ক্রমহ্রাসমান কৃষি জমি উদ্বেগজনক

ক্রমহ্রাসমান কৃষি জমি উদ্বেগজনক

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। স্বাধীনতার পর থেকেই জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে যেমন খাদ্যের ঘাটতি পূরণ করছে তেমনি জিডিপিতেও রাখছে অবদান। কিন্তু বাস্তবচিত্র ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। উন্নয়ন, নগরায়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপের কাছে মাথানত করতে বাধ্য হচ্ছে কৃষি জমি। সবুজ মাঠ বদলে যাচ্ছে কংক্রিটের জঙ্গলে। এই প্রবণতা যেমনি দেশের দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে তেমনি পরিবেশের ওপর তৈরি করছে বিশাল হুমকি। প্রশ্ন হচ্ছে কেন কমছে কৃষি জমি, আর এই সংকট উত্তরণের পথই বা কী? বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো(বিবিএস) সহ অন্যান্য গবেষণা সংস্থার তথ্যমতে প্রতি বছর প্রায় ০.৭০% থেকে ১% হারে কৃষি জমি কমছে, এর নেপথ্যে রয়েছে বেশ কিছু কারণ। প্রথমত, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষের বসবাসের জন্য জমির চাহিদা বাড়ছে। প্রতিবছর গ্রামীণ আবাদি জমি ব্যবহার করে নতুন বসতবাড়ি ও রাস্তাঘাট তৈরির মাধ্যমে যেমন আবাদি জমির পরিমাণ কমাচ্ছে তেমনি উত্তরাধিকার সূত্রে জমি ভাগ হয়ে ছোট ছোট খন্ড তৈরির মাধ্যমে কৃষি কাজে বাধার সৃষ্টি করছে। দ্বিতীয়ত, দ্রুত শিল্পায়নের চাহিদা মেটাতে নতুন নতুন শিল্প কারখানা, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) এবং (ইপিজেড)গড়ে উঠেছে যা অধিকাংশই কৃষি জমির উপর নির্মিত যা কৃষি জমি কমাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এছাড়া সড়ক ও যোগাযোগের জন্য মহাসড়ক, ব্রিজ, কালভার্টসহ অন্যান্য সরকারি অবকাঠামো নির্মাণেও কৃষি জমি কমাতে প্রভাব ফেলছে। তৃতীয়ত, দেশের বিভিন্ন স্থানে ইটভাটাগুলো কৃষি জমির উর্বর স্তর (টপ সয়েল) কেটে নিয়ে যাওয়ার ফলে যেমন দীর্ঘমেয়াদে কৃষি জমির উর্বরতা কমে পাশাপাশি সাময়িক সময়ের জন্য জমির পরিমাণও কমে যায়। চতুর্থত, উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমূদ্রের পানির স্তর বেড়ে গিয়ে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়ে কৃষি জমিগুলো ফসল ফলানোর অনুপযোগী হয়ে পরে। এছাড়া প্রতিবছর নদী ভাঙ্গনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ফলে বিপুল পরিমাণে কৃষি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। 

এই নীরব সংকট মোকাবেলার জন্য আমাদের কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন-এর কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি জমিতে আবাসিক বা শিল্প স্থাপনে সম্পূর্ণভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। ভূমি জোনিং অর্থাৎ কোনটা শিল্প এলাকা, কোনটা আবাসিক এলাকা এবং কোনটা কৃষি এলাকা হবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে ভূমি জোনিং ম্যাপ-এর বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সাথে গ্রামে বসতভিটা ও ছোট শহরে অনুভূমিকভাবে সম্প্রসারণ না করে উল্লম্বভাবে  বহুতল ভবন নির্মাণে উৎসাহ দিতে হবে, যাতে কম জমিতে বেশি মানুষের আবাসন নিশ্চিত করা যায়। কৃষি জমি সংরক্ষণ রেখে যারা বাড়ি নির্মাণ করবেন, তাদের জন্য বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য সরকারি সেবায় বিশেষ ছাড় বা প্রণোদনা যোগ করা যেতে পারে এবং বছরে একাধিক ফসল ফলানোর নীতিতে জোর দিতে হবে, যাতে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয়।  শহরাঞ্চলে বা অল্প জমিতে বহুতল কৃষি ও হাইড্রোপনিক পদ্ধতির মতো আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার ঘটাতে হবে এবং কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর জোর দিতে হবে, যাতে বিদ্যমান জমি থেকেই আরও বেশি আর্থিক সুফল পাওয়া যায়। একই সাথে মাটির ব্যবহার কমানোর জন্য ইট ও পরিবেশবান্ধব নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং ইটভাটার জন্য কৃষি জমির ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে। 

আমাদের মনে রাখতে হবে কৃষি জমি শুধুমাত্র মাটি নয়, এটি আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার মূলভিত্তি। জনসংখ্যা বাড়লেও মাথাপিছু জমির পরিমাণ কমে যাবে, কারণ তাতে খাদ্য সংকটের ঝুঁকি বাড়বে। সরকারকে এখনই কঠোর নীতি গ্রহণ করে, বিজ্ঞানসম্মত ভূমি ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পরিকল্পনা ও নগরায়ণ অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তা যেন কৃষি জমিকে গ্রাস না করে, সেদিকে কঠোর নজর রাখতে হবে। অন্যথায় আমরা উন্নত অবকাঠামোর পেছনে ছুটতে গিয়ে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্যের অধিকার থেকে বঞ্চিত হব। 

লেখক

ইশতিয়াক ইসা

শিক্ষার্থী, আইন ও ভূমি প্রশাসন অনুষদ
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। 

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/153715