এলপিজি সংকটে ভোগান্তি
এলপিজি গ্যাস এখন আর বিলাসী পণ্য নয়, এটি এখন নিত্যপ্রয়োজনীয়। তাই এর দাম নির্ধারণে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। উন্নত দেশের মতো এ ক্ষেত্রে মানুষের আয়,জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনা নিতে হবে। শক্ত বাজার তদারকি, সিন্ডিকেট ভাঙা, খুচরো বাজারে সরকার নির্ধারিত দামের কঠোর বাস্তবায়ন,প্রয়োজনে সীমিত ভর্তুকি সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া এ সংকট কাটবে না।
মাসখানেক ধরে নৈরাজ্য চলছে রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় এলপি গ্যাসের বাজারে। বগুড়া শহরের উপশহরের বাসিন্দা গৃহিনী হাসনাত জাহান শুক্রবার জানালেন, ‘অনেক কষ্ট করে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনলাম ১,৯৫০ টাকায়।’ যদিও সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা। দুই দিন ধরে আমার বাসায় রান্না বন্ধ। প্রচন্ড শীতে গোছলের জন্য গরম পানি সংকট। রান্না করে খাওয়াতে পারছি না। আমরা না হয় কষ্ট করে খাচ্ছি। বাধ্য হয়ে বাচ্চাদের রাতে শুকনো বিস্কুট পারুটি খাওয়াচ্ছি।’ এ চিত্র শুধু বগুড়ার নয়; সারা দেশের। এমন ভোগান্তির মধ্যেই কমিশন বৃদ্ধিসহ ছয় দফা দাবি আদায়ে ধর্মঘট ডেকেছিল এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। তাতে তারা অনেকটাই সফল। এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) দাবি মানার আশ্বাস দিয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, আমদানি কম হওয়ায় সংকট হচ্ছে। তবে সরকার বলছে, বাজারে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে, সংকট কৃত্রিম।
সংকট ও দায় ?
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, সমস্যার শুরু পরিবেশক পর্যায় থেকে। পাইকারিতে সরবরাহ কমছে, সেই সঙ্গে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলে খুচরায় দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। এলপি গ্যাস সমবায় ব্যবসায়ী সমিতি বলছে, দেশের বাজারে সাড়ে পাঁচ কোটি সিলিন্ডার থাকলেও বর্তমানে রিফিল হচ্ছে মাত্র এক কোটি ২৫ লাখের মতো। সমিতির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, অন্তত চার কোটি ২৫ লাখ সিলিন্ডার অব্যবহৃত পড়ে আছে। এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) জানিয়েছে, শীতকালে বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধি, জাহাজ সংকট ও আর্থিক জটিলতার কারণে ডিসেম্বরে আমদানি কমেছে; ফলে বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। তারা জানান, ২৮টি কোম্পানি এলপিজি ব্যবসা করে। এর মধ্যে ২৩টি কোম্পানির আমদানির অনুমোদন আছে। যদিও এখন মূলত ছয়টি কোম্পানি বেশির ভাগ এলপিজি আমদানি করে। আরও চারটি সীমিত পরিসরে আমদানি করে। বসুন্ধরা, ওরিয়নের মতো বড় কোম্পানিগুলো এখন আমদানি বন্ধ রেখেছে। লোয়াব জানায়, প্রতি মাসে দেশের বাজারে গড়ে এক লাখ ২০ হাজার টন এলপিজি সরবরাহ হয়। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য, শ্রীলঙ্কা, ভারতের উড়িষ্যার ধামরা সমুদ্রবন্দর দিয়ে অন্তত ৭০ হাজার টন গ্যাস আমদানি হয়। বাকি ৫০ হাজার টন বিশ্বের বিভিন্ন অপারেটর ও বন্দর হয়ে ইরান থেকে আসার কথা জানিয়েছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী। বর্তমানে বিভিন্ন দেশের এলপি গ্যাস খাতের প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা থাকায় ইরান থেকে আমদানি গ্যাস বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না। এ কারণেও আমদানি কমেছে। এদিকে সংস্থাটি এক বিবৃতিতে খুচরা বিক্রেতাদেরও সংকটের জন্য দায়ী করে। এলপিজি ব্যবসায়ীরা সংকটের জন্য সরকারের দায়ও দেখছেন। তারা বলেন, কয়েকটি কোম্পানি আমদানি সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অনেক দিন ধরে সরকারের কাছে দেন-দরবার করলেও অনুমোদন মেলেনি।