শহীদ জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষক থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক
বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে কিছু নক্ষত্র এমন জ্বলজ্বল করে যে, শতাব্দী পেরিয়েও তাদের আলো ম্লান হয় না। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম) তাঁদের মধ্যে এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। যেন এক বজ্রনির্ঘোষে জেগে উঠেছিলেন তিনি ১৯৭১-এর রণাঙ্গনে, আবার যেন শান্ত নদীর স্রোতের মতো প্রবাহিত হয়েছে তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা ও উন্নয়নের দর্শন। মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ থেকে শুরু করে যুদ্ধবিধ্বস্ত নতুন দেশের পুনর্গঠনে তাঁর জীবন যেন এক মহাকাব্য, যেখানে সাহস, দূরদর্শিতা এবং আত্মমর্যাদার সুর মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। গতকাল তাঁর ৯০তম জন্মদিনে, ফিরে দেখি সেই অধ্যায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত এক দেশকে তিনি দিয়েছেন শৃঙ্খলার দৃঢ় ভিত্তি, বহুদলীয় গণতন্ত্রের উজ্জ্বল দিগন্ত, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার স্বপ্ন এবং পররাষ্ট্রনীতিতে আত্মমর্যাদার অটুট মেরুদন্ড। তাঁর কর্মকান্ড রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছে যে, আজকের বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চর্চা ও উন্নয়ন যাত্রায় তাঁর ছাপ অমলিন। এই লেখায় আমরা তাঁর জীবনের বিভিন্ন পর্ব, রাজনৈতিক দর্শন এবং রাষ্ট্র বিনির্মাণে তাঁর অবদান গভীরে প্রবেশ করে, যেন এক কাব্যিক যাত্রা। জিয়াউর রহমানের জীবন শুরু হয়েছিল সাধারণ এক গ্রামীণ পরিবেশে। ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়া জেলার বাগবাড়ি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি, যেন বাংলার লাল মাটির গভীরে রোপিত এক বীজ। পিতা মনসুর রহমান ছিলেন একজন রসায়নবিদ ও সরকারি কর্মকর্তা, যার চাকরির সূত্রে শৈশব কেটেছে কলকাতা, বগুড়া ও অন্যান্য শহরে। কলকাতার হেয়ার স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর তাঁর মনে জাগে দেশসেবার স্বপ্ন। ১৯৫৩ সালে তিনি যোগ দেন পাকিস্তান মিলিটারি অ্যাকাডেমি কাকুলে। ১৯৫৫ সালে কমিশন লাভ করে শুরু হয় তাঁর সামরিক জীবনের যাত্রা। কমান্ডো ও প্যারাট্রুপার প্রশিক্ষণে তিনি হয়ে ওঠেন অসাধারণ দক্ষ। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে কাশ্মীর ফ্রন্টে তাঁর বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য ‘হিলাল-ই-জুরাত’ পদক লাভ করেন। ১৯৬৯-৭০ সালে জার্মানিতে স্টাফ কোর্স সম্পন্ন করে তিনি ফিরে আসেন আরও পরিপক্ব নেতৃত্ব নিয়ে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে তাঁর শৃঙ্খলা, সাহস এবং পেশাদারিত্ব যেন এক অটল পর্বতের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। ১৯৭১ সালের শুরুতে চট্টগ্রামে ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি যেন ঝড়ের আগে শান্ত সমুদ্র।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত। পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম গণহত্যা শুরু হলে চট্টগ্রামে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন মেজর জিয়া। ২৬ মার্চ রাতে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র দখল করে ২৭ মার্চ সকালে পাঠ করলেন স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র “আমি, মেজর জিয়াউর রহমান, শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।” যেন এক বজ্রনিনাদে জেগে উঠল সমগ্র জাতি। এই ঘোষণা বিশ্ব মিডিয়ায় প্রচারিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধকে আন্তর্জাতিক মর্যাদা দেয় এবং লাখো মানুষকে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করে। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। প্রথমে সেক্টর-১ এবং পরে সেক্টর-১১-এর কমান্ডার নিযুক্ত হন। তিনি গঠন করেন ‘জেড ফোর্স’ তিনটি ব্যাটালিয়ন নিয়ে এক শক্তিশালী ব্রিগেড। সম্মুখযুদ্ধে তাঁর নেতৃত্বে সফল হয় অসংখ্য অভিযান। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, রাঙামাটি অঞ্চলে তাঁর কৌশল যেন শত্রুর বুকে আঘাত হেনেছে। বীরত্বের জন্য তাঁকে ‘বীর উত্তম’
খেতাব দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর এই অধ্যায় অবিসংবাদিত যেন এক সিংহের গর্জন যা আজও অনুপ্রেরণা জোগায়। স্বাধীনতার পর দেশ পড়ে গভীর সংকটে। ১৯৭২-৭৫ সালের মধ্যে দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক অচলাবস্থা, রাজনৈতিক হত্যাকান্ড এবং অস্থিরতা বাড়তে থাকে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর দেশে একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। খন্দকার মোশতাক আহমদের সরকারের পর নভেম্বরে সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মধ্যে জিয়াউর রহমান পুনরায় সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন।
