দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধিতে নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ
জন-আকাক্ষা অনুযায়ী দেশ পরিচালনার শপথে যাত্রা শুরু করেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ ও নতুন সরকার। বগুড়ার সন্তান তারেক রহমান এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। তিনিসহ মন্ত্রিসভার সকল সদস্য, সকল সংসদ সদস্যদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। আমরা দৃঢ়ভাবেই বিশ্বাস করতে চাই যে, ক্ষমতাসীন সরকার তাদের ঘোষিত নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী দেশ ও মানুষের কল্যাণে দেয়া অঙ্গীকারগুলো পূরণ করবেন। বড় বড় রাজনৈতিক ইস্যুগুলোর বাইরে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে চাওয়া সপরিবারে প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার পাবার নিশ্চয়তা। নিরাপত্তা ও পুষ্টিমানের নিশ্চয়তা ছাড়া ইশতেহারে বর্ণিত খাদ্য নিরাপত্তার ঘোষণা অর্থহীন।
আজ থেকে শুরু হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। পবিত্র রমজান মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বরকতময় একটি মাস। সকলকে জানাই রমজানুল মোবারক। পবিত্র আল-কুরআন নাযিলের এই মহান মাস আত্মশুদ্ধি, সংযম, ত্যাগ ও তাকওয়া অর্জন ও চর্চার বিশেষ সুযোগের মাস। রমজান মুসলমানদের জন্য আধ্যাত্মিক উন্নতি ও নৈতিক শুদ্ধতার এক অনন্য সুযোগ। অতীতে যাই হয়ে থাক, আমরা অনুরোধ করি, ব্যবসায়ী ও সরকারে থাকা সকলেই এই মহান রমজানের নৈতিক শিক্ষার আলোকে খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, ভেজাল ও দূষণ সৃষ্টি থেকে নিজেদের বিরত রাখবেন।
নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য গ্রহণ সব সময়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে রমজান মাসে যেহেতু আমাদের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আসে, মানুষ অতিরিক্ত ভাজা-পোড়া, তৈলাক্ত, চিনি ও লবণ মেশানো খাবার বেশি গ্রহণ করে,তাই এ সময়ে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি বলে চিকিৎসকগণ মনে করেন। বিশেষ করে ইফতার ও সেহরিতে অনিরাপদ বা অস্বাস্থ্যকর খাবার শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে এবং তার ফলে একজন ব্যক্তির রোজার মূল উদ্দেশ্যও ব্যাহত হতে পারে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাজারে যে খাবারগুলো সচরাচর বেশি দেখা বা পাওয়া যায় তার নিরাপদতা, পুষ্টির মাত্রা নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিদ্যমান।
বাংলাদেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষ প্রতিদিন প্রতিজন গড়ে মাত্র ২০০ টাকার খাবার গ্রহণ করলে সেই হিসেবে দেশে প্রতিদিন ৩,৬০০ কোটি টাকার খাবার গ্রহণ করা হয়। বিশাল বাজারের এই খাদ্যসমূহ কতখানি নিরাপদ? দেশে অসংক্রামক রোগের বিস্তৃতি ঘটেছে প্রায় ৭০%। খাদ্যে ভেজাল, ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ, ইত্যাদি সমস্যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার অন্যতম প্রধান শর্ত। তাই নাগরিক সমাজ সরকারের কাছে সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানাচ্ছে। দেশের গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করে মাসব্যাপী জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অপরাধীকে শাস্তি দিতেই হবে, পাশাপাশি নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদক থেকে পরিবেশক অর্থাৎ ক্ষেত থেকে পাত পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সরকারকেই এজন্য সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। কেবল অর্থনির্ভর প্রকল্পভিত্তিক উদ্যোগ নয়, বরং ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা সৃষ্টির মাধ্যমে একটি নতুন কর্মধারা তৈরী করতে হবে। নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিতে স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগ নিতে হবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে।
বাংলাদেশে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি মানুষের খাদ্য প্রাপ্তি ও খাদ্য মূল্যস্ফীতির উপর প্রভাব বিস্তার করে। সংবাদমাধ্যমের মতে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে পয়েন্ট টু পয়েন্ট খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮.৫৮% হয়েছে যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৭.৭১%। এর অর্থ হলো চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, মাছ, মাংস, ডিম এবং শাকসবজির মতো প্রধান জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, যা সাধারণ ও নিম্নবিত্ত পরিবারের খাদ্য ব্যয়ের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে। খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পরিবারের অন্যান্য ব্যয়কে প্রভাবিত করেছে। খাদ্যের দাম বাড়লে কৃষক বাড়তি দাম পায় তা কিন্তু নয়। কৃষকের মাঠে যে পণ্যের দাম ৩০ টাকা সেটাই ঢাকার বাজারে বিক্রি হয় ১০০ টাকায়। এই বাড়তি ৭০ টাকা আসলে পরিবহনের চাঁদাবাজি, ফড়িয়া ও মজুদকারী ব্যবসায়ীদের পেটে যায়। সুতরাং নতুন সরকারকে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে হলে এই চাঁদাবাজ, ফড়িয়া ও মজুদকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষ ক্ষমতা আইন ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে তাদের দৌরাত্ম্য। বাঁচাতে হবে কৃষক ও ভোক্তা উভয়কেই। তাই, নতুন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা ও দাবি থাকবে তাঁরা যেন খাদ্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, কৃষি ও কৃষকের সমৃদ্ধি, এবং পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য তথা এগ্রোইকোলজি বিবেচনায় রেখে টেকসই কর্মসূচি গ্রহণে অগ্রাধিকার দেন। খাদ্যের বিশাল বাজার তথা উৎপাদন থেকে পরিবেশন পর্যন্ত ধাপগুলিতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে। এজন্য খাদ্য ব্যবস্থাপনা চক্রে তরুণ-যুব উদ্যোক্তা সৃষ্টির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এমতাবস্থায়, নাগরিক সমাজের আকাক্সক্ষা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে আমরা নতুন সরকারের কাছে জোর দাবি জানাই।
অনিয়ম, দুর্নীতি, কালোবাজারী অর্থনীতি ধ্বংসের জন্য দায়ী। সমন্বয়ের মাধ্যমে আইনের কঠোর প্রয়োগ, নিয়মিত বাজার তদারকি, ভোক্তাদের মধ্যে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যসচেতনতা বৃদ্ধির পদক্ষেপগুলো আমাদের মেধাসম্পন্ন ও অধিকতর কর্মদক্ষ জাতি গঠনে সহায়তা করবে। এর ফলে অর্থনীতি মজবুত হবে, মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। নতুন সরকারের কাছে আমরা নতুন ধরনের উদ্দীপনাময় কর্মদ্যোগ চাই, পুরানো ঘুণে ধরা ও লুটেরা ব্যবস্থায় ফিরে যেতে চাই না। সরকারের জন্য সেটা অনেক বড় একটা চ্যালেঞ্জ। যদিও নাগরিক সমাজকে সাথে নিয়ে সরকার এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারে। তার জন্য নতুনভাবে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, এগিয়ে আসতে হবে সরকারকেই। আসুন, সবাই মিলে সবার জন্য সুন্দর একটি দেশ গড়ে তুলি।
লেখক
আতাউর রহমান মিটন
সংগঠক, প্রাবান্ধিক।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/158545