রাত ২:৫৪, মঙ্গলবার, ২৯শে মে, ২০১৭ ইং
/ বিশেষ প্রতিবেদন

রাজকুমার নন্দী : পবিত্র রমজান মাসে চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ হতে যাচ্ছে দীর্ঘদিন রাজপথের বাইরে থাকা বিএনপির রাজনীতি। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের দাবিতে ভবিষ্যৎ আন্দোলন সফল এবং আগামী নির্বাচন প্রস্তুতিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের নেতৃত্বে দেশব্যাপী কর্মিসভার পর দলটি এবার প্রাধান্য দিচ্ছে ঘরোয়া রাজনীতিকে। ইফতার মাহফিলের মাধ্যমে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির। এছাড়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইফতারকে কেন্দ্র করে সরকারবিরোধী হিসেবে পরিচিত সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও সম্পর্কোন্নয়নের চিন্তা-ভাবনা রয়েছে দলটির। এদিকে, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও প্রতি বছরের ন্যায় এবারের রমজানেও রাজনীতিক, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী ও কূটনীতিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। এবার তিনি নিজ উদ্যোগে পাঁচটি ইফতার মাহফিলের আয়োজন করবেন। পুরো রমজান মাস জুড়েই ঘরোয়া রাজনীতি আর ধর্মীয় কর্মকান্ড নিয়েই ব্যস্ত থাকবেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। তবে রমজানের পর নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করবে দলটি। এছাড়া ইফতার রাজনীতির পর দ্রুতই দলের পুনর্গঠন প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করতে চায় বিএনপি। দলটির একাধিক সিনিয়র নেতার সাথে কথা বলে এমনটিই জানা গেছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, পুরো রমজান মাস জুড়েই বিএনপির নেতারা ঘরোয়া রাজনীতিতে সক্রিয় থাকবেন। দলটির নেতাদের মতে, পবিত্র রমজান মাসে রাজনীতি ঘরে আবদ্ধ থাকলেও ইফতারের মাধ্যমে নেতাকর্মীরা আরো কাছাকাছি হওয়ার সুযোগ পাবেন। এছাড়া সরকারি মামলা-হামলায় জর্জরিত যেসব নেতাকর্মী গ্রেফতারের ভয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন ইফতারকে কেন্দ্র করে তারাও প্রকাশ্যে আসার সুযোগ পারেন। এতে করে দল লাভবান হবে।

বিএনপির চেয়ারপারসন এবারের রমজানে নিজ উদ্যোগে পাঁচটি ইফতার মাহফিলের আয়োজন করবেন বলে জানিয়েছেন তার প্রেস উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান। এর মধ্যে এবারই প্রথম বিএনপির নেতাকর্মীদের জন্য আলাদা ইফতারের আয়োজন করবেন বেগম জিয়া। পাশাপাশি সিনিয়র নেতাদের নিয়ে ঢাকা মহানগর বিএনপিসহ দলের অঙ্গ সংগঠন ও ২০ দলীয় জোটের শরিকদের ইফতারেও অংশ নেবেন খালেদা জিয়া। তবে তিনি এ বছর রমজানের শেষদিকে পবিত্র ওমরাহ পালনে সৌদি আরব যাবেন কিনা, সে ব্যাপারে এখনো কিছু জানা যায়নি।

প্রতি বছরের ন্যায় এবারো পহেলা রমজানে এতিম ও আলেম-ওলামাদের সঙ্গে ইফতারের মধ্য দিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের ইফতারের কর্মসূচি শুরু হবে। রাজধানীর লেডিস ক্লাবে এই ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ২৯ মে কূটনীতিকদের সম্মানে রাজধানীর গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেলে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করবেন খালেদা জিয়া। পরবর্তীতে ৩ জুন রাজধানীর বসুন্ধরা আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে বিএনপির নেতৃবৃন্দের সম্মানে, পরদিন ৪ জুন একইস্থানে পেশাজীবী, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের সম্মানে এবং ৫ জুন একই জায়গায় বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের সম্মানে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করবেন বিএনপির চেয়ারপারসন। এছাড়া ৬ জুন লেডিস ক্লাবে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), ১০ জুন মতিঝিলের হোটেল পূর্বানীতে ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), ১২ জুন রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন প্রাঙ্গণে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি, ১৩ জুন গুলশানের ইমান্যুয়েলস ব্যাঙ্কুয়েট হলে লেবার পার্টি, ১৪ জুন বসুন্ধরা আন্তর্জাতিক কনভেশন সেন্টারে মহানগর উত্তর বিএনপির ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেবেন খালেদা জিয়া।

জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, রমজান মাসে সবাই রাজনীতিটাকে একটু দূরে রেখে ধর্ম-কর্ম করতে চান। তবে রাজনীতির তো আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো ছুটি হয়ে যায় না। এ মাসে ইফতার পার্টি ও বিভিন্ন সেমিনারে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক কর্মকান্ড চলে। আর এর মধ্য দিয়েই সাংগঠনিক কর্মকান্ড চলবে। এছাড়া বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাৎ বার্ষিকী উপলক্ষেও কর্মসূচি রয়েছে বিএনপির।

তিনি আরো বলেন, দলীয় চেয়ারপারসন প্রতি বছরই সিনিয়র নেতা, এতিম-আলেম-ওলামা এবং কূটনীতিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী ও রাজনীতিবিদদের সাথে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে থাকেন। এ বছরও তা হবে। এছাড়া সিনিয়র নেতাদের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন তিনি।

জিয়াউর রহমানের শাহাদাৎবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি ইতোমধ্যে আজ শনিবার থেকে আগামী ১০ জুন পর্যন্ত পনের দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এর বাইরে শাহাদাৎবার্ষিকী উপলক্ষে ৩০ মে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ২৩টি স্পটে এবং পরদিন ৩১মে নগর উত্তরের ১৫টি স্পটে দুস্থদের মাঝে কাপড় ও ইফতার সামগ্রী বিতরণ করবেন খালেদা জিয়া। এছাড়া জেলা ও মহানগরীসহ অন্যান্য ইউনিটে সুবিধা অনুযায়ী আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল ও দুস্থদের মাঝে কাপড় ও ইফতার সামগ্রী বিতরণ করা হবে।

দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে ধর্ষণ চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে নাইম এক তরুণীর খোঁজে পুলিশ

রুদ্র রাসেল : বনানীর রেইনট্রি হোটেলে দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে ধর্ষনের ঘটনায় মামলা গ্রহনের বিষয়ে বনানী থানা পুলিশের গাফেলতি পেয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তদন্ত কমিটি। কমিটির প্রধান ডিএমপির এডিশনাল কমিশনার মিজানুর রহমান জানান, ‘প্রাথমিকভাবে কিছু অনিয়ম ও অসঙ্গতি কমিটির নজরে এসেছে। এসব অনিয়ম ও অসঙ্গতির সঙ্গে যে জড়িত থাকুক না কেন, তার শাস্তির সুপারিশ করা হবে।’ তবে  রোববার এ কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা থাকলেও তারা সময় বৃদ্ধির আবেদন করেন। পরে তাদের আরও তিনদিনের সময় দেন ডিএমপি কমিশনার। এ ধর্ষন ঘটনার মামলা গ্রহণবিষয়ক কর্তব্য পালনে বনানী থানা পুলিশের কোনও গাফিলতি রয়েছে কিনা- তা জানতে এডিশনাল কমিশনার মিজানুর রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে ডিএমপি। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন- ডিএমপির যুগ্মকমিশনার (ডিবি) আবদুল বাতেন ও যুগ্মকমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণপদ রায়।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, এ পর্যন্ত মামলার আসামীসহ ১১ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। রিমান্ডে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে নাইম আশরাফ। আর ধর্ষনের শিকার দুই তরুণীর খুব কাছাকাছি থাকা এক তরুনীকে খুঁজছে পুলিশ। তবে তার কোন হদিস মিলাতে পারছে না পুলিশ।

এদিকে এ মামলার আসামি সাফাত আহমেদ ও সাদমান সাকিফের পর গাড়িচালক বিল্লাল হোসেন  আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এছাড়া পুলিশের আবেদনের প্রেক্ষিতে  আদালত আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদের ছেলে সাফাত আহমেদ ও রেগনাম গ্র“পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ হোসেনের ছেলে সাদমান সাকিফের কাছ থেকে জব্দ করা ৫টি মোবাইল ও একটি পাওয়ার ব্যাংক ফরেনসিক পরীক্ষা করানোর অনুমতি দিয়েছে। এছাড়া সর্বশেষ গ্রেফতার নাইম আশরাফের ডিএনএ পরীক্ষারও অনুমতি মিলেছে। ঢাকা মহানগর হাকিম দেলোয়ার হোসেন সিআইডি’র ফরেনসিক বিভাগকে এ আদেশ দেন। সংশ্নিষ্ট আদালতের সাধারণ নিবন্ধক উপ-পরিদর্শক আবদুল মান্নান এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এর আগে আসামিদের মোবাইল ফোন ফরেনসিক পরীক্ষার অনুমতি চেয়ে গত শনিবার আদালতে আবেদন করে তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর পুলিশের উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগ।

গাড়ি চালকের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি : দুই ছাত্রীকে ধর্ষণের মামলার আসামি সাফাত আহমেদ ও সাদমান সাকিফের পর গাড়িচালক বিল্লাল হোসেন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিচ্ছে। ঢাকা মহানগর হাকিম মাহমুদুল হাসান-এর আদালতের খাসকামরায় তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। আদালতসূত্র জানায়, মামলার এজাহারে বিল্লালের বিরুদ্ধে ধর্ষণের ঘটনা ভিডিও করার অভিযোগ করা হয়েছে। মামলা দায়েরে পর বিল্লাল ভিডিওটি মুছে ফেলে বলেও জানিয়েছে। এর আগে গত ১৮ মে ছয় দিনের রিমান্ডের একদিন বাকি থাকতে সাফাতকে এবং পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে সাদমানকে বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকার হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। স্বীকারেক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করার পর তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।

উল্লেখ্য, গত ২৮ মার্চ বনানীর রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণের শিকার হন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া দুই শিক্ষার্থী। ঘটনার প্রায় ৪০ দিন পর গত ৬ মে তারা বনানী থানায় মামলা করেন। মামলায় সাফাত আহমেদ, সাদমান সাকিফ, নাঈম আশরাফ, সাফাতের গাড়ি চালক বিল্লাল হোসেন ও বডিগার্ড রহমত আলী ওরফে আজাদকে আসামি করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইতোমধ্যে সব আসামিকে গ্রেফতার করেছে।

সহায়ক সরকারের রূপরেখা ও নির্বাচনী ইশতেহার তৈরিতে ব্যস্ত বিএনপি

রাজকুমার নন্দী : বিএনপির ভবিষ্যৎ রূপকল্প ‘ভিশন-২০৩০’ ঘোষণার পর এবার নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের রূপরেখা এবং নির্বাচনী ইশতেহার তৈরির কাজে মনোনিবেশ করেছে দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করে সংসদের বাইরে থাকা এই দলটি। যদিও আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি বিএনপি। তবে ‘ভিশন-২০৩০’ রূপকল্প ঘোষণার মধ্য দিয়ে এই বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে গেছে বলে মনে করছেন দলটির নেতাকর্মীরা। তবে ইশতেহারের আগেই নির্বাচনকালীন ‘সহায়ক’ সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করা হবে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ঈদুল ফিতরের পরপরই বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এই রূপরেখা ঘোষণা করবেন। আর ভিশন-২০৩০’র আলোকেই তৈরি হচ্ছে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার, যেটা একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে আগে ঘোষণা করা হবে। এদিকে, আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে ‘ভিশন-২০৩০’ রূপকল্পে কোনোকিছু সংযোজন-বিয়োজনের প্রয়োজন পড়লে সেটাও করবে বিএনপি। আর সেটা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার আগেই করা হবে। এই রূপকল্পকে বাংলাদেশের জন্য একটি দলিল-সনদ হিসেবে রাখতে চায় দলটি। বিএনপি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।


জানতে চাইলে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী ও সিনিয়র সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ দৈনিক করতোয়াকে বলেন, নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার নিয়ে কাজ চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে বিএনপি চেয়ারপারসন ঈদের পরপরই এই সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করবেন। কী ধরণের সহায়ক সরকার বিএনপি প্রত্যাশা করে, রূপরেখায় সেটা স্পষ্টভাবে বলা হবে। পরে এ নিয়ে কী আলোচনা-সমালোচনা হয়, তা-ও পর্যবেক্ষণ করা হবে। এরপর নির্বাচনের এক বা দুই মাস আগে ঘোষণা করা হবে নির্বাচনী ইশতেহার, যেটার কাজও এগিয়ে চলছে।

বিএনপির ভিশন-২০৩০’র সংযোজন-বিয়োজন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভিশনে পরিষ্কারভাবে বলা আছে- বিএনপি এটা নিয়ে সকলের সঙ্গে আলোচনা করতে চায়, উন্মুক্ত রাখতে চায়। আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে যেকোনো পয়েন্টে পরিবর্তনের প্রয়োজনে যদি ঐকমত্য হয়, তাহলে নিশ্চয় সেই পরিবর্তন আনা হবে। সব সতর্কতার পরেও ভুল হতেই পারে। সুতরাং রূপকল্পে জরুরি সংশোধনের প্রয়োজন হলে নিঃসন্দেহে তা করা হবে।


বিএনপি ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে কোথায় দেখতে চায়, সেটার ওপর ভিত্তি  করে ৩৭টি ইস্যু ও ২৫৬টি দফা নিয়ে গত ১০ মে ভিশন-২০৩০ ঘোষণা করে। এই রূপকল্পের পক্ষে জনমত সৃষ্টি ও জনগণের কাছে তুলে ধরতে কর্মিসভা, সেমিনার, সুধী সমাবেশসহ ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বিএনপি। এর অংশ হিসেবে রাজধানীতে ইতোমধ্যে দিনব্যাপী শিক্ষা বিষয়ক সেমিনারও হয়েছে। সেখানে দলের চেয়ারপারসনসহ শিক্ষাবিদরা বক্তব্য দেন। ওই অনুষ্ঠানের সুপারিশমালা যুক্ত হবে ইশতেহারে। এছাড়া স্বাস্থ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, অর্থনীতিসহ অন্যান্য বিষয়েও সেমিনার করবে বিএনপি। সবগুলোতেই উপস্থিত থাকবেন বিএনপি প্রধান। সেখানে উঠে আসা প্রস্তাবগুলোও নির্বাচনী ইশতেহারে যুক্ত হবে। এদিকে চিঠিসহ রূপকল্পের একটি কপি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সাংবাদিক, সুশীলসমাজের প্রতিনিধিসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে দ্রুতই পাঠানো হবে। এ প্রক্রিয়ায় কারও কোনো যুক্তিসঙ্গত-গ্রহণযোগ্য মতামত থাকলে তা সংগ্রহ করে ভিশন ও ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।


দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ভিশন-২০৩০’র আলোকেই একাদশ সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার তৈরি করছে বিএনপি। ভিশনে প্রতিটি ইস্যুর সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলেও ইশতেহারে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা থাকবে। নির্বাচিত হলে আগামী পাঁচ বছরে বিএনপি ভিশনের কী কী বাস্তবায়ন করবে, তা থাকবে ইশতেহারে। ইশতেহারের নানা দিক নিয়ে সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে কথা বলেছেন দল সমর্থিত কয়েকজন বুদ্ধিজীবী।

আরো জানা গেছে, ইশতেহারে অর্থনীতি ও রাজনীতি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ চমক থাকবে। কম সময়ের মধ্যে বড় ধরণের অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটানোর বিশেষ কর্মপরিকল্পনা জাতির সামনে তুলে ধরা হবে। রাজনীতিতেও ইতিবাচক আমূল পরিবর্তন আসবে। ইশতেহারের জন্য একটা ভালো সেøাগানও খুঁজছে দলটি। এজন্য বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হচ্ছে। বিশ্বায়নের নানা দিক তুলে ধরার পাশাপাশি তরুণ ও নারীদের আকৃষ্ট করতে নানামুখী উদ্যোগ থাকছে ইশতেহারে। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে প্রযুক্তিকে। বিভক্তি ও বিভাজনের রাজনীতির অবসান, বিরোধী দলকে সত্যিকার অর্থেই বিকল্প সরকারের মর্যাদা দেওয়াসহ ইতিবাচক সব অঙ্গিকার থাকছে এ নির্বাচনী ইশতেহারে।


এ প্রসঙ্গে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপি একটি নির্বাচনমুখী দল, যারা সুস্থধারার রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তাই নির্বাচনের জন্য ইশতেহার অবশ্যই দেওয়া হবে। ইশতেহারে ভিশন-২০৩০ এর নানাদিক গুরুত্ব পাবে। তবে বিএনপি এখন নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ভিশন-২০৩০’র সংযোজন-বিয়োজন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভিশন-২০৩০ উপস্থাপনের সময়ে বেগম খালেদা জিয়া প্রথমেই বলেছেন- এটাতে আপনারা মতামত দেবেন। আলোচনা-সমালোচনার ভিত্তিতে পরবর্তীতে এটাকে আরো সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করা হবে বলেও জানান ফখরুল।


বিএনপির সিনিয়র নেতারা বলছেন, নির্বাচনকালীন সরকার নিরপেক্ষ না হলে শক্তিশালী-স্বাধীন নির্বাচন কমিশনও কখনো অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে না। তাই অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সহায়ক সরকারের প্রয়োজন; যে সরকারের কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ-অভিলাষ থাকবে না, নির্বাচনের ফলাফল নিয়েও তাদের নিজস্ব কোনো স্বার্থ থাকবে না।

