ইন্ডাকশন নাকি ইনফ্রারেড, কোনটি সাশ্রয়ী?

ইন্ডাকশন নাকি ইনফ্রারেড, কোনটি সাশ্রয়ী?

মোঃ রেজাউল করিম রাজু : দেশে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া এবং সিলিন্ডার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে রান্নার বিকল্প মাধ্যম হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলার জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে বাজারে ‘ইন্ডাকশন’ এবং ‘ইনফ্রারেড’ এই দুই ধরনের প্রযুক্তির কুকটপ বা চুলা সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। বাহ্যিকভাবে দেখতে প্রায় একই রকম মনে হলেও এই দুই প্রযুক্তির কার্যপদ্ধতি, বিদ্যুৎ খরচ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বিস্তর ফারাক রয়েছে। তাই হুজুগে না মেতে কেনার আগে আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক চুলাটি বেছে নেওয়া জরুরি।

 

বাজারে গেলেই বিক্রেতারা বিভিন্ন ওয়াট ও মডেলের বৈদ্যুতিক চুলা দেখান। কিন্তু প্রযুক্তির পার্থক্য না বুঝলে অনেকেই ভুল পণ্যটি কিনে ফেলেন। ইন্ডাকশন ও ইনফ্রারেড চুলার মূল পার্থক্য হলো এদের তাপ উৎপাদনের কৌশলে।

 

প্রযুক্তি ও কার্যকারিতা

ইন্ডাকশন চুলা মূলত তড়িৎচৌম্বকীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে কাজ করে। এই চুলায় বিদ্যুৎ সংযোগ দিলে এর ভেতরে থাকা তামার কয়েলে চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়। মজার ব্যাপার হলো, এই চুলা নিজে গরম হয় না; বরং এর ওপর যখন লোহা বা স্টিলের পাত্র রাখা হয়, তখন পাত্রটি গরম হয়ে ওঠে। অর্থাৎ তাপ সরাসরি রান্নার পাত্রে উৎপন্ন হয়।

 

এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো গতি ও সাশ্রয়। যেহেতু তাপ সরাসরি পাত্রে তৈরি হয় এবং আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে না, তাই এতে শক্তির অপচয় খুবই কম হয়। পরিসংখ্যান বলছে, ইন্ডাকশন চুলা প্রায় ৮৫-৯০ শতাংশ বিদ্যুৎ শক্তিকেই তাপে রূপান্তর করতে পারে। ফলে পানি ফোটানো বা রান্নার কাজ অত্যন্ত দ্রুত হয় এবং বিদ্যুৎ বিলও তুলনামূলক কম আসে। তবে এর একটি সীমাবদ্ধতা হলো এতে সব ধরনের পাত্র ব্যবহার করা যায় না। কেবল চুম্বক আকর্ষণ করে এমন পাত্র (যেমন লোহা বা নির্দিষ্ট গ্রেডের স্টিল) ছাড়া এটি কাজ করবে না।

 

ইনফ্রারেড কুকটপ : অন্যদিকে, ইনফ্রারেড চুলায় প্রথাগত হিটিং এলিমেন্ট বা হ্যালোজেন ল্যাম্প ব্যবহার করা হয়। এটি বিদ্যুৎ শক্তিকে অবলোহিত রশ্মি বা ইনফ্রারেড রে-তে রূপান্তর করে প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে। এই তাপে প্রথমে চুলার ওপরের সিরামিক প্লেটটি লাল হয়ে গরম হয় এবং সেই তাপে পাত্র গরম হয়।

 

ইনফ্রারেড চুলার প্রধান সুবিধা হলো এর বহুমুখিতা। এতে অ্যালুমিনিয়াম, কাচ, সিরামিক, এমনকি মাটির পাত্রেও রান্না করা সম্ভব। অর্থাৎ আপনার ঘরে থাকা সাধারণ হাঁড়ি-পাতিল দিয়েই কাজ চালানো যাবে। তবে এই পদ্ধতিতে তাপ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে বলে রান্নাঘর কিছুটা গরম হয়ে ওঠে। ইন্ডাকশনের তুলনায় এর বিদ্যুৎ খরচও কিছুটা বেশি। এটি প্রায় ৬৫-৭০ শতাংশ কর্মদক্ষতায় কাজ করে।

 

নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ

নিরাপত্তার দিক বিবেচনায় ইন্ডাকশন চুলা অনেক এগিয়ে। কারণ রান্না শেষ হওয়ার পরপরই এর উপরিভাগ দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যায় এবং পাত্র ছাড়া এটি চালু হয় না। ফলে বাড়িতে শিশু থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কম। অন্যদিকে, ইনফ্রারেড চুলার উপরিভাগ রান্নার পরেও দীর্ঘক্ষণ অত্যন্ত গরম থাকে, যা অসাবধানতাবশত হাত পুড়ে যাওয়ার কারণ হতে পারে।

 

 

দিনশেষে কোন চুলাটি আপনার জন্য সেরা, তা নির্ভর করবে আপনার ব্যবহারের ধরন ও অগ্রাধিকারের ওপর। যদি আপনার প্রধান লক্ষ্য হয় দ্রুত রান্না করা, মাসিক বিদ্যুৎ বিল কমানো এবং সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তবে ‘ইন্ডাকশন কুকটপ’ হবে বুদ্ধিমানের পছন্দ। সেক্ষেত্রে আপনাকে হয়তো নতুন কিছু ম্যাগনেটিক হাঁড়ি-পাতিল কিনতে হতে পারে। অন্যদিকে, যদি আপনি পুরনো অ্যালুমিনিয়াম বা নন-স্টিক বাসনেই রান্না চালিয়ে যেতে চান এবং রান্নার গতি নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত না হন, তবে ‘ইনফ্রারেড চুলা’ আপনার জন্য সুবিধাজনক সমাধান হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদী সাশ্রয়ের কথা চিন্তা করলে প্রযুক্তিগতভাবে ইন্ডাকশনই এগিয়ে থাকবে।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/154150