বগুড়ার উন্নয়ন পরিকল্পনা ও প্রতিমন্ত্রী হয়ে ওঠার গল্প শোনালেন মীর শাহে আলম
রাহাত রিটু : বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মীর শাহে আলম বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লাী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রীপরিষদে স্থান করে নিয়েছেন। উত্তর বগুড়ার এক উপজেলা শিবগঞ্জ। কৃষিতে সমৃদ্ধ এই উপজেলার সন্তান মীর শাহে আলম। ছাত্র রাজনীতির মধ্যে দিয়ে রাজনীতির জগতে প্রবেশ তার।
ছাত্র রাজনীতির পর জড়িয়ে পড়েন বিএনপির রাজনীতির সাথে। জীবনে প্রথম তিনি তার নিজ ইউনিয়ন আটমূলের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেন ১৯৯৭ সালে। ওই নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। এলাকার মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থাকা শাহে আলম দিন দিন এলাকায় জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সমর্র্থ হন।
২০০৯ সালে তিনি শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন। এই ভোটেও তিনি বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি ওয়ার্ড থেকে শুরু করে ইউনিয়ন এবং উপজেলা পর্যন্ত অর্থাৎ তৃণমূল পর্যায় থেকে দলকে সুংগঠিত করেন। তিনি হয়ে ওঠেন শিবগঞ্জ মাটি ও মানুষের জনপ্রিয় নেতা। শুধু নিজ উপজেলা নয়। দলের মধ্যেও তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তার ন্যায়-নিষ্ঠা এবং পরিশ্রমের ফলে।
দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন তৃণমূলের এই নেতা। এরই ফলশ্রুতিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে শপথ গ্রহণের দিনই তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
সরকারের অত্যান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হওয়ার সুবাদে তিনি দেশের পল্লি জনপদের উন্নয়ন করার সুযোগ পাবেন। সেই সুবাদে দীর্ঘ ১৮ বছর উন্নয়ন বঞ্চিত বগুড়া জেলাকে তিনি এবং তার সরকার কী ভাবছে তাই আজ তুলে ধরা হচ্ছে। দৈনিক করতোয়ার সাথে সাক্ষাতকারে তিনি বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে পাবলিক বিশ্ববিদ্যায় কীভাবে করা যায় এবং বগুড়ার উন্নয়ন নিয়ে কথা বলেছেন।
করতোয়া : তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিমন্ত্রী হয়ে ওঠার গল্পটা কী?
মীর শাহে আলম : গল্পটা সহজ-কারণ আমরা জনগণের জন্য রাজনীতি করি। দীর্ঘ দিন জনগণকে নিয়ে কাজ করেছি। তৃণমূল পর্যায়ে এবং সাধারণ মানুষের পক্ষে বিএনপি’র ভূমিকা রেখেছে। জনগণের আন্দোলনে শরিক হয়েছি। বিএনপি করবার কারণে সেই আন্দোলনে আমরা নেতৃত্ব দিয়েছি এবং বিএনপির আন্দোলনটাই ছিল মানুষের অধিকার গণতন্ত্র সাম্য, মানবাধিকার এবং ভোটের অধিকার এবং এই লড়াইটা আমরা করেছি বিগত ২০ বছর যাবৎ এবং মহান আল্লাহর ইচ্ছায়।
জুলাই আন্দোলনে সেটি সবার সম্পৃক্তাতায় সফল হয়েছে। এই আন্দোলনতো আর একদিনে হয়নি, দীর্ঘদিন ধীরে ধীরে আমরা যারা বিএনপি করেছি বা যারা তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছি, আমরা মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়েছি। আমাদের গোছানো কর্মসূচি ছিল। আমাদের বহু নেতাকর্মী মামলার আসামি ছিল। সারা বাংলাদেশে আমাদের মামলার আসামি প্রায় ৬০ লাখ।
এর মধ্যে শিবগঞ্জের সংখ্যা অনেক বেশি। সেই সব আসামিদের জন্য আমরা কোর্টে গিয়েছি জামিন করিয়েছে, জেলখানায় থাকা অবস্থায় তাদের খোঁজ নিয়েছি, তাদের পরিবারের খোঁজ নিয়েছি, বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছি। এর বাইরে লন্ডন থেকে বিএনপির সেই সময়ের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি আমাদেরকে দিয়েছেন, যেমন শিবগঞ্জে আমাদের একটা কর্মসূচি চালু আছে সপ্তাহের শনিবার শিবগঞ্জের ৫শ’ অসহায় মানুষকে খাওয়ানো। মাঝে মাঝে মেডিকেল ক্যাম্প, অসহায় মানুষের মেয়ের বিয়েতে সহায়তা করা, অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ভাঙা রাস্তা মেরামত করা।
