মেয়াদ শেষ কেন্দ্রীয় কমিটির, ছাত্রদলে নতুন নেতৃত্বের আলোচনায় ডজনখানেক ছাত্রনেতা

মেয়াদ শেষ কেন্দ্রীয় কমিটির, ছাত্রদলে নতুন নেতৃত্বের আলোচনায় ডজনখানেক ছাত্রনেতা
সাকিব হাসান : বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপির) সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি এবং নাছির উদ্দীন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে গঠিত কমিটির দুই বছরের মেয়াদ গত ১ মার্চ পূর্ণ হয়। এর পর থেকেই সংগঠনটির ভেতরে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
 
ছাত্রদলের সর্বশেষ পাঁচটি কেন্দ্রীয় কমিটির মধ্যে চারটি প্রায় দুই বছর করে দায়িত্ব পালন করেছে। তবে অতীতে রাজীব–আকরাম কমিটি প্রায় পাঁচ বছর দায়িত্বে ছিল, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি কমিটি হিসেবে ধরা হয়।
 
সংগঠনের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ দুই বছর এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলা পর্যায়ের কমিটির মেয়াদ এক বছর। তবে বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই এসব কমিটি নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় দায়িত্বে থাকার নজির রয়েছে।
 
২৬০ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়েও বিভিন্ন সময়ে সমালোচনা হয়েছে। শীর্ষ নেতাদের ঘনিষ্ঠদের প্রাধান্য দেওয়া, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে সংগঠনের ভেতরে আলোচনা ছিল।
 
নতুন কমিটি নিয়ে আলোচনা :
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপির তেজগাঁও কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে উপদেষ্টারা দলের সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন কার্যক্রম দ্রুত শুরু করার পরামর্শ দেন। এরপর থেকেই বিএনপির অন্যান্য অঙ্গ সংগঠনের মতো ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি এবং এক নম্বর ইউনিট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় নতুন নেতৃত্ব আসতে পারে বলে নেতাকর্মীদের মাঝে জোড়ালো গুঞ্জন আছে।
 
কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন নেতৃত্ব গঠনের দাবি জোরালো হয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইতোমধ্যে তদবির, যোগাযোগ এবং সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়িয়েছেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং যে কোনো সময় তা ঘোষণা করা হতে পারে।
 
সম্ভাব্য প্রার্থীরা দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচি ও অনুষ্ঠানে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন। পাশাপাশি কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে আড্ডা, ইফতার মাহফিল এবং বিভিন্ন সাংগঠনিক কার্যক্রমও পরিচালনা করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও অনেকেই তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং নির্যাতনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন।
 
ডজনখানেক নেতা আলোচনায় :
সংগঠন সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন কমিটির শীর্ষ পদে অন্তত ডজনখানেক নেতার নাম ঘুরে ফিরে আলোচনায় আসছে। এর মধ্যে বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা এবং সাবেক কিছু কেন্দ্রীয় নেতাও রয়েছেন।
 
বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বড় কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় থাকা নেতাদের মধ্য থেকে কয়েকজনের নাম বেশি শোনা যাচ্ছে।
 
সভাপতি পদে সম্ভাব্যরা :
সভাপতি পদে আলোচনায় থাকা নেতাদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান এবং প্রচার সম্পাদক শরিফ প্রধান শুভ। এছাড়া কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি খোরসেদ আলম সোহেলের নামও আলোচনায় রয়েছে।
 
সাধারণ সম্পাদক পদে সম্ভাব্যরা:
সাধারণ সম্পাদক পদে সম্ভাব্যদের তালিকায় রয়েছেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. রাজু আহমেদ, গাজী মো. সাদ্দাম হোসেন, মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স, তারেক হাসান মামুন, জাহিদ হাসান শাকিল এবং তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মাহমুদ ইসলাম কাজল। পাশাপাশি বিএনপির মিডিয়া সেলের যোগাযোগ সমন্বয়ক দ্বীন ইসলাম খানের নামও আলোচনায় রয়েছে।
 
এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির কয়েকজন শীর্ষ নেতার নামও আলোচনায় আছে। তাদের মধ্যে ঢাবি সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস এবং সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন শাওনের নাম উল্লেখযোগ্য।
 
নেতাদের প্রত্যাশা:
সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী গাজী সাদ্দাম হোসেন বলেন, বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মেই সংগঠনের সাংগঠনিক অভিভাবক দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান নতুন কমিটি ঘোষণা করবেন বলে আমরা আশা করছি।
 
তিনি বলেন, দেশের শিক্ষার্থীরা যেন পড়াশোনার পাশাপাশি দেশ গঠনে মনোযোগী হয় এবং দলের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত হতে পারে—এমন নেতৃত্বই সামনে আসবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি।
 
ছাত্রদলের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মাহমুদ ইসলাম কাজল বলেন, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি হওয়া উচিত দীর্ঘদিনের রাজপথের পরীক্ষিত, ছাত্রবান্ধব এবং সাংগঠনিক দক্ষতা সম্পন্ন নেতাদের সমন্বয়ে। পাশাপাশি গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ছাত্র রাজনীতির বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে সক্ষম মননের অধিকারী নেতাদেরই দায়িত্ব দেওয়া উচিত।
 
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী জাহিদ হাসান বলেন, বাংলাদেশের ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার সংগঠন হচ্ছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়, সংগঠনের আদর্শকে সামনে রেখে কাজ করতে চাই।
 
তিনি বলেন, পদ বড় নয়—দায়িত্বই বড়। যে যেখানে আছি, সেখান থেকেই সংগঠনের জন্য সর্বোচ্চটা দেওয়াই হবে আমাদের লক্ষ্য।
 
সভাপতি পদপ্রত্যাশী এবং বর্তমান কমিটির ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান বলেন, কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। আমরা আমাদের সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমানের কাছে দ্রুত নতুন কমিটি দেওয়ার অনুরোধ জানাব।
 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এই শিক্ষার্থী বলেন, ছাত্রদলের দায়িত্ব পেলে তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফা বাস্তবায়নে ছাত্রদলকে ভ্যানগার্ড হিসেবে কাজ করাতে পারবেন বলে তিনি আশা করেন।
 
বিগত আন্দোলন-সংগ্রামের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, গত ১৭ বছরে ছাত্রদল করতে গিয়ে ছাত্রলীগ ও পুলিশের হাতে বহুবার শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ছয়বার আটক হয়ে প্রায় দুই বছর কারাগারে ছিলেন এবং ৩৩ দিন রিমান্ডেও ছিলেন। একবার গুমের শিকার হয়েও ফিরে আসার অভিজ্ঞতার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
 
নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা:
ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের আশা, নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়, ত্যাগী এবং সাংগঠনিকভাবে দক্ষ নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পাশাপাশি ছাত্রসমাজের কাছে গ্রহণযোগ্যতা এবং নতুন প্রজন্মের ভাবনা বোঝার সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।
 
দলীয় নেতাদের মতে, নতুন নেতৃত্বে যদি তরুণ উদ্যম ও অভিজ্ঞতার সমন্বয় থাকে, তাহলে সংগঠন আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে যেতে পারবে।
 
তবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হননি সংগঠনের দায়িত্বশীল নেতারা। তাদের মতে, ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক হিসেবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানই নতুন নেতৃত্বের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/160790