ভার্চুয়াল জগতের ফাঁদে শৈশব

ভার্চুয়াল জগতের ফাঁদে শৈশব

বর্তমান যুগ প্রযুক্তির যুগ। প্রযুক্তির উৎকর্ষতা আমাদের জীবনকে যেমন সহজ করে তুলেছে, তেমনি এর কিছু নেতিবাচক দিকও ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এর মধ্যে একটি অন্যতম উদ্বেগজনক বিষয় হলো শিশুদের মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত আসক্তি। এক সময় যেসব শিশু খেলাধুলা, বই পড়া কিংবা পারিবারিক গল্পে সময় কাটাতো, আজ তারা মোবাইল স্ক্রিনে চোখ রেখে দিন পার করছে। এই পরিবর্তন শিশুমনের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে মানসিক, শারীরিক এবং সামাজিক তিনটি দিক থেকেই। 

প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ হলেও, তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে প্রায় প্রতিটি পরিবারেই স্মার্টফোন একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় বস্তুতে পরিণত হয়েছে। বাবা-মায়ের ব্যস্ততা, শিশুদের সময় দেয়ার অভাব এবং প্রযুক্তির প্রতি অতি নির্ভরতা শিশুদের মোবাইলের প্রতি আগ্রহী করে তুলছে। সমসাময়িক কোনো গবেষণা না থাকলেও এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে আজকাল স্মার্টফোন ব্যবহার করছে আট বছরের চেয়ে কম বয়সী শিশুরাও। এমনকি জন্মের পরপরই আজকাল স্মার্টফোনে সঙ্গে পরিচয় ঘটে শিশুর। অনেক সময় শিশু কাঁদলে বা বিরক্ত করলে তাকে শান্ত রাখতে মোবাইলে ইউটিউব কিংবা গেম দিয়ে রাখা হয়। শুরুটা হয় এভাবেই, কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই শিশুটি এর প্রতি অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। শিশুরা সাধারণত বর্ণিল রঙ, সাউন্ড এবং চলমান দৃশ্যের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। ফলে কার্টুন, অ্যানিমেশন, গেম কিংবা নানা রকম অ্যাপ তাদের মনকে তাড়িত করে। তারা বাস্তব জগৎকে ভুলে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় বুঁদ হয়ে পড়ে। 

স্মার্টফোন, টেলিভিশন, ট্যাব ইত্যাদি ব্যবহারের পেছনে যে সময় ব্যয় হয়, তাকে বলা হয় ‘স্ক্রিন  টাইম’। শিশুবিশেষজ্ঞদের দেওয়া বৈশ্বিক নির্দেশিকা অনুসারে, দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের সকল প্রকার স্ক্রিন থেকে দূরে রাখতে হবে। ২ থেকে ৫ বছর বয়সীদের জন্য তা দৈনিক এক ঘণ্টার বেশি নয়। ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের জন্য স্বাভাবিক স্ক্রিন টাইম দুই ঘণ্টা। কিন্তু ২০২৩ সালের একটি আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা গেছে, ৮ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের দৈনিক স্ক্রিন টাইম গড়ে ৬ থেকে ৯ ঘণ্টা। একই জরিপে অংশগ্রহণকারী ৪৭ শতাংশ অভিভাবক মনে করেন যে তাঁদের সন্তানের স্মার্টফোন আসক্তি রয়েছে। 

মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহার শিশুদের জীবনে নানাবিধ নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা তাদের শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক বিকাশকে ব্যাহত করছে। প্রতিদিন মোবাইল ব্যবহারের ফলে শিশুরা একসময় এর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে এবং গেম খেলার প্রতিও গভীরভাবে নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের কারণে শিশুদের মধ্যে বিষন্নতা, উদ্বেগ, একাকীত্ব ও আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়। আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং সহানুভূতির অভাব তৈরি হয়। দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ব্যবহারে চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা, ঘাড় ও পিঠে ব্যথার মতো শারীরিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে। ঘুমের অভাবও একটি সাধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে, মোবাইলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি শিশুদের পড়াশোনায় মনোযোগ কমিয়ে দেয়, একাগ্রতা নষ্ট হয় এবং ফলাফল খারাপ হয়। তারা বন্ধুদের সঙ্গে সময় না কাটিয়ে একা মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকে, ফলে সামাজিক দক্ষতা গড়ে ওঠে না এবং তারা ধীরে ধীরে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। মোবাইল না থাকলে যে উদ্বেগ বা অস্থিরতা দেখা দেয়, তাকে বলা হয় ‘নোমোফোবিয়া’, যা এখন শিশুদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে। এছাড়া, ইন্টারনেটের অবারিত প্রবেশাধিকার শিশুদের অনুপযুক্ত বা সহিংস কনটেন্টের সংস্পর্শে আনতে পারে, যা তাদের মানসিক বিকাশে বাঁধা সৃষ্টি করে এবং অপরাধপ্রবণতা বাড়ায়। এমনকি, অনলাইন গেমের মাধ্যমে অনেক সময় শিশুদের আর্থিক প্রতারণার ফাঁদেও ফেলা হয়। স্কুলপড়ুয়া শিশুরা অনেক সময় সাইবার বুলিং, যৌন ও শাব্দিক হেনস্তার শিকার হয়, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্মার্টফোন ব্যবহারকারী ৫৯ শতাংশ শিশু-কিশোর এসব সমস্যার সম্মুখীন হয়। তাই শিশুদের মোবাইল ব্যবহার নিয়ে অভিভাবকদের সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন, যেন তারা ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে।

শিশুদের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার যেন তাদের বেড়ে ওঠার পথে অন্তরায় না হয়, সে বিষয়ে আমাদের সকলকে সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে।মোবাইল আসক্তি থেকে শিশুদের রক্ষা করতে বাবা-মা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সম্মিলিত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সর্বপ্রথমে বাবা-মাকে ঘরে একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মোবাইল ব্যবহারের নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হবে দিনে এক ঘণ্টার বেশি নয় এবং সেটাও যেন শিক্ষামূলক কনটেন্ট হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, শিশুদের বই পড়া, ছবি আঁকা, পাজল খেলা, প্রকৃতির সাথে সময় কাটানো, গান বা নাচ শেখা ইত্যাদি বিকল্প সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করা উচিত। বাবা-মা নিজেরাও যদি সবসময় মোবাইলে ডুবে থাকেন, তাহলে শিশুরাও তা অনুসরণ করবে, তাই নিজেদের আচরণে সচেতন হতে হবে। খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে শিশুদের মোবাইল ব্যবহারের ভালো ও খারাপ দিক বোঝানো উচিত, যাতে তারা নিজে থেকেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে শেখে। প্রয়োজনে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল অ্যাপ ব্যবহার করে নির্দিষ্ট অ্যাপ ও কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। এ ছাড়া শিশুদের রাতে ঘুমানোর অন্তত দুই ঘণ্টা আগে মোবাইল থেকে দূরে রাখতে হবে, কারণ রাতে ফোন ব্যবহার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় এবং শরীর-মন উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। শুধু পরিবার নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও শিশুদের স্ক্রিন টাইম সীমিত করা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশ নিতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। স্থানীয় কমিউনিটিগুলো যেন শিশুদের জন্য খেলার মাঠ, লাইব্রেরি ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপন করে, সেদিকে নজর দিতে হবে। শিশুদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নের জন্য পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি তাদের বাইরে খেলাধুলা করার সুযোগ দিতে হবে। ভালোবাসা, সময় ও যত্ন দিয়েই শিশুদের মোবাইল আসক্তি থেকে ধীরে ধীরে মুক্ত করা সম্ভব। 

শিশুদের মোবাইল ফোনে আসক্তি এখন আর নিছক একটি অভ্যাস নয়, এটি একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হচ্ছে। এই ব্যাধির প্রতিকার প্রয়োজন এখনই। মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে শিশুদের যে মানসিক, শারীরিক ও সামাজিক ক্ষতি হচ্ছে, তা রোধ করতে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে শিশুদের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ, সুস্থ ও আনন্দময় পরিবেশ নিশ্চিত করতে। মনে রাখতে হবে, আগামী দিনের দেশ ও জাতি গঠনের ভিত্তি আজকের শিশুরাই। তাই তাদের বেড়ে ওঠা যেন হয় আনন্দময়, সুস্থ ও মানবিক গুণে পরিপূর্ণ -এই দায়িত্ব আমাদের সবার। 

 

লেখক :

মিশকাতুল ইসলাম মুমু

শিক্ষার্থী

গণ যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। 

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/160113