স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ পেছানো 

স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ পেছানো 

বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উন্নীত হবে কি না এখন প্রশ্ন সেটা নয়; বরং কবে হবে সেটাই মূল বিষয়। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (ইউএন সিডিপি)-র নির্ধারিত সব শর্ত পূরণ করে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করেছে। তবে এই উত্তরণ আমাদের জন্য সম্মান বয়ে আনলেও সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাস্তবমুখী হওয়া অত্যন্ত জরুরি, কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও উন্নয়নের বিষয়। উত্তরণের সময়সীমা পেছানোর দাবি নতুন নয়। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, প্রস্তুতি এখনও অপর্যাপ্ত, তাই এলডিসি উত্তরণ আরও পাঁচ-ছয় বছর পিছিয়ে দেওয়া উচিত। বর্তমান সরকার অন্তত তিন বছরের জন্য উত্তরণ স্থগিতের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা বাস্তবসম্মত বলেই মনে হয়। কারণ উত্তরণের সঙ্গে সঙ্গেই বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলার সক্ষমতা আমরা পুরোপুরি অর্জন করেছি কি না-এটি ভাবার বিষয়। 

এই ধাক্কার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে দেশের পোশাক ও ঔষধ শিল্পের ওপর। বর্তমানে এলডিসি সুবিধার আওতায় বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৭৩ শতাংশ পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়। এর সিংহভাগই তৈরি পোশাক শিল্প থেকে আসে, যা মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর সাময়িক কিছু সুবিধার মেয়াদ শেষ হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর প্রায় ১২.৫ শতাংশ শুল্ক আরোপিত হতে পারে। এলডিসির অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা না থাকলে বাংলাদেশের বার্ষিক রপ্তানি আয়ের প্রায় ১৪ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার কমে যেতে পারে। এর বাইরে শ্রম, পরিবেশ এবং মেধাস্বত্ব সংক্রান্ত মানদন্ডেও কঠোর শর্ত আরোপ হতে পারে। ওষুধ শিল্পের জন্যও শঙ্কা কম নয়। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আওতায় দেওয়া ট্রিপস (টিআরআইপিএস) ছাড় বাতিল হলে স্থানীয় ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে ক্যান্সার ও এইচআইভি অ্যান্টি-রেট্রোভাইরালসের মতো জীবনরক্ষাকারী ওষুধের স্বল্পমূল্যের জেনেরিক উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। পেটেন্ট সুরক্ষা চালু হলে ওষুধের দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে, যা সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবা পাওয়া কঠিন করে তুলবে। উত্তরণ পিছিয়ে গেলে দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো নিজ দেশেই সক্রিয় ওষুধ উপাদান (এপিআই) তৈরি এবং মেধাস্বত্ব সংক্রান্ত নিয়মে ধীরে ধীরে খাপ খাইয়ে নেওয়ার কিছুটা  সুযোগ পাবে।

 আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। এলডিসি সুবিধা প্রত্যাহার এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতিজনিত উচ্চ শুল্ক ও কঠোর মানদন্ড এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাব রপ্তানিকারকদের জন্য বড় চাপ তৈরি করবে। তাই সরকারের উচিত যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যচুক্তির শর্তগুলো পুনর্বিবেচনা করা এবং প্রয়োজনে নতুন করে আলোচনা চালিয়ে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষিত করা। শুধু আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জই নয়, অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির দুর্বলতাও উত্তরণের পথে বড় বাধা। ব্যবসায়ী সংগঠন, ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি সংকট, ঋণের উচ্চ সুদ এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখনো কাটিয়ে ওঠা যায়নি। এই অবস্থায় উত্তরণের ধাক্কা মোকাবিলা কঠিন হবে। তাই জাতীয় পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনা করা দরকার, যেখানে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, রপ্তানিকারক সংস্থা, ঔষধ শিল্প, অর্থনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজ অংশ নেবে। প্রস্তুতির মধ্যে  থাকতে হবে অবশ্যই সুনির্দিষ্ট উত্তরণ পরিকল্পনা, নতুন বাজার সৃষ্টির কৌশল, দেশভিত্তিক বাণিজ্য আলোচনা, ব্যাংকিং সংস্কার ও অবকাঠামো উন্নয়ন। 

এ ছাড়া বাংলাদেশকে জাতিসংঘের সঙ্গে আলোচনা আরও জোরদার করতে হবে এবং নেপাল ও লাওসের মতো দেশগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে। আগেও বেশ কয়েকটি দেশ বিশেষ সমস্যার কারণে উত্তরণ পিছিয়েছে। কাজেই বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে তথ্যভিত্তিক ও সুস্পষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমেই উত্তরণের সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন জানানো যৌক্তিক। অবশেষে সব দিক বিবেচনা করলে দেখা যায় যে উত্তরণ পেছানো শুধু সময়ক্ষেপণ নয়, বরং এটি একটি সুযোগ যার মাধ্যমে দেশের শিল্পখাতকে শক্তিশালী করা, আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো অনুকূলে আনা এবং অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করা যাবে । তাই আবেগী না হয়ে বাস্তববাদী হয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে উত্তরণের সংকটে পরিণত না হয়ে সাফল্য বয়ে আনে।

লেখক :  

মিথিলা খাতুন

শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, 
সরকারি আজিজুল হক কলেজ।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/159314