টাকার দাসত্বে মানবিকতার বিলুপ্তি
মানুষের মানবিকতা কি টাকার কাছে বিক্রি হচ্ছে, না মানুষই নিজেকে বিকিয়ে দিচ্ছে টাকার দামে? প্রশ্নটি শুধুই তাত্ত্বিক নয়, এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। টাকার আবির্ভাব হয়েছিল মানুষের বিনিময় পদ্ধতির সরলীকরণের জন্য। প্রাচীন কালে বার্টার সিস্টেম বা পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে লেনদেন চলত, কিন্তু তার সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে উঠতেই মুদ্রার জন্ম। টাকা মূলত মানুষের জীবনকে সহজতর করতে এসেছিল খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিরাপত্তার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের একটি মাধ্যম হিসেবে। এটি কখনোই নিজে কোনো লক্ষ্য ছিল না; বরং তা ছিল একমাত্র বাহন।
কিন্তু আজকের সমাজে টাকা যেন হয়ে উঠেছে চূড়ান্ত গন্তব্য। মানুষ জীবনের সার্বিক মূল্যায়ন করছে টাকার পরিমাণ দিয়ে। একসময় যেখানে মানুষ অর্থ উপার্জন করত বেঁচে থাকার জন্য, এখন মানুষ বেঁচে থাকে টাকার জন্য। এই অবস্থায় শুধু মানবিকতা নয়, বিক্রি হয়ে যাচ্ছে বিবেক, নৈতিকতা, ভালোবাসা এমনকি আত্মসম্মানও। চাকরি পাওয়ার আশায় ঘুষ, ভালো গ্রেডের আশায় দুর্নীতি, সুসম্পর্ক রক্ষার বদলে স্বার্থপরতা সবই যেন টাকার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। তবে কি দোষ টাকার? একটিবার ভাবতে হয় টাকা তো এক নিরপেক্ষ কাগজ মাত্র, মূল্য দিয়েছি আমরাই। টাকা মানুষের সেবায় আসবে, মানুষের মনুষ্যত্ব রক্ষা করবে, এটাই ছিল উদ্দেশ্য। কিন্তু যখন মানুষই নিজের চাহিদার দাস হয়ে পড়ে, তখন সে টাকাকে হাতিয়ার বানিয়ে নিজের মানবিক রূপ বিসর্জন দেয়। অর্থের জন্য সম্পর্ক ত্যাগ, ন্যায়বিচার বিসর্জন, এমনকি নিজের আত্মার সাথেও প্রতারণা করে।
তাই প্রকৃত সংকট টাকার নয়, সংকট মানুষের। টাকার দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যদি মানুষ আবার নীতিবোধ, সহানুভূতি আর সেবার আদর্শে ফিরে আসে তবেই মানবিকতা টিকবে। নয়তো অর্থের আধিপত্যে মানুষ থাকবে, কিন্তু মানবতা থাকবে না। আজকের সমাজে মানবিকতা যেন একটি প্রদর্শনের বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ গরীবকে সাহায্য করলে তা ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করে, যেন এটি কোনো সহানুভূতির কাজ নয়, বরং নিজেকে “ভালো মানুষ” হিসেবে প্রমাণ করার হাতিয়ার। অথচ প্রকৃত মানবিকতা নীরব, নির্জন ও নিঃস্বার্থ। এক সময় যেখানে মানুষ নিঃস্বকে সাহায্য করত শুধু হৃদয়ের ডাকে, আজ তা হয়ে উঠেছে জনপ্রিয়তা অর্জনের উপায়। এদিকে টাকার জন্য মানুষ দেখাচ্ছে তার অন্তরের সবচেয়ে নিকৃষ্ট রূপ। নিজের স্বার্থে মানুষ প্রতারণা করছে, বিশ্বাস ভাঙছে, এমনকি খুন-ধর্ষণের মতো অপরাধেও জড়াচ্ছে শুধুমাত্র অর্থের লোভে। এর চেয়েও ভয়াবহ বিষয় হলো, যেসব সম্পর্ক একসময় হৃদয়ের বন্ধনে গড়ে উঠত, সেগুলো এখন টাকার উপর নির্ভরশীল। আগে সম্পর্কের মূল ছিল বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা—আজ সেই জায়গায় বসেছে আর্থিক সামর্থ্য, উপহার, ও সামাজিক মর্যাদা। স্বামী-স্ত্রীর মতো পবিত্র বন্ধনও আজকাল শুরু হচ্ছে অর্থকেন্দ্রিক চুক্তির মাধ্যমে। বিয়ের পেছনে যে আবেগ, সম্মান ও দায়িত্ব ছিল তা আজ ঠাঁই পেয়েছে যৌতুক, উপহার আর প্রেস্টিজের সমীকরণে। যেখানে সম্পর্কের শুরুতেই টাকা মূখ্য হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে ভালোবাসার জায়গা খুঁজে পাওয়া সত্যিই দুষ্কর। তখন স্বাভাবিকভাবেই টাকার গুরুত্ব ভালোবাসাকে ছাপিয়ে যায়, আর সম্পর্ক হয়ে পড়ে এক প্রকার লেনদেন।
