ডিগ্রির আড়ালে দক্ষতাহীন জনবল: উচ্চশিক্ষার সহজলভ্যতা কি বেকারত্বের নতুন কারখানা?

ডিগ্রির আড়ালে দক্ষতাহীন জনবল: উচ্চশিক্ষার সহজলভ্যতা কি বেকারত্বের নতুন কারখানা?

আমাদের সমাজে একটি বদ্ধমূল ধারণা প্রচলিত আছে-সন্তানকে অন্তত ‘মাস্টার্স’ পাস করতে হবে, নয়তো সমাজে মুখ দেখানো ভার। এই সামাজিক আকাঙ্ক্ষা আর রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার মেলবন্ধনে গত এক দশকে দেশে উচ্চশিক্ষার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। পাড়ায় পাড়ায় কলেজ আর জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় এখন আর অলীক কল্পনা নয়। কিন্তু একজন গণমাধ্যমকর্মী ও সচেতন নাগরিক হিসেবে যখন দেখি, উচ্চশিক্ষার এই অবাধ সুযোগ দেশের শিক্ষিত বেকারের পাল্লা ভারি করছে, তখন প্রশ্ন জাগে-আমরা কি আসলে ‘শিক্ষিত’ করছি, নাকি কেবল ‘সনদধারী’ তৈরি করছি?

বর্তমানে উচ্চশিক্ষা লাভের হার আগের চেয়ে বহুগুণ বেশি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়—সবখানেই ডিগ্রির ছড়াছড়ি। প্রতি বছর কয়েক লাখ গ্র্যাজুয়েট কর্মবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু বাজার কি তাদের গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত? এখানেই মুদ্রার উল্টো পিঠ দৃশ্যমান। আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘সনদসর্বস্ব’। পর্যাপ্ত গবেষণাগার, মানসম্পন্ন শিক্ষক এবং আধুনিক পাঠ্যক্রমের অভাব অনেক প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি নড়বড়ে করে দিয়েছে। ফলে ডিগ্রি মিললেও শিক্ষার্থীর মধ্যে সেই বিষয়ের গভীর জ্ঞান বা প্রয়োগিক দক্ষতা থাকছে না। এই ‘অদক্ষ শিক্ষিত’ শ্রেণিটিই মূলত বেকারত্বের মূল চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিল্পোদ্যোক্তাদের সাথে কথা বললে একটি আক্ষেপ প্রায়ই শোনা যায়— “যোগ্য লোক পাচ্ছি না”। অথচ বাইরে হাজার হাজার যুবক চাকরির দাবিতে আন্দোলন করছে। এই যে ‘ডিমান্ড-সাপ্লাই’ গ্যাপ, এর মূল কারণ আমাদের পাঠ্যক্রম। বর্তমান বিশ্বের কর্মবাজার যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স বা উন্নত প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে, আমাদের উচ্চশিক্ষা তখনো মান্ধাতা আমলের তাত্ত্বিক নোট আর গাইড বইয়ে বন্দি। সাধারণ স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পেছনে একজন শিক্ষার্থী জীবনের মূল্যবান ৪-৫ বছর ব্যয় করছে, কিন্তু দিনশেষে সে বাজারের জন্য ‘আনফিট’। অথচ এই সময়টা যদি সে কোনো কারিগরি বা বিশেষায়িত পেশাদার শিক্ষায় ব্যয় করত, তবে তাকে চাকরির পেছনে ছুটতে হতো না, বরং চাকরিই তাকে খুঁজত।

আমাদের দেশে ‘ভোকেশনাল’ বা কারিগরি শিক্ষাকে এখনো ‘দ্বিতীয় শ্রেণির’ শিক্ষা হিসেবে দেখা হয়। মেধাবীদের প্রথম পছন্দ থাকে সাধারণ কোনো বিষয়ে ডিগ্রি নেওয়া, কারণ সমাজ মনে করে ডিগ্রি মানেই সম্মান। এই ভুল সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে হাজার হাজার তরুণ কারিগরি দক্ষতা অর্জনের চেয়ে একটি সাধারণ বিএ বা এমএ ডিগ্রিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলাফল? পিয়নের চাকরির জন্য হাজার হাজার মাস্টার্স পাস প্রার্থীর আবেদন। এটি কেবল ব্যক্তির জীবনের অপচয় নয়, রাষ্ট্রের মানবসম্পদ উন্নয়নের পথে এক বিরাট অন্তরায়।

সমাধান কোথায়?

উচ্চশিক্ষাকে ‘মুড়ি-মুড়কির’ মতো সহজলভ্য না করে একে ‘মানসম্পন্ন’ ও ‘চাহিদানির্ভর’ করা এখন সময়ের দাবি। সবাইকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে-এই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষাকে মূলধারায় আনা জরুরি।

১.কারিকুলাম সংস্কার: বাজারের চাহিদার সাথে মিল রেখে পাঠ্যসূচি আধুনিকায়ন করতে হবে।
২.মান নিয়ন্ত্রণ: যত্রতত্র অনার্স-মাস্টার্স কোর্স না খুলে বিশেষায়িত ও কারিগরি ইনস্টিটিউট বাড়ানো দরকার।
৩. শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগ: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে সরাসরি শিল্পকারখানার সংযোগ ঘটাতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার মাঝেই হাতে-কলমে শিখতে পারে।

পরিশেষে বলতে চাই, উচ্চশিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং জাতির মেধা বিকাশের পথ। কিন্তু যখন সেই পথ কেবল একটি কাগজের টুকরো (সার্টিফিকেট) ধরিয়ে দিয়ে কর্মহীন ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেয়, তখন সেই ‘সহজলভ্যতা’ আশীর্বাদের চেয়ে অভিশাপই বেশি। বেকারত্বের অভিশাপ থেকে বাঁচতে হলে আমাদের শিক্ষার ‘পরিমাণ’ নয়, ‘পদ্ধতি’ বদলাতে হবে। হাত বাড়ালেই ডিগ্রি নয়, বরং হাত বাড়ালেই যেন দক্ষতা ও কর্মসংস্থান মেলে-এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলাই হোক আমাদের লক্ষ্য।

হাসান মো: শাব্বির
সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক

 

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/160126