ব্রিজ মেরামত করে দেওয়া, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি রয়েছে বিএনপির। এরকম বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে বিশেষ করে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে যে ভূমিকাটা ছিল-সেই আন্দোলনে নেতৃত্বের কারণে সাধারণ মানুয়ের কাছে ব্যক্তিগতভাবে আমি গ্রহণযোগ্য হয়েছি। যেহেতু আমি অনেক অল্প বয়সে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলাম এরপর অল্প বয়সে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলাম স্বাভাবিক কারণেই এই জনপদের মানুষের সাথে আমার ব্যক্তিগত এবং আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে-সেই সম্পর্ক থেকে আমার রাজনীতিতে আসা এবং মনোনয়ন পাওয়া এবং নির্বাচিত হওয়া।
সবচেয়ে বড়ো কথা হচ্ছে, তৃণমূল থেকে রাজনীতি করে উঠে আসা এবং মহান আল্লাহর ইচ্ছায় একদম গণতান্ত্রিক পন্থায় মানুষের বিপুল সমর্থন নিয়ে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাকে মন্ত্রী পরিষদের সদস্য করেছেন। এজন্য মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি এবং তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।
করতোয়া : আপনি এমন একটা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন, যেখানে বিএনপি মহাসচিব আপনার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। আপনি যে সুযোগ পাবেন তা হলো তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের কাজ করার সুযোগ। এক্ষেত্রে আপনার এলাকার পাশাপাশি বগুড়া জেলাকে নিয়ে আপনার ভাবনাটা কী?
মীর শাহে আলম : আপনি সঠিক বলেছেন। একদম তৃণমূল মানুষের এবং জনবান্ধব কাজের সাথে সম্পৃক্ত আমাদের মন্ত্রণালয়। তবে আমি এক দিক থেকে সৌভাগ্যবান যে দলের সর্বোচ্চ দ্বিতীয় ব্যক্তি যিনি, দলের মহাসচিব যিনি মাননীয় মন্ত্রী, আমার অভিভাবক। সেই কারণে আমার আমার ওপর প্রেসারটা আমি এতো মনে করি না। স্বাভাবিক কারণেই উনি যেহেতু পূর্ণ মন্ত্রী এবং দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তি, দলের মহাসচিব উনি অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করছেন।
এই দায়িত্বের পাশাপাশি সুযোগ দিচ্ছেন ডেভলপমেন্টের বিষয়গুলাকে। আমাদের অল্প কিছুদিন সময় হয়েছে। এই সরকারের বয়স মাত্র ৯ দিন। কর্ম দিবস পালন করেছি মাত্র ৬ দিন। এর মধ্যে থেকে মাননীয় মহাসচিব অভিভাবক হিসেবে আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন, তা হলো সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, এলজিইডি, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা এই বিষয়গুলো আস্তে আস্তে আমরা দেখছি। তবে অতিতের কথা আমরা বলবো না। অতিতের প্রত্যেকটা সেক্টরের অনিয়ম, দুর্নীতি যেগুলো নজরে আসছে, সেগুলো আমরা দেখছি।
এই বিষয়গুলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদেরকে নির্দেশনা দিয়েছেন। শক্তহস্তে এই বিষয়গুলা দেখতে। জনগণের যে প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, সিটি কর্পোরেশন এই প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে মানুষের সেবক হিসেবে এবং জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় সে ব্যাপারে আমরা আমাদের সরকার এবং আমাদের মন্ত্রণালয় ভূমিকা রাখবে।