জানা গেছে, সহায়ক সরকারের রূপরেখায় বেশকিছু বিকল্প প্রস্তাব থাকতে পারে। এর মধ্যে নির্বাচনকালীন সময়ে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাবনা গুরুত্ব পাবে। তবে জামায়াতকে নিয়ে নানামুখী সমালোচনার কারণে নিবন্ধন বাতিল হওয়া ২০ দলীয় জোটের শরিক এই দলটিকে বাইরে রেখেই কৌশলে দেয়া হতে পারে ওই প্রস্তাব। এছাড়া ক্ষমতা হ্রাস করা সাপেক্ষে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনেও আগামী নির্বাচনে যাওয়ার ইঙ্গিত থাকতে পারে প্রস্তাবে। সেক্ষেত্রে নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ না করার শর্তে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও ওই সরকারের প্রধান থাকতে পারবেন। এছাড়া রূপরেখায় সংবিধান সংশোধন করে নতুন কাঠামোয় নির্বাচন দেয়ার প্রস্তাবও আসতে পারে। বিএনপি মনে করছে, সংবিধানে এ ‘সহায়ক সরকার’ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কাজটি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকেই করতে হবে। কারণ, তারাই নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছে। তাছাড়া বর্তমান সংসদে তাদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তাই আইন পরিবর্তন-পরিবর্ধন শুধু সিদ্ধান্তের ব্যাপার।

বরেন্দ্র অঞ্চলে বিষমুক্ত পেয়ারা চাষ বাড়ছে

এ কে তোতা, গোদাগাড়ী (রাজশাহী) : বরেন্দ্র অঞ্চলে থাই পেয়ারা চাষে  বিপ্লব ঘটেছে। বিষমুক্ত পেয়ারা চাহিদা ব্যাপক থাকায় চাষীরা লাভবান হচ্ছে। এতেকরে এ অঞ্চলে প্রতিবছর  পেয়ারা চাষ বাড়ছে।

রাজশাহীর  গোদাগাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়,  চলতি  মৌসুমে গেদাগাড়ী উপজেলায়  ২ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে থাই জাতের পেয়ারা চাষ করা হয়েছে। উপজেলার  দেওপাড়া ইউনিয়নের ইস্বরী পুরে ২০১০ সালে প্রথম থাই  পেয়ারা  চাষ করে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে মনিরুল  নামের এক বেকার যুবক। পরের বছর বেশি জমিতে পেয়ারা চাষ করে ১০ লাখ টাকা আয় করে। মনিরুলের কাছ থেকে থাই পেয়ারা চাষের পদ্ধতি গ্রহণ করে উপজেলার আরও কয়েকজন কৃষক।

এর পর থেকেই  গোদাগাড়ী উপজেলায়  থাই পেয়ারা চাষ সম্প্রসারিত হয়। কৃষকদের পাশাপাশি জমি লীজ গ্রহণ করে  বেকার যুবকেরা বাণিজ্যিক ভাবে পেয়ারা চাষ করে  কর্মসংস্থান ঘটিয়েছে। উপজেলায় ৩ হাজার  লোক পেয়ারা চাষে জড়িত।

বঙ্গবন্ধু কৃষি পদক প্রাপ্ত  মনিরুল বহুমুখী ফসল চাষের পাশাপাশি ১০০ বিঘা জমিতে থাই পেয়ারা চাষ করেছে। প্রতি বিঘায় বছরে ৪০ হাজার টাকা খরচে আয়  হয় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। কৃষক মনিরুল ইসলাম বলেন থাই পেয়ারা চাষে তাকে কারিগরি সহায়তা দিয়েছে স্থানীয় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা অতনু সরকার। মাঠ পর্যায়ে এই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, প্রথম বছর থাই পেয়ারা ফলন কম হয়।  তবে পরের বছর থেকে  পেয়ারা ফলন বাড়তে থাকে। একটানা ৬  থেকে ৭ বছর পেয়ারার ভাল ফলন পাওয়া যায়।
উপজেলার বসন্তপুরের এই কৃষক  শাহাদত ১০ বিঘা জমিতে পেয়ারা চাষ করে অর্থনৈতিক ভাবে লাভবান হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া শাহাদত  হোসেন  চাকরি না করে জমি লিজ নিয়ে  পেয়ারা সহ বিভিন্ন অর্থকারী ফসল বাণিজ্যিক ভাবে চাষ শুরু করে  ২০১৬ সাল থেকে।  শাহাদত হোসেন বলেন, উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর থেকে পেয়ারা সহ বিভিন্ন ফসল চাষের উপর প্রশিক্ষণ নিয়েছে। সহজে ব্যাংক ঋণ পাওয়া গেলে শাহাদত হোসেন পেয়ারা চাষ সম্প্রসারিত করবে জানান।

 গ্রোগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি ২০০ বিঘা জমিতে থাই পেয়ারা চাষ করেছে হেনা মাস্টার। ভাল ফলন হওয়ায় ব্যাপক সাফল্য পাওয়ার  আসা করছে এই পেয়ারা চাষী।

 এ প্রসঙ্গে গোদাগাড়ী কৃষি কর্মকর্তা  তৌফিকুর রহমান বলেন,  বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটি পেয়ারা চাষের জন্য খুবই উপযোগী। বিশেষ করে উচু জমিতে থাই পেয়ারার উৎপাদন ভাল হয়। এ ধরনের জমি বেশি থাকায়  গোদাগাড়ী উপজেলায়  থাই পেয়ারা চাষ অন্য উপজেলার চেয়ে অনেক বেশি।

কৃষি কর্মকর্তা আরও জানান, পেয়ারা চাষে জৈব সার বেশি ব্যবহার  হয়। আর গাছে ফল আসা মাত্রই ব্যাগিং পদ্ধতি ব্যবহার করার কারণে রোগ বালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ দেখা না দেওয়ায় কীটনাশক  প্রয়োজন হয় না। এঅঞ্চলে উৎপাদিত থাই পেয়ারা বিষ মুক্ত হওয়ায় এর পুষ্টি গুণ পুরো পাওয়া যায়। এই জন্য অন্য ফলের চেয়ে থাই পেয়ারার চাহিদা বেশি। জানা গেছে এখন স্থানীয় বাজারে  প্রতি কেজি থাই পেয়ারা বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকা থেকে ১২০ টাকায়।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দুশ্চিন্তায় এমপি-মন্ত্রীরা তৃণমূলে নির্বাচনী প্রস্তুতি

মাহফুজ সাদি : আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি পর্ব চলছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে। অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে একক ও ‘জনপ্রিয়’ প্রার্থী নিশ্চিত এবং তৃণমূলকে ঐক্যবদ্ধ করতে চায় দলটি। এর অংশ হিসেবে আগামী ২০ মে জেলা নেতাদের সাথে বসছেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা। এর আগে দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিরোধপূর্ণ কিছু জেলার নেতাদের সাথে বৈঠক করেন। এদিকে দলীয় প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া শুরুর পর ‘জনবিচ্ছিন্ন’, ‘গডফাদার’ ও ‘বিতর্কিত’ এমপি-মন্ত্রীদের প্রতি দলীয় প্রধানের কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে। এতে মনোনয়ন নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন শতাধিক বিতর্কিত এমপি-মন্ত্রী। অন্যদিকে এই ঘোষণায় উজ্জীবিত হয়ে মনোনয়ন প্রত্যাশী তৃণমূল নেতারা নির্বাচনী প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। তারা নিজেদের জনপ্রিয়তা দেখানোর চেষ্টা করছেন।

আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ নিবে এবং নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ হবে। এজন্য তৃণমূলে ‘জনপ্রিয়’ ও ‘ক্লিন ইমেজের’ একক প্রার্থী চুড়ান্ত করতে চায় আওয়ামী লীগ, যাতে ভোটের লড়াইয়ে জয় নিয়ে ঘরে ফেরা যায়। এর অংশ হিসেবেই গত ৭ মে সংসদীয় দলের বৈঠকে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘জনবিচ্ছিন্ন’, ‘গডফাদার’ ও ‘বিতর্কিত’ এমপি-মন্ত্রীদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি বার্তা দিয়েছেন। ইতোমধ্যে অভিযুক্তদের তালিকা তৈরির কাজও শুরু হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে ওয়ার্ড থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এরপর  সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর অনির্ধারিত আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন, যেসব এমপির এলাকায় গ্রহণযোগ্যতা নেই, জনপ্রিয়তা নেই, যারা তৃণমূল নেতাকর্মীদের দ্বিধা-বিভক্ত করেছেন, ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে এলাকার জনগণের অভিযোগ রয়েছে তারা মনোনয়ন পাবেন না। এ সময় অন্যান্য মন্ত্রীও তার সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মন্ত্রীদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক। বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে অংশ নেবে। চারদিক দিয়ে হিসাব-নিকাশ করে এই নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হবে। মন্ত্রী ও এমপিদের উদ্দেশ্যে তিনি আরও বলেন, দলকে তৃণমূল পর্যায়ে আরও সুসংগঠিত করে তুলতে হবে। কোনো কোনো জায়গায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে এমপি-মন্ত্রীদের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। এ দূরত্ব দ্রুত ঘোঁচাতে হবে। তা না হলে আপনারা (এমপি-মন্ত্রী) ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা বর্তমানে এমপি আছেন, তারা নিশ্চিত মনোনয়ন পাবেন- এমন ধারণা নিয়ে থাকলে ভুল করবেন। কারণ আগামী নির্বাচন ২০১৪ সালের মতো হবে না। যারা এলাকার জনগণের জন্য কাজ করেছেন জনগণের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছেন তাদেরই মনোনয়ন দেয়া হবে। আলোচনাকালে প্রধানমন্ত্রী জরিপের কথাও উল্লেখ করেছেন। জানা গেছে, বিতর্কিত এমপি-মন্ত্রীদের নিয়ে দলীয় প্রধানের কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণের পর থেকে তৃণমূলে চলছে নির্বচনী প্রস্তুতি। দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী অনেক নেতা নিজেদের ‘জনপ্রিয়তা’ দেখাতে মাঠে নেমেছেন। জেলা পর্যায়ের অন্তত তিন নেতা বলেন, তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রাধান্য দিয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্য সময়োপযোগী ও সঠিক সিদ্ধান্ত। কারণ নেতাকর্মীদের সাথে সময় দেওয়া তো দূরে থাক, অনেক সংসদ সদস্য আছেন ঢাকা ছেড়ে এলাকায় আসেননি গত তিন বছর। দলের নেতাকর্মীদের জেলে বন্দি হওয়ার পেছনেও অনেক এমপির ষড়যন্ত্র আছে। অন্তত ৩০টি জেলায় পাওয়া যাবে এমন নজির। বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য জানিয়েছেন, এমপি হিসেবে তৃণমূলে জনপ্রিয় হওয়া খুবই কঠিন। কারণ এমপিদের কাছে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের চাওয়া-পাওয়ার কোনো সীমা নেই। কিন্তু আমাদের ক্ষমতা অসীম নয়, তাই সব চাওয়া পূরণ করা সম্ভব হয় না। সংসদ সদস্যদের জনপ্রিয় হওয়া অনেক কঠিন। মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে তৃণমূলের কাছে জনপ্রিয়তাই যদি একমাত্র মানদণ্ড হয়, তাহলে একজন এমপিও খুঁজে পাওয়া যাবে না যিনি জনপ্রিয়। ওইসব এমপিরা আরো বলেন, তৃণমূলের নেতাদের কাছে শতভাগ জনপ্রিয় হওয়া কষ্টসাধ্য। তাদের অনেক চাওয়া-পাওয়া থাকে। তা পূর্ণ করতে না পারলে সৎ থেকেও তৃণমূলে জনপ্রিয়তা পাওয়া যায় না।

২০ মে মুখ খুলতে পারে জেলা নেতারা: আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে আগামী ২০ মে সকাল সাড়ে ১০টায় দলের জেলা নেতাদের সাথে বৈঠকে বসছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে তার সরকারি বাসভবন গণভবনে এই মতবিনিময় সভার অনুষ্ঠিত হবে। এই বৈঠকে দলীয় এমপি-মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে পারেন তৃণমূলের নেতারা। একাধিক জেলা নেতার সাথে কথা বলে এমন ইঙ্গিত মিলেছে। এই বৈঠক তৃণমূলে অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে ঐক্যবদ্ধ করতে এবং একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন নেতারা। জানা গেছে, এই সভায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণের চূড়ান্ত নির্দেশনা দেবেন দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এ সভায় নতুন সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রমের উদ্বোধন করার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হবে। এ লক্ষ্যে দলের সদস্যপদ নবায়নের পাশাপাশি নতুন সদস্য সংগ্রহ অভিযান চলবে। প্রতিটি সাংগঠনিক জেলায় একটি করে ল্যাপটপ দেওয়া হবে। এই ল্যাপটপ নিয়েই সদস্য সংগ্রহ শুরু করবেন তৃণমূল নেতারা। সদস্য সংগ্রহ অভিযান কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন দলের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আবদুর রহমান। তাদের সহযোগিতা করবেন আট সাংগঠনিক সম্পাদক। আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সংসদীয় দলের সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমপিদের কী করলে মনোনয়ন পাবে আর কী করলে মনোনয়ন পাবে না, সেই প্রসঙ্গে কিছু বার্তা দিয়েছেন। শীর্ষ পর্যায় থেকে সতর্কতা অনেকের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে কাজ দেখিয়ে তাদের অবস্থান সুসংহত করার সময় এখনও আছে। আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, সংসদীয় দলের সভায় এমপিদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিষ্কার জানিয়েছেন, আগামী নির্বাচনে যার যার কর্মফল মনোনয়নের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে। এতে তার কিছু করার নেই। যে জনপ্রিয় সে মনোনয়ন পাবে।

দলীয় সভাপতির বক্তব্য অনেকের ভেতরে দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে। তবে এটাও সত্যি যে, ভালো কাজ করে থাকলে চিন্তামুক্ত হওয়ার সুযোগ আছে। আওয়ামী লীগের রাজনীতি মানুষের জন্য, তাই মানুষের সংস্পর্শে যেসব এমপি আছেন তারাই আবারও মনোনয়ন পাবেন। সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, বর্ধিত সভার মাধ্যমে সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের বিবরণ জনগণের সামনে তুলে ধরার জন্য তৃণমূল নেতাদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হবে। সেই সঙ্গে সরকারের গত আট বছরের উন্নয়নমূলক কাজের এবং আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসী তৎপরতার ভিডিওচিত্র দেওয়া হবে। উপ-দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ূয়া বলেছেন, বিশেষ বর্ধিত সভার পর ২১ মে সকাল সাড়ে ১০টায় ধানমন্ডির প্রিয়াংকা কমিউনিটি সেন্টারে তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, দপ্তর সম্পাদক, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, উপ-দপ্তর সম্পাদক এবং উপ-প্রচার সম্পাদকদের বৈঠক হবে। বৈঠকে ওবায়দুল কাদেরসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত থাকবেন।

 

 

খরচ কম লাভ বেশি রাণীনগরে পাতি চাষে ঝুঁকছে চাষি

এস এম সাইফুল ইসলাম, রাণীনগর (নওগাঁ) : নওগাঁর রাণীনগরে চলতি রবিশস্য মৌসুমে ধান, গমের পাশাপাশি পাতি চাষে ঝুকছে চাষি। খরচ কম লাভ বেশি হওয়ায় ইরি-বোরো ধান চাষের আগ্রহ কিছুটা কমিয়ে বনপাতি ও জলপাতি চাষে দিকে কৃষকদের মনোযোগ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। একসময় এই জনপদে পাতি চাষ তেমন না হলেও পাতি দিয়ে তৈরি পরিবেশ বান্ধব মাদুরের প্রধান উপকরণ হিসেবে কদর বেশি থাকায় চলতি মৌসুমে অন্যান্য ফসলের সাথে রেকর্ড পরিমাণ পাতি চাষ করেছে এই উপজেলার কৃষকরা। ইতিমধ্যেই মাঠ পর্যায়ে পাতি ভালো হওয়ায় কৃষকরা কাটা শুকানো শুরু করাই ভালো দামে বাজারে পুরোদমে বিক্রয় হচ্ছে। সরকার পর্যায় থেকে কৃষকদের মাঝে বিভিন্ন ফসল চাষের জন্য কৃষি উপকরণ, বীজ, রাসায়নিক সার বিনা মূল্যে বিতরণ করা হলেও পাতি চাষের জন্য প্রান্তিক কৃষকদের কোনো প্রকার সহযোগিতা প্রদান করা হয় না। চলতি রবিশস্য মৌসুমে কোনো প্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ হানা না দেওয়ায় পাতি চাষের পরিবেশ অনুকূলে থাকায় পাতির ভালো ফলনের সম্ভবনা রয়েছে। ইতিমধ্যেই মাঠ পর্যায়ে কৃষকরা নিজ নিজ জমিতে প্রথম কাটা শেষ করেছে। এই ফসলটি একই জমি প্রায় তিন বার কাটা যায়। গ্রামীণ জনপদের কৃষকরা এই পাতি বৈশাখ শুরু থেকে মাস অবদি কাটা শুকানোর কাজ চলতে থাকে। মাদুর তৈরির উপযোগী করতে ভালো রোদ থাকলে প্রায় দুই দিন সময় লাগে তা শুকাতে। এরপর কিছু কৃষক সাংসারিক প্রয়োজনে বাজার জাত করলেও বেশি লাভের আশায় অধিকাংশ কৃষক গুদাম জাত করে রাখে। দাম বেশি হলে সুযোগ বুঝে তারা অবসর সময়ে পরিবারে সবাই মিলে মাদুর তৈরি করে বেশি দামে বাজারে বিক্রয় করে।

জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে প্রায় ১শ’ ২০ হেক্টর জমিতে বনপাতি ও জলপাতি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও চলতি বছরে উপজেলায় লক্ষ্য মাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে পাতির আবাদ হয়েছে। শুরুতেই ভাল আবহাওয়া অনুকূলে থাকা এবং পাতির ক্ষেতে রোগ-বালাই না থাকায় ও মাঠ পর্যায়ে পাতি চাষিদের উপ-সহকারী কৃষি অফিসাররা যথা সময়ে উপযুক্ত পরামর্শ নজরদারি ও প্রত্যক্ষ কারিগরি সহযোগিতার কারণে পাতি ক্ষেত অনেকটা ভালো হয়েছে। তবে মিরাট, গোনা, কাশিমপুর, রাণীনগর সদর, কালীগ্রাম ও পারইল ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি পাতি চাষ হয়েছে। পাতি কাটার মৌসুমে রোদ ভালো থাকলে মানসম্পূর্ণভাবে শুকাতে পারলে প্রতি বিঘা জমিতে প্রায় ৬০ হাজার টাকার পাতি বিক্রয় হবে। এতে পাতি চাষ করে অল্প খরচে লাভ বেশি হওয়ায় প্রান্তিক চাষিরা দিন দিন পাতি চাষের দিকে ঝুকছে।

