ঈদের অর্থনীতি: জাকাত —ফিতরার সম্ভাবনা ও বাস্তবতা

ঈদের অর্থনীতি: জাকাত —ফিতরার সম্ভাবনা ও বাস্তবতা

দীর্ঘ এক মাসের সংযম ও সাধনার সময় শেষে আসে পবিত্র ঈদ। ঈদের অনাবিল আনন্দ আর উল্লাস যেন ছড়িয়ে পড়ে ধনী, দরিদ্র, মিসকিন ও এতিমদের জীবনে এটিই ইসলামের মূল শিক্ষা। এই উৎসবের সমান্তরালে ইসলামি বিধানের মাধ্যমে গড়ে ওঠে দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য। দারিদ্র্য বিমোচনের এই অনন্য ও কার্যকর কর্মসূচির নামই হলো ‘জাকাত ও ফিতরা’। বাংলাদেশে প্রায় ৪ কোটি পরিবার রয়েছে, যার একটি বড় অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে অথবা প্রান্তিক পর্যায়ে জীবিকা নির্বাহ করে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য ঈদের আনন্দ নিশ্চিত করতে জাকাত ও ফিতরার ভূমিকা অপরিসীম। 

ঈদের এই বিশাল অর্থপ্রবাহ কেবল আমাদের দেশের বার্ষিক প্রথাগত দানের রীতিনীতি নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার প্রক্রিয়া। দারিদ্র্য বিমোচনে জাকাত ও ফিতরার ভূমিকা অপরিসীম। প্রতি বছর ঈদের প্রাক্কালে বাংলাদেশে যে হাজার হাজার কোটি টাকা জাকাত ও ফিতরা হিসেবে বিতরণ করা হয়, তা যদি খন্ডিত বা বিচ্ছিন্ন না হয়ে একটি সুসংহত ব্যবস্থার অধীনে আসত, তবে এটি নিছক দান হিসেবে না থেকে দারিদ্র্য নিরসনের একটি দীর্ঘমেয়াদী হাতিয়ারে পরিণত হতো। জাকাত ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ। যেসব মুসলমান নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক হন এবং সেই সম্পদ এক বছর ধরে জমা রাখেন, তাদের জন্য সেই সম্পদের ২.৫ শতাংশ জাকাত প্রদান করা ফরজ। 

বাংলাদেশের জাকাত ব্যবস্থার একটি প্রধান সমস্যা হলো এর বিচ্ছিন্নতা। জাকাতের নৈতিক উদ্দেশ্যের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আত্মশুদ্ধি। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করো, যা দ্বারা তুমি তাদের পবিত্র করবে এবং পরিশুদ্ধ করবে।” (সূরা তাওবা: ১০৩)। জাকাত মানুষকে লোভ, কৃপণতা ও অর্থের মোহ থেকে মুক্ত করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ দেখায়। অনেকেই নামমাত্র শাড়ি—লুঙ্গি, ডাল—চাল জাকাত প্রদান করে থাকেন, যা গ্রহীতাকে সাময়িক সহায়তা করলেও দারিদে্র্যর দুষ্টচক্র থেকে বের করে আনতে পারে না। নামমাত্র অর্থ বা পণ্য বিতরণে কোনো পরিবারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এক শতাংশও বৃদ্ধি পায় না; বরং এটি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে এক ধরনের মানসিক নির্ভরতা তৈরি করে। তাদের মধ্যে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, ঈদ এলে কিছু অনুদান পাওয়া যাবে, যা দিয়ে কোনোমতে উৎসবের কেনাকাটা ও ভালো খাবারের জোগান হবে। এই প্রথা কেবল সাময়িক তৃপ্তি দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তাদের জন্য কোনো কর্মসংস্থান বা টেকসই জীবিকার পথ তৈরি করে না। অথচ ইসলামের মূল দর্শন অনুযায়ী, জাকাত কেবল একটি বার্ষিক দান নয়, বরং এটি দারিদ্র্য বিমোচনের একটি সুসংহত হাতিয়ার। জাকাতের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো অভাবী মানুষকে এমনভাবে সহায়তা করা, যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে এবং পরবর্তী সময়ে জাকাত গ্রহীতা থেকে জাকাত দাতার কাতারে উন্নীত হতে পারে।

