শিশু কন্যাদের ওপর পাশবিকতা, রক্তক্ষরণ থামবে কবে
একটা কন্যা শিশু,যে ভালো করে সবকিছু দেখতে,বুঝতেই শেখেনি,যার চকলেট খাওয়ার আব্দার করা,দোলনায় দোল খাওয়া, পুতুল খেলা, স্কুলে যাওয়ার বয়স, তাকে হঠাৎ করে ভয়ার্ত চোখে দেখতে হচ্ছে ধর্ষকের লালসার চোখ আর সইতে হচ্ছে অসহনীয় নির্যাতন। এরকম একটি দুটি শিশু নয়, মাঝে মধ্যেই দেশের কোথাও না কোথাও প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে অনেক অবোধ অসহায় শিশু কন্যা পাশবিক ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, প্রাণও হারাচ্ছে কেউ কেউ। অনেক খবরই প্রকাশ পায় না দুর্বৃত্তের অত্যাচার কিংবা বদনামের ভয়ে, নয়তো প্রভাবশালীদের অনৈতিক চাপে। যেটুকু প্রকাশিত হয়,তাতে জনমনে কিছুদিন তোলপাড়, আহাজারি হয় বটে, এক সময় সেসব থেমেও যায়। প্রতিকার বলতে কিছুই হয় না। ধর্ষক পশুদের শিশুকন্যা ধর্ষণ, হত্যা চলতেই থাকে, চলছেও। এই সেদিনও, পয়লা মার্চে ঘটলো আরেকটি শিশুকে ধর্ষণ চেষ্টার হৃদয় বিদারক ঘটনা, চ্ট্টগ্রামের সীতাকুন্ডুর ইকো পার্কে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আটককৃত আসামী শেখ বাবু পুলিশকে বলেছে-সে প্রথমে আট বছরের ইরা নামের শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। এই সময় শিশুটি চিৎকার করে বাবাকে বলে দেবে বলে জানালে বাবু শেখ তার শুধু মুখই চেপে ধরে না, তাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে গলায় ছুরি বসিয়ে দেয়। পরে মুমূর্ষু ইরাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে তার শ্বাসনালী অস্ত্রোপচার করা হলেও তাকে আর বাঁচানো যায়নি। আমাদের মানবিক হৃদয়ের রক্তক্ষরণ বরাবরের মতো তার কোন কাজে আসেনি। আসেও না। লোকচক্ষুর অন্তরালে এমন কত যে ইরা নীরবে ধর্ষণের শিকার হয়ে চলেছে,কে তার হিসেব রাখে? শুধু গত ফেব্রুয়ারি মাসেই সারা দেশে ৩২ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ৯ জনই কন্যাশিশু,যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নারী ও কন্যা নির্যাতন বিষয়ক মাসিক প্রতিবেদন এবং পত্র-পত্রিকার খবরে এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। গত ২৭ জানুয়ারি নরসিংদীর মাধবদী এলাকায় রাতে বাবার সামনে থেকেই এক কিশোরীকে তুলে নিয়ে যায় স্থানীয় একদল যুবক। পরদিন সকালে গ্রামের এক জমি থেকে মৃত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয় বলে খবরে প্রকাশ। এর কিছুদিন আগে মাদারিপুরের শিবচরে ৬ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের খবর দিয়েছে এক গণমাধ্যম। মাস তিনেক আগে পটুয়াখালির গলাচিপায় আট বছর বয়সী মাদ্রাসায় পড়া আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে করা মামলার আসামী সেই মাদ্রাসার শিক্ষককে ধরে পুলিশে দিয়েছেন শিশুর বাবা নিজেই। এমন সাহসী বাবা ক’জনইবা আছেন? সংবাদ মাধ্যমই বা কতটুকু সাহসী হতে পারছে? পর্যবেক্ষকরা বলছেন-নারী ও কন্যাশিশুর নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে মূলত আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব,অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না পাওয়া,প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দাপট,আইনের ফাঁকফোকড় দিয়ে জামিনে বেরিয়ে আসার কারণে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে-প্রতিটি ধর্ষণের ঘটনা মানুষের মানবিক বোধকে প্রচন্ডভাবে যতটা নাড়া দেয়, তার প্রতিকারের ব্যবস্থা ততটাই দুর্বল। শিশুকন্যা ধর্ষণের এই ক্রমবর্ধমান উৎকণ্ঠা দূর করতে রাষ্ট্র ও সরকারের যেমন দায় রয়েছে, তেমনি দায় রয়েছে পরিবার ও সমাজেরও। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, মূলত নিকটাত্মীয় ও পরিচিতরা শিশুদের সরল বিশ্বাসকে পুঁজি করে তাদের লোলুপ দৃষ্টি দিয়ে এসব জঘন্য কাজ করে থাকে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের এক নিবন্ধেও বলা হয়েছে-এ ধরনের নির্যাতন সবচেয়ে বেশি ঘটে থাকে পরিবারের নিকটতম সদস্য ও স্বজনদের কাছ থেকেই। শতকরা ৮৫ ভাগ ক্ষেত্রেই যৌন নির্যাতনকারীরা হয় শিশু কন্যার আত্মীয়, পরিচিত, বা বিশ্বস্ত কেউ। প্রযুক্তির উৎকর্ষতার ফলে সমাজে সহজলভ্য হয়ে ওঠা ব্লু ফিল্মের দুনিয়াও ধর্ষক বৃদ্ধির একটি অন্যতম কারণ। পরিবারের নিয়ন্ত্রণ না থাকার সুযোগে প্রযুক্তির প্রতি অত্যধিক আসক্ত অনেক সন্তান ব্লু ফিল্ম ও ক্রাইমদৃশ্য দেখে দেখে কিশোর বয়স থেকেই ধর্ষণকারীর বিকৃত মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠছে। এ ব্যাপারে পরিবারের সচেতনতা ও সন্তানদের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কোন বিকল্প নেই। নারীদেরও বিশেষ করে তরুণীদের পোশাকে ও চলাফেরায় শালীনতা বজায় রাখাও জরুরি। মায়েদেরও উচিত তার ছেলেমেয়েরা কোথায় কী দেখে, কাদের সাথে মিশছে, তা তলিয়ে দেখা। গণমাধ্যমে এসব ধর্ষণের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন(সংশোধন)অধ্যাদেশ ২০২৫ এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে বলে একটি সংবাদপত্রের খবরে জানা গেছে। সেখানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন(সংশোধন)অধ্যাদেশ, ২০২৫ এর মাধ্যমে ধর্ষণের সংজ্ঞা সংশোধন করা হয়েছে, প্রণয়ের সম্পর্ক থাকাকালে বিয়ের প্রলোভন বা অন্য কোন প্রতারণার মাধ্যমে যৌনকর্ম করার দন্ড প্রদানের বিধান করা হয়েছে এবং শিশু ধর্ষণ অপরাধ দমন ট্রাইবুনাল গঠনের কথা বলা হয়েছে। এটি এখন আইনে পরিণত করবে কিনা নতুন সরকার, তা দেখার বিষয়। তবে শুধু আইন করলেই নয়, সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও স্বল্পতম সময়ে ধর্ষকের বিচার ও দন্ড কার্যকরের ব্যবস্থাগ্রহণ। এটি নিশ্চিত হলে এবং পাশাপাশি ব্যাপক পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে উঠলে কন্যাশিশু ও নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে আশাবাদী হওয়া অমূলক হবে না নিশ্চয়ই।
লেখকঃ
রাহমান ওয়াহিদ
কবি, কথাশিল্পী ও কলামিষ্ট
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/160110