উপজেলা কৃষি অফিসার এস এম গোলাম সারওয়ার জানান, উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের মধ্যে ৪/৫টি ইউনিয়নে বিগত বছরের তুলনায় লক্ষ্য মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণ পাতি চাষ হয়েছে। কুটির শিল্পের মাদুর তৈরির প্রধান উপকরণ পাতি। আর বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা থাকায় লাভ বেশি হওয়ার কারণে ধীরে ধীরে কৃষকরা অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি পাতি চাষে ঝুকছে।

ভিশন-২০৩০ তুলে ধরতে নানা পদক্ষেপ নেবে বিএনপি

রাজকুমার নন্দী : বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেলে কিভাবে দেশ পরিচালনা করবে, তার একটি রূপরেখা দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ইতোমধ্যে জাতির সামনে তুলে ধরেছেন, যেটা ভিশন-২০৩০ নামে পরিচিত। এই রূপকল্প জনগণের কাছে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরতে সভা-সেমিনার ও আলোচনাসহ নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে দলটি। এ লক্ষ্যে একাধিক ওয়ার্কিং গ্রুপও তৈরি করবে বিএনপি। এছাড়া বিষয়ভিত্তিক মতামত গ্রহণ করে তা দলের সর্বোচ্চ ফোরামে পর্যালোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করবে দলটি।

এদিকে, বিএনপির ‘ভিশন-২০৩০’ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গণে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। বিএনপির পক্ষ থেকে এই রূপকল্পকে অত্যন্ত সময়োপযোগী উল্লেখ করে বলা হচ্ছে, এটি অর্জন কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ওই রূপকল্পকে ‘ফাঁকা প্রতিশ্রুতির ফাপানো রঙিন বেলুন’ হিসেবে আখ্যায়িত করলেও ভিশন উপস্থাপন করাকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন বিশিষ্টজনেরা।

জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা এই ভিশন জনগণের কাছে তুলে ধরবো বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও আলোচনার মাধ্যমে। এ জন্য দেশের বিভিন্ন জেলায় জেলায় আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে। এ লক্ষ্যে একাধিক ওয়ার্কিং গ্রুপও তৈরা করা হবে। এরপর বিষয়ভিত্তিক মতামত গ্রহণ করে তা দলের সর্বোচ্চ ফোরামে পর্যালোচনা করা হবে। দেশের অর্থনীতির জন্য অর্থনীতিবিদদের, গণমাধ্যমের জন্য সিনিয়র মিডিয়া ব্যক্তিদের, তথ্য-প্রযুক্তির জন্য বিশিষ্ট তথ্য প্রযুক্তিবিদ এবং শিক্ষার জন্য শিক্ষবিদদের কাছ থেকে মতামত নেয়া হবে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ শনিবার ঢাকায় শিক্ষা বিষয়ক দিনব্যাপী সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। জানা গেছে, রাজধানীর লেডিস ক্লাবে দুই অধিবেশনে এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। বিকেলে সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি থাকবেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

বিএনপির ওই রূপকল্পকে ‘ফাঁকা প্রতিশ্রুতির ফাপানো রঙিন বেলুন’ হিসেবে আখ্যায়িত করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, এই বেলুন অচিরেই চুপসে যাবে। এটা জাতির সাথে একটি তামাশা ও প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে দলের জন্য লক্ষ্য ঠিক করে খালেদা জিয়ার ‘ভিশন-২০৩০’ উপস্থাপনকে দেশের জন্য ইতিবাচক বলে মনে করছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বিএনপির ভিশন-২০৩০ ‘পুরোটাই উদ্ভাবনের ফসল’ বলে দাবি করে মির্জা ফখরুল বলেন, এটা অত্যন্ত সময়োপযোগী।

বিএনপির রূপকল্প প্রসঙ্গে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, খালেদা জিয়া ঘোড়ার আগে গাড়ি ‍জুড়ে দিয়েছেন। কারণ, তার কথাগুলো হয়েছে খাপছাড়া, কোনো রোডম্যাপ নেই। তার এই বক্তব্য মোটেই সময়োপযোগী হয়নি। বিএনপির চেয়ারপারসনের উচিত ছিল, বিএনপি বর্তমান ব্যবস্থায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কিনা- তা নিশ্চিত করা। তবে খালেদা জিয়ার প্রতিশ্রুতিতে অবৈতনিক শিক্ষা, বেকার সমস্যার সমাধান, মাথাপিছু আয় বাড়ানোসহ কিছু ভালো বিষয়ও দেখছেন জাতীয় পার্টির এই নেতা।

খালেদা জিয়ার ভিশন ২০৩০-কে ‘ফাঁকা বুলি’ ও ‘অর্থহীন’ বলে মন্তব্য করেছেন তথ্যমন্ত্রী ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু। তিনি বলেন, উনি (খালেদা জিয়া) ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা বলেছেন। এটা গণতান্ত্রিক চল কথা কিন্তু ক্ষমতার ভারসাম্যের ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা ও প্রস্তাব দেননি, এটা দেওয়া উচিত ছিল।

ভিশন-২০৩০ সম্পর্কে ২০ দলীয় জোট শরিক জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সভাপতি শফিউল আলম প্রধান বলেন, ভিশন-২০৩০ ঘোষণা করে বেগম খালেদা জিয়া পরিবর্তিত সমাজের যে চাহিদা, বিশেষ করে নাগরিকদের যে চাহিদা সেটার প্রতি সাড়া দিয়েছেন। কারণ, আজকের নাগরিক জানতে ও বুঝতে চায়, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দেশবাসীর জন্য কী কী করবেন? নাগরিকদের এই আকাক্সক্ষার পক্ষে উনি যে সাড়া দিয়েছেন, এটাই হচ্ছে রাজনীতিতে গুণগত অর্জন-যা আমি পজিটিভলি নিচ্ছি।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রেসিডিয়াম সদস্য হায়দার আকবর খান রনো বলেন, বড় দুটো দল (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি) দুটো ভিশন হাজির করেছে, দুটোই ধাপ্পা। তারা মানুষকে চটকদারি কথার দ্বারা একটা ভিশন হাজির করছে। এই ভিশনের মধ্যে গরিব মানুষের কোনো কথা নেই।

বিএনপির ভিশন-২০৩০ উপস্থাপনকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন দলটির রাজনীতির পরামর্শক ও সমালোচক গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি বলেন, এটি একটি ভাল দলিল, তবে অসম্পূর্ণ। এটি আরও স্বচ্ছ হওয়া উচিত ছিল। এখানে সুশাসনের কথা বলা হয়েছে। তবে ঢাকা শহরে বসে কখনো সুশাসন হবে না। সে বিষয়ে তিনি (খালেদা জিয়া) কোনো ধারণা দেন নাই। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি আন্দোলন করলেও সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। দেশে আইন-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবেন। কিন্তু র‍্যাবকে বিলুপ্ত করবেন কিনা, সেটা বলেননি। একইসঙ্গে ক্ষমতায় গেলে এই ধরণের কোনো বাহিনীও যে আর গঠন করা হবে না, সে বিষয়েও কোনো বক্তব্য নেই।

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, এই ভিশনে ভালো কথা রয়েছে। কিন্তু এসব বাস্তবায়ন করবে কে? এর জন্য কি দল প্রস্তুত আছে?

খালেদা জিয়া ঘোষিত ‘ভিশন-২০৩০’ কে যুগান্তকারী দলিল হিসেবে আখ্যায়িত করে বাংলাদেশ ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গাণি ও এনপিপির চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বলেন, এই দলিল বাস্তবায়নে জনমত তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত করতে হবে জাতীয় ঐক্য।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে মহানন্দা নদীতীর ময়লা আবর্জনার ভাগাড়

ইমতিয়ার ফেরদৌস সুইট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ : চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহানন্দা নদীতীর ময়লা আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত করেছে পৌর কর্তৃপক্ষ। ময়লার দুর্গন্ধে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে নদীতীরবর্তী এলাকায় বসবাসরত মানুষের জীবন। বৃষ্টির পানিতে এসব ময়লা-আবর্জনা নদীর পানিতে মেশায় মহানন্দার স্বচ্ছ পানি দূষিত হয়ে পড়েছে। ফলে ধীরে ধীরে মারাত্মক দূষণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে মহানন্দা নদী।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত চার বছর ধরে জেলা শহরের খালঘাট এলাকায় মহানন্দা নদীর তীরে শহরের যাবতীয় ময়লা-আবর্জনা ডাম্পিং করছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা। প্রথমে এলাকাবাসী বাধা দিলেও তাতে কর্ণপাত করেনি কর্তৃপক্ষ। বছরের পর বছর ধরে ময়লা-আবর্জনা ফেলায় মহানন্দার তীর এখন যেন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এতে করে ওই এলাকায় নদীতীরে দুর্গন্ধ ও নোংরা পরিবেশের সৃষ্টি হওয়ায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নদী তীরবর্তী এলাকায় বসবাসরত এলাকাবাসীসহ নৌ-পথের যাত্রীদের। এসব ময়লা-আবর্জনা থেকে জন্ম নিচ্ছে মশা ও মাছি। বৃষ্টির পানিতে এসব ময়লা-আবর্জনা নদীর পানিতে মেশায় নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, জেলা শহরের নয়াগোলায় পৌরসভার নিজস্ব ভাগাড় থাকলেও কয়েক বছর ধরে তা ব্যবহার করা হচ্ছে না। নদীতীর দখলের জন্য স্থানীয় প্রভাবশালী এক জনপ্রতিনিধির নির্দেশে চার বছর ধরে পৌর এলাকার সমস্ত ময়লা আবর্জনা ফেলা হচ্ছে খালঘাটে মহানন্দা নদীর তীরে। অথচ এই ভাগাড়ের পাশেই রয়েছে জনবসতি। প্রতিদিন খালঘাট, হুজরাপুর, রেলস্টেশন বস্তিসহ আশপাশের কয়েকশ’ নারী-পুরুষ গোসল করেন এখানে। এছাড়া এই খেয়াঘাটে নৌকায় করে প্রতিদিন ২/৩ হাজার মানুষ নদী পারাপার হয়ে থাকেন। কিন্তু পৌরসভার ফেলা ময়লা-আবর্জনার গন্ধে এখানে ৫ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকাই এখন কষ্টকর বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার বিভাগের কর্মকর্তা জহির উদ্দিন জানান, চার বছর আগেও নয়াগোলায় পৌরসভার নিজস্ব ভাগাড়ে এসব ময়লা ফেলা হতো। কিন্তু পরে তা খালঘাটে মহানন্দা নদীর তীরে সরিয়ে নেয়া হয়। ময়লা আবর্জনার কারণে নদী দূষণের কথা তিনি স্বীকার করলেও বিষয়টি নিয়ে তিনি মেয়রের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।

মঙ্গলবার সকালে সরেজমিন ওই এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পৌরসভার ৩/৪টি ট্রাকে করে এখানে ময়লা ফেলা হচ্ছে। পৌরসভার এক কর্মী জানান, প্রতিদিন ৮-১০ ট্রাক ময়লা ফেলা হয় এখানে। এরই মধ্যে ময়লার স্তূপ ফেলে বেশ কিছু এলাকা ভরাট করে ফেলা হয়েছে। এলাকাবাসীর ধারণা যে কোন সময় ভরাট করা এই জায়গা দখল করে নিতে পারে প্রভাবশালীরা।
নৌকার যাত্রী তরিকুল ইসলাম বলেন, নৌকা পেতে দেরি হলে খালঘাটের বটগাছের নিচে খানিকটা বিশ্রাম নিতাম। কিন্তু এখন ময়লা-আবর্জনা ফেলায় দুর্গন্ধে এখানে দাঁড়ানোই যায় না।

সদর উপজেলার যাদুপুর গ্রামের শাহজাহান আলী বলেন, খালঘাট দিয়ে নৌকায় করে প্রতিদিন শিক্ষার্থী, চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার কয়েক হাজার মানুষ চলাফেরা করেন। গত চার বছর ধরে এই এলাকার মানুষজনকে দুর্গন্ধ সইতে হচ্ছে। তিনি বলেন, নদীতীরের ময়লা-আবর্জনা থেকে বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় পথচারীদের নাকে রুমাল দিয়ে চলতে হয়। বিশেষ করে নৌকার যাত্রীরা খুবই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে জানান তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে খালঘাটের একাধিক অধিবাসী জানান, একটি জনবসতি এলাকায় পৌর কর্তৃপক্ষ কিভাবে ময়লার ভাগাড়ে পরিণত করতে পারে এটা তারা বুঝছেন না। প্রথম প্রথম বাধা দিলেও প্রভাবশালীদের হুমকি ধমকিতে এক সময় চুপ হয়ে যান এলাকার মানুষ। ময়লার দুর্গন্ধে এখন এখানে বসবাস করায় তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান তারা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের পরিশেবাদী সংগঠন সেভ দ্য ন্যাচারের সমন্বয়ক রবিউল হাসান ডলার জানান, নদীতীরে আবর্জনা ফেলায় দূষিত হচ্ছে পানি। এখনই এসব কর্মকান্ড বন্ধ না হলে মহানন্দাকে বাঁচানো যাবে না বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।
এ ব্যাপারে পৌরসভার ২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর জিয়াউর রহমান আরমান জানান, জনবসতি ওই এলাকায় যেন ময়লা ফেলা বন্ধ করা হয়, সেজন্য তিনি পৌর মেয়রের সাথে কথা বলবেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নজরুল ইসলাম কারাঅন্তরীণ থাকায় এ ব্যাপারে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

 

মন্ত্রিসভায় রদবদলের আভাস

মাহফুজ সাদি: আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রস্তুতির পাশাপাশি মন্ত্রিসভায় রদবদলের গুঞ্জন চলছে। সম্প্রতি দলের একাধিক বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হওয়ার পর  সোমবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তেমন আভাসই দেন। এরপর দলের অভ্যন্তরে এ নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয়েছে।
 
এদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নয়া কৌশল নিয়েছে আওয়ামী লীগ। কৌশলগুলোর মধ্যে রয়েছে- মুখ দেখে নয়, জরিপের মাধ্যমে দলীয় প্রার্থী বাছাই করে মনোনয় দেয়া, দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করা, মন্ত্রিসভায় রদবল করে সরকারের ক্লিন ইমেজ বৃদ্ধি করা, সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড আসনভিত্তিক এমপিদের মাধ্যমে প্রচার করা এবং ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) পক্ষে জনমত গড়ে তোলা। আওয়ামী লীগ নেতারা এসব তথ্য জানিয়েছেন।

মন্ত্রিসভায় রদবদলের গুঞ্জন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠক থেকে বের হলে কাদেরের কাছে সাংবাদিকরা জানতে চান- জাতীয় পার্টি মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে গেলে নতুন মুখ দেখা যাবে কিনা? জবাবে তিনি বলেন, কেবিনেটের রিশাফল তো হয়ই, একটা হবে, অনেক দিন তো হয়ে গেছে। সেখানে কারা থাকবেন কারা থাকবেন না সেটা তো একান্তভাবে প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার, এটা আমরা কেউ জানি না। শিগগিরই তা হচ্ছে কি না- তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আই ডোন্ট নো এগজাক্টলি, আমি জানি না। যখন হবে- চাঁদ উঠলে সবাই দেখবে। জাতীয় পার্টির সরকার ছাড়ার সম্ভাবনার বিষয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, এটা তাদের ব্যাপার, তারা সরকার থেকে যাবে কি যাবে না। তবে আমার মনে হয় না, খুব তাড়াতাড়ি তারা সরকার থেকে চলে যাচ্ছে। এরশাদের এই জোটকে ‘সংখ্যাতত্ত্বের চমক’ হিসেবে বর্ণনা করে এর রেশ কাটতে অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন ওবায়দুল কাদের। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ‘ঐকমত্যের সরকারে’র এই মন্ত্রিসভায় এইচ এম এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি থেকে এক মন্ত্রী ও দুই প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর গঠিত বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভায় প্রথম ও সর্বশেষ রদবদল করা হয়েছিল গত বছরের জুলাইতে।

জরিপ দেখে মনোনয়ন: আগামী নির্বাচনে কারও মুখ দেখে নয়, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার চালানো জরিপ দেখে দলীয় প্রার্থী বাছাই করে জনপ্রীয়দের মনোনয়ন দেয়া হবে। রোববার দলের সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এমপিদের এই সতর্ক বার্তা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। আগামী নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ে শেখ হাসিনার জরিপ চালানোর কথা এর আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও জানিয়েছিলেন।  বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক সংসদ সদস্য জানান, প্রধানমন্ত্রী ছয় মাস পর পর জরিপের কথা বলেছেন। এই জরিপে যারা ভালো করবেন, আগামী নির্বাচনে তাদের মনোনয়ন দেওয়ার কথা বলেছেন নেত্রী। অন্য একজন এমপি বলেন, নেত্রী বলেছেন, জরিপে যাদের নাম আসবে, তাদেরকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে। তবে তিনি একইসঙ্গে বলেছেন, জরিপে যাদের অবস্থা এখন খারাপ, তাদের কয়েকজনকে ইতোমধ্যেই জানিয়ে দেয়া হয়েছে, তাদের ওভারকাম করার সুযোগ এখনও আছে।

তৃণমূলে ঐক্যের নির্দেশ: সরকারের মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের এমপিদের সাথে স্থানীয় নেতাদের দ্বন্দ্বে তৃণমূলে অভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দল চরম আকার ধারণ করেছে। এর ফলে নিজেরাই রক্তাক্ত সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে প্রায়শই। এই সংঘাতের নেপথ্যে রয়েছেন মূলত দলীয় মনোনয় প্রত্যাশীরা এবং প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা। সম্প্রতি কোন্দলপূর্ণ বেশ কিছু জেলা চিহ্নিত করে সেখানকার নেতাদের ঢাকায় ডেকে দ্বন্দ্ব মেটানোর টেষ্টা করেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। কিন্তু সে চেষ্টা আশানুরূপ ফল দেয়নি। পরে বিষয়টি দলীয় প্রধানকে অবহিত করা হয়। এর প্রেক্ষিতে রোববারের বৈঠকে দলীয় সংসদ সদস্যদের তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে আনার নির্দেশ দেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। সময় হাতে খুব একটা নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। এক সংসদ সদস্য বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে বলেছেন। সংসদীয় দলের বৈঠকে শেখ হাসিনা তৃণমূল পর্যায়ে দলকে সক্রিয় করতে সংসদ সদস্যদের ইউনিয়ন পর্যায়ে বৈঠক করতেও বলেছেন।

