বগুড়ার পথে পথে কুকুরের দাপট: নিধন নয়, সমাধান হোক পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা
বগুড়া শহরের সাতমাথা থেকে শুরু করে চেলোপাড়া, কিংবা ঠনঠনিয়া থেকে বনানী—প্রতিটি মোড়ে এখন পথকুকুরের একচ্ছত্র আধিপত্য। সন্ধ্যার পর সাধারণ পথচারী, বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য রাস্তা দিয়ে হাঁটা এক চরম আতঙ্কের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কেবল বগুড়া নয়, সারা দেশেই পথকুকুরের সংখ্যা এখন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। কিন্তু উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও ‘পশু কল্যাণ আইন-২০১৯’-এর কারণে কুকুর নিধন এখন দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইনি সীমাবদ্ধতা আর ক্রমবর্ধমান কুকুরের উপদ্রবের মাঝে সাধারণ মানুষ আজ পিষ্ট। একদিকে পশুপেমীদের যুক্তি, অন্যদিকে জলাতঙ্কের মতো মরণব্যাধির হাত থেকে বাঁচার আকুতি—এই দুইয়ের মাঝে একটি কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি।
নিধন কেন সমাধান নয়?
অনেকেই মনে করেন কুকুর মেরে ফেলাই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের একমাত্র পথ। কিন্তু পরিবেশবিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। একটি নির্দিষ্ট এলাকার কুকুর মেরে ফেললে পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে নতুন ও সম্ভবত আরও বেশি হিংস্র কুকুর সেই জায়গা দখল করে। এছাড়া কুকুর নিধন কেবল নিষ্ঠুরতাই নয়, এটি বাস্তুসংস্থানের জন্যও ক্ষতিকর। তবে নিধন বন্ধ করা হলেও কুকুরদের নিয়ন্ত্রণে রাখার বিকল্প কোনো ব্যবস্থা শহরগুলোতে জোরালোভাবে গড়ে ওঠেনি, যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়েছে।
জলাতঙ্ক: এক নীরব ঘাতক
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলাতঙ্ক ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। কুকুরের কামড় বা আঁচড় থেকে ছড়ানো এই ভাইরাসের কোনো চিকিৎসা নেই; লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর মৃত্যু প্রায় শতভাগ নিশ্চিত। অথচ এই মরণব্যাধিটি শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য। বগুড়া পৌরসভা ও স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে যে টিকাদান কর্মসূচি চালানো হয়, তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। কুকুর হিংস্র হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ হলো খাবারের অভাব এবং অসুস্থতা। শহরের ডাস্টবিনগুলো থেকে ঠিকমতো বর্জ্য অপসারণ না হওয়ায় কুকুরগুলো ক্ষুধার্ত ও রোগাক্রান্ত হয়ে মানুষের ওপর আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে।
গৃহীত পদক্ষেপ ও পরামর্শ
জলাতঙ্ক নির্মূল ও পথকুকুরের উপদ্রব কমাতে আমাদের ‘পদ্ধতিগত’ পরিবর্তন প্রয়োজন:
১. গণটিকাদান (MDV): প্রতিটি এলাকায় পথকুকুরদের চিহ্নিত করে অন্তত ৭০% কুকুরকে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা দিতে হবে। এটি করা গেলে কুকুরের শরীরে ভাইরাস থাকবে না, ফলে কামড়ালেও জলাতঙ্ক হবে না।
২. বন্ধ্যাত্বকরণ কর্মসূচি (CNVR): নিধন না করে কুকুরের প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট করে দেওয়ার (বন্ধ্যাত্বকরণ) বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে কুকুরের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে।
৩. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: শহরের যত্রতত্র ময়লা ফেলা বন্ধ করতে হবে। উচ্ছিষ্ট খাবারের লোভে কুকুর লোকালয়ে ভিড় করে। সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কুকুরের ঘনত্ব কমাতে সাহায্য করে।
কামড়ালে বা আঁচড়ালে করণীয়: যদি কোনো কুকুর কামড়ায় বা আঁচড় দেয়, তবে আতঙ্কিত না হয়ে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি:
* আক্রান্ত স্থানটি দ্রুত কাপড় কাচার ক্ষারযুক্ত সাবান ও প্রবাহমান পানি দিয়ে অন্তত ১৫-২০ মিনিট ধুয়ে ফেলতে হবে। এতে ভাইরাসের কার্যকারিতা অনেকটা কমে যায়।
* ক্ষতস্থানে কোনোভাবেই চুন, লবণ, তেল বা পান পড়া লাগানো যাবে না।
* দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতাল বা টিকাদান কেন্দ্রে গিয়ে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ইনজেকশন (Vaccine) নিতে হবে। মনে রাখবেন, জলাতঙ্কের কোনো চিকিৎসা নেই, প্রতিকারই একমাত্র পথ।
বগুড়াবাসীকে এই আতঙ্ক থেকে মুক্তি দিতে সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভাকে কেবল আইনের দোহাই দিয়ে বসে থাকলে চলবে না। পশু কল্যাণ আইনকে সম্মান জানিয়েই আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে কুকুর নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রাণীর অধিকার যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকে। আমরা চাই না বগুড়ার কোনো মা তার সন্তানকে জলাতঙ্কে হারাতে দেখুক, আবার আমরা এও চাই না যে নিরীহ প্রাণীরা নির্বিচারে হত্যার শিকার হোক। সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে।
হাসান মো: শাব্বির
সাংবাদিক,প্রাবান্ধিক
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/158536