রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিপর্যস্ত পাবনা সেচ প্রকল্প

রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিপর্যস্ত পাবনা সেচ প্রকল্প

বেড়া (পাবনা) প্রতিনিধি: পাবনার বেড়া উপজেলার সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তত্ত্বাবধানে ১৯৯২ সালে প্রায় ৩৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ে পাবনা সেচ ও পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প (পিআইআরডিপি) চালু হয়।

বেড়া উপজেলার বৃশালিখায় প্রধান পাম্পস্টেশন স্থাপন করা হয়। সেখান থেকে যমুনা ও হুরাসাগর নদ থেকে পানি তুলে বিভিন্ন সেচ খালে সরবরাহ করা হতো। কৈটোলায় নির্মাণ করা হয় রেগুলেটর (স্লুইস গেট), যা বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। আমন ও বোরো মৌসুমে কৃষকরা স্বল্প খরচে পানি পেতেন। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে প্রতি বিঘা জমিতে নামমাত্র মূল্যে সেচ সুবিধা দেওয়া হতো।

বেড়া উপজেলার হাটুরিয়া-নাকালিয়া, নতুন ভারেঙ্গা, পুরান ভারেঙ্গা, জাতসাখিনী, মাশুমদিয়া ও চাকলা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি এই প্রকল্পের আওতায় পড়ে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বেড়া ছাড়াও সাঁথিয়া ও সুজানগর উপজেলার কিছু অংশ উপকৃত হয়।

পাবনা সেচ ও পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প (পিআইআরডিপি) এক সময় যা ছিল বেড়া উপজেলার কৃষকদের আশার আলো, রক্ষণাবেক্ষণ আর তদারকির অভাবে সেচখালগুলো (ক্যানেল) প্রভাবশালী ও স্থানীয়দের দখলে চলে যাওয়ায় কুশিয়ারা, বাগজান ও তারাপুরসহ চাকলা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের কয়েক হাজার কৃষক আজ সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার কুশিয়ারা, বাগজান, তারাপুর ও চাকলা এলাকার মধ্য দিয়ে যাওয়া সেচখালগুলোর অস্তিত্ব এখন সংকটে। খালের ওপর অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় টোং দোকান। অনেক জায়গায় খালের মুখ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ব্যক্তিগত চলাচলের যাওয়ার রাস্তা। পরিকল্পিত নজরদারির অভাবে খালের মূল প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় পানি পৌঁছাতে পারছে না এসকল ফসলি জমিগুলোতে।

চাকলা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য (মেম্বর) মো. আলমগীর হোসেন জানান, গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে টি-৭ ক্যানেল দিয়ে আর পানি আসে না। প্রায় ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ক্যানেল থেকে ২ কিলোমিটার বিস্তৃত এম-১ ও এম-২ ক্যানেলে নিয়মিত পানি সরবরাহ হলে কৃষকদের বাড়তি খরচ হতো না। কিন্তু ক্যানেলের মুখ বন্ধ থাকায় পানি প্রবাহ বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে তদারকির জন্য কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি না থাকায় সমস্যাটি আরও জটিল হয়েছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এর স্থানীয় কর্মকর্তাদের নিয়মিত নজরদারির অভাবেই এই দখলদারিত্ব মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। উচ্ছেদ অভিযানের কোনো উদ্যোগ না থাকায় দখলকারীরা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। ফলে সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পের সুফল থেকে সাধারণ কৃষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন।

সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পটি দ্রুত সংস্কার ও দখলমুক্ত করা না হলে কৃষকরা আরও ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে স্থানীয়দের আশঙ্কা। এ বিষয়ে বেড়া পানি উন্নয়ন উপ-বিভাগ-১, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. হায়দার আলী বলেন, সেচ ক্যানেল দখল করা সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ।

কুশিয়ারা ও বাগজান এলাকায় খালের ওপর অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে ইতিমধ্যে একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে সংশ্লিষ্ট ক্যানেলগুলোর সংস্কারের লক্ষ্যে সমীক্ষা প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সংস্কার কাজ বাস্তবায়িত হলে ক্যানেলগুলোর পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হবে এবং কৃষকদের দীর্ঘদিনের সেচসংকট অনেকাংশে দূর হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/159067