ইরানে হামলা করা নিয়ে দ্বিধায় যুক্তরাষ্ট্র, বিভক্ত ট্রাম্প প্রশাসন

ইরানে হামলা করা নিয়ে দ্বিধায় যুক্তরাষ্ট্র, বিভক্ত ট্রাম্প প্রশাসন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানে বিক্ষোভ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। পশ্চিম এশিয়ার এই দেশটিতে সহিংসতায় ইতোমধ্যেই ৫ শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। এদিকে চলমান গণবিক্ষোভ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র কী পদক্ষেপ নেবে— তা নিয়ে ওয়াশিংটনের ভেতরেই মতভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নিষেধাজ্ঞা ও সাইবার ব্যবস্থার পাশাপাশি সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও আলোচনায় থাকলেও এর পরিণতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন মার্কিন সামরিক ও রাজনৈতিক মহলের একাংশ।সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড বলছে, ইরানে দেশজুড়ে চলমান বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ব্রিফ করা হতে পারে বলে জানিয়েছে প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বৈঠকে বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা হবে— যার মধ্যে নিষেধাজ্ঞা জোরদার, সাইবার ব্যবস্থা গ্রহণ থেকে শুরু করে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও রয়েছে।

তবে এই পর্যায়ে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার সম্ভাবনা কম বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইনের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।এদিকে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেয়া মন্তব্যে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা বলেছেন, সম্ভাব্য কোনও হামলার আগে সেনা মোতায়েন ও প্রস্তুতির জন্য আরও সময় প্রয়োজন হবে। তার মতে, এর মধ্যে অবস্থান সুসংহত করা এবং ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা জোরদারের বিষয়গুলোও রয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, সামরিক পদক্ষেপের ফল অনাকাঙ্ক্ষিত হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে— ইরানের জনগণ সরকারের পক্ষে একত্রিত হয়ে যাওয়া অথবা পুরো অঞ্চলে পাল্টা হামলার সূত্রপাত হওয়া।

মূলত গত ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের ব্যাপক অবমূল্যায়ন ও ক্রমাবনত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিবাদে ইরানে বিক্ষোভ চলছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে তেহরানকে বিক্ষোভ দমনে কঠোরতা না দেখানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তবে ইরানি কর্মকর্তারা এসব বক্তব্যকে ‘বেপরোয়া হস্তক্ষেপ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান দলের একাধিক আইনপ্রণেতাও প্রশ্ন তুলেছেন যে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ আদৌ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে ভালো পথ কি না। রোববার টেলিভিশন চ্যানেলের সাক্ষাৎকারে অন্তত দুই মার্কিন সিনেটর সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। রিপাবলিকান সিনেটর র‌্যান্ড পল এবিসি নিউজকে বলেন, ‘ইরানে বোমা হামলা চালালে সেটি যে কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে, আমি তা নিশ্চিত নই।’

অন্যদিকে ইরানে চলমান বিক্ষোভে এ পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ)। রোববার এই তথ্য প্রকাশের মধ্যেই তেহরান সতর্ক করে বলেছে, বিক্ষোভকারীদের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করলে তারা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। মূলত ২০২২ সালের পর সবচেয়ে বড় বিক্ষোভের মুখে পড়েছে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ধর্মীয় নেতৃত্ব। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার হুমকি দিয়েছেন যে বিক্ষোভকারীদের ওপর শক্তি প্রয়োগ করা হলে তিনি হস্তক্ষেপ করবেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, ইরানের ভেতরে ও বাইরে থাকা কর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, তারা ৪৯০ জন বিক্ষোভকারী এবং ৪৮ জন নিরাপত্তা সদস্যের মৃত্যুর ঘটনা যাচাই করেছে। দুই সপ্তাহের অস্থিরতায় ১০ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও সংস্থাটি জানিয়েছে। ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করেনি। বার্তাসংস্থা রয়টার্সও এই তথ্যগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

রোববার রাতে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘সামরিক বাহিনী বিষয়টি পর্যালোচনা করছে, আর আমরা কিছু খুব শক্ত বিকল্প নিয়ে ভাবছি’। তবে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ ওয়াশিংটনকে ‘ভুল হিসাব’ না করার আহ্বান জানিয়েছেন। সাবেক রেভল্যুশনারি গার্ডস কমান্ডার কালিবাফ বলেন, ‘ইরানে হামলা হলে দখলকৃত ভূখণ্ড (ইসরায়েল)সহ যুক্তরাষ্ট্রের সব ঘাঁটি ও জাহাজ আমাদের বৈধ লক্ষ্য হবে।’

গত ২৮ ডিসেম্বর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ক্ষমতায় থাকা ধর্মীয় শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে রূপ নেয়। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে জানানো হয়, ইরানি কর্তৃপক্ষ এই অস্থিরতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করেছে। সোমবার ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের’ প্রতিবাদে দেশজুড়ে সমাবেশের ডাক দেয়াও হয়েছে।এছাড়া গত বৃহস্পতিবার থেকে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ইরান থেকে তথ্যপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। এমন অবস্থায় ইসরায়েলি তিনটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের আশঙ্কায় ইসরায়েল সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধ হয়েছিল এবং সেসময় যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে যুক্ত হয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। এর জবাবে ইসরায়েল ও কাতারে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইরান।

পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/153564