সামাজিক মাধ্যমে প্রচারের তাগিদ: আগামী সংসদ নির্বাচন প্রতিদ্বদ্বিতামূলক হবে উল্লেখ করে রোববারের বৈঠকে সরকারের উন্নয়ন চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুলে ধরতে দলীয় সংসদ সদস্যদের বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক সংসদ সদস্য বলেন, সরকারের সময়ে মাধ্যমিক স্তরে কত পুস্তক বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে, কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে, মাথাপিছু আয়, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, শিক্ষা উপবৃত্তি কত টাকা দেওয়া হয়েছে; তা সবার কাছে জানতে চান তিনি (শেখ হাসিনা)। তিনি জানান, অধিকাংশই সঠিক উত্তর না দিয়ে ইতস্তত করায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা নিজের সরকারের উন্নয়নের চিত্রই ঠিকমতো বলতে পারে না, তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কী তথ্য দেবে? একই দিন এর আগে প্রধানমন্ত্রীপুত্র ও তথ্য প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা’ শীর্ষক দলীয় এমপিদের এক কর্মশালায় সরকারের অর্জনগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার চালাতে দলের সবার প্রতি আহ্বান জানান। জয় বলেন, পারলে রোজ একটা করে পোস্ট দেবেন। দিনে দুই তিনটা করেও দিতে পারেন। আমরা যেগুলো পোস্ট দেব, সেগুলো শেয়ার করেন। এগুলা কিন্তু ভাইরাল হয়ে যায়। তিনি বলেন, আমাদের একটা ধারণা ছিল, কাজ করলেই মানুষ ভোট দিবে। কিন্তু বাস্তব কথা হচ্ছে, আজকাল হচ্ছে প্রচারের যুগ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার নিয়ে আওয়ামী লীগের ৫০ জন সংসদ সদস্যেকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এই কর্মশালায়। আগামী ৮ ও ৯ মে আরও ১০০ জন সাংসদকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের রোববারের বৈঠকে স্বতন্ত্র হয়ে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে ১১ জন যোগ দেন। শুরুতেই তাদের পরিচয় করিয়ে দেন শেখ হাসিনা।

ইভিএমে ভোটের পক্ষে অবস্থান: ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) পক্ষের পক্ষে অবস্থান নিয়ে জনমত গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে আওয়ামী লীগ। রোববার ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অফিসে এক অনির্ধারিত আলোচনায় ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে অবস্থানের কথা জানান প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। এর আগে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাসহ দল সরকারের শীর্ষপর্যায় থেকে বলা হয়েছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ই-ভোটিং চালু করতে চায় সরকার। অন্যদিকে শুরু থেকেই ইভিএম চালুর বিরোধী করে আসছে বিএনপি। স্বয়ংক্রিয় এই ব্যবস্থা চালু করলে এর বিরুদ্ধে আন্দোলনে যাওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে দলটির।

 

দেড় বছরের মধ্যে নিশ্চিহ্ন হবে নব্য জেএমবি

রুদ্র রাসেল : দেশে আরও জঙ্গি আস্তানা আছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তথ্য রয়েছে। তবে জঙ্গিরা মাথাচাড়া দিয়ে কোন অঘটন ঘটানোর ক্ষমতা হারিয়েছে বলে মনে করছেন তারা। জঙ্গিরা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করলেই ধরা পড়বে, এমনভাবেই বিছানো রয়েছে গোয়েন্দা জাল। তবে আগামী দেড় বছরের মধ্যে দেশ থেকে নব্য জেএমবিকে নির্মূল করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেছেন, ‘দেশে আরও জঙ্গি আস্তানা আছে। আমরা যখনই খবর পাচ্ছি, তখনই অভিযান চালাচ্ছি। আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অভিযান চলবে। আগামী দেড় বছরের মধ্যে নব্য জেএমবির কেউ থাকবে না। তবে অন্য কোনও নামে আসলেও আসতে পারে।’

মনিরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘হলি আর্টিজান হামলার ঘটনায় এখনও কেউ কেউ অধরা রয়েছে। তবে সংখ্যা দিয়ে তা নিরূপণ করা যাবে না। আমাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য আছে। এই হামলায় কার কী রোল ছিল, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ পর্যায়ে। আশা করছি, এ বছরের মধ্যে তদন্ত সমাপ্ত করতে পারব।’ ঢাকায় এনে অমিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে : কাউন্টার টেররিজম ইউনিট সূত্র জানায়, মনিরুল ইসলাম জানান, গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার ঘটনায় কুমিল্লার জঙ্গি আস্তানা থেকে গ্রেফতার নব্য জেএমবির সদস্য আহমেদ ইমতিয়াজ তালুকদার অমিকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে সিটিটিসি ইউনিট। সিটিটিসি কর্মকর্তারা বলেন, ‘কুমিল্লার চান্দিনায় পুলিশের ওপর হামলকারী দুই জঙ্গির একজন অমি। তার সঙ্গে জঙ্গি নেতা তামিম চৌধুরীর যোগাযোগ ছিল। অমি বর্তমানে চট্টগ্রামে একটি মামলায় রিমান্ডে রয়েছে। আমরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করব। সে হামলায় সরাসরি জড়িত না থাকলেও ঘটনার সম্পর্কে জানতে পারে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই কার কী রোল, তা জানা যাবে। তাকে ঢাকায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

আমাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য আছে।’
তাহমিদ ফ্রি : হলি আর্টিজান হামলার পর আলোচনায় আসা তাহমিদ প্রসঙ্গে সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম জানান, ‘গুলশান হামলার ঘটনায় ৫৪ ধারায় গ্রেফতার ও পরবর্তী সময়ে আদালত থেকে অব্যাহতি পাওয়া তাহমিদ হাসিব খান এখন ফ্রি। সে বিদেশেও যেতে পারবে।’ সূত্র মতে, গত বছরের ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জে অভিযান তামিম চৌধুরীসহ তিনজন নিহত হয়। ওই আস্তানা থেকে সাত দিন আগে অমি চলে যায়। অমি গুলশান হামলায় অংশ নেওয়া পাঁচ জঙ্গিকেও চিনত। নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা মাইনুল ইসলাম মুসার নেতৃত্বে নতুন হামলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল সে। গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অমি নিজেই এসব তথ্য জানিয়েছে।  গত বছরের ২৯ ফেব্র“য়ারি গুলশানের বাসা থেকে বের হয়ে যায় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল সানবীম-এর ‘এ’ লেভেল পড়ুয়া আহমেদ আজওয়াদ ইমতিয়াজ তালুকদার ওরফে অমি। ৭ মার্চ সকালে পুলিশ কুমিল্লার চান্দিনায় শ্যামলী পরিবহনের একটি বাস থামালে পুলিশের ওপর গ্রেনেড হামলার চেষ্টা করে দুই জঙ্গি। তাদের একজন আহমেদ আজওয়াদ ইমতিয়াজ ওরফে অমি, অন্য জন মাহমুদ হাছান। পরবর্তী সময়ে তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের একটি বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ গ্রেনেড উদ্ধার করে পুলিশ। সিটিটিসি সূত্র জানায়, গ্রেফতার অমি এক সেনা কর্মকর্তার ছেলে। একবছর ধরে অমিকে খোঁজা হচ্ছিল। সে বাসা থেকে কিভাবে পালিয়ে গেল এবং কিভাবে জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লো, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বিস্তারিত জানিয়েছে সে।

 

 

অনুকূল পরিবেশে নির্বাচনে যেতে চায় বিএনপি

রাজকুমার নন্দী : সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশের নিশ্চয়তা পেলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে সব দলের অংশগ্রহণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেতে চায় বিএনপি। একই সঙ্গে ভোট পরবর্তী ফলাফল ঘোষণাতেও কোনো ধরণের অনিয়ম হবে না- সেই নিশ্চয়তাও চায় দলটি। তবে বিরোধী দলে যেতে নয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্য নিয়েই সে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি। সম্প্রতি ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে জোটনেত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আগামী নির্বাচন নিয়ে নিজের এমন মনোভাব ব্যক্ত করেন। কিন্তু নির্বাচনে যাওয়ার ব্যাপারে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি বিএনপি। বিভিন্ন কর্মসূচিতে বিএনপির শীর্ষ নেতারা শর্তসাপেক্ষে আগামী নির্বাচনে দলের অংশগ্রহণ নিয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য দিচ্ছেন। তাদের সবার বক্তব্যে সারা দেশে এখন থেকেই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি, নেতাকর্মীদের মামলা প্রত্যাহার ও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারসহ অনুকূল পরিবেশের কথা উঠে আসছে।

আগামী নির্বাচন নিয়ে খালেদা জিয়া সম্প্রতি গুলশান কার্যালয়ে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের এক মতবিনিময় সভায় বলেন, আমরা অবশ্যই নির্বাচনে যাবো, নির্বাচনে যেতে চাই। তবে সেই নির্বাচন হতে হবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। কারণ, বর্তমান সরকারের অধীনে আমরা অনেক নির্বাচন দেখেছি। সেগুলো কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি এবং ভবিষ্যতেও হবে না। এদিকে, আগামী নির্বাচন বর্জন করলে নিবন্ধন বাতিলের ঝুঁকিকেও তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না বিএনপি। নিবন্ধন বাতিল হওয়ার ভয় না দেখিয়ে বিএনপিকে কিভাবে আগামী নির্বাচনে আনা যায়, সেই চেষ্টা করতে সরকারের প্রতি সম্প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

রাজনৈতিক মহলে প্রচার রয়েছে, একাদশ সংসদ নির্বাচন হবে নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ফের সরকার গঠন করবে। আর বিএনপি ওই নির্বাচনে অংশ নিলে ৭০-৮০টি সিট নিয়ে বিরোধী দলের আসনে বসবে। বিষয়টি সম্প্রতি গুলশান কার্যালয়ে ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নজরেও আনেন জোটের এক শীর্ষ নেতা। তখন ব্যাপারটি নিয়ে পাশে বসা দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন বেগম জিয়া। মাঠে এ ধরণের প্রচার রয়েছে বলে বিএনপি মহাসচিবও হ্যাঁ-সূচক জবাব দেন। এরপর ওই বৈঠকে একাদশ সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে খালেদা জিয়া বলেন, বিএনপি নির্বাচনে গেলে বিরোধী দলে থাকার জন্য নয়, সরকার গঠনের উদ্দেশ্যেই যাবে। অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট হলে বিপুল ব্যবধানে বিএনপিই বিজয়ী হবে। কারণ, জনগণ বিএনপির সঙ্গেই রয়েছে। তবে সে নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই হতে হবে। বৈঠক সূত্রে ওই তথ্য জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দৈনিক করতোয়াকে বলেন, বিএনপি কি ৭০-৮০ সিটের দল? এটি অপপ্রচার। দেশব্যাপী বিএনপির ঢল এ সময়। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল এখন বিএনপি। তিনি আরো বলেন, বিএনপি একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনাকারী একটি দল। সুতরাং আমরা অবশ্যই নির্বাচনে যেতে চাই। তবে এজন্য প্রয়োজন অনুকূল পরিবেশ। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হলে, মাঠে সমতা থাকলে এবং জনগণের নির্বিঘেœ ভোটাধিকার প্রয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হলে যেকোনো সময় নির্বাচনে যেতে প্রস্তুত বিএনপি। রিজভী বলেন, বিএনপি নির্বাচন ও আন্দোলন-দুটোর জন্যই প্রস্তুত। পরিস্থিতি যেটা ডিমান্ড করবে সে অনুযায়ী আমরা পদক্ষেপ নেব।

বিএনপির বড় একটি অংশই মনে করছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করা ঠিক হয়নি। প্রকাশ্যে না বললেও দলীয় বিভিন্ন ফোরামে তারা তাদের এমন মনোভাব তুলে ধরেছেন। তাই আগামীতে যাই ঘটুক না কেন, আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে একটি ইতিবাচক ফল আসার সম্ভাবনা দেখছেন তারা। তবে একাদশ সংসদ নির্বাচনে যাওয়ার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো না নিলেও যেকোনো পরিস্থিতিতে নির্বাচনে যাওয়ার প্রাক-প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে বিএনপি। এ লক্ষ্যে গোপনীয়তা রেখে ৩০০ আসনেই সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা তৈরি করছেন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এছাড়া বিএনপির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ‘ভিশন-২০৩০’ এর রূপরেখাও প্রায় চূড়ান্ত। দুই-একদিনের মধ্যে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডেকে কিছু সংযোজন-বিয়োজন করে তা চূড়ান্ত করা হবে। ক্ষমতায় গেলে কী কী করবেন, তার একটি দিক-নির্দেশনা থাকবে বেগম জিয়ার ভিশন-২০৩০-এ। এর আলোকেই দলের নির্বাচনী ইশতেহারও রচিত হচ্ছে। গত বছরের ১৯ মার্চ দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে খালেদা জিয়া ‘ভিশন-২০৩০’র কিছুটা ধারণা তুলে ধরেছিলেন। আগামী ১০ অথবা ১১ মে সংবাদ সম্মেলন করে জাতির সামনে তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরবেন বিএনপির চেয়ারপারসন।

এ প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমাদের জাতীয় কাউন্সিলে ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) বক্তব্যে ‘ভিশন ২০৩০’ এর রূপরেখা দেওয়া হয়েছিল, সেটা ছিল আউটলাইন। এখন পূর্ণাঙ্গ করে দেওয়া হবে। এটার সঙ্গে নির্বাচনী ইশতেহার বা নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের রূপরেখার কোনো সম্পর্ক নেই।

জানা গেছে, সুবিধাজনক সময়ে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের প্রস্তাবনাও তুলে ধরবেন বিএনপি চেয়ারপারসন। বিএনপির ওই প্রস্তাবনা ধরে ক্ষমতাসীনরা আলোচনার উদ্যোগ না নিলে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে রাজপথেও নামতে পারেন বেগম জিয়া। এ লক্ষ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিরসন করে তৃণমূলে সংগঠনকে চাঙ্গা ও নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের নেতৃত্বে দলের ৫১টি টিমকে সারা দেশে মাঠে নামিয়েছেন তিনি। ৭ মে সফর শেষে স্ব স্ব জেলার সার্বিক পরিস্থিতির ওপর তৈরিকৃত সাংগঠনিক প্রতিবেদন বিএনপি চেয়ারপারসনের কাছে পাঠানো হবে, যা আগামী দিনে আন্দোলন ও নির্বাচনে কাজে দেবে বলে মনে করছেন দলটির নেতারা। 

বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে চালের বাজারে

সামসউদ্দীন চৌধুরী কালাম, পঞ্চগড় : অতিবর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে হাওরাঞ্চলে ব্যাপকভাবে ফসলহানির পর এবার সারাদেশে শুরু হয়েছে ধানের গলা পচা বা ব্লাস্ট রোগ। হাজার হাজার হেক্টর জমির উঠতি বোরো ধান ক্ষেতেই নষ্ট হচ্ছে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে। এতে করে সারাদেশে লক্ষ্যমাত্রার এক-তৃতীয়াংশ ধান কম উৎপাদন হবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর প্রভাব পড়তে পারে চালের বাজারে। চলতি বোরো মৌসুমে পুরোদমে ধান কাটা মাড়াই শুরু হলেও প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে চালের দাম। ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিদেশ থেকে চাল আমদানি করা হলেও চালের বাজারে দাম স্থিতিশীল হচ্ছে না। চাল আমদানিতে শুল্ক কমানো হলেও চালের বাজারে খুব বেশি একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এমন অবস্থা চলতে থাকলে আগামী আমন ধান ওঠার আগ পর্যন্ত চালের দাম স্থিতিশীল না হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য মতে, চলতি বোরো মৌসুমে সারাদেশে ৪৮ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। আর এ সকল জমি থেকে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল এক কোটি ৯১ লাখ ৫৩ হাজার মেট্টিক টন। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে ধান আবাদ করা হলেও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার প্রচুর হেরফের হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, গত মাসের শুরুতে অতি বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে সাত জেলার হাওরাঞ্চলে পানি ঢুকে উঠতি বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যায়। এতে করে ওই সাত জেলা থেকেই প্রায় ১৮-২০ লাখ মেট্টিক টন ধান কম উৎপাদন হবে। গত মাসের শেষের দিকে রাজশাহী অঞ্চলের চলনবিলসহ নদীর তীরবর্তী নিচু এলাকার ধানও পানিতে তলিয়ে গিয়ে ব্যাপক ফসলহানি হয়। সেই সাথে সারাদেশে শুরু হয়েছে ধান গাছের গলা পচা বা ব্লাস্ট রোগ। ইতোমধ্যে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে কয়েক লাখ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে। বাকি ধান ক্ষেতও নষ্ট হওয়ার পথে। আবহাওয়া প্রতিকূলে থাকায় কোন প্রতিশেধকই কাজে আসছে না। অনেক কৃষক ক্ষেতের ধান গাছ কেটে সেগুলো গো-খাদ্য হিসেবে বিক্রি করে দিচ্ছেন।

কৃষিবিদরা বলছেন, দিনে প্রচন্ড গরম আর রাতে ঠান্ডা থাকায় ওষুধ প্রয়োগের পর সেইভাবে কাজ করছে না। উত্তরের অনেক জেলায় এখনও রাতে হালকা কুয়াশা ঝরছে। এছাড়া মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে বিচ্ছিন্নভাবে দেশব্যাপী বৃষ্টি আবার কোথাও কালবৈশাখী ঝড় হচ্ছে। অনেক জেলায় বৃষ্টি না হলেও আকাশ মেঘলা থাকছে। তাই এই রোগের প্রতিষেধক জমিতে ছিঁটানোর পর খুবই কম কাজ করছে। অন্যান্য জাতের ধানে ক্ষতি কিছুটা কম হলেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৮ ধান। বাজারে বেশি দাম হওয়ায় অনেক কৃষক এবারও এই জাতের ধান চাষ করেছে। বিক্রি ছাড়াও সারাবছর নিজের খাওয়ার জন্য কৃষকরা এই জাতের ধান চাষ করে আসছে।

