গ্রামীণ নারীদের নির্যাতনের চিত্র থাকে লুকায়িত

গ্রামীণ নারীদের নির্যাতনের চিত্র থাকে লুকায়িত

গ্রামের মাটিতে যেন নারীদের স্বপ্ন গেঁথে দেওয়া হয় শেকড়ের মতো। তারা হয়তো বাইরে থেকে দেখতে সাদামাটা, চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ আর ধুলোমাখা হাতে কাজের চাপ। কিন্তু তাদের ভেতরে, সেই মাটির ভেতরে জ্বলতে থাকে নীরব আগুন যা ব্যথা, অপমান আর দীর্ঘদিন ধরে চেপে রাখা আর্তনাদের আগুন। 

বাংলাদেশের নারীদের জীবন মানেই নীরব সংগ্রামের গল্প। গ্রামের নারীদের প্রতিদিনের সকাল শুরু হয় ভোরে উঠে হাঁস-মুরগি দেখা, পুকুর থেকে পানি টেনে আনা, ছেলে মেয়ের মুখে ভাত তুলে দেওয়া আর সারাদিন স্বামীর চোখ মুখের ভাব বুঝে চলা। এসবের ফাঁকে তারা নিজের স্বপ্নগুলোকে গলা টিপে মেরে ফেলে। নারীরা পরিবার, সমাজ আর সংস্কারের নিয়মে এমনভাবে গেঁথে থাকে যে কোথায় ভালোবাসা শেষ হয় আর কোথায় নির্যাতনের শুরু হয় এই বিভেদটাই তারা করতে পারেনা। স্বামী গালি দিলেও সেইটাকে তারা স্বামীর রাগ-রোষ মনে করে। শ্বশুরবাড়ির কথা সহ্য করাটাকে ভদ্র মেয়ের পরিচয় হিসেবে ধরা হয়। তাই তারা নিজের কষ্টের কথা মুখ ফুটে বলতে শেখেনি। শহরে যখন নারী অধিকার, কর্মক্ষেত্রে সমতা, যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে বিভিন্ন আলোচনা, মিছিল হয় তখন গ্রামের নারীরা রান্নাঘরের ধোঁয়ার ভেতরে সংসারকে টিকিয়ে রাখার যুদ্ধ করে। ওই নারীদের গল্প আমরা অনেক সময় শুনি না কারণ তারা চিৎকার করতে জানেনা। কিন্তু যারা কাঁদতে জানে না তাদের নীরবতা অনেক গভীর। এই নীরবতাই আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।   

বাংলাদেশের ৮০% এর বেশি এলাকা এখনো গ্রামীণ। এই গ্রামগুলোতেই বাস করেন দেশের অধিকাংশ নারী। তবে বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে নারীদের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে রয়েছে। সময়ের সাথে সাথে নারী শিক্ষা ও স্বাধীনতার অগ্রগতি আসলেও এর পেছেনে নারী নির্যাতন নামের এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা রয়েছে। তারা শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন। অনেক সময় এই নির্যাতন পরিবার বা সংসারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, সমাজের চোখে পড়ে না। তারা প্রতিবাদ করলেও অনেক সময় তা সংসার ভাঙার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। 

২০২৪ সালে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ২০টি জেলার ৮০টি গ্রামে একটি সমীক্ষা চালায়। সেখানে দেখা যায়,৮০ শতাংশ নারী কোনো না কোনো ভাবে শারীরিক, মানসিক এবং আর্থিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন্তু এই নারীদের মধ্যে মাত্র ১২ শতাংশ আইনি বা সামাজিক সহায়তা নিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, নাবিলা বেগম নামের একজন নারীকে তার স্বামী দিনের পর দিন সন্দেহ করত, গায়ে হাত তুলতো, সন্তানদের সামনেই অপমান করত। কিন্তু, নাবিলা কখনো প্রতিবাদ করেননি। কারণ সমাজ তাকে শিখিয়েছে মেয়ে হয়ে জন্মেছো তাই সব কিছু সহ্য করতে হবে। এই উদাহরণ আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় নারী নির্যাতনের শেকড় কতটা গভীরে বিস্তার করছে। এই নির্যাতনের পেছনে কিছু সুস্পষ্ট কারণ রয়েছে,  শিক্ষার অভাব নারীদের অধিকার ও আত্মপ্রতিষ্ঠায় অজ্ঞ করে রাখে। অনেক গ্রামীণ নারী  প্রাথমিক শিক্ষাও শেষ করতে পারেন না, তাই তারা বুঝতে পারেন না কোনটা অধিকার আর কোনটা নির্যাতন। অর্থনৈতিক নির্ভরতা নারীদের আরও বেশি দুর্বল করে ফেলে। যেহেতু তারা সংসারে উপার্জনের সুযোগ পান না তাই তারা নির্যাতনের মাঝেও টিকে থাকার চেষ্টা করেন। সামাজিক অপবাদ ও ভয়ের কারণেও নারীরে চুপ করে থাকেন। একজন নারী যদি নির্যাতনের কথা শিকার করেন তাহলে সমাজ তাকে দোষী বানিয়ে দেয়। আবার আইনি সহায়তা থেকেও তারা বঞ্চিত হন। অনেক সময় তাদের অভিযোগ না নিয়ে উল্টো প্রাশ্ন করা হয় তারা ঘরের বিষয় ঘরেই না মিটিয়ে নেয়নি কেন। 

বেশ কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে এই নির্যাতনের অবসান ঘটানো সম্ভব। নারী শিক্ষার সুযোগ বিস্তৃত করতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি উপযোগী কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। ছোট ব্যবসা, সেলাই, হাঁস-মুরগি পালন, অনলাইন মার্কেটিং এইসব ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আর্থিক স্বাবলম্বিতার সুযোগ করে দিতে হবে। প্রতিটি ইউনিয়ন বা উপজেলা পর্যায়ে গ্রমীণ নারী সহায়তা কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে যেখানে নারী নির্যাতন বিষয়ে পরামর্শ, মানসিক ও আইনি সহায়তা পাওয়া যাবে। এর পাশাপাশি নারীর মর্যাদা রক্ষায় সমাজকে কাজ করতে হবে। 

নারী নির্যাতন রোধ কতে হলে শুধু আইনি সহায়তা বা বক্তৃতা দিলে চলবে না, এর জন্য দরকার পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ পর্যন্ত একসাথে কাজ করা। একজন নারী যদি বিশ্বাস করেন তিনি নির্যাতিত হলেও কেউ তাকে বিশ্বাস করবে না তাহলে তিনি কখনোই নিজের জন্য দাঁড়াতে পারবেন না। আমাদের সমাজে এই বিশ্বাসের ঘাটতি রয়েছে আর তাই আমাদেরকেই এই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে। একদিন দেখা যাবে, নারী নির্যাতিত হলেও কাঁদবে না বরং নিজের পক্ষে দাঁড়াবে এবং তার পাশে দাঁড়াবে পরিবার, প্রতিবেশি সহ সমাজ। 

লেখক

আরমীন আমীন ঐশী 

শিক্ষার্থী

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ 
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা 

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/154306