ডিজিটাল রেলসেবায় কালোবাজারি: ঈদযাত্রায় সাধারণ মানুষের হতাশা
ঈদ মানেই ঘরে ফেরার আনন্দ। প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানোর এক অদম্য আকাক্সক্ষা। বছরের এই বিশেষ সময়ে হাজারো মানুষ শহর ছেড়ে ছুটে যায় গ্রামের পথে শুধু পরিবারকে কাছে পাওয়ার আশায়। কিন্তু সেই আনন্দযাত্রা প্রায়ই বিষাদে রূপ নেয় যখন ট্রেনের টিকিট পাওয়া হয়ে ওঠে এক কঠিন লড়াই। রেলসেবাকে সহজ ও স্বচ্ছ করতে বাংলাদেশ রেলওয়ে কয়েক বছর ধরে ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থা চালু করেছে। তাত্ত্বিকভাবে এটি যাত্রীসেবাকে দ্রুত ও স্বচ্ছ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক যাত্রীর অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। বিশেষ করে ঈদ মৌসুম এলেই এই ডিজিটাল ব্যবস্থার মধ্যেই যেন নতুন এক ধরনের অস্বচ্ছতা ও ভোগান্তি সামনে আসে।
এবারের ঈদযাত্রায় টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে পশ্চিমাঞ্চল (ওয়েস্ট জোন) ও পূর্বাঞ্চল (ইস্ট জোন) আলাদা সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। ইস্ট জোনের টিকিট বিক্রি শুরু হয় সকাল ৮টায় এবং ওয়েস্ট জোনের টিকিট বিক্রি শুরু হয় দুপুর ২টায়। সময় নির্ধারণে সমস্যা নেই; সমস্যা শুরু হয় যখন হাজার হাজার যাত্রী নির্ধারিত সময়ে রেলসেবা অ্যাপে প্রবেশ করেন। অনেকেই দেখেন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সব টিকিট শেষ। যে কয়েকটি আসন ফাঁকা দেখা যায়, সেগুলোতে ক্লিক করলেই ভেসে ওঠে Not Available Now বার্তা।
প্রশ্ন উঠতেই পারে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হাজার হাজার টিকিট কীভাবে শেষ হয়ে যায়? সাধারণ যাত্রীরা যখন একটি টিকিট কিনতে লড়াই করছেন, তখন কোথাও না কোথাও কি কোনো অসাধু চক্র এই ব্যবস্থাকে ব্যবহার করছে? দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে, প্রযুক্তির ফাঁকফোকর ব্যবহার করে কিছু অসাধু ব্যক্তি বা চক্র আগেভাগে বিপুল সংখ্যক টিকিট সংগ্রহ করে পরে বেশি দামে বিক্রি করছে। ডিজিটাল ব্যবস্থার লক্ষ্য ছিল কালোবাজারি বন্ধ করা; কিন্তু বাস্তবে অনেকের ধারণা, কালোবাজারির ধরন শুধু বদলেছে বন্ধ হয়নি।
এ সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় অনলাইন প্রতারণা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক যাত্রী যখন টিকিট না পেয়ে “টিকিট প্রয়োজন” বলে পোস্ট দেন, তখন কিছু প্রতারক সেই সুযোগ নেয়। তারা টিকিট দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিকাশ বা নগদে টাকা নেয়, তারপর নম্বর বন্ধ করে দেয়। ফলে যাত্রীরা যেমন টিকিট পান না, তেমনি অর্থও হারান। ঈদযাত্রা সাধারণ মানুষের জন্য শুধুই ভ্রমণ নয়; এটি আবেগ, পরিবার এবং সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই ট্রেনের টিকিট নিয়ে এমন অনিশ্চয়তা ও প্রতারণা শুধু ভোগান্তিই নয়, মানুষের বিশ্বাসকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এ অবস্থায় প্রয়োজন স্বচ্ছ ও কার্যকর উদ্যোগ। রেলওয়ের ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো, স্বয়ংক্রিয় টিকিট সংগ্রহকারী বট বা অবৈধ সফটওয়্যার শনাক্ত করা, কালোবাজারি চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং অনলাইন প্রতারণা প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে টিকিট বিক্রির পুরো প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। ডিজিটাল সেবা তখনই সফল হবে, যখন তা সাধারণ মানুষের জন্য সত্যিকার অর্থে সহজ, নিরাপদ এবং ন্যায্য হবে। অন্যথায় “ডিজিটাল রেলসেবা” নামটি মানুষের কাছে সুবিধার নয়, বরং নতুন ধরনের ভোগান্তির প্রতীক হয়ে থাকবে।
লেখক :
বুশরা আজমী
সমাজকর্ম বিভাগ, রাজশাহী কলেজ
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/160458