দেশ সংস্কার হলেও সংস্কার হয়নি সরকারি হাসপাতালগুলো

দেশ সংস্কার হলেও সংস্কার হয়নি সরকারি হাসপাতালগুলো

জুলাই আন্দোলনের পরে  দেশের প্রায় সকল  সেক্টরগুলোই কমবেশি  সংস্কার করা  হয়েছে। অবৈধ ও অসাধু উপায় অবলম্বন করে  চাকরি পাওয়া বা অবৈধ কাজ করা এমন লোকগুলোর চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এখনো কিছু কিছু সেক্টর এ দুর্নীতির চরম পর্যায় বিরাজমান। তারমধ্যে অন্যতম হলো সরকারি হাসপাতাল। এখানে দেখা যায় সর্বময় ক্ষেত্রে দালাল আর দুর্নীতিবাজদের দৌরাত্ম্য। টিকেট নেয়া থেকে শুরু করে সকল পরীক্ষা নিরীক্ষায় এটি বেশ প্রতীয়মান রয়েছে। এই হাসপাতালগুলোতে যে যে ক্ষেত্রে দুর্নীতি আর বৈষম্য দেখা যায় সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ঘুষের বিনিময়ে টিকেট দেয়া, ডাক্তার দেখানোর সময় কিছু ঘুষ দিলেই সিরিয়াল ব্রেক করে আগে দেখানো ইত্যাদি। এসব সরকারি হাসপাতালগুলো থেকে জনগণ সেবার জন্য আসলেও প্রচুর ভোগান্তিতে পড়ে। যার ফলে রোগী ডাক্তার দেখানোর জন্য দ্বিতীয়  বার আসার আগেও  কয়েকবার ভাবনা চিন্তা করে। যদি নিজেকে প্রশ্ন করা হয় যে জরুরি পরিস্থিতিতে সাধারণ নাগরিকদের  দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থা আছে আমাদের দেশে? উওর আসবে নাহ।

কেননা সাধারণ  মানুষের বুকে ব্যথা মানেই বুকের উপরে ভর্তি ফরম, সিরিয়াল, অ্যানালাইসিস ফি, প্রতীক্ষার ওয়ার্ড, ডাক্তার আসতে দেরি হবে, টাকা  জমা করেন, ডাক্তার মেকাপ নিচ্ছে , এখন ডাক্তারের  লাঞ্চ সময় , আর হয়তো একটা শোকবার্তা! এখানে সেবা পেতে হলে ধনী হতে হবে, জনপ্রিয় হতে হবে, নয়তো হতে হবে নিছক ভাগ্যবান! তবে কি বাংলাদেশে উন্নত চিকিৎসা একেবারেই  নেই? হ্যাঁ আছে, তবে শর্ত প্রযোজ্য। যেমন : চিকিৎসা আছে সততা নেই, ডাক্তার আছে দায়িত্ব নেই, হাসপাতাল আছে মানবতা নেই। দেশ আছে - সাধারণ জনগণের উন্নত চিকিৎসা নেই। মোটকথা, বাংলাদেশে উন্নত চিকিৎসা আছে ,তবে সাধারণ জনগণের জন্য নেই। সাধারণ জনগণের জন্য আছে লাঞ্চের পরে আসুন বাক্যে ।

আমাদের সমাজে যারা একেবারে নিম্ন্নশ্রেণীর বা নিম্নবিত্ত মানুষ রয়েছে এক্ষেত্রে তাদের কষ্ট থাকে সীমাহীন। কেননা দেশের অন্যান্য প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে ডাক্তারদের পরিদর্শন ফি বা অন্যান্য পরীক্ষা নিরীক্ষার দাম তুলনামূলক অনেক বেশি হয়ে থাকে। যা নিম্নবিত্ত শ্রেণী কিংবা সাধারণ মানুষের কাছে উক্ত খরচ বহন করা আর অসাধ্য কে সাধন করা একই কথা। আর এ কারণেই প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে দেশের উচ্চ বিত্ত শ্রেণীদেরই যাতায়াত বেশি দেখা যায়। অনেক উচ্চ বিত্তদের নিকট প্রাইভেট হাসপাতাল ও সুচিকিৎসা দিতে ব্যর্থ। এজন্য তারা আরো মানসম্মত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরের চিকিৎসা কে প্রাধান্য দেয়। অন্যদিকে বাংলাদেশে হাসপাতালের তুলনায় মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি, অর্থাৎ মানুষের তুলনায় হাসপাতালের সংখ্যা খুবই কম। যেমন :- ২০২৫ সালের আনুমানিক জনসংখ্যা: ১৭ কোটির বেশি (১৭০ মিলিয়ন)। পাশাপাশি সরকারি হাসপাতাল: প্রায় ৬০০ - ৭০০টি। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক: প্রায় ৫,০০০-–৬,০০০ টি। মানে মোট হাসপাতাল (সরকারি + বেসরকারি): প্রায় ৬,০০০-৭,০০০ টি। তাহলে প্রতিটি হাসপাতালের জন্য জনসংখ্যা = ১৭ কোটি ৭,০০০  ২৪,২৮৫ জন প্রতি একটি হাসপাতাল। অর্থাৎ, প্রতিটি হাসপাতালের জন্য গড়ে প্রায় ২৪ হাজার মানুষ। এই হার একটি উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য খুবই অপ্রতুল। মোদ্দাকথা, বাংলাদেশে মানুষের তুলনায় হাসপাতালের সংখ্যা অনেক কম, তাই হাসপাতাল, ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যসেবার পরিমাণ বাড়ানো প্রয়োজন বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকায়। এমতাবস্থায়, বাংলাদেশে হাসপাতালের তুলনায় মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় যে স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি হয়েছে, তার সমাধান ধাপে ধাপে নেওয়া যেতে পারে। প্রতিটি উপজেলায় অন্তত ৫০ শয্যার মানসম্পন্ন হাসপাতাল স্থাপন, ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে শক্তিশালীকরণ এবং ঢাকা কেন্দ্রিকতা কমিয়ে গ্রামে আধুনিক চিকিৎসা সেবার মান বাড়াতে হবে। জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং  অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি ও ওষুধের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ নিশ্চিত করা।চিকিৎসক ও নার্সের সংকট পূরণে নিয়োগ বৃদ্ধি, গ্রামে চাকরিতে উদ্বুদ্ধ করতে আর্থিক প্রণোদনা, নিয়মিত স্কিল ট্রেনিং ও প্রশিক্ষণ প্রদান। 

টেলিমেডিসিন সার্ভিস চালু করে দূর-দূরান্তে চিকিৎসা প্রদান, অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট, প্রেসক্রিপশন ও রোগী ফলোআপ সিস্টেম চালু করা। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ, মানহীন চিকিৎসা বন্ধে লাইসেন্স ব্যবস্থা ও মনিটরিং করতে হবে। স্বাস্থ্য সচেতনতা ক্যাম্পেইন, রোগ প্রতিরোধে টিকা, পুষ্টি, পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক উদ্যোগ, পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। আমাদের দেশের  প্রশাসনের উচিত এই বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে সংস্কার সাধন করা। দিনশেষে একজন রোগী যখন চিকিৎসা নিতে যাবেন তখন সুচিকিৎসা পাবেন এবং দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করতে সক্ষম হবেন। সিস্টেম পরিবর্তন হোক, চিকিৎসা সেবা হোক সবার জন্য সেই প্রত্যাশায়।


লেখক 

আজিজুল হক (আজিজ)

শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ(২০-২১)
ঢাকা কলেজ, ঢাকা -১২০৫।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/157049