প্রশ্ন আসে, তবে মানবিকতা কোথায়? মানুষ কোথায়? ভালোবাসা কোথায়? এই অর্থ-নির্ভর সমাজে মানবিকতা যেন হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিযোগিতার ভিড়ে, মানুষ নিজেই নিজের ভেতর হারিয়ে ফেলছে সত্যিকারের “মানুষ” হয়ে ওঠার ইচ্ছেটুকু। ভালোবাসা আজ প্রশ্নবিদ্ধ, কারণ তাতে শর্ত জুড়ে গেছে আছে কি গাড়ি, ফ্ল্যাট, মোবাইল, বা সামাজিক স্ট্যাটাস? এই অবস্থা কাম্য নয়। সমাজ যদি মানবিক, সুস্থ এবং সহানুভূতিশীল হতে চায়, তাহলে টাকা সম্পর্কের অংশ হতে পারে কিন্তু নিয়ন্ত্রক নয়। মানুষ হতে হবে হৃদয়ের, সম্পর্ক গড়তে হবে আন্তরিকতার, আর ভালোবাসতে হবে নিঃস্বার্থভাবে। অন্যথায় আমরা কেবল অর্থপিশাচে পরিণত হবো যাদের মুখে হাসি থাকলেও হৃদয়ে থাকবে শূন্যতা। প্রশ্ন উঠেছে মানুষ কি টাকাকে নিয়ন্ত্রণ করে, না টাকা মানুষকে? এক সময় টাকা ছিল মানুষের তৈরি একটি মাধ্যম জীবন চালানোর সরঞ্জাম। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় দেখা যায়, মানুষ নিজের সমস্ত কর্ম, চিন্তা, এমনকি নীতিকেও পরিচালনা করছে টাকার দাসত্বে। অর্থ যেন এখন শুধু প্রয়োজন নয়, বরং প্রাধান্য, প্রতিপত্তি ও পরিচয়ের মাপকাঠি হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে সবচেয়ে বড় নেশা কী? গাঁজা, মদ কিংবা সিগারেট? না, মানুষের সবচেয়ে বড় ও গভীর নেশা এখন টাকা। গাঁজার নেশা শরীরে ক্ষণিকের পরিবর্তন আনে, কিন্তু টাকার নেশা মানুষের চরিত্র বদলে দেয়, মনুষ্যত্বকে গলিয়ে দেয়, আত্মাকে কর্দমাক্ত করে তোলে। এই নেশা এতটাই তীব্র যে, মানুষ তার পরিবার, সম্পর্ক, নৈতিকতা, এমনকি নিজের আত্মসম্মানও বিসর্জন দিতে পারে শুধু আরও কিছু অর্থের আশায়। অনেকেই বলে, বর্তমানে মানুষের নিয়ন্ত্রক হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কিন্তু বাস্তবে এআই এখনো মানুষের সহকারী, মানুষের হাতে তৈরি এক প্রযুক্তি। অথচ টাকা এখন মানুষের হাতে নয়, বরং মানুষের মন-মগজ সব দখল করে নিয়েছে। মানুষ আজ কাজ করে না সৃষ্টির আনন্দে, করে টাকার প্রয়োজনে। শিক্ষা নেয় না জ্ঞান অর্জনের জন্য, নেয় চাকরির বাজারে টিকে থাকার জন্য। এমনকি ভালোবাসাও জন্মায় না হৃদয়ে, বরং নির্ধারিত হয় ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স দেখে। এই পরিস্থিতি এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়। যদি মানুষ টাকার নেশা থেকে মুক্ত হয়ে এটিকে পুনরায় নিয়ন্ত্রণে না নেয়, তবে মানুষ থাকবে কেবল চেহারায় আচরণে হয়ে উঠবে যন্ত্রচালিত অর্থলোভী প্রাণী। তাই এখনই সময় নিজেকে প্রশ্ন করার আমি কি টাকাকে ব্যবহার করছি, না সে আমাকে চালাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তরেই নির্ধারিত হবে আমাদের ভবিষ্যৎ মানবিক না নিষ্ঠুর।
লেখক :
হালিমা আক্তার হানী
শিক্ষার্থী, রাজশাহী কলেজ
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/156623