদানি—রপ্তানির ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এখনও দেশের প্রায় এক—তৃতীয়াংশ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অভ্যন্তরীণ নৌপথ ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। এক পরিসংখ্যান হতে জানা যায় যে, নৌ—যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রতিটন মালামাল প্রতি কিলোমিটার ব্যয় হয় মাত্র ০.৯০ টাকা। যেখানে রেলপথে ২.০০ টাকা এবং সড়কপথে ২.২০টাকা ব্যয়। নদীর তীরে মানুষ অবসর সময় কাটায়, যা প্রকৃতির সাথে সংযোগ স্থাপন করে। সুতরাং প্রায় সব ক্ষেত্রে নদ—নদী কোনো না কোনোভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। আমাদের সবারই উচিত নদীকে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার না করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করা। নদীর অপকারিতার দিকে তাকালে দেখা যায়, নদীগুলি ভাঙ্গণের ফলে মানুষ ভূমিহীন, গৃহহীন হয়ে পড়ে। ফলে মানুষ ভিটে মাটি ও সহায় সম্বল হারিয়ে দিশেহারা হয়ে শহরমুখি হয়। সামাজিক বন্ধন বিঘ্নিত ঘটে।

 নদীর পানি থেকে শক্তি উৎপাদন বেলজিয়ামের ওয়াটারমিল একটি দৃষ্টান্ত। দ্রুম্নত প্রবাহিত নদী এবং জলপ্রপাতগুলি জলকল এবং জলবিদ্যুৎ কেন্দে্রর মাধ্যমে শক্তির উৎস হিসাবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ওয়াটারমিলের প্রমাণ দেখায় যে সেগুলি বহু শত বছর ধরে ব্যবহার করা হচ্ছে, উদাহরণস্বরূপ ডনবি ক্লিক মিলের অর্কনিতে। বাষ্প শক্তি উদ্ভাবনের আগে, সিরিয়াল পিষানোর জন্য এবং উল এবং অন্যান্য বস্ত্র প্রক্রিয়াকরণের জন্য ওয়াটারমিলগুলি ইউরোপ জুড়ে সাধারণ ছিল। ১৮৯০—এর দশকে নর্থম্বারল্যান্ডের ক্র্যাগসাইডের মতো জায়গয় নদীর জল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রথম মেশিনগুলি স্থাপিত হয়েছিল এবং সা¤প্রতিক দশকগুলিতে বিশেষ করে নরওয়ের মতো আদ্রর্ পার্বত্য অঞ্চলে জল থেকে বৃহৎ আকারে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পেয়েছে।

নদী ধ্বংসের মানবসৃষ্ট কারণগুলি, যেমন অতিরিক্ত শোষণ এবং দূষণ, সবচেয়ে বড় হুমকি এবং উদ্বেগ যা নদীগুলিকে পরিবেশগতভাবে মৃত এবং শুকিয়ে দিচ্ছে। প্লাস্টিক দূষণ প্রাকৃতিক পরিবেশে প্লাস্টিকের স্থায়িত্বের কারণে জলজ জীবন এবং নদীর বাস্তুুতন্ত্রের উপর হুমকির সৃষ্টি করে। প্লাস্টিক ধ্বংসাবশেষের ফলে কচ্ছপ, পাখি এবং মাছের মতো জলজ প্রাণীর গুরুতর আঘাত ও মৃত্যুর কারণ হতে পারে। নদ—নদীর আশেপাশে মানুষের জীবিকাও প্লাস্টিক দূষণ দ্বারা প্রভাবিত হয়। ড্রেন এবং অন্যান্য জলবাহী অবকাঠামো আটকে যাওয়ার ফলে বন্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের দেশের নদীগুলো এখন হুমকির সম্মুখীন।

 নদী গবেষকদের মতে, নদী কখনো একা মরে না। নদীর মৃত্যু হলে পাড়ের জনপদও একটু একটু করে মরতে শুরু করে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘বিশ্ব নদীকৃত্য দিবস’ পালন করা হয়। নদী রক্ষায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হয় বিশ্ব নদীকৃত্য দিবস। দিবসটি পালনের মূল উদ্দেশ্য মানুষকে নদী রক্ষায় সচেতন করা। তবে আমাদের দেশে নদী ও মানুষের জীবন অবিচ্ছেদ্য হওয়ায় নদী নিয়ে পরিবেশবাদীসহ সাধারণ মানুষের উদ্বেগ রয়েছে। আজ ১৪ মার্চ আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস। সারা বিশ্বে বিভিন্ন অয়োজনের মাধ্যমে দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে। দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘নদী বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও’। দিবসটি পালনের মূল উদ্দেশ্য মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি, নদীর প্রতি মমত্ববোধ বাড়ানো, ভালোবাসা সৃষ্টি ও সংরক্ষণ বিষয়ে করণীয় জাগ্রতবোধ বাড়ানো।

আজ বাংলাদেশে অনেক নদ—নদী মৃত্যু উপত্যকায়। আর কয়েক বছর পর ২৫টিরও অধিক নদী তার অস্তিত্ব হারাবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। অনেক নদী আজ প্রভাবশালীদের দখলে। বিগত সরকারগুলো নদীকে দখলমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে, তবে এখন পর্যন্ত নদীর পানিকে দূষণমুক্ত করার জন্য খুব বেশি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। যার ফলে নদী তার স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্য হারাচ্ছে। বর্তমান সরকারের কাছে নদী প্রেমিক মানুষের আশা,তাদের দেয়া নদী—খাল খনন ও সংরক্ষণের ওয়াদা নিশ্চয়ই পালন করবেন! নদী—খাল খনন ও দখল—দূষণমুক্ত করে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন।

নদী রক্ষায় কার্যকর আইন প্রয়োগ, সুশাসন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা জরুরি। তা ছাড়াও নদী রক্ষা কমিশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট, যৌথ নদী কমিশন, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি টেকসই কর্মপরিকল্পনা হাতে নিতে হবে, যাতে করে নদী তার আগের গতিপথ ফিরে পায়। দূষণ, দখল ও পয়োবর্জ্য নিষ্কাশন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বাভাবিক নাব্য নদী ও নৌপথ গড়ে তুলতে হবে। দেশের মানুষ নদীর মালিকানা চায়, নদীর সব ব্যবহারকারীর কর্তৃত্ব সমন্বয়কারী চায়, জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতা গ্রহণকারী চায়। নদীমাতৃক বাংলাদেশে জালের মতো বিছিয়ে থাকা নদীগুলো মালিকানার অভাবে অস্তিত্ব¡ হারাতে বসেছে। আমার বিশ্বাস, রাষ্ট্র নদী রক্ষায় উদ্যোগী হবে এবং জাতীয় নদী কমিশনকে সংস্কার করবে।

লেখক

মোঃ জিয়াউর রহমান 

পরিবেশ সংগঠক ও প্রাবন্ধিক

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/161184