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান ও জরিমানার খবর নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রির দায়ে ডিলারদের শাস্তি দেওয়া আইনানুগ ও প্রয়োজনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই কি সংকটের সমাধান হবে? বাস্তব চিত্র বলছে, মোবাইল কোর্টের ভয়ে অনেক বিক্রেতা দোকান বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে এবং গোপনে দ্বিগুণ দামে গ্যাস বিক্রি হচ্ছে। এতে ভোক্তা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছেন। এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন যে তথ্য দিয়েছে, তা গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। বহু কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এ অবস্থায় পরিবেশকদের সঙ্গে আলোচনা না করেই বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নতুন দর ঘোষণা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে এনবিআরের মূসক নীতি বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, আজকেই তারা এ সংক্রান্ত চিঠি পেয়েছেন। অতএব এ ব্যাপারে এখনও কোনো আলোচনা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, এ ধরনের একটি চিঠি তারা পেয়েছেন। এমনিতেই এলপি গ্যাসের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের এলসি দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়। এ ছাড়া কাঁচামাল হিসেবে ৩৬০ দিনের বাকিতে আমদানির সুযোগ রয়েছে। তবে সবুজ শিল্প হিসেবে কম সুদে ঋণ দেওয়ার যে দাবি করা হয়েছে, বিদ্যমান ব্যবস্থায় সে সুযোগ নেই। এ প্রেক্ষাপটে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড গতকাল বিকেলে সারাদেশে এলপিজি বিপণন ও সরবরাহে ঘোষিত অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছে। সরকার মনে করছে এলপিজি সংকট মিটাতে এক সপ্তাহের সময় লাগবে। নীতিনির্ধারণে অংশীজনের উপেক্ষা করলে তার নেতিবাচক ফল ভোক্তাদেরই ভোগ করতে হয়। বর্তমান সংকটও তারই প্রমাণ। অন্যদিকে রাজধানীর চায়ের দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ এলপিজি নির্ভর ক্ষুদ্র ব্যবসা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত দামে গ্যাস কিনে ব্যবসা চালানো সম্ভব নয় বলে অনেকেই দোকান বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে কর্মসংস্থান ও জীবিকার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ সংকট থেকে উত্তরণে প্রয়োজন সমন্বিত ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ। একদিকে যেমন দ্রুত জরুরি ভিত্তিতে এলপিজি আমদানি ও সরবরাহ বাড়াতে হবে, অন্যদিকে ন্যায্য কমিশন নির্ধারণের মাধ্যমে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রশাসনিক নজরদারি অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তা যেন সরবরাহ ব্যবস্থাকে অচল করে না দেয় সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে।
সংবিধানে আমাদের জীবন ও জীবন ধারণের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। ‘গ্যাস’ জীবন ধারণের অপরিহার্য উপাদান ‘খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ’-এর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এটা আমাদের বেঁচে থাকার অন্যতম অনিবার্য অনুষঙ্গ। তাই ‘গ্যাস সংযোগ’ বা সুলভ মূল্যে ‘গ্যাস’ পাওয়াটা শুধু নাগরিক অধিকার নয়; এটা জনগণের মৌলিক অধিকার। অথচ সেই গ্যাস সংযোগের দরজা দীর্ঘদিন বন্ধ। আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ আজ প্রায় ছয় বছর। চলমান সংকট নিরসনে ওই দরজা খোলা এখন খুবই জরুরি। জীবন বাঁচাতে বিকল্প হিসেবে এলপিজি গ্যাসে অসহায় জনগণ আশ্রয় খুঁজছে, সেই গ্যাসের দাম ও সরবরাহ নিয়ে চলছে উদ্ধারহী হয়রানি ও নৈরাজ্য। সাধারণ মানুষ তাহলে যাবে কোথায়? এই নৈরাজ্য ঠেকাবে কে? আমরা মনে করি, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ন্যায্যমূল্যে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। শীতের মৌসুমে পাইপলাইনের গ্যাস সংকটের বাস্তবতা মাথায় রেখে এলপিজিকে একটি কৌশলগত জ্বালানি হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। নইলে গ্যাস সংকট মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে, যার দায় কোনোভাবেই এড়ানো যাবে না।
লেখক
মাহমুদ হোসেন পিন্টু
সাংবাদিক-প্রাবন্ধিক
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/153486