জাকাত ও ফিতরা কোনো ব্যক্তিগত ইবাদত নয়, বরং এটি সামাজিক ব্যাধি নির্মূলের অন্যতম প্রধান অবলম্বন। একে সামাজিক বিমা বা সুরক্ষা জাল হিসেবে কার্যকর করতে হলে আমাদের বিতরণ পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। জাকাতের টাকা সরাসরি নগদ অর্থ হিসেবে না দিয়ে দারিদ্র্য বিমোচনের অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। যেমন—ভূমিহীন কৃষকের জন্য সেচ পাম্প বা গবাদি পশু কিনে দেওয়া, রিকশাচালককে রিকশা, দর্জিকে সেলাই মেশিন কিংবা কোনো ব্যবসায় অল্প বিনিয়োগ ইত্যাদি প্রকল্প হিসেবে পালন করতে হবে। এছাড়া শিক্ষিত বেকারের জন্য দক্ষতা অর্জনের সুযোগ বা তরুণ যুবকদের জন্য কারিগরি শিক্ষায় এনরোলমেন্ট করিয়ে দেওয়াও জাকাতের অন্যতম খাত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের বিনিয়োগ একজনের পক্ষে কষ্টকর হতে পারে, তাই ৩ থেকে ৪ জন মিলে একত্রে জাকাত প্রদান করলে তা আরও ফলপ্রসূ হবে।

বর্তমান ডিজিটাল বাংলাদেশে ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে জাকাতের টাকা কোথায়, কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তা রিয়েল টাইমে মনিটরিং করা সম্ভব। এর ফলে ধনী ব্যক্তিদের আস্থা বাড়বে এবং তারা আরও বেশি উদার হয়ে জাকাতের টাকা এই তহবিলে জমা দেবেন। ফিতরা যেহেতু দ্রুত বিতরণযোগ্য, তাই একে স্থানীয় পর্যায়ে দরিদ্র শিশুদের শিক্ষা এবং পুষ্টির জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। ফিতরার অর্থ দিয়ে ‘ফুড ব্যাংক’ পরিচালনা করা সম্ভব, যা ঈদের পর অন্তত এক মাস দরিদ্রদের খাদ্য নিরাপত্তা দেবে। এজন্য মসজিদ ভিত্তিক ফিতরা সংগ্রহের পাশাপাশি, মোবাইল ব্যাংকিং ও অ্যাপ—ভিত্তিক ফিতরা সংগ্রহের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এটি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে। বিকাশ, রকেট, নগদের মতো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে ফিতরা সংগ্রহের ব্যবস্থা করলে দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের জন্যই এটি সহজ হবে।

 পরিশেষে, অর্থনীতির ভাষায় জাকাত হলো সম্পদ পুনর্বণ্টনের একটি ব্যবস্থা, যা সমাজের উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে আনে। ফিতরা হলো ঈদের আনন্দকে সমানভাবে বণ্টন করার একটি মাধ্যম। এই দুইয়ের সমন্বয়েই গড়ে ওঠে একটি কল্যাণমূলক অর্থনীতি। সরকার, বেসরকারি সংস্থা, ধর্মীয় নেতা এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি ‘ডিজিটাল ও টেকসই জাকাতব্যবস্থা’ গড়ে তোলা সময়ের দাবি। আসুন, আমরা আমাদের জাকাত ও ফিতরাকে কেবল সাময়িক দান হিসেবে না দেখে, একটি দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার বিনিয়োগ হিসেবে দেখি। এই বিনিয়োগই হবে আমাদের পরকালের সঞ্চয় এবং ইহকালের কল্যাণ। 

লেখক:


লাবনী আক্তার শিমলা

শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/160896