বিপর্যয়ের পদধ্বনি: ভূমিকম্পের তীব্র ঝুঁকিতে বাংলাদেশ, আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু?

বিপর্যয়ের পদধ্বনি: ভূমিকম্পের তীব্র ঝুঁকিতে বাংলাদেশ, আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু?

প্রকৃতি মাঝেমধ্যে আমাদের চরম সতর্কবার্তা দেয়, কিন্তু আমরা কি তা শুনতে পাই? গত কয়েক মাসের ভূকম্পন পরিস্থিতি যেন সেই পুরনো প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। গত বছরের ২১ নভেম্বর নরসিংদীতে ৫.৭ মাত্রার কম্পন আর গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর ৫.৪ মাত্রার ঝাঁকুনি—এই ঘনঘন কম্পন কি কেবলই কাকতালীয়, নাকি কোনো বড় বিপর্যয়ের পদধ্বনি? তথ্য বলছে, চলতি মাস শেষ হওয়ার আগেই দেশ ১০ বার কেঁপে উঠেছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি দুই দিনে একবার। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘অশনিসংকেত’

ইতিহাসের আয়নায় বর্তমান আতঙ্ক

বাংলাদেশ অঞ্চলে সবশেষ বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়েছিল প্রায় ৯৬ বছর আগে, ১৯৩০ সালে। সে সময় রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৭। এর আগের ৬৫ বছরে অন্তত ছয়বার বড় ধরনের ভূমিকম্প এই জনপদকে তছনছ করে দিয়েছিল। সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ১৮৯৭ সালের ১২ জুনের ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক’, যার মাত্রা ছিল ৮-এর বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ যে ভৌগোলিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে বড় বড় টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থল। বিশেষ করে ইন্দো-বার্মা প্লেট এখন অত্যন্ত সক্রিয়। ইতিহাস ও গবেষণা বলে, বড় ফল্ট লাইনগুলোতে ১০০ থেকে ১৫০ বছর পরপর ৭ মাত্রার বেশি এবং ২৫০ থেকে ১০০০ বছর পরপর ৮ মাত্রার বেশি ভূমিকম্প ফিরে আসে। সেই হিসেবে বাংলাদেশ এখন এক মহাবিপর্যয়ের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় শত বছর পার করা এই প্লেটগুলো যেকোনো সময় তীব্র ঝাঁকুনি দিতে পারে।


আমাদের ঝুঁকি ও ভঙ্গুর অবকাঠামো

ভূমিকম্পে মানুষ মারা যায় না, মানুষ মারা যায় ভবনের নিচে চাপা পড়ে। আর ঠিক এখানেই বাংলাদেশের ভয়ের মূল কারণ। পরিসংখ্যান অত্যন্ত ভয়াবহ। রাজধানী ঢাকাতেই বর্তমানে প্রায় ২১ লাখ বাসাবাড়ি আছে। এর মধ্যে ৩০ শতাংশই ছয় তলার বেশি উঁচু। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ভবনগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশই ভূমিকম্প সহনীয় নয়। শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশেই ছড়িয়ে আছে কয়েক লাখ ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো। অপরিকল্পিত নগরায়ন, জলাশয় ভরাট করে ভবন নির্মাণ এবং বিল্ডিং কোড না মানার সংস্কৃতি আমাদের শহরগুলোকে একেকটি মরণফাঁদে পরিণত করেছে।

নরসিংদীর ভূমিকম্পে ৫.৭ মাত্রাতেই যখন কয়েকজনের প্রাণহানি ঘটে, তখন ৭ বা ৮ মাত্রার কম্পনে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে পারে, তা কল্পনা করলেও শিউরে উঠতে হয়। সরু রাস্তা আর ঘিঞ্জি বসতির কারণে দুর্যোগ পরবর্তী উদ্ধারকাজ চালানোও হবে প্রায় অসম্ভব।
 

প্রস্তুতির অভাব নাকি উদাসীনতা?

প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমরা রুখতে পারব না, কিন্তু প্রস্তুতি দিয়ে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কমিয়ে আনা সম্ভব। জাপানের মতো দেশ ৯ মাত্রার ভূমিকম্পেও টিকে থাকে কেবল তাদের প্রকৌশলগত সক্ষমতা আর সচেতনতার কারণে। আমাদের প্রধান প্রস্তুতি হওয়া উচিত বিদ্যমান অবকাঠামোকে ভূমিকম্প সহনীয় করে তোলা বা ‘রেট্রোফিটিং’ করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC) মানার হার হতাশাজনক। সরকারি তদারকি সংস্থার সীমাবদ্ধতা আর সাধারণ মানুষের অসচেতনতা আমাদের চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

করণীয়:

এখন সময় অ্যাকশনের: বড় বিপর্যয় ঘটার পর হাহাকার করে লাভ নেই। এখনই সময় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার:

ভবন পরিদর্শন: ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সংস্কার অথবা অপসারণ করতে হবে।
বিল্ডিং কোড নিশ্চিতকরণ: নতুন যেকোনো অবকাঠামো নির্মাণে ভূমিকম্প সহনীয় নকশা বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং এর কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
জনসচেতনতা ও মহড়া: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে নিয়মিত ভূমিকম্পকালীন মহড়া আয়োজন করা জরুরি।
উদ্ধার সরঞ্জাম বৃদ্ধি: বড় দুর্যোগ মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিসসহ উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়ার প্রযুক্তি পৃথিবীতে এখনো নেই। তবে বিপর্যয়ের সংকেত প্রকৃতি আমাদের দিচ্ছে। ৯৬ বছরের এক দীর্ঘ ‘শান্তকাল’ হয়তো যেকোনো মুহূর্তে শেষ হতে পারে। এই মুহূর্তে বাসাবাড়িসহ সব অবকাঠামো ভূমিকম্প সহনীয় করে তোলাই হবে আমাদের আত্মরক্ষার প্রধান ঢাল। আমরা কি প্রকৃতির এই সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দেব, নাকি ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে শেখার অপেক্ষায় থাকব ? উত্তরটি আমাদের আজই খুঁজতে হবে।

হাসান মো: শাব্বির
সাংবাদিক-প্রাবন্ধিক।

 

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/159174