ফ্যামিলি কার্ড মানবিক অগ্রযাত্রা স্বাবলম্বী পদক্ষেপ
সার্বিকভাবে ফ্যামিলি কার্ড নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হলেও,সাধারণ মানুষের কাছে কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির দলিল নয়, এটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক চুক্তি। এগুলো ইতোমধ্যে রাষ্ট্রের সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠেছে। আগামী ১০ মার্চ ১৪ জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে কার্যক্রম শুরু হওয়ার ঘোষণা সরকারের সদিচ্ছার ইঙ্গিত দেয়। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সমগ্র মহাবিশ্ব অস্থির মধ্যপ্রাচ্য অশান্ত, তেলের মূল্যবৃদ্ধি, নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ব্যয় সামাল দিতে অনেক পরিবারই হিমশিম খাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরাসরি নগদ সহায়তা প্রদান শুধু তাৎক্ষণিক স্বস্তিই দেবে না, বরং একটি নিরাপত্তা বলয় তৈরি করবে। বিশেষ করে নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রশংসনীয়- কারণ গবেষণায় দেখা গেছে, নারীর হাতে আর্থিক সহায়তা পৌঁছালে তা পরিবার ও সন্তানের কল্যাণেই বেশি ব্যয় হয়। বাংলাদেশে নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যখন ক্রমাগত বেড়ে চলেছে, তখন স্বল্পমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের উদ্যোগ হিসেবে সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও মানবিক পদক্ষেপ। রাজধানীর কড়াইল হতে আগামী ১০ মার্চ ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রাথমিক পর্যায়ে ১৪টি উপজেলায় একটি ইউনিয়নের একটি করে ওয়ার্ডের হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত নারীরা ফ্যামিলি কার্ড পাবেন। এ কার্ডের আওতায় প্রতি পরিবার মাসে ২,৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবে। সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী এবং তাৎপর্যপূর্ণ। প্রশ্ন হচ্ছে এই কর্মসূচি কতটুকু স্বচ্ছতার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন হবে? তবে এ বিষয়ে সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেছেন, বাছাই নয়; বরং ডোর-টু-ডোর তথ্য সংগ্রহের ভিত্তিতে ‘ইউনিভার্সাল’ পদ্ধতিতে কার্ড বিতরণ করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক হতে সরাসরি অর্থ চলে যাবে ফ্যামিলি কার্ড হোল্ডার একাউন্ট। এতে কোনো রাজনৈতিক বা গোয়েন্দা সম্পৃক্ততা থাকবে না। এ ঘোষণা জনমনে আস্থা সৃষ্টিতে সহায়ক হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যদি ঘোষিত নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করে, তবে এটি ভবিষ্যতের বৃহত্তর কল্যাণমূলক কর্মসূচির জন্য একটি সফল মডেল হয়ে উঠতে পারে। ১৪টি উপজেলায় পরীক্ষামূলক বাস্তবায়ন একটি বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত। পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে ত্রুটি-বিচ্যুতি চিহ্নিত করে তা সংশোধনের সুযোগ থাকে। সফল হলে ধাপে ধাপে সারা দেশে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য হ্রাস, আর্থসামাজিক বৈষম্য কমানো এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় আনার পথ সুগম হবে।
সরকারের বিশ্বাস- এই কর্মসূচি আগামী প্রজন্মকে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করবে। নিয়মিত সহায়তা পরিবারগুলোকে ঋণনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করতে পারে, শিশুদের স্কুলে ধরে রাখতে পারে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে। যদি এর সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন, ক্ষুদ্রঋণ ও কর্মসংস্থানমুখী প্রশিক্ষণ যুক্ত করা যায়, তবে এর প্রভাব হবে আরও বহুমাত্রিক।
রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব নাগরিকের মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অর্থনৈতিক বৈষম্য যখন সমাজে গভীরতর হয়, তখন সরাসরি নগদ সহায়তা কর্মসূচি প্রান্তিক মানুষের জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তি বয়ে আনে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং নিম্নআয়ের পরিবারের সীমিত সঞ্চয়ের বাস্তবতায় মাসিক ২,৫০০ টাকা অনেক পরিবারের জন্য খাদ্য, শিক্ষা কিংবা চিকিৎসা ব্যয়ের গুরুত্বপূর্ণ সহায় হয়ে উঠতে পারে। তাই বলা যায়, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি কেবল একটি আর্থিক সহায়তা প্রকল্প নয়; এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের অঙ্গীকার। যথাযথ তদারকি, স্বচ্ছ বাস্তবায়ন এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে এই উদ্যোগ দেশের সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোয় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
ফ্যামিলি কার্ড ধারণা, উদ্দেশ্য ও প্রত্যাশা। ফ্যামিলি কার্ডের মূল ধারণা হলো-নিম্নআয়ের ও দরিদ্র পরিবারগুলোকে একটি লক্ষ্যভিত্তিক কাঠামোর আওতায় এনে স্বল্পমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করা। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই ধরনের একটি কর্মসূচি নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে এখনো প্রায় দুই কোটির কাছাকাছি মানুষ দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। এই জনগোষ্ঠীর জন্য ফ্যামিলি কার্ড চালু হলে খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার হতে পারে এবং সামাজিক অস্থিরতা কমানোর ক্ষেত্রেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এখানেই আসে মূল প্রশ্ন-কারা এই কার্ড পাবেন, আর কারা পাবেন না? এই বাছাই প্রক্রিয়া যদি শুরু থেকেই অস্পষ্ট বা প্রভাবিত হয়, তাহলে ভালো উদ্যোগও বিতর্কে জড়িয়ে পড়বে। ঘোষিত লক্ষ্য ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কোনো ব্যত্যয় না ঘটে। নিয়মিত তদারকি, তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি দেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। জনগণের প্রত্যাশা- ঘোষিত লক্ষ্য অনুযায়ী কর্মসূচিটি সফল হোক এবং সত্যিকার অর্থে প্রান্তিক মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনুক। কেবল বিতরণ করলেই এই উদ্যোগ সফল হবে না, বরং কার্ডের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী তদারকি সেল গঠন করা জরুরি। ২৫০০ টাকা প্রদানের চেইনের প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলে এবং নিয়মিত ঝটিকা অভিযানের ব্যবস্থা থাকলে কার্ডধারী সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষা করা সম্ভব হবে।
সম্ভাব্য ব্যয় ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে পণ্য সরবরাহ আওতায় অথবা ২৫০০ টাকা ভর্তুকি-দুটিই রাষ্ট্রের জন্য উল্লেখযোগ্য আর্থিক দায় তৈরি করবে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই কর্মসূচিগুলো পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়িত হলে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রয়োজন হতে পারে। এই ব্যয় তখনই যৌক্তিক হবে, যখন সুবিধা সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছাবে। অন্যথায় এটি কেবল আরেকটি অদক্ষ ভর্তুকি ব্যবস্থায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে, যা রাজস্বের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। এই কর্মসূচিগুলো সফল করতে হলে শুরুতেই একটি নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ ডাটাবেস তৈরি করা জরুরি। জাতীয় পরিচয়পত্র, আয়সংক্রান্ত তথ্য সমন্বয় না করলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। পাশাপাশি তালিকা প্রণয়নে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ও তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি কেবল মূল্যস্ফীতির সময়ে একটি ত্রাণমূলক ব্যবস্থা নয়; এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন দর্শনের প্রতিফলন। রাষ্ট্র যখন দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ায়, তখন তা সামাজিক সংহতি ও আস্থাকে দৃঢ় করে। তাই এই উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত, টেকসই ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলা সময়ের দাবি। মানুষের কল্যাণে এমন উদ্যোগই একটি মানবিক ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের পরিচয় বহন করে।
মাহমুদ হোসেন পিন্টু
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/159727