ব্যালট ও সংবিধানের সন্ধিক্ষণে: থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশ এক ভিন্নমুখী যাত্রায়

ব্যালট ও সংবিধানের সন্ধিক্ষণে: থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশ এক ভিন্নমুখী যাত্রায়

ফেব্রুয়ারি ২০২৬। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে দুটি দেশ—বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ড—একই সাথে তাদের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের ভাগ্য নির্ধারণে লিপ্ত। রোববার, ৮ই ফেব্রুয়ারি ব্যাংককের রাজপথে যখন ভোটারদের দীর্ঘ সারি, ঠিক দুই দিন পরেই বৃহস্পতিবার, ১২ই ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথও একই দৃশ্যের সাক্ষী হতে যাচ্ছে। অদ্ভুত এক সমান্তরাল রেখায় মিলে গেছে এই দুই দেশের বর্তমান রাজনীতি; যেখানে কেবল সরকার নির্বাচন নয়, বরং রাষ্ট্রের ‘ডিএনএ’ বা সংবিধান পরিবর্তনের প্রশ্নেও জনমতের মুখোমুখি হতে হচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্রকে।

থাইল্যান্ড: রাজতন্ত্র ও সংস্কারের ত্রিমুখী লড়াই

থাইল্যান্ডের নির্বাচনটি কেবল ক্ষমতা বদলের পালা নয়, বরং এটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক স্থবিরতা থেকে মুক্তির এক লড়াই। তিন ধারার রাজনৈতিক শক্তি—সংস্কারপন্থি (পিপলস পার্টি), সামরিক-সমর্থিত রক্ষণশীল (ভুমজাইথাই) এবং জনতাবাদী (ফেউ থাই) মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। রোববারের নির্বাচনের বিশেষত্ব হলো সাধারণ ভোটের পাশাপাশি ২০১৭ সালের সামরিক জান্তা-প্রণীত সংবিধান বাতিলের প্রশ্নে ‘গণভোট’।

থাই ভোটারদের ৫ কোটি ৩০ লাখের ম্যান্ডেট আজ শুধু একজন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করবে না, বরং তারা নির্ধারণ করবে আগামী দিনে থাইল্যান্ডে অনির্বাচিত সামরিক বা বিচার বিভাগীয় প্রতিষ্ঠানের প্রভাব কতটুকু থাকবে। জরিপ বলছে, কোনো দলই হয়তো একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না, যা দেশটিকে আবারও এক জটিল কোয়ালিশন বা জোট সরকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিশেষ করে ফিউ থাই এবং পিপলস পার্টির মতো দলগুলোর ভাগ্য আজ নির্ধারিত হচ্ছে ব্যালটে।

বাংলাদেশ: সংস্কার ও প্রত্যাবর্তনের মহাযজ্ঞ

অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার ‘ব-দ্বীপ’ বাংলাদেশে প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১২ই ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের যে ডাক দিয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে লজিস্টিক দিক থেকে বৃহত্তম এক আয়োজন। ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের এই কর্মযজ্ঞ সামলানো বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের জন্য এক এসিড টেস্ট।

বাংলাদেশের নির্বাচনেও সাধারণ ভোটের সাথে গণভোট যুক্ত করা হয়েছে, যা রাজনৈতিক সংস্কারের প্রতি জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। থাইল্যান্ডের মতো এখানেও ৫১টি দলের অংশগ্রহণ একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের ইঙ্গিত দেয়। বিএনপি যেখানে ২৯১ জন প্রার্থী দিয়ে একক দল হিসেবে মাঠে শক্তিশালী অবস্থানে, সেখানে জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলোর উপস্থিতি এবং বিপুল সংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থী রাজনীতির সমীকরণকে বহুমাত্রিক করে তুলেছে।

গণভোট ও সাধারণ নির্বাচন: একই বৃন্তে দুটি ফুল ?

থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশ—উভয় দেশই একই দিনে সাধারণ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন করে এক সাহসী চ্যালেঞ্জ নিয়েছে। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, এ অঞ্চলের জনগণ এখন কেবল ‘কাকে’ ভোট দেবে তা নিয়ে ভাবছে না, বরং ‘কীভাবে’ দেশ শাসিত হবে—সেই সংবিধানের মৌলিক কাঠামো নিয়েও কথা বলতে চায়।

তবে এই দ্বৈত ভোটিং প্রক্রিয়ার লজিস্টিক চ্যালেঞ্জগুলো উপেক্ষা করার মতো নয়। থাইল্যান্ডে ইতিমধ্যে দেখা গেছে যে, তিনটি আলাদা ব্যালট সামলানো এবং গণনা করা সময়সাপেক্ষ ও জটিল। বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় হলো, ৪২ হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্রে ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য দিয়ে এই বিশাল জনতাকে সুশৃঙ্খলভাবে রাখা। বিশেষ করে ব্যালট পেপার ও গণভোটের ব্যালটের রঙের পার্থক্য নিশ্চিত করা এবং ভোটারদের বিভ্রান্তি দূর করা হবে ইসি-র প্রধান কাজ।

এক নজরে দুই দেশের নির্বাচনি পরিসংখ্যান:

থাইল্যান্ডে গণভোট ও সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে রোববার, ৮ ফেব্রুয়ারি আর বাংলাদেশ গণভোট ও সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী  ১২ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার ।

থাইল্যান্ডের মোট ভোটার ৫ কোটি ৩০ লাখ এবং বাংলাদেশে ১২ কোটি ৭৭ লাখ । থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশে যথাক্রমে ৫০০টি, ২৯৯টি সংসদীয় আসন । থাইল্যান্ডে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দল ৫০-এর অধিক অপরদিকে বাংলাদেশে অংশ নেবে ৫১টি । থাইল্যান্ডে মূল ইস্যু সামরিক সংবিধান সংস্কার ও অর্থনীতি, বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কার ও গণতান্ত্রিক সরকার গঠন । থাইল্যান্ডে গণভোটের ধরন ২০১৭ সালের সংবিধান পরিবর্তন । অপরদিকে, বাংলাদেশে গণভোটের ধরন সংস্কার প্রস্তাবের অনুমোদন ।

থাইল্যান্ড যা শেষ করেছে, বাংলাদেশ হয়তো দুই দিন পর তার চাইতেও বড় পরিসরে সেই একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাবে। থাইল্যান্ডে যদি কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায়, তবে সেখানে ‘জোট সরকার’ গঠনের যে বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের ৫১টি দলের অংশগ্রহণের প্রেক্ষাপটেও তেমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সবশেষে বলা যায়, ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ঘোষিত ফলাফলে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চানভিরাকুল নেতৃত্বাধীন ভূমজাইথাই পার্টি । গণভোটের রায়ও গেছে নতুন সংবিধানের পক্ষে । থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশের এই ফেব্রুয়ারি মাসটি কেবল ক্ষমতার পালাবদলের নয়, বরং ‘ব্যালট বক্সে’ নাগরিক অধিকার পুনরুদ্ধারের মাস। যদি এই দুই দেশ সফলভাবে একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট সম্পন্ন করতে পারে, তবে তা এশিয়ার অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের জন্য এক অনন্য রোল মডেল হয়ে থাকবে।

হাসান মো: শাব্বির
সাব-এডিটর, দৈনিক করতোয়া।
০১৭১১-০৩৯২৭৬।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/157056