আশা—আকাঙ্খার বাতিঘর

আশা—আকাঙ্খার বাতিঘর

বিগত বছরগুলোর পর্যালোচনার ভিত্তিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)—এর তথ্য বলছে— বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ পরিচালনায় প্রতি মিনিটে গড় ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৬৩ হাজার থেকে ২ লাখ ৭২ হাজার টাকা পর্যন্ত। এই বিশাল ব্যয় জনগণের করের টাকা থেকে মেটানো হয়। কারো ব্যক্তিগত কোষাগার বা দানের টাকায় নয়। সংসদ অধিবেশন হলো রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আইনসভা বা সংসদ সদস্যদের একটি নির্দিষ্ট সময়ে মিলিত হয়ে আইন প্রণয়ন, সংশোধন, বাজেট পাস ও সরকারি কার্যক্রম তদারকির আনুষ্ঠানিক সভা। 

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৭২ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ অধিবেশন আহ্বান, স্থগিত বা ভেঙ্গে দিতে পারবেন। নতুন আইন প্রণয়ন, পুরনো আইন সংশোধন, বাজেট অনুমোদন এবং সরকারের কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এর প্রধান কাজ। সংবিধান অনুযায়ী, বছরে কমপক্ষে দুবার বৈঠক করতে হবে এবং দুই অধিবেশনের মধ্যে ৬০ দিনের বেশি বিরতি থাকা যাবে না। এ সময়ে সংসদ সদস্যরা জনস্বার্থে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা ও বিতর্ক করবেন, এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার জন্য—যা কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আইন পাশ করা নয়, বাস্তবিক অর্থে “জনকল্যাণমুখী”। আজ ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসছে। বাঙালি জাতি সদ্য এক সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উঠে এসেছে। তারা এখন আশাবাদী হতে চায়। এই সংসদের কাছে তাদের প্রত্যাশা অনেক। তাদের করের টাকায় পরিচালিত এই সংসদ সমস্ত সংকট উত্তরণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হোক। 

অযাচিত বাক্যবাণে অন্যের হৃদয়ে ক্ষরণ সৃষ্টির আগে নিজেকে নিয়ে ভাবুন। ভাবুন, আপনার এই কথায় দেশের কি উন্নয়ন হবে? আপনাকে এই কথা বলার জন্য সংসদে পাঠিয়েছে জনগণ! আপনি এই মহান সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছেন জনগণের কৃপায়। তাদের কথা বলুন। কিভাবে তাদের জীবনমান উন্নয়ন হবে সেই পরিকল্পনাগুলো হাতে নিন। এবং স্বচ্ছতার সাথে সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইন তৈরি বা রহিত করুন। বিরোধী দল সরকারি দলের আবার সরকারি দল বিরোধী দলের সমালোচনায় মেতে থাকবেন না। মনে রাখতে ভুলবেন না, এখানে কথা বলতে প্রতি মিনিটে গড় ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৬৩ হাজার থেকে ২ লাখ ৭২ হাজার টাকা পর্যন্ত। আপনার নিজের গল্প শোনার জন্য বা আপনার প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করার জন্য হাজারো অভিধা যোগ করে শেষ—মেষ জগাখিচুড়ি বাক্য তৈরি করবেন—সেটা হবে না। এই জন্য ট্রেনিং জরুরি। আরও জরুরি নিজের সচেতনতা। কারণ, ট্রেনিং “আপনাকে” সচেতন করতে সাহায্য করবে না। কোন বিষয়ে সচেতন হবেন সেই দ্বার উন্মোচন করবে মাত্র, আপনার সচেতন আপনাকেই হতে হবে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় শক্তিশালী বিরোধী দল অপরিহার্য, কারণ তারা সরকারকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সাহায্য করে।

 বিষয়টা এমন—হয়তো আর কিছু আসন পেলেই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ফেলতো তারা। কিন্তু পায়নি। আবার আসনভিত্তিক ভোটের ব্যবধানেও বিরোধী দল কাছাকাছি অবস্থানে থাকে। জনগণের বড়ো একটা অংশ তাদের সমর্থক। সংসদে তাদের জন্য কথা বলা বা প্রতিনিধিত্ব করা যেমন প্রয়োজন তেমনি এরা সংসদে সরকারের কাজের গঠনমূলক সমালোচনা করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে। প্রয়োজনে “শ্যাডো ক্যাবিনেট” বা বিকল্প সরকার গঠন করে, সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবে। সরকার যাতে একনায়কতান্ত্রিক আচরণ করতে না পারে, তার জন্য ভারসাম্য বজায় রেখে সরকারের জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে জনমত গঠন এবং জনগণের যৌক্তিক দাবি সংসদে উপস্থাপন করবেন। সর্বোপরি সরকারের সহযোগী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন বিরোধী দল। তাদের গঠনমূলক সমালোচনাগুলো আগামীতে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে সাহায্য করবে। তখন হয়তো জনগণের ভালোবাসায় তারাই গঠন করবেন সরকার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং মাননীয় সংসদ সদস্যদের সুদূরপ্রসারী বুদ্ধিদীপ্ত বাকচাতুর্যে প্রতিটি মিনিট প্রতিটি কর্মঘন্টা কেবল মাত্র জনহীতকর কাজে ব্যবহৃত হোক আর মহান সংসদ তার কার্যকর ভূমিকা রেখে বাংলাদের সকল শ্রেণিপেশার মানুষের আশা—আকাঙ্ক্ষার বাতিঘরে পরিণত হোক এটাই প্রত্যাশা। তাহলেই জিতবে বাংলাদেশ।

লেখক:

এস এম হুমায়ুন কবির

নির্মাতা এবং সিনিয়র ভিডিও এডিটর,  বাংলাভিশন

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/160899