এদিকে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা এই রোগ নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে আসলেও মাঠের চিত্র উল্টো। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ট্রাইসাইক্লাজন অথবা টেবুকোনাজল-ট্রাইফ্লস্ট্রিবিন গ্র“পের বিভিন্ন কোম্পানির বিভিন্ন নামের ওষুধ প্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণে আসা তো দূরের কথা; আক্রান্ত এলাকার পরিধি দ্রুত বাড়ছে। যে ক্ষেতের এক অংশে ধানের শীষ মরে যাচ্ছিল, ওষুধ প্রয়োগের পর তা গোটা জমি ছড়িয়ে পড়ছে। পঞ্চগড়, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁওসহ বেশ কয়েকটি জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই এলাকার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জমির ২৮ ধানে কাঁচি লাগাতে পারবে না কৃষকরা। কৃষকরা জানিয়েছে, ধানের শীষ বের হওয়ার পর এবং ধানে সোনালি রং ধরার আগেই গাছ সবুজ থাকলেও শীষ মরে যাচ্ছে। শুরুতে কম করে হলেও কয়েকদিনের মধ্যে গোটা জমির ধান মরে সম্পূর্ণ চিটা হয়ে যাচ্ছে।

পঞ্চগড় জেলায় ৩৬ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানে মাত্র ১০ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। আর দিনাজপুরে এক লাখ ৭৭ হাজার ৮০ হেক্টর জমির মধ্যে ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হওয়া মাত্র ৫.৬ হেক্টর জমির ক্ষতিগ্রস্তের হিসাব দিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে তাদের দেয়া তথ্যের কোন মিল নেই। নিজেদের দোষ ঢাকতেই তারা নামমাত্র জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য দিচ্ছেন বলে কৃষকরা অভিযোগ করেছে।
হাওরাঞ্চল ছাড়াও চলনবিল এবং নদীতীর এলাকার নিচু জমির ধান পানিতে তলিয়ে পচে যাওয়া ছাড়াও ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ৫০ লাখ মেট্টিক টন কম ধান উৎপাদিত হবে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষিবিদরা। এতে করে সরকারের ধান চাল সংগ্রহ অভিযান বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি এর প্রভাব গিয়ে পড়বে চালের বাজারে।

হাওরাঞ্চলের ফসল ডুবির আগে চালের বাজার কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বর্তমানে তা বেসামাল হয়ে পড়েছে। ডলারের মূল্য বৃদ্ধির অযুহাতে চাল আমদানিকারকরা এবং ধানের সংকট দেখিয়ে অটো হাস্কিং মিল মালিকরা সিন্ডিকেট করে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। চাহিদামত চালের যোগান পাচ্ছেন না চাল ব্যবসায়ীরা। এ কারণে বেসুমার বাড়ছে চালের বাজার। এ অবস্থায় সরকার চাল আমাদানিতে শুল্ক কমানোর চিন্তা ভাবনা করলেও সরকারের কঠোর হস্তক্ষেপ ছাড়া চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে আসবে না এমন ধারণা অনেকেরই।    

পঞ্চগড় জেলার মধ্যে ব্লাস্ট রোগে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলা বোদা ও দেবীগঞ্জ। অন্যান্য উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ কিছুটা কম। বোদা উপজেলার এক সাথে বেশি আবাদি জমি বেংহারী কান্দরে গিয়ে দেখা গেছে শত শত হেক্টর জমির ধানে এই রোগ দেখা দিয়েছে। ধান গাছের শীষে সোনালি রঙ ধারণের আগেই চিটা হয়ে গেছে ক্ষেতের পর ক্ষেত। একর প্রতি ২০/২২ হাজার টাকা খরচ করে ক্ষেতের ধান নষ্ট হওয়ার পর আর ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেত দেখতেও যাচ্ছে না কৃষকরা। অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেতের ধান গাছ গো-খাদ্য হিসেবে পাশের বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন। তাদের বিপদের সময় কৃষি বিভাগের কর্মর্তাদের কাছে পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকরা।

এদিকে গত মঙ্গলবার সকালে বোরো ক্ষেতে ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হওয়ায় বোদা উপজেলার ময়দানদিঘী বাজারে ক্ষতিপূরণের দাবিতে মানববন্ধন করে পঞ্চগড়-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে। ওই এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকশ’ কৃষক কর্মসূচিতে অংশ নেন।

পঞ্চগড় সদর উপজেলার ধাক্কামারা ইউনিয়নের খানপুকুর গ্রামের কৃষক অলিয়ার রহমান জানান, আমার এক একরসহ আমার পরিবারের সদস্যরা ৪ একর জমিতে ২৮ ধান চাষ করেছি। কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ প্রয়োগ করেও কোন কাজ হয়নি। ৪ একর জমি থেকে চার মণ ধানও তিনি ধরে তুলতে পারবেন না বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, আশপাশের কয়েকটি গ্রামের প্রায় ৫০ জন কৃষকের ৬০ একর জমির ২৮ ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। পার্শ্ববর্তী কবিরাজপাড়া গ্রামের সোলায়মানের এক একর, শিকারপুর গ্রামের আশরাফুল ইসলামের এক বিঘা, বোদা উপজেলার বেংহারী ইউনিয়নের ধকরাহাট গ্রামের তরেন চন্দ্র রায়ের এক একর জমির ২৮ ধান পুরোটাই শেষ হয়ে গেছে।  

ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে কৃষকদের বোরো ধানক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা স্বীকার করে পঞ্চগড় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক শামসুল হক এই প্রতিবেদককে বলেন, এই রোগ নিয়ন্ত্রণে আমাদের কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন। আমরা কৃষকদের আক্রান্ত ক্ষেতে ট্রাইসাইক্লাজন অথবা টেবুকোনাজল-ট্রাইফ্লস্ট্রিবিন গ্র“পের ওষুধ ¯েপ্র করার পরামর্শ দিচ্ছি। তবে আবহাওয়া প্রতিকূলে থাকায় ওষুধে ভাল একটা কাজ হচ্ছে না। কারণ যখন তখন বৃষ্টি হচ্ছে। দিনে গরম হলেও রাতে ঠান্ডা আবহাওয়া বিরাজ করছে। মাঝে মধ্যে কুয়াশাও পড়ছে। এসব কারণে ওষুধে সম্পূূর্ণ কাজ হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে পঞ্চগড় জেলায় ১০ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার হিসাব দিয়েছি। এখন আমরা প্রতিটি উপজেলায় ঘুরে ক্ষতিগ্রস্ত জমির তালিকা তৈরি করছি। তালিকার কাজ শেষ হলেই বোঝা যাবে প্রকৃতপক্ষে কত হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।  

 

 

হারিয়ে যাচ্ছে সিলেটের শিল-পাটার কারিগর

এম এ.সাবলু হৃদয়, সিলেট : আধুনিক যুগ শিল্পায়নের যুগ। শিল্পায়নের এই যুগে পাথর কেটে শিলপাটা তৈরি কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে। একটা সময় ছিল শিলপাটা ছাড়া চুলায় হাঁড়িও উঠত না। ব্যাপক চাহিদা ছিল শিলপাটার। প্রতিটি পরিবারের কাছে একটি পরিচিত নাম ছিল শিলপাটা।

চিরায়ত গ্রামবাংলার শিলপাটা নিয়ে রয়েছে নানা মজার কাহিনী। এখনো গ্রাম-বাংলার অনেক পরিবার রয়েছে যারা শিলপাটায় বাটা মসলা ছাড়া রান্না খেতে পছন্দ করে না। শিলপাটা দিয়ে শুধু মসলা বাটা নয়, একসময় মেহেদী বাটা থেকে শুরু করে নানা ধরনের খাবারের ভর্তা বাটা ছিল ঘরের গৃহিণীদের কাছে প্রতিদিনের রুটিন মাফিক কাজ।
কিন্তু এখন বদলে গেছে যুগ পাড়া-মহল্ল¬ার প্রতিটি মুদির দোকানে হাত বাড়ালেই পাওয়া নানা জাতের প্যাকেটজাত মসলা আর মসলা ভাঙার মেশিনত আছেই। বাণিজ্যিকভাবে মসলা ভাঙার মেশিন চালু হওয়ায় শিলপাটায় মসলা বাটার গুরুত্ব একেবারেই কমে গেছে।

শিলপাটা কারিগরদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, এখানে দীর্ঘদিন ধরে শিলপাটা তৈরি করে প্রায় ৫০/৬০টি পরিবার জীবন জীবিকা নির্ভর করে আসছে। বর্তমানে শিলপাটার কদর আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। আবার কেউ কেউ বাব দাদার পেশা ধরে রেখেছেন। এখনো কিছুটা চাহিদা আছে বলে তারা জানান।

শিলপাটা কারিগর মাহমুদ আলী জানান, দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে পাথরের সাথে যুদ্ধ করে চালিয়ে যাচ্ছেন তার জীবন-জীবিকা। তার নিত্যসঙ্গী হিসেবে রয়েছে হাতুড়ি আর ছেনি (ধারালো লৌহখন্ড)।

মাহমুদ আলী জানান, প্রায় ৩৫ বছর আগে উপজেলা সদর থেকে আনুমানিক ১২ কি.মি. উত্তরে লোভা পাথর কোয়ারিতে কাজ করতাম। ওই সময় বড় পাথর ভাঙতে গিয়ে চারকোনা টুকরো বের হতো। অনেকেই টুকরোগুলো কিনে নিয়ে শিল-পাটা তৈরি করতেন। দেখে দেখে লেগে যাই শিল-পাটা তৈরির কাজে।
বর্তমানে আমার এখানে ২-৩ জন শ্রমিক প্রতিদিন কাজ করে, দিনে ৫-৬টি শিল-পাটা তৈরী করতে পারে একজন শ্রমিক। একটি শিল-পাটা ১৫০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।

বগুড়া থেকে জাফলং বেড়াতে আসা পর্যটক শারমিন জাহান বলেন, শিলপাটার কোন বিকল্প নেই। বাজারের মসলার মধ্যে ভেজাল থাকে। বাড়িতে শিলপাটার বাটা মসলা দিয়ে রান্নার তরকারির স্বাদই আলাদা। তাই একটি শিলপাটা কিনলাম।

সুজানগরে খাল-বিল শুকিয়ে চৌচির নৌকা নিয়ে বিপাকে মৎস্যজীবীরা

শেখ তৌফিক হাসান, সুজানগর (পাবনা) : চলতি শুষ্ক মৌসুমে পাবনার সুজানগরের অধিকাংশ খাল-বিল এবং নদী-নালা শুকিয়ে চৌচির হয়ে গেছে। এতে উপজেলার মৎস্যজীবীরা তাদের নৌকা রক্ষা করা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। সেই সাথে খাল-বিল এবং নদী-নালা শুকিয়ে যাওয়ায় মৎস্যজীবীরা বেকার হয়ে পড়েছেন। এদের মধ্যে ২/৪জন স্বচ্ছল মৎস্যজীবী দূর-দূরান্তের মৎস্য খামার বা নদী-নালার মাছ কিনে এনে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করলেও বেশিরভাগ মৎস্যজীবী তা পারছেন না।

উপজেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ঐতিহাসিক গাজনার বিলসহ উপজেলায় ছোট-বড় ২০/২৫টি খাল-বিল এবং নদী-নালা রয়েছে। আর উপজেলার প্রায় ৩হাজার মৎস্যজীবী এসব খাল-বিল এবং নদী-নালায় নৌকা চালিয়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। কিন্তু চলতি শুষ্ক মৌসুমে ঐতিহাসিক গাজনার বিলসহ উপজেলার অধিকাংশ খাল-বিল এবং নদী-নালা শুকিয়ে গেছে। এমনকি গ্রামগঞ্জে ব্যক্তি পর্যায়ে খনন করা বেশিরভাগ পুকুরও পানিশূন্য। ফলে যে সকল মৎস্যজীবী ওই সকল খাল-বিলে নৌকার সাহায্যে মাছ ধরে থাকেন তারা তাদের নৌকা রক্ষা করা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। উপজেলার বাদাই গ্রামের ভুক্তভোগী মৎস্যজীবী সমির কুমার জানান, আমরা মৎস্যজীবীরা নৌকার সাহায্যে খাল-বিলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে থাকি। কিন্তু বর্তমানে উপজেলার খাল-বিল শুকিয়ে যাওয়ায় নৌকা রাখার মত পানি পাচ্ছিনা। ২/৪ জন মৎস্যজীবী আশপাশের পুকুরে তাদের নৌকা ডুবিয়ে রক্ষা করতে পারলেও বেশিরভাগ নৌকা শুকিয়ে যাওয়া খাল-বিলে পড়ে নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি খাল-বিল শুকিয়ে যাওয়ায় মাছ ধরতে না পেরে বেশিরভাগ মৎস্যজীবি তাদের পরিবারপরিজন নিয়ে অত্যন্ত কষ্টে দিনাতিপাত করছে বলেও ভুক্তভোগীরা জানান।

অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়া বগুড়া প্রি-ক্যাডেট হাই স্কুল

স্টাফ রিপোর্টার : অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে বগুড়া প্রি-ক্যাডেট হাই স্কুল। শহরের অভিজাত জলেশ্বরীতলা এলাকায় প্রায় চার দশক আগে প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইতিপূর্বে শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে সুনাম অর্জন করলেও পরিচালনা কমিটির সাবেক এবং বর্তমান সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকের দুর্নীতি এবং অনৈতিক কর্মকান্ডের কারণে এখন প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তিই সংকটে পড়েছে। স্কুলটিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য সরকারি হস্তক্ষেপ চেয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন জানানো হয়েছে।

গত ২৩ এপ্রিল করা ওই আবেদনে বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে সরকারি পর্যায়ে এডহক কমিটি গঠনের পাশাপাশি সাবেক ও বর্তমান সভাপতি এবং প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ এনে এর তদন্তের অনুরোধ জানানো হয়েছে। জলেশ্বরীতলা এলাকাবাসী, প্রি-ক্যাডেট হাইস্কুলের শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের পক্ষে জনৈক তোজাম্মেল হোসেন স্বাক্ষরিত আবেদনের অনুলিপি বগুড়ার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং জেলা শিক্ষা অফিসারের দপ্তরেও পাঠানো হয়েছে। আবেদনের অনুলিপির সঙ্গে ইতিপূর্বে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনও সংযুক্ত করা হয়েছে। প্রি-ক্যাডেট হাই স্কুলের প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালনা কমিটির অন্যতম সদস্য বগুড়া পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান এড. রেজাউল করিম মন্টু অভিযোগ করেছেন, অনিয়ম-দুর্নীতিতে নিমজ্জিত স্কুলটিকে নানা ধরনের অনৈতিক কর্মকান্ডের আখড়ায় পরিণত করা হয়েছে। রাতে সেখানে মাদকসেবী আর সন্ত্রাসীদের আসর বসে। প্রতিষ্ঠাকালীন অপর সদস্য বগুড়া বারের সিনিয়র আইনজীবী এড. রফিকুল ইসলাম লাল জানিয়েছেন, অভিজাত এলাকার স্কুলটিকে সবার চোখের সামনে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কেউ যেন দেখেও দেখছে না।

তারা বলেন, যদি এখনই কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয় তাহলে হয়তো আগামীতে স্কুলটিকে আর কোনভাবেই রক্ষা করা সম্ভব হবে না। অভিযোগকারীদের অনেকের মতে প্রতিষ্ঠানটিতে অনিয়ম ও দুর্নীতি কতটা সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে তা অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক জহুরুল আলমকে স্বপদে বহাল রাখার মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়ে গেছে। এলাকাবাসীর পক্ষে করা লিখিত অভিযোগ এবং ২০১৫ সালের ৪ এপ্রিলে দাখিল করা তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি টাকারও বেশি অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পরেও প্রধান শিক্ষক জহুরুল আলমকে স্বপদে বহাল রাখা হয়েছে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর প্রি-ক্যাডেট হাই স্কুল পরিচালনা কমিটির তৎকালীন সভাপতি তাইজুল ইসলাম রোম অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক জহুরুল আলমকে ২০১৪ সালের ২০ আগস্ট সাময়িক বরখাস্ত করলেও মাত্র ১৬ দিন পর তাকে আবার স্বপদে বহাল করেন।

প্রি-ক্যাডেট হাইস্কুল পরিচালনা কমিটির তৎকালীন সদস্য মোঃ আজিজুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত ৩ সদস্যের কমিটির  প্রতিবেদন অনুযায়ী অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক জহুরুল আলমের বিরুদ্ধে মোট ১ কোটি ৬ লাখ ৮১ হাজার ৩৯৮ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া যায়। তাকে স্বপদে বহাল করার কারণ হিসেবে তদন্ত কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রধান শিক্ষক জহুরুল আলম ২০১৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর স্বপদে বহালের আবেদন করেন। পরে ওই স্কুলের ১৭জন শিক্ষক-শিক্ষিকাও তাকে স্বপদে বহালের আবেদন জানান। তারপরই তাকে স্বপদে বহাল করা হয়। অবশ্য দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার কারণ দেখিয়ে ২০১৫ সালের ১৮ মার্চ তাকে আর একবার সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু কিছুদিন পর আবারও তিনি স্বপদে বহাল হন। পরবর্তীতে সভাপতির পদ থেকে তাইজুল ইসলাম রোম দায়িত্ব থেকে সরে গেলে ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে নাসিমুল বারী নাসিম নতুন সভাপতি মনোনীত হন।

আগের সভাপতির মত বর্তমান সভাপতিও প্রধান শিক্ষক জহুরুল আলমের দুর্নীতির ব্যাপারে নির্বিকার বলে অভিযোগ। তদন্তে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্থায়ীভাবে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে বরং তাকে বার বার স্বপদে বহাল রাখায় সাবেক সভাপতি তাইজুল ইসলাম রোমের ভূমিকা নিয়ে সে সময় প্রশ্ন উঠেছিল। এমনকি বর্তমান সভাপতি নাসিমুল বারী নাসিম সেই একই পথের যাত্রী হওয়ায় তার ভূমিকাও সমানভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক সভাপতি তাইজুল ইসলাম রোম কোন না কোনভাবে সুবিধা পাওয়ার জন্য প্রধান শিক্ষক জহুরুল আলমের দুর্নীতির বিষয়ে নীরব ছিলেন। আর বর্তমান সভাপতি নাসিমুল বারী নাসিম প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন করে যে অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন তা এলাকাবাসীর পক্ষে করা লিখিত অভিযোগ থেকেই উঠে এসেছে।

দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও প্রধান শিক্ষককে স্বপদে বহাল রাখার কারণ জানতে চাইলে প্রি-ক্যাডেট হাইস্কুলের সাবেক সভাপতি তাইজুল ইসলাম রোম করতোয়া’কে বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে কি রাজনৈতিক চাপের কারণে আমি সে সময় প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নিতে পারিনি। তার বিরুদ্ধে ২০১৪ সালে স্কুল ফান্ডের ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে একটি মামলা করেছি। পরবর্তীতে মামলাটি দুদকে পার করা হয়। বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে’। তার মেয়াদকালে স্কুলের মাঠ সংকুচিত করে দোকান ঘর নির্মাণ করা ঠিক হয়নি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘এসব ক্ষেত্রে যে বোর্ড থেকে অনুমোদন নিতে হয় সেটা আমার জানা ছিল না। সেই হিসেবে বলতে পারেন আমার ওই পদক্ষেপ ভুল ছিল।’ অবশ্য তার সময়ে শিক্ষক নিয়োগে কোন বাণিজ্য হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমার সময়ে যথাযথ নিয়ম মেনেই যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে কোন অনিয়ম হয়নি।’

বর্তমান অবস্থা : এলাকাবাসীর পক্ষে লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, সাবেক সভাপতি তাইজুল ইসলাম রোম, বর্তমান সভাপতি নাসিমুল বারী নাসিম এবং প্রধান শিক্ষক জহুরুল আলম দুর্নীতি, অনিয়ম এবং অনৈতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে স্কুলটিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে বর্তমানে মাদক, সন্ত্রাস ও অসামাজিক কার্যকলাপের একটি স্থানে পরিণত করেছে। ওই স্কুলে গেল পাঁচ বছরে সংঘটিত অনিয়ম, দুর্নীতি এবং নানা ধরনের অনৈতিক কর্মকান্ডের বিবরণ তুলে ধরে বলা হয়েছে, ‘সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরের উদাসীনতা এবং ন্যুনতম নিয়মতান্ত্রিক পর্যবেক্ষণের অভাবে এক সময়ের স্বনামধন্য বিদ্যালয়টি আজ দুর্নীতি অনিয়ম এবং সীমাহীন অনৈতিকতায় বগুড়া জেলা, বিভাগ তথা দেশে উদাহরণ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে।’ শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর দাখিল করা লিখিত অভিযোগে নাসিমুল বারী নাসিমকে একাধিক মামলার আসামী উল্লেখ করে তাকে প্রি-ক্যাডেট হাইস্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব প্রদানের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বলা হয়েছে, সাবেক সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকের অপকর্ম চাপা দিতেই তাকে সভাপতি করা হয়েছে। ওই অভিযোগপত্রে উল্লে­খ করা হয়েছে নতুন সভাপতি যোগদানের পরেই স্কুলের মূল্যবান গাছ ও সীমানা প্রাচীরের ইট বিক্রি এবং তিনতলা বাণিজ্যিক ভবনের অগ্রিম ভাড়া বাবদ ৫ লাখ টাকা ও নতুন চুক্তি সৃষ্টি করে ৭ লাখ টাকা গ্রহণ, ম্যানেজিং কমিটি কর্তৃক নিয়োগ বন্ধের নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ ও আত্মীয়করণের মাধ্যমে কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। স্কুলের প্রধান ফটক ও মাঠ ছোট করে আবারো বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ভাড়া, বৈধ অনুমোদন ছাড়া ৩টি দোকানঘর নির্মাণ শুরু করা হয়েছে। ওই দোকানঘর বাবদ প্রায় ২৪-২৫ লাখ টাকা জামানত গ্রহণ করে যা স্কুলের ফান্ডে জমা দেয়া হয়নি। প্রধান শিক্ষক এসবের অনুমতি দিয়ে আসছে আগের মতই।

এছাড়া ওই অভিযোগপত্রে আরও উল্লে­খ করা হয়েছে বর্তমান সভাপতি কোনো নিয়মনীতি না মেনে ম্যানেজিং কমিটির মিটিং করে পরে উপস্থিতির স্বাক্ষর নেন। শিক্ষকদের বেতন কমিয়ে শিক্ষার্থীদের বেতন বৃদ্ধিরও অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া স্কুলের দ্বিতীয় তলায় সভাপতির অত্যাধুনিক কক্ষ করে তাতে এসি ও সিসি ক্যামেরা বসানোর অভিযোগের উল্লে­খ রয়েছে। বর্তমান সভাপতি নাসিমুল বারী নাসিমের কাছে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো নিয়ে কথা বলতে গেলে তিনি ‘করতোয়া’ কে বলেন, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একটি পবিত্র স্থান। এখানে দুর্নীতি বা কোনো অনিয়ম করা হয়নি। স্কুলের মাঠও সংকোচন করা হয়নি। যা কিছু করা হয়েছে সবই স্কুলের স্বার্থে ও উন্নয়নের জন্য। এই প্রতিষ্ঠানে বাইরে থেকে কোনো অনুদান আসে না। অথচ অর্ধশতাধিকের বেশি রয়েছে শিক্ষক-কর্মচারী। শিক্ষার্থীদের বেতন থেকে যে আয় আসে তা দিয়ে বেতন হয় না। এছাড়া স্কুলের বিদ্যুৎ বিলসহ অন্যান্য খরচ রয়েছে। সে সব খরচ বহনের জন্য দোকানঘর নির্মাণ করা হচ্ছে।

যে জায়গায় দোকানঘর নির্মাণ করা হচ্ছে ওই জায়গাটি খালিই পড়ে ছিল। ওখানে এ্যাসেম্বলী করা হতো না। আগে স্কুলের কোনো নিরাপত্তা ছিল না। যখন-তখন শিক্ষার্থীরা বের হয়ে অযথা ঘোরাফেরা করতো। অভিভাবকদের বসার জায়গা ছিল না। কিন্তু আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর স্কুলের গেটটি ঠিক করেছি। গেটের বাইরে অভিভাবকদের বসার জন্য সুন্দর ব্যবস্থা করেছি। ম্যানেজিং কমিটির সাথে একাধিকবার আলোচনা করেই দোকানঘর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই খাতে যে অগ্রিম টাকা নেওয়া হয়েছে তা স্কুল ফান্ডেও জমা দিয়েছি। বোর্ড থেকে যদি তদন্তে আসে তবেই দেখতে পাবে টাকা কি করা হয়েছে।’ ম্যানেজিং কমিটি কর্তৃক নিয়োগ বন্ধের নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি কোনো শিক্ষক নিয়োগ দেইনি।

তবে প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনেই খন্ডকালীন ২ জন শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে।’ এক্ষেত্রে কোনো রকম বাণিজ্য হয়নি। স্কুলে সন্ধ্যার পর সন্ত্রাসী ও মাদকসেবীদের আড্ডার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করে বলেন, ‘স্কুলের খুঁটিনাটি অনেক কাজ থাকে। দিনের বেলা পাঠদান চলে, সেই সময় মিস্ত্রিরা কাজ করলে শিক্ষার্থীদের মনোযোগের অসুবিধা হয়। এ কারণে স্কুলে প্রায় রাত ১০টা পর্যন্তথেকে এ কাজগুলো করে নেই। আর যেহেতু আমি একটি রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত, তাই আমার দলের কোনো কোনো কর্মী এসে আমার সাথে আলোচনা সেরেই আবার চলে যায়। তারা কেউ সন্ত্রাসী বা মাদকসেবী নয়’। স্কুলের ভিতরে তার জন্য ভিন্ন একটি কক্ষ থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘স্কুলটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্যই অধিকাংশ সময় স্কুলে কাটাতে হয়। এসিসহ ওই কক্ষের বেশকিছু আসবাবপত্র আমার ব্যক্তিগত অর্থে কেনা হয়েছে’। স্কুল থেকে তিনি কোনো বাড়তি সুবিধা নিচ্ছেননা বলেও দাবি করেন। প্রধান শিক্ষকের দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর তার কোনো দুর্নীতি আমার চোখে পড়েনি। আর তাকে দুর্নীতির দায়ে যে দু’বার সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল, দু’বারই আগের সভাপতি অনিয়মতান্ত্রিকভাবে করেছেন।’ বোর্ড থেকে তদন্ত কমিটি এসেও তার কোনো দুর্নীতি প্রমাণ করতে পারেননি উল্লেখ করে বর্তমান সভাপতি বলেন, প্রধান শিক্ষক যদি সত্যিই দুর্নীতি করে থাকেন, সেটা বোর্ড তদন্ত করে তারাই তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।’ তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকার বিষয়ে আনা অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘শত্রুতা করে এসব মামলা করা হয়েছে। কোন মামলাতেই আমি এখনও দোষী সাব্যস্ত হইনি।’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, সব সভাই তিনি নিয়মতান্ত্রিকভাবে করেছেন।

ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক জহুরুল আলমের কাছে তার বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করে বলেন, ‘সাবেক সভাপতি শত্র“তামূলক আমার নামে স্কুল ফান্ডের ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের দায়ে দুদকে মামলা করেছেন। দুই-দুইবার বরখাস্ত করেছেন। আমি ১০ লাখ টাকা নিয়েছিলাম বাড়ি তৈরি করার জন্য, তা শোধও করেছি। তারপরও তিনি আরও টাকা দাবি করছিলেন, আমি দিতে রাজি না হওয়ায় তিনি এসব করেছেন। এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটিও গঠন হয়েছিল, কিন্তু তারাও তো কোনো কিছু পায়নি’। স্কুলের মাঠ সংকোচন করে দোকান ঘর নির্মাণের বিষয়টি তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছুই বলবো না। মাঠের সংকোচন-বিয়োজন যা কিছুই হচ্ছে, সব ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্তেই হচ্ছে। যেহেতু ম্যানেজিং কমিটির হাত ধরেই আমি স্কুলে যোগদান করেছি, তাই এই বিষয়ে কিছু বলার আমার নেই।’ তিনি স্বীকার করেন যে শিক্ষকদের বেতন কিছু কমানো হলেও শিক্ষার্থীদের বেতন বাড়ানো হয়নি। বরং কিছু কমানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। অপরদিকে স্কুলের শিক্ষক প্যাটার্ণ সম্পর্কে জহুরুল আলম বলেন, স্কুলের মোট শিক্ষক কর্মচারী রয়েছে ৫২ জন। এরমধ্যে ৩৮ জনই এমপিওভুক্ত। ২৯ জন পাওনা শিক্ষকের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ২৮ জন। এরমধ্যে ২৬ জনই এমপিওভুক্ত।

লাইব্রেরিয়ান ২ জনের মধ্যে এক জন এমপিওভুক্ত, অফিস সহকারি পদে ২ জনই এমপিওভূক্ত, চতুর্থ শ্রেণীর ১২ জন কর্মচারীর মধ্যে ৯ জন এমপিও ভূক্ত। এছাড়া খন্ডকালীন শিক্ষক রয়েছে ৭ জন এবং খন্ডকালীন অফিস সহকারি রয়েছে ১ জন। প্রতিষ্ঠানটির ফলাফল সম্পর্কে তিনি জানান, দিন দিন ফলাফল ভাল হচ্ছে। ২০১০ সালে এসএসসি পরীক্ষায় যেখানে মাত্র ৫ জন জিপিএ-৫ পেয়েছিল, ২০১২ তে সেখানে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪২ জন এবং সর্বশেষ ২০১৬ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬৩ জন। প্রধান শিক্ষক জহুরুল আলমের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে সাবেক সভাপতি তাইজুল ইসলাম রোম রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে একটি অভিযোগ দাখিল করেছিলেন। ওই অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ২১ মে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড থেকে বগুড়া জেলা শিক্ষা অফিসার গোপাল চন্দ্র সরকারের কাছে একটি চিঠি দেওয়া হয়।

ওই চিঠিতে বগুড়া প্রি-ক্যাডেট স্কুলের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগটি তদন্ত করে জেলা শিক্ষা অফিসারের সুস্পষ্ট মতামত চেয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। এই বিষয়ে গোপাল চন্দ্র সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘বোর্ড থেকে ওই চিঠি পাওয়ার পর আমি অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকসহ ম্যানেজিং কমিটিকে দুই-তিন দফা চিঠি দিয়ে মিটিং আহবান করেছিলাম। প্রতিটি মিটিংয়েই প্রধান শিক্ষক বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে অনুপস্থিত ছিলেন। এক পর্যায়ে সে সময়ের সভাপতি নিজেদের মধ্যে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলবেন আশ্বাস দেন। তাই আর আমি অগ্রসর হইনি। মূলত ম্যানেজিং কমিটির সাথে দুর্নীতি ও অনিয়মের আঁতাত করেই প্রধান শিক্ষক ওখানে টিকে আছেন’। এই বিষয়ে তিনি বোর্ডকে কি মতামত দিয়েছেন, জানতে চাইলে গোপাল চন্দ্র সরকার বলেন, ‘যেহেতু বোর্ড পরবর্তীতে আমাকে আর চিঠি দেয় নি, তাই আমিও কিছু জানাইনি, অর্থাৎ অমিমাংসিত রয়েছে বিষয়টি’।  স্কুলের জায়গা সংকোচন করে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ম্যানেজিং কমিটি করতে পারে কি-না এই বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা শিক্ষা অফিসার বলেন, শিক্ষার্থীদের পাঠদানসহ অন্যান্য বিষয়ে যদি কোনো অসুবিধা না হয় তবে স্কুলের উন্নয়নের জন্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়তে পারেন। তবে তার আগে অবশ্যই বোর্ডকে জানাতে হবে। বোর্ড কর্তৃপক্ষ এসে জায়গা পর্যবেক্ষণ করে অনুমোদন দিলে তবেই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা যাবে। স্কুলে সভাপতির আলাদা কক্ষ থাকার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জেলা শিক্ষা অফিসার বলেন, সভাপতির আলাদা কক্ষ থাকার কোন সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। তবে বিধি মোতাবেক প্রধান শিক্ষকের কক্ষেই ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির  চেয়ার থাকার নিয়ম রয়েছে।

 

তৃণমূলের অন্তর্কোন্দল মেটাতে আওয়ামী লীগের তৎপরতা শুরু

মাহফুজ সাদি: দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের তৃণমূলে অন্তর্কোন্দল বিরাজ করছে। অভ্যন্তরীণ সেই দ্বন্দ্বের জেরে সহিংসতা ও প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটছে। এ নিয়ে প্রায়ই নেতিবাচক সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে আওয়ামী লীগ। আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে দলটি। এজন্য বিরাজমান দ্বন্দ্বের কারণ অনুসন্ধান করে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদকরা। এর সাথে তারা বিরোধ নিষ্পত্তির সুপারিশমালাও দিয়েছেন। সেই আলোকে তৃণমূল নেতাদের কেন্দ্রে ডেকে সমাধানের তৎপরতা আজ রোববার থেকে শুরু হচ্ছে। কোন্দলপূর্ণ জেলার নেতাদের ঢাকায় ডেকে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কথা বলবেন। আওয়ামী লীগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, আজ রোববার থেকে শুরু হচ্ছে ধারাবাহিক বৈঠক। এদিন চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলার নেতাদের সাথে কোন্দল নিরসনের জন্যে বসবেন দলের সাধারণ সম্পাদক। আগামীকাল সোমবার ডাকা হয়েছে যশোর জেলার নেতাদের। মঙ্গলবার সাতক্ষীরা জেলার নেতাদের ডাকা হবে। তারপর নীলফামারীর নেতাদেরকে ডাকা হয়েছে ২৭ এপ্রিল। এরপর ধারাবাহিকভাবে ডাকা হবে কোন্দলপূর্ণ অন্যান্য জেলার নেতাদেরকেও।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক দৈনিক করতোয়াকে বলেন, টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার কারণে কিছু জেলায় দলের নেতাকর্মীদের মতবিরোধ, দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। এর ফলে সহিংস ও প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। দলীয় প্রধানের নির্দেশ মতো দ্বন্দ্বের কারণ অনুসন্ধান করে সমাধান বের করার জন্য আমারা প্রতিবেদন ও সুপারিশ দলের সম্পাদকমন্ডলীর জমা দিয়েছি। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন জেলার নেতাদের কোন্দলের মূলে রয়েছে নেতৃত্বের দ্বন্দ, আধিপত্য বিস্তার, জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত স্বার্থ ইত্যাদি। এর ফলে তারা প্রায়ই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। দলীয় কোন্দলের কারণে বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতাই শুধু নয়, জনপ্রিয়তার লড়াইয়ে হার হয়েছে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের। আওয়ামী লীগের নেতারা জানান, কয়েকটা সাংগঠনিক জেলায় সমস্যা সমাধান করা গেলেও কিছু জায়গায় এখনও সমাধান করা যায়নি। আর বেশি বিরোধপূর্ণ জায়গার সমস্যা সমাধানের জন্য তারা কেন্দ্রীয় কমিটির দ্বারস্থ হয়েছেন। এখন কেন্দ্রীয় কমিটিই তা সমাধান করবে।

সূত্রমতে, কোন্দলের কারণে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনসহ সিলেটের ওসমানীনগর, সুনামগঞ্জের জগন্নাথগঞ্জ এবং কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হেরেছেন বিএনপির প্রার্থীর কাছে। তিনটি উপজেলাতেই ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ভুগিয়েছে নৌকার প্রার্থীকে। দলের দুই নেতার সম্মিলিত ভোট তিনটি এলাকাতেই বিজয়ী বিএনপি প্রার্থীর দেড়গুণ বা তার চেয়ে বেশি ছিল। এরপর জেলা পর্যায়ের কোন্দলের বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে কাজ শুরু করে আওয়ামী লীগ। সূত্র জানায়, আগামী জাতীয় নির্বাচনের সময় দলে শৃঙ্খলা না থাকলে বিরোধী পক্ষ সুযোগ নেবে-এই আশঙ্কা থেকেই মাঠে নামে ক্ষমতাসীন দল। আর এই প্রক্রিয়ায় সুফলও মিলেছে। সদ্য সমাপ্ত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ১৫২ টি এলাকার মধ্যে অল্প কিছু এলাকা ছাড়া সবগুলোতেই জিতেছে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, দেড়শ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ছিল টেস্ট কেইস। এখানে আওয়ামী লীগের কোন্দল ছিল না। এবং নির্বাচনের ফল প্রমাণ করেছে, আওয়ামী লীগ একাট্টা হলে এই মুহূর্তে নির্বাচনে কোনো দল হারাতে পারবে না। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, বিরোধপূর্ণ সাংগঠনিক জেলার নেতাদের ঢাকায় ডাকা হয়েছে। ঢাকা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, আগামী নির্বাচনের জন্য দলের তৃণমূলকে শক্তিশালী করতে আমরা কাজ করছি। এর অংশ হিসাবে যেসব ইউনিটের কমিটি নেই, সেগুলো দ্রুত সম্পন্ন করতে আমরা সংশ্লিষ্ট জেলা ইউনিটকে তাগাদা দিচ্ছি।