৭ নভেম্বর ১৯৭৫ তিনি হন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। যেন এক প্রচন্ড ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে তিনি ধরলেন রাষ্ট্রের হাল দৃঢ় হাতে, অটল সংকল্পে। তাঁর শাসনকাল (১৯৭৫-১৯৮১) ছিল রাষ্ট্র পুনর্গঠনের স্বর্ণযুগ। ১৯৭৫ সালে একদলীয় ব্যবস্থা (বাকশাল) চালু হওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা সংকুচিত হয়। জিয়াউর রহমান চতুর্থ সংশোধনী বাতিল করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ খুলে দেন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনেন, বিরোধী দলগুলোকে রাজনীতি করার সুযোগ দেন। ১৯৭৮ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যা আজও দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। যেন গণতন্ত্রের শুকনো মাটিতে তিনি বুনে দিলেন নতুন বীজ যা আজ ফলবান বৃক্ষ। ‘বাঙালি’ জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে তিনি প্রবর্তন করেন ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ভূখন্ড ভিত্তিক পরিচয়, যাতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ সকলে এক সুতোয় গাঁথা। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যোগ করেন ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ এবং ‘আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’। এই দর্শনের লক্ষ্য ছিল জাতীয় ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করা যেন এক বিশাল বটগাছের ছায়ায় সকলে আশ্রয় পায়। জিয়াউর রহমানের হৃদয়ে ছিল গ্রামবাংলার প্রতি গভীর ভালোবাসা। তিনি চালু করেন ‘খাল খনন কর্মসূচি’ যা সেচ ব্যবস্থার বিপ্লব ঘটায় এবং কৃষি উৎপাদন বহুগুণে বাড়ায়। খাদ্য ঘাটতির দেশকে তিনি নিয়ে যান খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে। গ্রাম সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করে স্থানীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত করেন। স্বাধীন ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানকে সমর্থন দিয়ে গ্রামীণ দরিদ্রদের হাতে তুলে দেন স্বপ্নের চাবিকাঠি। তাঁর এই দর্শন যেন এক সবুজ বিপ্লব যা বাংলার কৃষকের মুখে হাসি ফোটায়। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের বেসরকারিকরণ, বেসরকারি খাতের উৎসাহ, রপ্তানিমুখী নীতি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এসবের মাধ্যমে তিনি অর্থনীতিকে নতুন গতি দেন। জিডিপি প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে, দারিদ্র্য হ্রাস পায়। শ্রমিক- কৃষকবান্ধব নীতি তাঁর দর্শনের মূলে ছিল। যেন এক শুকনো নদীতে তিনি প্রবাহিত করলেন জীবনের স্রোত। ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে শত্রুতা নয়’ এই নীতি তাঁর পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র। ভারতের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি চীন, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরবসহ মুসলিম দেশগুলোর সাথে সেতুবন্ধন গড়েন। ওআইসি-তে যোগদান, সার্কের ধারণা প্রবর্তন এবং ফারাক্কা পানি বণ্টন চুক্তি এসব তাঁর দূরদর্শিতার প্রমাণ। যেন বিশ্ব মঞ্চে বাংলাদেশের মাথা উঁচু করে দাঁড় করালেন তিনি। ১৯৮১ সালের ৩০ মে। চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে একটি ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে আকস্মিকভাবে প্রাণ হারান জিয়াউর রহমান। তাঁর এই মৃত্যুসংবাদ যেন বিদ্যুৎস্পর্শের মতো ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। পুরো দেশ শোকে স্তব্ধ হয়ে গেল। লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে এলেন, তাঁর জানাজায় অংশ নিলেন এমন জনসমুদ্র প্রায় ২০ লক্ষ লোক হয়, যা বাংলাদেশ আগে কখনো দেখেনি। যেন জাতির হৃদয়ে এক গভীর, অপূরণীয় ক্ষতি যা আজও অনেকের মনে জ্বালা করে। তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে বিএনপি আজও বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় একটা শক্তি। তিনি যে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিলেন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা দিয়ে সবাইকে এক ছাতার নিচে এনেছিলেন, গ্রামের উন্নয়নে যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, আর পররাষ্ট্রনীতিতে যে আত্মমর্যাদা দেখিয়েছিলেন এগুলো তাঁর সত্যিকারের চিরস্থায়ী উপহার। এগুলো আজও আমাদের রাজনীতি আর সমাজকে প্রভাবিত করে চলেছে। জিয়াউর রহমান ছিলেন সংকটের মুহূর্তে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার এক জ্বলন্ত উদাহরণ একজন সাধারণ মানুষের মতোই সাহসী, কিন্তু অসাধারণ দূরদর্শী। তাঁর জীবন দর্শ আমাদের শেখায় যে, সত্যিকারের সাহস, দূরদর্শিতা আর জনগণের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে একটা দেশকে নতুন পথে নেওয়া সম্ভব। আজকের বাংলাদেশে যে গণতন্ত্র চলছে, উন্নয়নের গতি বাড়ছে, আত্মমর্যাদা নিয়ে বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছি সেখানে তাঁর অবদানের ছাপ স্পষ্ট দেখা যায়। তিনি শারীরিকভাবে চলে গেছেন অনেক দিন আগে, কিন্তু তাঁর আদর্শ, তাঁর কাজ আর তাঁর স্বপ্ন আজও আমাদের মাঝে অম্লান হয়ে আছে, পথ দেখিয়ে চলেছে। তাঁর ৯০তম জন্মবার্ষিকীতে এই কালজয়ী রাষ্ট্রনায়ককে জানাই গভীর ও বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক
প্রফেসর ড. মোঃ আলিমুল ইসলাম
উপাচার্য, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/154549