দ্বিমত থাকুক, বিভাজন নয় শব্দের রাজনীতি নিয়ে ঢাবিতে প্রাণবন্ত আলোচনা

দ্বিমত থাকুক, বিভাজন নয় শব্দের রাজনীতি নিয়ে ঢাবিতে প্রাণবন্ত আলোচনা

ঢাবি প্রতিনিধি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ে টিএসসিতে ভাষা, শব্দ ও রাজনীতির জটিল সম্পর্ক নিয়ে জমে উঠল ব্যতিক্রমধর্মী এক উন্মুক্ত বিতর্ক। ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি (ডিইউডিএস) আয়োজনে টিএসসি পায়রা চত্বরে অনুষ্ঠিত হলো বিশেষ আয়োজন “শব্দের রাজনীতি: আরোপিত নাকি সহজাত?”। বিকেল সাড়ে ৩টায় শুরু হওয়া এই আয়োজনে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গবেষক ও আগ্রহী শ্রোতাদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে মডারেটরের দায়িত্ব পালন করেন অধ্যাপক ড. এস এম শামীম রেজা। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. তারিক মনজুর, থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. শাহনান মৈশান, কবি ও সমালোচক ইমরুল হাসান এবং প্রাবন্ধিক ও গবেষক তাহমিদাল জামি। প্রারম্ভিক বিতর্কে অংশগ্রহণ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতার্কিক মায়িশা মালিহা, নুসরাত জাহান শামামা, ইমরান হোসেন ফাহিম এবং ডিইউডিএস-এর সাধারণ সম্পাদক রাগীব আনজুম। সভাপতিত্ব করেন ডিইউডিএস-এর সভাপতি জুবায়ের হোসেন।

আলোচনায় বক্তারা ভাষা ও শব্দের ভেতর নিহিত ক্ষমতার সম্পর্ক, রাজনৈতিক প্রভাব, সাংস্কৃতিক নির্মাণ এবং সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে শব্দের আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। তাঁদের মতে, শব্দ কেবল নিরপেক্ষ যোগাযোগের মাধ্যম নয়; বরং তা সমাজ-রাজনীতি, ইতিহাস ও ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। ড. তারিক মনজুর বলেন, “ভাষা একটা বহমান নদীর মতো। ভাষা গড়ে ওঠার মাঝে অপরায়ণ ও সহজাতকরণ উভয় প্রবণতাই থাকে।

এই দুইয়ের মাধ্যমেই ভাষা এগিয়ে চলে… দ্বিমত হবেই কিন্তু ভাষা নিয়ে বিভাজন সৃষ্টি করা যাবে না।” তাঁর বক্তব্যে ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তন ও সহাবস্থানের গুরুত্ব উঠে আসে। ড. শাহনান মৈশান বলেন, “ভাষা নিয়ে তর্ক যত বেশি জারি থাকবে, ভাষা ততই প্রাঞ্জল থাকবে।” তিনি ভাষাকে একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক অনুশীলন হিসেবে ব্যাখ্যা করে মত দেন, মতভেদ ভাষাকে দুর্বল নয়, বরং শক্তিশালী করে।

তাহমিদাল জামি ভাষাকে নিয়ন্ত্রণের রাজনৈতিক প্রচেষ্টার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “নদীকে যেভাবে বাঁধ দিয়ে আটকানোর চেষ্টা করা হয়, ভাষাকেও সেভাবে ক্ষমতাকাঠামো নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে… অনেক ক্ষেত্রে মেরেও ফেলে।” তাঁর মতে, ভাষার স্বাভাবিক প্রবাহ রুদ্ধ হলে সমাজের বহুত্ববাদও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে ইমরুল হাসান বলেন, “প্রমিত বাংলার নামে আমাদের সামনে বাংলার একটি কঠিন রূপ জারি রাখা হয়েছে; যেই ভাষা লেখার ও বলার জন্য বেশ কঠিন।” তিনি ভাষার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও প্রমিত রূপের সামাজিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

প্রশ্নোত্তর পর্বে শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানে নতুন মাত্রা যোগ করে। মুক্ত আলোচনা ও যুক্তিতর্কের মাধ্যমে বিষয়টি নানা দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষিত হয়। বক্তা ও অংশগ্রহণকারীদের পারস্পরিক সংলাপে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—ভাষা নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে, তবে সেই মতভেদ যেন বিভাজনে রূপ না নেয়।

আয়োজক সংগঠন ডিইউডিএস ভবিষ্যতেও এ ধরনের চিন্তনমূলক ও অংশগ্রহণভিত্তিক আয়োজন অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। ভাষা ও সমাজ-বাস্তবতা নিয়ে এ ধরনের উন্মুক্ত আলোচনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে আরও গতিশীল করবে বলে আশা প্রকাশ করেন আয়োজকরা।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/159102