খুলনা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, সংগঠনকে অধিক শক্তিশালী ও গণমুখী করা ছাড়া আগামী নির্বাচনে ভালো ফলাফল করা সম্ভব নয়। তাই দলের কোন্দল নিরসন করেই আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে। সবাই এক সাথে নিয়ে কাজ করতে আমরা চেষ্টা করছি। দলের স্বার্থে সবাই সকল দ্বন্দ্ব ভুলে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন। গত বুধবার আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে সম্পাদকমণ্ডলীর এক সভায় এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন ওবায়দুল কাদের। ওই সভায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকরা দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগের কয়েকটি জেলার উপর সাংগঠনিক প্রতিবেদন তুলে ধরেছেন ওবায়দুল কাদেরের সামনে। এর প্রেক্ষিতে ওবায়দুল কাদের পাঁচ জেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্ট জেলার থানার নেতাদের ঢাকায় ডেকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

 

ঠাকুরগাঁওয়ে লাভবান হন মধ্যস্বত্বভোগীরা

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি : সরকার প্রতিবারই ধান-চাল ও গমের মূল্য নির্ধারণ করে যখন কৃষকের ঘরে ফসল থাকে না। কিন্তু কোন দিনও সরকারি মূল্যে কোথাও ধান ও গম দিতে পারিনি। মাঠ থেকে ফসল কেটেই বাজারে বিক্রি করি। আর যখন সরকারি দাম নির্ধারণ হয় তখন ফসল থাকে না ঘরে। তাই কার্ড বাধ্য হয়েই নেতা ও ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করে দেই। এভাবেই কথাগুলো বলেছিলেন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা রুহিয়া এলাকার কৃষক মিনহাজুল ইসলাম।


চলতি বছরে ১৬ লাখ মেট্টিক টন খাদ্যশস্য ক্রয় করবে সরকার। এর মধ্যে ২৪ টাকা কেজি দরে সাত লাখ মেট্টিক টন ধান, ৩৪ টাকা কেজি দরে সাত লাখ মেট্টিক টন সিদ্ধ চাল, ৩৩ টাকা কেজি দরে এক লাখ মেট্টিক টন আতপ চাল ও ২৮ টাকা কেজি দরে এক লাখ মেট্টিক টন গম কেনা হবে। এই দাম নির্ধারণ করায় উৎপাদন খরচ উঠবে বলে আশায় বুক বাঁধেন কৃষকরা।


 মৌসুমের শুরুতেই সরকারের মূল্য ঘোষণায় খুশির হলেও ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে শঙ্কিত ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষক। তাই ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয়ের সরকারি     ঘোষণা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন এ জেলার কৃষকরা। জেলা খাদ্য বিভাগ জানায়, ঠাকুরগাঁওয়ে জেলায় এবার গমের বরাদ্দ পাওয়া গেছে ১৭ হাজার ৯১৭ মেট্টিক টন। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৫ হাজার ৪শ’ মেট্টিক টন গম। কৃষক ইউসুফ আলী জানান, প্রতিবার সরকার কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান ও গম ক্রয়ের ঘোষণা দিলেও বাস্তবে তা করা হয় না।

 

 এর ফলে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়। আর লাভবান হন মধ্যস্বত্বভোগীরা। রায়পুর এলাকার তৈয়বুর রহমান জানান, বেশ ক’বছর থেকেই কৃষকরা ধানের মূল্য পাচ্ছে না। পাশাপাশি উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ধান আবাদ করে লোকসান গুনতে হয়েছে তাদের।

 

সরকার যখন দাম নির্ধারণ করে তখন নেতারাই সব ভাগাভাগি করে নিয়ে নেয়। এবারও যাতে তাদের লোকসান না হয়, সে জন্য সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে গম ও ধান সংগ্রহের দাবি কৃষকদের। ঠাকুরগাঁও চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হাসান রাজু জানান, সরকারের এ উদ্যোগে কৃষকরা ন্যায্য দাম পাবে। কিন্তু কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ক্রয় না করলে উৎপাদনের খরচও উঠবে না।


ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক মাসুদুদুল হক জানান, সরকার ধান, চাল ও গমের যে মূল্য নির্ধারণ করেছে তা যদি সঠিক ভাবে বাস্তবায়ন হয় কৃষক তার উৎপাদিত মূল্যের নায্য দাম পাবে।জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আশরাফুজ্জামান জানান, আমরা বরাদ্দের কাগজ পাওয়ার পর জেলা খাদ্য কমিটির সভায় আলোচনা করেছি। সম্প্রতি আমরা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান, গম ও চাল ক্রয় অভিযান শুরু করব।

 

ঠাকুরগাঁও জেলা খাদ্য কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক আব্দুল আওয়াল জানান, সরাসরি যেন কৃষকের কাছ থেকে ধান, গম ও চাল ক্রয় করা হয় সে কারণে খাদ্য বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। না হলে সরকারের এই মহৎ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। শিগগিরই ক্রয় অভিযানের উদ্বোধন করা হবে।

আন্দোলন ও নির্বাচন প্রস্তুতিতে তৃণমূলে বিএনপির ৪০ টিম

রাজকুমার নন্দী : দ্বন্দ্ব-কোন্দল নিরসন করে তৃণমূলে সংগঠনকে শক্তিশালীকরণ ও সরকারি মামলা-হামলায় জর্জরিত নেতা-কর্মীদের চাঙ্গা করতে সাংগঠনিক সফরে যাচ্ছে বিএনপি। নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ে প্রয়োজনে ভবিষ্যতে আবারও আন্দোলনে যেতে চায় দলটি। একইসঙ্গে আগামী নির্বাচনের জন্যও প্রস্তুতি নিতে চায় বিএনপি। এ লক্ষ্যে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নির্দেশে কেন্দ্রীয় নেতাদের নেতৃত্বে ইতিমধ্যে ৪০টি দল (টিম) গঠন করা হয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও যুগ্ম-মহাসচিবদের টিম লিডার করা হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের নিজ জেলার বাইরের টিমের প্রধান করা হয়েছে। এসব টিমের নেতারা দেশব্যাপী ৮০টি সাংগঠনিক জেলা সফর করবেন।

গত মঙ্গলবার বিএনপির কেন্দ্রীয় দফতর থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত টিম প্রধানের কাছে এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠি অনুযায়ী আজ শনিবার থেকে এই সাংগঠনিক সফর শুরু হবে, যা আগামী ৭ মে পর্যন্ত চলবে। সফর শেষে টিম লিডাররা বিএনপির কেন্দ্রীয় দফতরে সংশ্লিষ্ট জেলার সার্বিক পরিস্থিতির ওপর সাংগঠনিক প্রতিবেদন জমা দেবেন। পরে সব প্রতিবেদন সমন্বয় করে একটি সার্বিক প্রতিবেদন তৈরি করে দলীয় চেয়ারপারসনের কাছে দেয়া হবে। বিএনপি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।    

সাংগঠনিক সফর প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগরের দায়িত্বপ্রাপ্ত টিমের প্রধান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দৈনিক করতোয়াকে বলেন, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি- সাংগঠনিক ব্যাপারে কাজ করার জন্য বিভিন্ন জেলায় আমাদের দলের নেতারা যাবেন। আর সফর শেষে সংশ্লিষ্ট জেলার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে কেন্দ্রের কাছে জমা দেবেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা ও মহানগরে দ্রুতই কার্যক্রম শুরু করবেন বলে জানান তিনি।

জানা যায়, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে সফরে নেতাদের করণীয় সম্পর্কে বেশকিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এতে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট জেলার নেতাদের নিয়ে কর্মিসভা করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কর্মিসভার দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা এবং বিভাগীয় সাংগঠনিক ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকদের তা অবহিত করতে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট জেলার সব কেন্দ্রীয় নেতাকে টিমে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে চিঠিতে। জেলার উদ্যোগে এসব কর্মিসভায় টিম প্রধানদের দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দলের অবস্থান ও দলের ঐক্য সম্পর্কে বক্তব্য রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

বিএনপির মহাসচিব স্বাক্ষরিত সাংগঠনিক সফর সংক্রান্ত চিঠি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন রাজশাহী জেলা ও মহানগরের দায়িত্বপ্রাপ্ত টিমের প্রধান ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে দ্রুত তার কার্যক্রম শুরু করবেন বলে জানান। ফেনি জেলা টিমের দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালীও দ্রুত সংশ্লিষ্ট এলাকায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান।

ভবিষ্যৎ আন্দোলন ও আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হওয়াই সাংগঠনিক সফরের লক্ষ্য বলে দৈনিক করতোয়াকে জানান যশোর জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত টিমের প্রধান বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। তিনি বলেন, নেতাদের মধ্যে ছোট-খাটো কোনো সমস্যা থাকলে তা নিরসন করে তৃণমূলকে চাঙ্গা করাও এ সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য হবে।

বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু দৈনিক করতোয়াকে বলেন, সরকারবিরোধী বিগত দু’টি আন্দোলনের পর সরকারি মামলা-হামলা ও নির্যাতন-নিপীড়নে আমাদের সারাদেশের নেতা-কর্মীরা জর্জরিত। এই অবস্থা থেকে তাদের সক্রিয়-উজ্জীবিত করার অংশ হিসেবে এই সাংগঠনিক সফর। কারণ, নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ে বিএনপির ভবিষ্যৎ আন্দোলন সফলে আমরা পুনরায় তৃণমূলের নেতাকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ চাই।

সিরাজগঞ্জে যমুনার ভয়াবহ ভাঙন দিশাহারা কয়েকশ’ পরিবার

হেলাল আহমেদ, সিরাজগঞ্জ : ভারতের আসামে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং গত তিনদিন যাবৎ সিরাজগঞ্জসহ উত্তরাঞ্চলে প্রবল বর্ষণে সিরাজগঞ্জের কাছে যমুনা নদীতে পানি বৃদ্ধির সাথে শুরু হয়েছে ভয়াবহ ভাঙন। এরই মধ্যে শুভগাছা, রতনকান্দি এবং ছোনগাছা ইউনিয়নের ৬টি গ্রামের আরও দুইশতাধিক বাড়িঘর ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থাপনাসহ শতাধিক বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে আরও শতাধিক  বাড়িঘর। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার রতনকান্দি ইউনিয়নের বাহুকা গ্রামের টুটুলের মোড়ে ব্রহ্মপুত্র বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধে ফাটল ধরায় এলাকাবাসীর মধ্যে আবার নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ভয়াবহ ভাঙনরোধে বালির বস্তা নিক্ষেপের কাজ শুরু করেছে।

চলতি বছরের শুষ্ক মৌসুমের শুরু থেকেই যমুনা নদী তীরবর্তী সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার রতনকান্দি ইউনিয়নের চরবাহুকা, বাহুকা, টুটলের মোড়, ছোনগাছা ইউনিয়নের পাঁচ ঠাকুরী, ভাটপিয়ারী এবং কাজিপুর উপজেলার শুভগাছা ও চরশুভগাছাসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় নদী ভাঙন শুরু হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ ভয়াবহ ভাঙনে এলাকার পর এলাকা বিলীন হতে থাকলেও তা প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পানি উন্নয়ন বোর্ড। এখন বর্ষা মৌসুম এগিয়ে আসার সাথে সাথে উজান থেকে পানির ঢল নেমে আসছে। একই সাথে প্রবল বর্ষণ শুরু হওয়ায় ভাঙনের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এলাকাবাসী দিশাহারা হয়ে পড়েছে।

রতনকান্দী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা খোকন ও সাবেক চেয়ারম্যান রেজাউল করিম জানান, যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙনের ফলে এলাকার শত শত মানুষ আজ নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার কয়েক দফা ভাঙনের শিকার হয়েছে। বার বার তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙন রোধে কোন কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। বর্তমানে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তাতে আরও বহু বাড়িঘর, ফসলি জমিসহ অন্যান্য স্থাপনা বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভাঙনকবলিত বাহুকা এলাকার কৃষক হযরত আলী, শাহার ভানু, আব্দুল কাদের, শুভগাছা টুটুলের মোড়ের রুস্তোম আলী, রেজাউল করিম, আব্দুল মজিদসহ ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেই জানান, শুভগাছা বাহুকা থেকে পাঁচ ঠাকুরী পর্যন্ত নদী তীরবর্তী অঞ্চলে প্রতিদিনই বড় বড় ফাটল ধরে ধসে পড়ছে। এভাবে ভাঙনে গত দুই মাসের মধ্যে অসংখ্য বাড়িঘর বিলীন হয়ে গেছে। চর বাহুকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ পুরো গ্রাম এখন শুধুই স্মৃতি। এছাড়া একটি মসজিদ ও চোরমারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বাহুকা, শুভগাছাসহ আশপাশের গ্রামগুলো এখন রয়েছে চরম হুমকির মুখে।
স্থানীয়রা জানান, নদীভাঙন প্রতিরোধে শিগগিরই ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে যে কোনো সময় শিমলা-খুদবান্দি বাঁধটি ভেঙে নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে। সেই সাথে অর্ধশত গ্রাম পাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী রনজিত কুমার বলেন, বাহুকা থেকে খুদবান্দি ও কাজিপুরের মেঘাই এলাকা মিলে ৭ কিলোমিটার নদী তীররক্ষা বাঁধের ৬৮৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প ইতিমধ্যে প্রি-একনেকে অনুমোদন পেয়েছে। প্রকল্পটি এখন একনেকের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এছাড়া জরুরিভিত্তিতে ভাঙনরোধের জন্য বালির বস্তা নিক্ষেপের কাজ আজ শুক্রবার সকাল থেকে শুরু হবে।

 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে অবাধে ঢুকছে অস্ত্র ও বিস্ফোরক দ্রব্য

ইমতিয়ার ফেরদৌস সুইট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ : চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে অস্ত্র ব্যবসায়ীরা। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ভারত থেকে দেশে ঢুকছে আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও বিস্ফোরকের চালান। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ওপারে ভারতের সীমান্ত ঘেঁষা এলাকাগুলোতে গড়ে উঠা ছোট ছোট কারখানায় তৈরি হচ্ছে এসব মারণাস্ত্র। বাংলাদেশে পাচার হয়ে আসার পর অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র পৌছে যাচ্ছে জঙ্গিগোষ্ঠী আর সন্ত্রাসীদের হাতে। আর এসব আগ্নেয়াস্ত্রের জোরেই ক্রমেই আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে সন্ত্রাসীরা।

দীর্ঘদিন ধরেই ভারত থেকে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও বিস্ফোরক দ্রব্য পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত এলাকা। সবচেয়ে বেশি অস্ত্রের চালান আসে শিবগঞ্জ উপজেলার সীমান্ত এলাকাগুলো দিয়ে। ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান রে¯োÍরাঁয় জঙ্গি হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়েই ভারত থেকে দেশে আনা হয়েছিলো বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা সূত্রগুলো। গত এক বছরে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১০৩ টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৬৭৮ রাউন্ড গুলি, ১৬১টি ম্যাগজিন ও ৬ কেজি গানপাউডার উদ্ধার করেছে। এসব ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়েছে ৪৭ জনকে। জেলায় সবচেয়ে বড় অস্ত্রের চালানটি ধরা পড়ে গতবছরের অক্টোবর মাসে। ওই দিন চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার শংকরবাটী এলাকা থেকে ২২টি অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গুলি উদ্ধার করে পুলিশ। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকছে অস্ত্রের চালান। এসব অস্ত্র বহন করে নিয়ে যাওয়ার সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে ধরা পড়ছে জেলার অধিবাসীরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশে সরবারহের জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তের ওপারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার বৈষ্ণবনগর, মোয়াজ্জেমপুর, কালিয়াচক, গোলাপগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় গড়ে উঠেছে ছোট ছোট অস্ত্র তৈরির কারখানা। এসব কারখানায় মুলত লেদ মেশিনেই তৈরি করা হচ্ছে এসব অস্ত্র। পরে সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া ডিঙ্গিয়ে আর চোরাচালানকৃত গরুর মাধ্যমে এসব আগ্নেয়াস্ত্র পাচার হচ্ছে বাংলাদেশে। শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা, বিনোদপুর ও শাহাবাজপুর ইউনিয়নে রয়েছে অস্ত্র ব্যবসার একাধিক রাঘববোয়াল। প্রভাবশালী এই অস্ত্র ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের চাহিদা মোতাবেক বিশ্বস্ত বাহকের মাধ্যমে এসব অস্ত্র পৌছে দিচ্ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। মাঝে মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অস্ত্রের চালানসহ এর বাহকদের ধরতে পারলেও তার মূল হোতারা সহজে ধরা পড়েনা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত থেকে একটি অস্ত্রের চালান ঢাকায় পৌছে দিতে পারলে বাহকরা পান মাত্র ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা। আর সামান্য এই টাকার জন্য ঝুঁকি নিয়ে অস্ত্র পৌছে দেয়ার কাজে জড়িয়ে পড়েছেন বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ। তবে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে অস্ত্র ব্যবসার গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তের ওপারে ভারতে ছোট ছোট অস্ত্র কারখানা গড়ে উঠার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা। অস্ত্র চোরাচালানে ব্যবসায়ীরা ঘন ঘন কৌশল পরিবর্তন করায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তা দমনে হিমশিম খাচ্ছে। অস্ত্র চোরাচালান প্রতিরোধে সম্প্রতি নৌ রুটকেও গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহবুব আলম খান জানান, গত আট মাসে ৩১টি অস্ত্র, ২৬১ রাউন্ড গুলি ও ৬ কেজি গানপাওডার উদ্ধার করেছে পুলিশ। অস্ত্র ব্যবসায়ীদের ধরতে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন এসব কারনে এখন আগের চেয়ে বেশি অস্ত্র ধরা পড়ছে।  

