চলনবিলে মিঠা পানির শুঁটকি শিল্প কোটি টাকার সম্ভাবনাময় বাজার
গুরুদাসপুর (নাটোর) প্রতিনিধি : দেশের বৃহত্তম জলাভূমি চলনবিল যেখানে নোনা পানির শুঁটকির তীব্র গন্ধ নেই, আছে মিঠা পানির স্বাদ, গন্ধ, পুষ্টিগুণ আর মানুষের জীবিকার গল্প। একসময় যেসব মাছ বিক্রি করতে না পেরে জেলেদের বাড়ির উঠোনে পাতা হতো রোদে শুকানোর জন্য, সেসবই আজ পরিণত হয়েছে কোটি টাকার এক সম্ভাবনাময় শিল্পে। বিলের প্রকৃতি, জেলেদের সৃজনশীলতা, মানুষের পরিশ্রম এবং বাজারের চাহিদা সব মিলিয়ে মিঠা পানির শুঁটকি এখন দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও পরিচিতি পেয়েছে।
চলনবিলে শুঁটকি তৈরির সূচনা হয় মূলত বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে। তখন একদিকে প্রচুর মাছ ধরা পড়লেও সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় নষ্ট হয়ে যেত অসংখ্য মাছ। সেই সমস্যার সমাধানেই জেলেরা রোদে শুকিয়ে মাছ সংরক্ষণ শুরু করেন।
প্রতি বছর বর্ষার শেষ দিকে অক্টোবর-নভেম্বর মাসে বিলের উঁচু জায়গায় বাঁশের ছোট ছোট চাতাল তৈরি করেন শুটকি উৎপাদনকারীরা। জেলেরা চলনবিলের আশপাশের সিংড়া, গুরুদাসপুর ও নলডাঙ্গা বাজারে ভোরবেলা এসে বিক্রি করেন বিলের বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। সারারাত বিভিন্ন স্থানে মাছ ধরা শেষে কাক ডাকা ভোরে এসব মাছ মৎস্য আড়তে নিয়ে আসেন জেলেরা। শুটকি ব্যবসায়ীরা আড়ত থেকে মাছ কিনে চাতালে নিয়ে যান এবং নারী শ্রমিকদের সহযোগিতায় মাছগুলোতে লবণ মাখিয়ে ২-৩ ঘণ্টা রেখে দেন।
বিলের দেশীয় মাছের মধ্যে রয়েছে টেংরা, পুঁটি, খলসে, চেলা, টাকি, শোল, বোয়াল, কই, মাগুর, শিংসহ নানা প্রজাতির মাছ। সম্প্রতি সিংড়ার নিংগইন এলাকার একটি বড় শুটকি চাতালে সকালে গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন এক কর্মচাঞ্চল্য। প্রায় ৩০ জন নারী-পুরুষ শ্রমিক ব্যস্ত মাছ ধোয়া, কাটা, লবণ মাখানো, রোদে দেওয়া এবং শুকানোর কাজে।
শুটকি তৈরির কাজ শুরু হয় সকালে নারী শ্রমিকদের হাতেই। আবহাওয়া ভালো থাকলে টানা দুইদিনে মাছ শুকিয়ে প্রস্তুত হয় শুটকি। এরপর চাতাল মালিকরা পুরুষ শ্রমিকদের সহযোগিতায় বিভিন্ন প্রজাতির শুটকি প্যাকেটজাত করে সৈয়দপুর আড়তে বিক্রির জন্য পাঠান।
চাতাল মালিক জাহিদুল ইসলাম জানান, স্থানীয় বাজার থেকে তারা বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ ক্রয় করে শুটকি তৈরি করেন। টেংরা কাঁচা মাছ সাইজ অনুযায়ী প্রতি কেজি ৩শ’-৫শ’ টাকায় কিনতে হয়, আড়াই কেজি কাঁচা মাছ শুকিয়ে তৈরি হয় ১ কেজি শুটকি, যার দাম ১ হাজার-১ হাজার ৫শ’ টাকা। পুঁটি মাছ কাঁচা ১৫০-২শ’ টাকা কেজি, দুই কেজি কাঁচা মাছ শুকিয়ে হয় ১ কেজি শুটকি, যার দাম ৫শ’-৫৫০ টাকা।
খলসে কাঁচা ৮০-৯০ টাকা কেজি কিনে শুটকি বিক্রি হয় ২৫০-৩শ’ টাকায়। টাকি কাঁচা মাছ ২১০-২৩০ টাকা, ৪ কেজি কাঁচা টাকি মাছ শুকিয়ে ১ কেজি শুটকি হয়; দাম ৮১০-১ হাজার টাকা। শোল কাঁচা মাছ ৪শ’-৫শ’ টাকা কেজি, ৩ কেজি কাঁচা মাছ শুকিয়ে ১ কেজি শুটকি তৈরি হয়, বাজারমূল্য ১ হাজার ৭শ’-২ হাজার টাকা। বোয়াল কাঁচা ৩শ’-৪শ’ টাকা কেজি কিনে ৩ কেজি কাঁচা মাছ শুকালে ১ কেজি শুটকি পাওয়া যায়; দাম ১২শ’-১৪শ’ টাকা। একইভাবে চেলা, কই, মাগুর, শিংসহ অন্যান্য মাছও ক্রয় করে শুটকি তৈরি করা হয়।
নাটোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলনবিলের আয়তন প্রায় ৮শ’ বর্গমাইল। এর মধ্যে রয়েছে ১৪টি নদ-নদী ও ৭১টি খাল। বিস্তীর্ণ এই বিলজুড়ে সবচেয়ে বেশি শুটকি উৎপাদন হয় নাটোরের সিংড়া ও গুরুদাসপুর এলাকায়। চলনবিলে চারটি বড় চাতালসহ ৩৯টি স্থানে ২১৫ জন ব্যবসায়ী শুটকি উৎপাদনে যুক্ত আছেন। ২০২৪ সালে উৎপাদিত হয়েছে ২৫০ মেট্রিক টন শুটকি এবং ২০২৫ সালে লক্ষ্যমাত্রা ৩২০ মেট্রিক টন। যার বাজারমূল্য প্রায় ১৮ কোটি টাকা।
নাটোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ওমর আলী জানান, সরকারি পর্যায়ে শুটকি উৎপাদকদের প্রশিক্ষণ এবং মান নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে সংরক্ষণাগার স্থাপন করা গেলে চলনবিলের শুটকি রপ্তানিযোগ্য পণ্যে পরিণত হবে। চলনবিলের শুটকি এখন আর শুধু খাবার নয়-এটি গ্রামীণ জীবিকার প্রতীক, নারীর আত্মনির্ভরতার গল্প এবং বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় এক শিল্পের ভবিষ্যৎ।
পোস্ট লিংক : https://karatoa.com.bd/article/148479