জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শীতকালীন সবজি চাষে

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শীতকালীন সবজি চাষে

এক সময় শীতকাল মানেই ছিল সবজির মৌসুম। মাঠ ভরে উঠত বাঁধাকপি, ফুলকপি, গাজর, শিম, মুলা আর শাকসবজিতে। শীতের ঠান্ডা আবহাওয়া এই ফসলগুলোর জন্য ছিল সবচেয়ে উপযোগী। কৃষকও নিশ্চিন্ত থাকতেন শীত এলেই সবজি হবে, ফলন ভালো হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই চেনা চিত্রটা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। শীতকাল আগের মতো নেই, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শীতকালীন সবজি চাষে। জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, এটি বর্তমানের বাস্তবতা। তাপমাত্রার অস্বাভাবিক ওঠানামা, অনিয়মিত বৃষ্টি, কুয়াশার সময় বদলে যাওয়া সব মিলিয়ে কৃষকের হিসাব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে শীতকালীন সবজি চাষে এই পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে। আগে শীত আসত নির্দিষ্ট সময় ধরে। নভেম্বরের শেষ দিক থেকেই ঠান্ডা পড়ত, জানুয়ারি পর্যন্ত সেই ঠান্ডা স্থায়ী থাকত। এখন দেখা যাচ্ছে, কখনো শীত দেরিতে আসে, কখনো আবার হঠাৎ উষ্ণতা বেড়ে যায়। অনেক সময় শীতের মাঝেই গরমের অনুভূতি হয়। এই অনিশ্চিত আবহাওয়া শীতকালীন সবজির জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শীতকালীন সবজির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এগুলো নির্দিষ্ট তাপমাত্রার ওপর নির্ভরশীল। বেশি গরম হলে গাছ ঠিকভাবে বাড়ে না, ফুল বা ফলন কমে যায়। আবার অতিরিক্ত ঠান্ডা বা কুয়াশাও ক্ষতির কারণ হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন তাপমাত্রার এই ভারসাম্য নষ্ট হয়, তখন ফসলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনিয়মিত বৃষ্টিও বড় একটি সমস্যা। শীতকাল সাধারণত শুষ্ক থাকে। এই শুষ্ক আবহাওয়া অনেক সবজির জন্য উপযোগী। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, শীতের মাঝেও হঠাৎ বৃষ্টি হচ্ছে। এই বৃষ্টিতে জমিতে পানি জমে গাছ পচে যায়, রোগবালাই বাড়ে। কৃষক বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ব্যবহার করেন, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়। কুয়াশার চরিত্রও বদলে গেছে। আগে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কুয়াশা থাকত। এখন অনেক সময় দীর্ঘস্থায়ী কুয়াশা পড়ে থাকে। এতে গাছ ঠিকমতো সূর্যালোক পায় না। ফলে ফুলকপি, বাঁধাকপি বা টমেটোর মতো সবজির বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রে ফলন ছোট হয় বা বাজারজাতের উপযোগী থাকে না। জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে রোগ ও পোকার আক্রমণে। তাপমাত্রা বাড়ার কারণে এমন অনেক পোকা ও রোগ দেখা দিচ্ছে, যেগুলো আগে শীতকালে তেমন ছিল না। কৃষকরা বলছেন, আগের তুলনায় এখন শীতকালেও বেশি ওষুধ দিতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে নিরাপদ খাদ্য নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন ছোট ও মাঝারি কৃষকরা। বড় কৃষকরা কোনোভাবে ক্ষতি সামলে নিতে পারেন, কিন্তু প্রান্তিক কৃষকের পক্ষে তা কঠিন। একবার ফসল নষ্ট হলে তার পুরো বছরের হিসাব এলোমেলো হয়ে যায়। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে চাষ করেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যদি ফলন কমে যায়, তাহলে সেই ঋণের বোঝা আরও ভারী হয়ে ওঠে। শুধু উৎপাদন নয়, বাজার ব্যবস্থাও এই পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কখনো একসঙ্গে অনেক সবজি বাজারে চলে আসছে, আবার কখনো ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। ফলে দাম স্থিতিশীল থাকছে না। কোনো সময় কৃষক ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না, আবার কোনো সময় ভোক্তাকে বেশি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কৃষকদের অভিযোজন ক্ষমতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক কৃষকের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। কখন বীজ বপন করতে হবে, কোন জাত আবহাওয়ার সঙ্গে বেশি মানানসই এই সিদ্ধান্তগুলো আগের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে নেওয়া হতো। এখন সেই অভিজ্ঞতা আর কাজে আসছে না। এক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ ব্যবস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের আধুনিক ও জলবায়ু সহনশীল চাষপদ্ধতি শেখানো দরকার। উন্নত জাতের বীজ, সঠিক সময়ের চাষ, পানি ব্যবস্থাপনা এসব বিষয়ে কার্যকর সহায়তা না পেলে কৃষক একা এই সংকট মোকাবিলা করতে পারবে না। একই সঙ্গে গবেষণার দিকেও জোর দেওয়া প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে এমন শীতকালীন সবজির জাত উদ্ভাবন এখন সময়ের দাবি। শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, ফসলের সহনশীলতা বাড়ানোই হওয়া উচিত গবেষণার মূল লক্ষ্য। 

এই সংকটের প্রভাব শুধু কৃষকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শীতকালীন সবজি আমাদের পুষ্টির বড় উৎস। এই সবজির উৎপাদন ব্যাহত হলে মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টি নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়ে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য শীতকালীন সবজি সহজলভ্য পুষ্টির প্রধান ভরসা। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নীতিনির্ধারকদেরও আরও সক্রিয় হতে হবে। কৃষি খাতকে জলবায়ু ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, ফসল বীমা এবং প্রণোদনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। সবশেষে বলা যায়, শীতকালীন সবজি চাষ এখন আর শুধু মৌসুমি চাষের বিষয় নয়, এটি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি চ্যালেঞ্জ। মাঠে দাঁড়িয়ে কৃষকরা যে বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। 

লেখক

সুরাইয়া বিনতে হাসান 

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ 
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা 

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/153716