দুর্নীতির অদৃশ্য মূল্য: যে ক্ষতি গণনা হয় না

দুর্নীতির অদৃশ্য মূল্য: যে ক্ষতি গণনা হয় না

আমরা সংখ্যা দেখি, কিন্তু এর অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা ধ্বংসযজ্ঞ দেখি না। পত্রিকার পাতায় লেখা থাকে ‘সেতু প্রকল্পে পাঁচশত কোটি টাকা আত্মসাৎ’। সংখ্যাটা বড়, চোখ টানে। কিন্তু এর পেছনে যে হাজার হাজার মানুষের জীবন ভেঙে পড়ছে, যে ক্ষতির হিসাব কোনো নিরীক্ষকের খাতায় ওঠে না। এসব সংখ্যা আমরা দেখি, মুখস্থ করি, ভুলে যাই। কিন্তু দুর্নীতির যে মূল্য কোনো খাতায় লেখা হয় না, যার কোনো পরিসংখ্যান নেই, সেটা আসলে কী? একটি গ্রামে প্রাথমিক স্কুল সংস্কারে বরাদ্দ ছিল পনেরো লাখ টাকা। কাজ হয়েছে আট লাখের। বাকি সাত লাখ? চেয়ারম্যান, ঠিকাদার আর দুয়েকজন কর্মকর্তার পকেটে। আমরা বলি, দুর্নীতি সাত লাখ টাকার। কিন্তু যখন দুর্বল ছাদের নিচে, বর্ষায় জলভরা ক্লাসরুমে, ভাঙা বেঞ্চে বসে তিনশ শিশু পড়াশোনা করে তখন এই ক্ষতি কি শুধু সাত লাখ টাকা থাকে? অর্থনীতিবিদরা যাকে বলেন মাল্টিপ্লায়ার এফেক্ট- একটি ঘটনা যেভাবে স্তরে স্তরে ছড়িয়ে বহুগুণ ক্ষতি করে। দুর্নীতির ভয়াবহ প্রভাব এই শিক্ষা ক্ষেত্রে লক্ষ করা যায়। যখন শিক্ষক নিয়োগে সুপারিশ চলে, যোগ্যরা বাদ পড়ে, অযোগ্যরা শিক্ষক হয় তখন পুরো একটি প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যোগ্য শিক্ষকের অভাবে শিক্ষার মান হ্রাস পায়। হার্ভার্ডের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, একজন যোগ্য ও অযোগ্য শিক্ষকের পার্থক্যে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ আয়ে পনেরো থেকে বিশ শতাংশ পার্থক্য হতে পারে। তখন সেই দুর্নীতি দাঁড়ায় কয়েকশ কোটি টাকায়। এটাই বাস্তবতা। এবার একটি সড়কের কথা ভাবুন। বরাদ্দ ছিল পঞ্চাশ কিলোমিটার রাস্তা পাকা করার। দুর্নীতিতে বরাদ্দ থেকে ত্রিশ শতাংশ গেল। ফলে সিমেন্টে ভেজাল, বিটুমিনে কম মান, রড কম দেওয়া। ছয় মাসেই গর্ত পড়ল রাস্তায়। এখন প্রতিদিন হাজারো গাড়ি সেই গর্তের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি গাড়ির জ্বালানি খরচ বাড়ছে বিশ শতাংশ। রক্ষণাবেক্ষণ খরচ দ্বিগুণ। একটি ট্রাকে আলু নিয়ে যাচ্ছে ঢাকায়। ঝাঁকুনিতে দশ ভাগ আলু নষ্ট হলো। ঢাকায় আলুর দাম বাড়ল। কৃষক কম দাম পেল, ক্রেতা বেশি দাম দিল, মাঝখানের ক্ষতিটা গেল সেই সড়কের গর্তে। দুর্নীতির খাতায় এসব লেখা নেই।

দুর্নীতির সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়ে সামাজিক আস্থায়। মানুষ যখন দেখে দুর্নীতিবাজরা ধরা পড়ে না, বরং উন্নতি করে, তখন তাদের মনে একটা বিষ ছড়িয়ে যায়। “সৎ থেকে লাভ কী?” এই প্রশ্ন একটা সমাজের নৈতিক ভিত্তি ধ্বংস করে দেয়। একজন কৃষক সদ্ভাবে কৃষি ঋণ নিয়ে ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু যখন দেখলেন অন্য একজন জাল কাগজে ঋণ নিয়ে অন্য কাজে খরচ করেছে, কোনো শাস্তি হয়নি তখন তার বিশ্বাস টলে গেল। পরের বার ঋণ নিতে তিনিও মিথ্যা তথ্য দিলেন। এভাবে একে একে সবাই। ফলাফল? ব্যাংক বুঝল তথ্যে ভরসা নেই, তাই ঋণ দেওয়া কমিয়ে দিল। যে সৎ কৃষক যাদের সত্যিই ঋণ দরকার ছিলো, তারা পেলেন না। কৃষি উৎপাদন কমল, খাদ্য নিরাপত্তা হুমকিতে পড়ল। এভাবেই একটি সমাজ ধীরে ধীরে পচে যায়। বিশ্বব্যাংকের গবেষণা বলছে, যে দেশে সামাজিক আস্থা বেশি, সেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেশি। আর আস্থা ধ্বংসের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার দুর্নীতি। ন্যায়বিচার পাওয়ার পথেও দুর্নীতি ভয়াবহ ক্ষতি করে। একজন ছোট ব্যবসায়ী তার পাওনা দশ লাখ টাকা উদ্ধার করতে মামলা করলেন। কিন্তু মামলা চলছে পাঁচ বছর ধরে। প্রতি তারিখে খরচ, উকিল ফি, কোর্টে যাওয়া-আসা। এই পাঁচ বছরে তিনি নতুন কোনো চুক্তি করতে সাহস পাননি। মূলধন আটকে আছে। ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারছেন না। যার ফলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলো না। এভাবে একটি দীর্ঘ মামলা পুরো অর্থনীতিতে চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি করে। ফলে অর্থনীতিতে লেনদেন কমে, প্রবৃদ্ধি থমকে যায়।

আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। যখন টাকা দিয়ে অপরাধী ছাড়া পেয়ে যায়, তখন অপরাধের মূল্য কমে যায়। একজন দোকানদার প্রতি মাসে চাঁদা দিচ্ছেন স্থানীয়দের। এই চাঁদার টাকা দোকানদার তুলছেন পণ্যের দাম বাড়িয়ে। কিনছি আমরা সবাই। মানে দুর্নীতির খরচ বহন করছি আমরাই। কিন্তু সবচেয়ে বড় ক্ষতি ভিন্ন জায়গায়। যখন সৎ মানুষ দেখে অপরাধীরা টাকার জোরে পার পেয়ে যাচ্ছে, তখন সততার মূল্য কমে যায়। সমাজে একটা নৈরাজ্যবোধ ছড়িয়ে পড়ে। দুর্নীতির অন্যতম ভয়াবহ প্রভাব পড়ে স্বাস্থ্যখাতে। একটি হাসপাতালে পনেরো লাখ টাকায় এক্স-রে মেশিন কেনা হলো, কিন্তু আসলে সেটার দাম আট লাখ। বাকি সাত লাখ দুর্নীতি। ফলাফল? নিম্নমানের মেশিন, অস্পষ্ট ছবি, ভুল রিপোর্ট। একটি ভুল রিপোর্টের কারণে রোগ শনাক্তে দেরি হয়। আর দেরি মানেই মৃত্যুঝুঁকি। একটি ঝাপসা এক্স-রে ছবির পেছনে লুকিয়ে থাকে একটি মৃত্যু। যার দায় কোনো খাতায় লেখা হয় না।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, দুর্নীতির পারসেপশন ইনডেক্সে এক পয়েন্ট উন্নতি হলে একটি দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ বাড়ে। বাংলাদেশের জিডিপি চারশ বিলিয়ন ডলারের বেশি। হিসাব করুন দুর্নীতি কমানোর ফলে বছরে দুই বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধি সম্ভব। কিন্তু আমরা সেই সম্ভাবনা নষ্ট করছি প্রতিদিন। দুর্নীতি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এটি মানবসৃষ্ট সমস্যা। এটি একটি আয়না, যা আমাদের নিজেদের চেহারা দেখায়। আয়না মুছে ফেললে, চেহারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল সিস্টেম, দ্রুত শাস্তি নিশ্চিতকরণ, সৎ কর্মকর্তাদের পুরস্কার এসব পদক্ষেপ নিলে পরিবর্তন সম্ভব। দুর্নীতির অর্থনৈতিক খরচ যেমন অসীম, তেমনি দুর্নীতি দূর করার সুবিধাও অসীম। আইএমএফ এর হিসাব অনুযায়ী, দুর্নীতি কমলে বাংলাদেশ বছরে দশ থেকে পনেরো বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত জিডিপি পেতে পারে।

দুর্নীতি পুরো অর্থনীতির গতি কমিয়ে দেয়। কিন্তু এই ক্ষতি অনিবার্য নয়। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা, সচেতনতা আর দায়বদ্ধতা। কারণ দুর্নীতি কোনো সংখ্যা নয়, এটি একটি মানসিকতা। আর মানসিকতা বদলানো গেলে বদলে যায় দেশের ভাগ্য। দুর্নীতির হিসাব কখনো মেলে না, কারণ এর দাম মাপা হয় ভাঙা স্বপ্নে, ঝরে যাওয়া প্রজন্মে, আর হারিয়ে যাওয়া আস্থায়। কিন্তু পরিবর্তনের হিসাবও সহজ একটি কণ্ঠস্বর, একটি প্রতিবাদ, একটি প্রশ্ন। এভাবেই জেগে ওঠে একটি জাতি।

 

লেখক

মুহম্মদ গোলাম রাব্বি

শিক্ষার্থী

পরিসংখ্যান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় 

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/153947