বগুড়ার উন্নয়ন নিয়ে যেটা বলছেন, তা হলো বিগত ১৭ বছর বগুড়া উন্নয়ন বঞ্চিত ছিল-স্বাভাবিক কারণেই। আমরা মাঠে-ঘাটে ঘুরি, রাস্তাঘাটসহ অনেক সমস্যা আমাদের রয়েছে। বগুড়ার উন্নয়নের বিষয়টি যদি আমরা জোড়ালোভাবে বলি, বগুড়ায় সবকিছু করে দিবো বিষয়টা আমরা এই ভাবে বলবো না তবে, যেহেতু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে উন্নয়ন রিলেটেড মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব দিয়েছেন এবং আমার বাড়ি বগুড়ায়।
বগুড়ার মানুষ ৩০ বছর পর মন্ত্রী পেয়েছেন। এই উপজেলার মানুষ পেয়েছে ৪০ বছর পর। ১৯৮৬ সালে প্রয়াত মোজাফ্ফর রহমান-বন ও কৃষি প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। এরপর এই উপজেলা থেকে আমি মন্ত্রী হয়েছি। পাকিস্তান আমলে সাবেক হুইপ রেজাউল বারী ডিনার বাবা প্রদেশিক মিনিস্টার ছিলেন। স্বাভাবিক কারণেই যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রনালয় এবং উন্নয়নমূলক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব আমি পেয়েছি।
বগুড়াটাকে আলাদাভাবে আমি দেখবোই-তবে সেটা যেন অন্য জেলার সাথে অবিবেচকের মতো না হয়।,এক তরফা যাতে না হয়। যে ঘাটতি আছে সেই ঘাটতি পূরণ করে ৬৩ জেলার সাথে মিলাবো এবং যেটুকু ঘাটতি আছে-যত দ্রুত সময়ের মধ্যে পূরণ করা যায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিয়ে সেটা করবো ইনশাল্লাহ।
করতোয়া : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বগুড়ায় তার সমাবেশে বলেছিলেন, বগুড়াকে তিনি মডেল করতে চান, যে মডেল ধরে বাকি ৬৩টি জেলাকে তিনি সাজাবেন। সেক্ষেত্রে বগুড়ার উন্নয়ন কাজ ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত করেছেন। বগুড়া সিটি কর্পোরেশন করার একটা প্রক্রিয়া আছে সেই প্রক্রিয়া কোন পর্যায় রয়েছে?
মীর শাহে আলম : আমি দায়িত্ব নেয়ার পর সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাকে আমি ডেকেছি কথা বলেছি। এটা বর্তমানে মন্ত্রী পরিষদ বিভাগে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। বিষয়টি আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নোটিশে এনছি; উনি বলেছেন, কেবল মাত্র দায়িত্ব নিলাম আমাদের জাতীয় কিছু কর্মসূচি আছে এই কর্মসূচি মাঠে গড়ানোর পরে আমরা এই বিষয়গুলো দেখবো। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়টি রিভাইজ হবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাধারণ করা যায় কিনা এটা নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে আমার কথা হয়েছে। এর বাইরে বগুড়ার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন-বিমানবন্দর, রেল যোগাযোগ, করতোয়া নদী খনন ইত্যাদি। আমি ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী জেলা প্রশানক মহোদয়কে বলেছি, আমাদের কোন কোন বিষয়ের অগ্রগতি কী হয়ে আছে এবং কোন কোন মন্ত্রণালয় বিষয়গুলো কী অবস্থায় আছে তা জেনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নোটিশে এনে তার সদয় সম্মতি নিয়ে আমি এগুবো।
বগুড়ার মানুষ অনেক আশা নিয়ে বিএনপিকে নিরঙ্কুশ ভোট দিয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রী সদর থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন এমপি হিসেবে। আমাদের দায় অবশ্যই রয়েছে বগুড়ার মানুষের প্রতি। বিশেষ করে আমি যেহেতু তৃণমূল থেকে উঠে আসা একজন কর্মী। আমি যেহেতু মন্ত্রী হয়েছি আমি অবশ্যই বগুড়ার মানুষের যে স্বপ্ন, বগুড়ার মানুষের যে ইচ্ছা, তা বাস্তবায়নের জন্য সবার সহযোগিতা নিয়ে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখবো ইনশাআল্লাহ।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/159490