পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস একটি জাতীয় সংকট

পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস একটি জাতীয় সংকট

সরকারি চাকরি একটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোর মেরুদন্ড হিসেবে কাজ করে। রাষ্ট্র পরিচালনা, আইন প্রয়োগ, জনসেবা নিশ্চিতকরণ, উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, জাতিকে শিক্ষিত করে তোলা এবং জনগণের অধিকার সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সরকারি কর্মচারীদের ওপর ন্যস্ত থাকে। তাই এসব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, সততা, দক্ষতা ও মেধার সঠিক মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি। এ কারণেই সরকারি চাকরির পরীক্ষাকে দেশের সবচেয়ে বড়, কঠিন ও প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর কাছে সরকারি চাকরি কেবল একটি পেশা নয়; বরং এটি একটি স্বপ্ন, লক্ষ্য, নিরাপদ ভবিষ্যৎ, সামাজিক মর্যাদা এবং দীর্ঘদিনের অধ্যবসায় ও পরিশ্রমের ফল। একটি পরিবারের কাছে এই চাকরি আশীর্বাদ স্বরূপ এবং উচ্চ মর্যাদার স্থান। দেশের লাখো লাখো শিক্ষার্থী তাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিন রাত এক করে পড়াশোনা করছে শুধুমাত্র তাদের মেধার প্রমাণ দিয়ে একটি আসনের জন্য। চাকরির বাজারে একটা সরকারি চাকরি যেন সোনার হরিণ যার পেছনে ছুটছে শত শত পরিশ্রমী। 

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি চাকরি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে নকল করার প্রবণতা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এর ফলে পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে এবং মেধাভিত্তিক, স্বচ্ছ ও ন্যায্য নিয়োগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়ছে। মেধাকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। বর্তমানে কিছু অসাধু পরীক্ষার্থী ও সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র পরিকল্পিতভাবে এই অনৈতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত। তারা প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রযুক্তির অপব্যবহার ও নানা অসৎ কৌশলের মাধ্যমে পরীক্ষার স্বচ্ছতা নষ্ট করছে, যা রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। বর্তমানে একটি সংঘবদ্ধ চক্র বিভিন্ন সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আগেই সংগ্রহ করে তা উচ্চমূল্যে পরীক্ষার্থীদের কাছে বিক্রি করে থাকে। অনেক পরীক্ষার্থী লোভের বশবর্তী হয়ে এসব প্রশ্ন কিনে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে, যা তাদের মেধা ও নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবমাননা। আবার কেউ কেউ আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় পরীক্ষাকেন্দ্রে নকল করে থাকে। মোবাইল ফোন, ব্লুটুথ ডিভাইস, মাইক্রো ক্যামেরা, ইয়ারপিস এবং সিমকার্ড সংযুক্ত ক্ষুদ্র যন্ত্র ব্যবহার করে তারা পরীক্ষাকেন্দ্রের ভেতর থেকে বাইরে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। ফলে পুরো পরীক্ষাব্যবস্থা একটি সংঘবদ্ধ অপরাধে পরিণত হচ্ছে, যা আইন শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক শুদ্ধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এই অনৈতিক প্রবণতার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ দায়ী। তন্মধ্যে সরকারি চাকরির প্রতি অতিরিক্ত সামাজিক আকর্ষণ এবং নিরাপদ ও স্থায়ী জীবনের মোহ, সীমিত সংখ্যক পদের বিপরীতে বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর অংশগ্রহণ, যা প্রতিযোগিতাকে অত্যন্ত তীব্র করে তোলে। এছাড়াও দ্রুত সাফল্য অর্জনের মানসিকতা ও পরিশ্রমবিমুখতা অনেককে শর্টকাট পন্থা বেছে নিতে উৎসাহিত করে।এর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং তার অপব্যবহার, পরীক্ষাকেন্দ্রে পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব, দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং কিছু ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবহেলা বা অসচেতনতা এসব কারণ মিলেই সরকারি চাকরি পরীক্ষায় নকল ও জালিয়াতির প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অনৈতিক কর্মকান্ডের প্রভাব অত্যন্ত মারাত্মক ও সুদূরপ্রসারী। সরকারি চাকরি পরীক্ষায় নকলের বিস্তারের ফলে সৎ, মেধাবী ও পরিশ্রমী প্রার্থীরা তাদের যোগ্য স্থান ও ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়,তারা তাদের সঠিক মর্যাদা পায় না, তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম মূল্যহীন হয়ে পড়ে, যা সামাজিক ন্যায়বিচারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। অপরদিকে অযোগ্য ও অসৎ ব্যক্তিরা প্রশাসনে প্রবেশ করলে সরকারি সেবার মান হ্রাস পায়, দুর্নীতি ও অনিয়ম বৃদ্ধি পায় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব দেখা দেয়। এর ফলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়, রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা দুর্বল হয়ে পড়ে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং এক পর্যায়ে জনগণ রাষ্ট্রের ওপর থেকে আস্থা হারাতে শুরু করে। এতে রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। তাছাড়া পরীক্ষায় ডিভাইস ব্যবহার করে নকল করা কেবল একটি আইনগত অপরাধ নয়; এটি চরম নৈতিক অবক্ষয়েরও বহিঃপ্রকাশ। যারা শিক্ষাজীবনের শুরুতেই অসৎ পথে সাফল্য অর্জনে অভ্যস্ত হয়, তারা ভবিষ্যৎ কর্মজীবনেও দুর্নীতি ও অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়ানোর প্রবণতা রাখে। এর ফলে সমাজে সততা, শ্রম, ন্যায়বোধ ও দায়িত্বশীলতার মতো মৌলিক মূল্যবোধ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে, যা একটি জাতির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। এই সংকট উত্তরণে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। পরীক্ষাকেন্দ্রে বডি স্ক্যানার ব্যবহার, মোবাইল জ্যামার স্থাপন এবং প্রবেশপথে কঠোর তল্লাশি নিশ্চিত করতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শক ও কেন্দ্রসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে প্রশ্নফাঁস ও ডিভাইস সরবরাহকারী চক্র শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের অপরাধে জড়াতে সাহস না পায়। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা, সততা ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে জোর দিতে হবে। সর্বোপরি, সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার ও প্রশ্নফাঁস বর্তমানে একটি জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। যা পুরো দেশ ও জাতিকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করার সমান। তাই মেধাভিত্তিক, স্বচ্ছ ও ন্যায্য নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হলে এই অনৈতিক প্রবণতা কঠোরভাবে দমন করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, পরীক্ষার্থী এবং সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই একটি দক্ষ, সৎ ও দায়িত্বশীল প্রশাসন গড়ে তোলা সম্ভব। যার মাধ্যমে রাষ্ট্র পাবে একটি সৎ, যোগ্য এবং দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের কান্ডারী যারা তাদের শ্রম,সততা এবং দক্ষতা দিয়ে বাংলাদেশকে উন্নয়নের শীর্ষে অবতরণের পথ প্রশস্ত করবে। 


লেখক :

শেখ সুলতানা মীম

শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ (ইংরেজি বিভাগ) 

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/154190