ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের নেপথ্যে চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক আধিপত্যের অঙ্ক
বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত দাবার চাল। আপাতদৃষ্টিতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে ধর্মীয় বা আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াই মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য রক্ষার মরণপণ চেষ্টা। এই সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চীন।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি রাষ্ট্রকে পঙ্গু করার জন্য এখন আর সরাসরি যুদ্ধের প্রয়োজন হয় না; তার জ্বালানি সরবরাহ এবং অর্থনৈতিক লেনদেনের পথ বন্ধ করে দিলেই চলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গত কয়েক দশক ধরে ‘পেট্রোডলার’ সিস্টেমের মাধ্যমে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে। নিয়মটি সহজ-বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে জ্বালানি কিনতে হলে আপনাকে ডলার ব্যবহার করতে হবে। যারা এই নিয়ম ভাঙার চেষ্টা করেছে, তাদের কপালে জুটেছে ‘নিষেধাজ্ঞা’ নামক অর্থনৈতিক মারণাস্ত্র। ভেনেজুয়েলা এবং ইরানের ক্ষেত্রে আমরা ঠিক এটাই ঘটতে দেখেছি।
ভেনেজুয়েলা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম খনিজ তেলের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও আজ চরম অর্থনৈতিক সংকটে। কারণটি রাজনৈতিক অস্থিরতা নয়, বরং দেশটির তেলের ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ এবং ডলারের বাইরে লেনদেনের চেষ্টা। আমেরিকা চায়নি ভেনেজুয়েলার তেল চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার ঢাল হয়ে উঠুক। ফলে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দেশটির তেল বিক্রির পথ রুদ্ধ করা হয়েছে, যাতে চীন সেখান থেকে সস্তায় ও নিরাপদ বিকল্প পথে জ্বালানি না পায়।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, ইরানের সাথে বর্তমান সংঘাতের সম্পর্ক কী? ইরান কেবল মধ্যপ্রাচ্যের একটি শক্তিশালী দেশই নয়, বরং তারা চীনের ‘এনার্জি পার্টনার’। চীন যখন ইরান বা ভেনেজুয়েলার সাথে স্থানীয় মুদ্রায় (যেমন ইউয়ান) তেল কেনাবেচার চুক্তি করে, তখন ডলারের ভিত্তি কেঁপে ওঠে। চীন যদি ডলার সিস্টেমকে বাইপাস করে তার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ফেলে, তবে আমেরিকার বৈশ্বিক খবরদারি অর্থহীন হয়ে পড়বে।
ইসরায়েল-ইরান সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির দিকে তাকালে বোঝা যায়, এটি মূলত ইরানকে ঘিরে থাকা চীনের ‘জ্বালানি সাপ্লাই চেইন’ ছিন্ন করার একটি প্রক্রিয়া। বাইডেন প্রশাসন যেভাবে ট্যারিফ যুদ্ধের মাধ্যমে চীনকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করেছিল, বর্তমান ট্রাম্প বা পরবর্তী প্রশাসনগুলোও একই কৌশল ভিন্নভাবে প্রয়োগ করছে। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা বজায় থাকলে ইরানের তেল উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে চীনের ওপর। চীন যত বড় প্রযুক্তি শক্তিই হোক না কেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ ছাড়া তার কলকারখানা ও অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়বে।
ইরানের ওপর বর্তমান এই প্রচণ্ড চাপ এবং সামরিক উত্তেজনার মূল লক্ষ্য হলো- দেশটিকে এতটাই অস্থিতিশীল করে তোলা যাতে চীন সেখান থেকে দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিশ্চয়তা না পায়। মূলত, চীনকে ‘এনার্জি হাঙ্গরি’ রেখে তাকে আপস করতে বাধ্য করাই পশ্চিমা কৌশলের প্রধান অংশ।
পরিশেষে বলা যায়, এই যুদ্ধ কেবল ইসরায়েল, ইরান বা আমেরিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এক মেরু বনাম বহু মেরু বিশ্বের লড়াই। একদিকে আছে ডলারের আধিপত্য রক্ষার মরিয়া চেষ্টা, অন্যদিকে চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরির প্রচেষ্টা। ইরানের আকাশে যে বারুদ উড়ছে, তার লক্ষ্য আসলে বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক উত্থানকে রুদ্ধ করা। ইতিহাস সাক্ষী, যে পক্ষ জ্বালানি এবং মুদ্রার লড়াইয়ে জিতবে, আগামীর পৃথিবী হবে তাদেরই।
হাসান মো: শাব্বির
সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/159470