চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও মর্যাদার প্রশ্ন
চা-প্রেমী মানুষের কাছে চা শুধু একটি পানীয় নয় এটি দৈনন্দিন জীবনের এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ। অথচ যে শ্রমে এই চা আমাদের টেবিলে পৌঁছে, সেই চা শ্রমিকরা আজও বঞ্চিত ন্যায্য পারিশ্রমিক, সম্মান ও মর্যাদা থেকে। বাংলাদেশের চা শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের স্বল্প মজুরিতে কঠোর পরিশ্রম বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো, যা তাদের মানবেতর জীবনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বৈরি প্রকৃতিকে উপেক্ষা করে বিপদসংকুল প্রতিকূল জঙ্গলী পরিবেশে লড়াই মাধ্যমে বেঁচে আছে অবহেলিত চা শ্রমিকরা। অত্যন্ত কষ্ট ও ক্লেশপূর্ণ তাদের জীবন। যা দেখলে হৃদয়ে নাড়া দেয় মানবতার চাবি। সেই নিগৃহীত শ্রমিক জনগোষ্ঠীকে মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করলে চা’র মত জাতীয় প্রাকৃতিক সম্পদ আরো সমৃদ্ধ হতে থাকবে।
অপর্যাপ্ত মজুরির কারণে চা শ্রমিকরা ঠিকমতো খাবার, চিকিৎসা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে পারেন না। অপুষ্টি ও নানা রোগে ভুগে তাদের জীবন কাটে চরম অনিশ্চয়তায়। এই দারিদ্র্য এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বহমান হয়ে সমাজে গভীর বৈষম্য সৃষ্টি করছে, যা শেষ পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। স্বল্প আয়ের কারণে খাবার, পোশাক ও চিকিৎসা ব্যয় বহন করা তাদের জন্য দুরূহ হয়ে পড়ে। অনেক সময় তিন বেলা খাবার জোটে না। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বঞ্চনা তাদের মানসিকভাবে ভেঙে দেয়; জীবনে এগিয়ে যাওয়ার আশা ও স্বপ্ন ক্রমেই ম্লান হয়ে যায়।
এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ একমুখী নয়। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হলে চা শিল্পকে টেকসই ও আধুনিক করার বিকল্প নেই। উৎপাদন বাড়ানো, গবেষণায় বিনিয়োগ, উন্নত জাত উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং নিলাম ব্যবস্থার সংস্কার সবকিছু মিলিয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু শ্রমিকের ঘাড়ে বোঝা চাপিয়ে রেখে শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে এই শ্রমজীবী মানুষগুলোর জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখার।
এখন সময় এসেছে তাদের এই নীরব কষ্টগুলো অনুভব করার এবং প্রাপ্য মর্যাদা নিশ্চিত করার। হতাশায় আচ্ছন্ন মুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য না বলা গল্প। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দিনের পর দিন তাদের কাজ করতে হয় চা বাগানে। একজন নারী চা পাতা সংগ্রহকারী প্রতিদিন প্রায় ৮ ঘণ্টা শ্রম দিয়ে ২০ থেকে ২১ কেজি চা পাতা সংগ্রহ করেন, যার বিনিময়ে তার আয় মাত্র ১৭৮ টাকা। বর্তমান দুর্মূল্যের বাজারে এই অর্থ অত্যন্ত অপ্রতুল। এমনকি নির্ধারিত ওজনের চেয়ে সামান্য কম হলে পুরো টাকাটুকুও অনেক সময় প্রদান করা হয় না। এই প্রেক্ষাপটে বিষয়টিকে আর অবহেলা করার সুযোগ নেই। চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে বাগান মালিক ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর, মানবিক ও সহানুভূতিশীল পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। তাদের শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ন্যায্য পারিশ্রমিক ও সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
লেখক
উম্মে ছুমাইয়া
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়