চাঁপাইনবাবগঞ্জ র‌্যাব ক্যাম্পের কমান্ডার এএসপি নূরে আলম জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তের অনেক এলাকা দুর্গম চরাঞ্চল হওয়ায় চোরাচালানীরা অবৈধ অস্ত্র পাচারে সুযোগ নিচ্ছে। তিনি বলেন অস্ত্র ব্যবসার লাগাম ধরতে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে র‌্যাব। গত এক বছরে র‌্যাব এই অঞ্চলে ৩৭টি অস্ত্র ও ২৬৯ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করেছে। এই অভিযান আরো জোরদার করা হবে বলে জানান তিনি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৯ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেঃ কর্নেল আবুল এহসান জানান, অস্ত্র চোরাচালান রোধে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছে বিজিবি। সেই সঙ্গে বাড়ানো হয়েছে সমন্বিত গোয়েন্দা নজরদারী। গত এক বছরে ৩৫টি অস্ত্র ও ১৪৮ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ভারতীয় নাগরিকদের ছবিসহ প্রয়োজনীয় তথ্য বিএসএফের কাছে নিয়মিত দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন এব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করছে বিজিবি।

জনস্বার্থ ইস্যুতে মাঠে নামতে চায় বিএনপি

রাজকুমার নন্দী : নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের ইস্যু, সরকারবিরোধী জনমত সৃষ্টি ও তৃণমূলের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করার লক্ষ্যে দ্রুততম সময়ে রাজপথে নামতে চায় বিএনপি। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সর্বশেষ দু’টি বৈঠকে দলটির নেতারা চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে রাজপথে নামার প্রস্তাব দিয়েছেন। ২০ দলীয় জোটের বৈঠকেও নেতারা জোটনেত্রীকে একই প্রস্তাব দেন। এছাড়া দল গুছিয়ে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যু নিয়ে বেগম জিয়াকে মাঠে নামার পরামর্শ দিয়েছেন বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবীরাও। বিএনপি চেয়ারপারসনও সবকিছু গুছিয়ে গ্যাস-বিদ্যুৎ-দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা ইস্যুতে দ্রুততম সময়ে রাজপথে নামার চিন্তাভাবনা করছেন। কর্মসূচি চূড়ান্ত হলে দেশের কয়েকটি বিভাগীয় শহরের পাশাপাশি বড় জেলাগুলোয় সমাবেশ করতে পারেন তিনি। তবে সেটা পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগে সম্ভব নয়। অবশ্য এর আগে আগামী পহেলা মে ঢাকায় শ্রমিক সমাবেশে খালেদা জিয়া অংশ নেবেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শ্রমিক সমাবেশের অনুমতির জন্য শ্রমিক দল ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদনও করেছে।

গত ডিসেম্বরে বিভাগীয় শহরে সমাবেশ করার চিন্তা-ভাবনা ছিল বিএনপির হাইকমান্ডের। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তের পর আগের সেই অবস্থান থেকে সরে আসে দলটি। বিএনপির সিনিয়র নেতারা মনে করছেন, সরকারবিরোধী বিগত দু’টি আন্দোলন সফল না হওয়ায় নেতাকর্মীরা মানসিকভাবে অনেকটা ভেঙে পড়েছেন। তাছাড়া সরকারের মামলা-হামলা ও নির্যাতনে তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী এখনো এলাকাছাড়া। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন থেকেই নেতাকর্মীদের মানসিকভাবে চাঙ্গা করা প্রয়োজন। জেলায় জেলায় সম্ভব না হলেও অন্তত বিভাগীয় সমাবেশের মাধ্যমে ওই এলাকার নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করা যাবে। তবে খালেদা জিয়া ছাড়া তৃণমূলকে চাঙ্গা-উজ্জীবিত করা কঠিন হবে। নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচনসহ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে চেয়ারপারসনের দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও চাঙ্গা করা সম্ভব হবে। সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি নেতাকর্মীরা মানসিকভাবে উজ্জীবিত হলে তা দলের জন্য ইতিবাচক হবে।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, খালেদা জিয়া ঢাকার বাইরে সফরে যাওয়ার আগে দলের তৃণমূল পুনর্গঠন কাজও শেষ করার প্রক্রিয়া চলছে। এরই মধ্যে অনেক জেলার নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি কমিটিগুলোও দ্রুততম সময়েই দেয়ার কথা জানিয়েছে দলটি।

এদিকে, খালেদা জিয়া সরাসরি মাঠে না নামলেও তার নির্দেশে সরকারবিরোধী জনমত তৈরিতে নতুন কৌশলে পোস্টার ও প্রচারপত্রের মাধ্যমে গত মাস থেকে দেশজুড়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। ‘জাতীয় সম্পদ, জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে খালেদা জিয়ার ডাক’ সংবলিত ওই পোস্টারে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনসহ ১৯টি দাবি তুলে ধরা হয়েছে। দলের ৮০টি সাংগঠনিক জেলা ইউনিটের মাধ্যমে সারাদেশে ইতোমধ্যে প্রচারপত্রটির লক্ষাধিক কপি সাঁটানো হয়েছে। দল ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতারা এই কার্যক্রমে সম্পৃক্ত রয়েছেন।

গত মাসে গুলশান কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে বিএনপিপন্থী পাঁচজন বুদ্ধিজীবী বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে খালেদা জিয়াকে জনসম্পৃক্ত ইস্যু নিয়ে রাজপথে নামার পরামর্শ দেন তারা। কথিত সংস্কারপন্থীদের ফিরিয়ে নেয়াসহ দল গুছিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাকে জনগণের মাঝে যাওয়ার আহ্বান জানান। খালেদা জিয়াও সবকিছু গুছিয়ে দ্রুতই জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুতে কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে বুদ্ধিজীবীদের জানান। জানতে চাইলে ওই বৈঠকে থাকা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী দৈনিক করতোয়াকে বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বেগম খালেদা জিয়ার উচিত জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো, জনগণের সাথে কথা বলা। এ জন্য অবিলম্বে দল গুছিয়ে তার (খালেদা জিয়া) জনগণের মাঝে যাওয়া দরকার।

গত ২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও খালেদা জিয়াকে রাজপথে নামার প্রস্তাব দেন দলটির নেতারা। ওই বৈঠকে নেতারা বলেন, ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জনসভায় প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে নৌকার পক্ষে ভোট চাইতে শুরু করেছেন। এ অবস্থায় আমাদের আর ঘরে বসে থাকার সময় নেই। তাছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসন তৃণমূলে গেলে নেতাকর্মীরাও উজ্জীবিত হবে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে স্বাক্ষরিত বিভিন্ন চুক্তির প্রেক্ষিতে করণীয় ঠিক করতে ১০ এপ্রিল স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে দেশের জনগণ কিছুই পায়নি বলে মনে করে বিএনপি। দলটির দাবি, সফরে দেশের জনগণের স্বার্থকে উপেক্ষা করে বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকে সই করা হয়েছে। বৈঠকে এই ইস্যুতে সরকারবিরোধী জনমত তৈরির সিদ্ধান্ত নেয় দলটির নীতি-নির্ধারকরা। এ লক্ষ্যে বেগম জিয়াকে তারা আবারো রাজপথে নামার তাগিদ দেন। এছাড়া গত ১২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ২০ দলীয় জোটের বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে দেশবাসী কিছুই পায়নি বলে জোটের নেতারা মত দেন। এই ইস্যুতে সরকারবিরোধী জনমত তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। এর অংশ হিসেবে জোট নেতারা খালেদা জিয়াকে বিভাগীয় শহর ও বড় জেলাগুলোতে সমাবেশ করার প্রস্তাব দেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ২০ দলীয় জোটের এক শীর্ষ নেতা জানান, সরকারবিরোধী জনমত সৃষ্টিতে জোটনেত্রীকে আমরা ঢাকার বাইরে একাধিক সমাবেশের প্রস্তাব দিয়েছি। তবে ঈদুল ফিতরের আগে এসব সমাবেশ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দৈনিক করতোয়াকে বলেন, বিএনপি গণমানুষের দল। দলটি সবসময় জনগণের জন্যই কাজ করে থাকে। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে চেয়ারপারসনের ঢাকার বাইরে সফরের চিন্তা-ভাবনা রয়েছে। তবে এখনো তারিখ চূড়ান্ত হয়নি। এ নিয়ে সিদ্ধান্ত হলেই উনি (খালেদা জিয়া) ঢাকার বাইরে সফরে যাবেন।

 

জয়িতা অন্বেষণে মনোনীত পাঁচবিবির ৫ সংগ্রামী নারী

আব্দুল হালিম সাবু, পাঁচবিবি (জয়পুরহাট) : জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ-এর আওতায় মনোনীত হয়েছেন পাঁচবিবির ৫ জন সংগ্রামী সফল নারী। তারা এখন আত্মনির্ভরশীল ও সুখী। জীবনের নানান প্রতিকূলতায় লড়াই করে জয়ী করেছেন নিজেদের। এখন তারা কাজ করে চলেছেন সমাজে নিপীড়িত, নির্যাতিত ও অধিকার বঞ্চিত মানুষের কল্যাণে।

এমন সফল জননী বালিঘাটা ইউনিয়নের বরগোছা গ্রামের মাহমুদা বেগম জানান, তার পিতা একজন প্রতিবন্ধী। সংসারে উপার্জনের কেউ ছিল না। অসহায় পিতা একই গ্রামের দরিদ্র তোতা মিয়ার সাথে তার বিয়ে দেন। অভাব অনটনের সংসারে একটি মেয়ে ও একটি পুত্র সন্তান জন্মের পর আমার স্বামী আমাদের ফেলে রেখে অন্যত্র চলে যান। মাহমুদা অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসারের হাল ধরেছেন। সন্তানদের লেখাপড়া  শেখানোর জন্য তিনি মাঠে ধান কাঁটা, মাড়াই, সিদ্ধ ও শুকানোর কাজ করেছেন বছরের পর বছর। বর্তমানে তার কন্যা বি.এ পাস করে স্থানীয় একটি এনজিও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছে। ছেলে ৩২তম বি.সি.এস ব্যাচে পাস করে বন গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। এখন তার সংসারে অভাব নেই। জীবন যুদ্ধে তিনি একজন সফল ও গর্বিত জননী।

নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করেছেন উপজেলার কাশিয়াবাড়ি গ্রামের শ্রাবন্তী সরকার। মাধ্যমিক পড়াকালীন এক আত্মীয়র সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার। এই সম্পর্কের এক পর্যায়ে স্বামী সুশান্ত নানান অজুহাতে টাকা নিতেন। বিষয়টি পরিবারের কেউ জানত না। বিত্তবান পরিবারের মেয়ে হওয়ায় নানান স্বপ্ন দেখিয়ে সে আমাকে ভারতে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করে। পরে অর্থের জন্য আমাকে চাপ দিতে থাকে। বিয়ের ১৭ দিনের মাথায় আমি জানতে পারি তার আরও একটি স্ত্রী ও সন্তান রয়েছে। তারাও সমাজে নানান অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত। আমি বাধা দিলে তারা আমাকে নির্যাতন চালায়। আমি নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরে এসে এইচ.এস.সি পাসের পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে সহকর্মীদের সাথে বুটিকের কাজ ও টিউশনি দিয়ে নিজের ভরণপোষণ ও পড়াশুনার খরচ চালাই। পরে স্বামী আবারো নিজের অপকর্মের জন্য ক্ষমা চায়। আমি আবারো সরল বিশ্বাসে তার সাথে ভারতে চলে যাই। যাওয়ার পর  থেকেই অর্থের জন্য সে আমাকে চাপ দিতে থাকে।  আবারো দেশে ফিরে বি.বি.এ শেষ করে একটি এনজিওতে কাজ করছি। পাশাপাশি সমাজের নিপীড়িত, প্রান্তিক নারী ও শিশু এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে অধিকার আদায়ের দাবি জানাচ্ছি।

অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী ধরঞ্জী ইউনিয়নের পাবর্তীপুর গ্রামের সুসমা রাণী বলেন, পিতার সংসারে অভাব থাকার কারণে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করি। আমার অন্ধ প্রতিবন্ধী বাবা ১৪ বছর বয়সেই আমার বিয়ে দেন। শুধুমাত্র ভিটা ছাড়া স্বামীর কিছুই নেই। মানুষের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছি। পরে এনজিওতে প্রশিক্ষণের পর ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করি। একসময় অর্থের অভাবে দুই সন্তানের লেখাপড়া বন্ধ হয়েছিল। এখন দুই ছেলে এইচ.এস.সি এবং এস.এস.সি পাস করেছে। বড় ছেলে ব্যবসার হাল ধরেছে। আজ তিনি জীবন সংগ্রামে জয়ী এক অর্থনৈতিকভাবে সফল নারী। তিনি আশা করেন গ্রামের সাধারণ নারী বা তারই মত ব্যবসা ক্ষেত্রে নিজেকে নিয়োজিত করে সফলতা লাভ করুক। ক্ষুদ্র আয়ের মাধ্যমে ও নিরলস পরিশ্রম করলে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

শিক্ষা ও চাকরীর ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী পৌরসভার দানেজপুর গ্রামের মোছাঃ সেলিনা আক্তার বলেন, রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম হওয়ার কারণে একটি মেয়ের যে চাওয়া পাওয়া থাকে তা মূল্যায়ন হয়নি। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে পরিবারের কাছে সাহায্য সহযোগিতা চেয়ে আশাহত হয়েছি। প্রচন্ড ইচ্ছা শক্তির কারণে আজ আমি উচ্চ শিক্ষা অর্জন করেছি। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত আছি। যৌতুকের মত এমন প্রথাকে অস্বীকার করে স্বামীর সংসারে এসেছি শুধুমাত্র শিক্ষাকে অবলম্বন করে। শিক্ষা অর্জন না করলে একটি মেয়ে পরিবার সমাজ এবং রাষ্ট্রের কাছে বোঝা স্বরূপ।

সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন ধাপ গ্রামের মেরিনা। তিনি বলেন, বাবার মৃত্যুর পর পঞ্চম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় পাঁচবিবির রফিকুল ইসলামের সাথে তার বিয়ে হয়। ২ বছর পর তার সংসারে আছে একটি কন্যাসন্তান। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ায় তিনি সংসারে নিয়ম-কানুন বুঝতেন না। এ কারণে স্বামীসহ পরিবারের সকলের দ্বারা শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত হন। পরে সংসারের কাজের পাশাপাশি দর্জি বিদ্যা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন মেরিনা। ২০১৩ সালে পল্লীশ্রীর উদ্যোগে তাদের গ্রামবাসীর সহযোগিতায় তিনি টিয়া নারী নামে একটি দল গঠন করেন। এ দলের মাধ্যমে আলোচিত মুরশিদাসহ ১২টি বাল্য বিবাহ প্রতিরোধে, হিন্দু, মুসলিম, আদিবাসী সম্প্রদায়ের মাঝে ৬৩টি স্বামী-স্ত্রী ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব নিরসন, ২২ জনকে মাতৃকালীন ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, ভিজিডি, ভিজিএফ কার্ড প্রাপ্তিতে সহযোগিতা করেছেন। বর্তমানে মেরিনা উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদফতর থেকে পুঁথির কজের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। প্রশিক্ষণ শেষে এলাকায় ফিরে কিশোরী ও নারীদের বড় আকারে প্রশিক্ষণ দিয়ে আয়মূলক কাজের সাথে সম্পৃক্ত করবেন।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক বাস্তবায়িত জয়িতা অন্বেষনে বাংলাদেশ শীর্ষক কার্যক্রমটি একটি ভালো কার্যক্রম। উপজেলার বিভিন্ন স্তর থেকে উঠে আসা এই ৫ জন শ্রেষ্ঠ জয়িতার জীবন কাহিনী পড়ে আমাদের নারী সমাজ উৎসাহিত হবে এবং এভাবেই নারীর ক্ষমতায়ন হবে বলে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ফারজানা ইয়াসমিন জানান।

এসো হে বৈশাখ, স্বাগত ১৪২৪

সৈয়দ আহমেদ অটল : ‘ওই নূতনের কেতন ওড়ে/ কালবৈশাখীর ঝড়/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর।’ আজকের দিনে এই জয়ধ্বনি দিয়েই কেবল অশুভ শক্তিকে পরাভূত করা সম্ভব। কালবৈশাখীর ঝড় দিয়েই ‘মুছে যাক গ্ল¬ানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ তবেই সত্য, সুন্দর, মানবতাবোধ ও সামাজিক মুক্তি আসতে পারে। গড়ে উঠতে পারে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। মানুষে মানুষে গড়ে উঠতে পারে ভালোবাস আর প্রীতির বন্ধন। আজ পহেলা বৈশাখ। শুভ নববর্ষ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ। নারী আর পুরুষের মিলিত কন্ঠে আজ ছড়িয়ে যাবে সেই চিরচেনা সুর, চির আহবান- ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’।

জীর্ণ-পুরাতনকে পিছনে ফেলে নতুনকে স্বাগত জানাবার দিন আজ। আজ জয় করবার দিন, বিজয়ী হবার দিন। জয়ধ্বনি করবার দিন।
পহেলা বৈশাখ কেবলই একটি নতুন বছরের শুরুর দিন নয়। নতুন করে যাত্রা শুরুতে যে আনন্দ-উৎসব আয়োজিত হয়, সেটাই বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে ঐতিহ্য বাঙালির হাজার বছরের। যে উৎসব ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক সুতায় গেঁথে আছে অনাদিকাল থেকে। যেখানে সাম্প্রদায়িকতার কোন স্থান নেই। নেই অপসংস্কৃতির। সমাজের সকল প্রকার অশুভ শক্তিকে পরাভূত করবার নতুন শক্তি অর্জনের দিন আজ। বলা হয়, বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাস বা লোকজ ঐতিহ্য ও গৌরব পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ পেয়েছে এই পহেলা বৈশাখে। পহেলা বৈশাখ বাঙালির এক অপার শক্তি। পহেলা বৈশাখের মূল বাণী – উৎসবের মধ্যদিয়ে আনন্দ প্রকাশ। যে উৎসব হবে সার্বজনীন। যে উৎসবে আজ বাঙালি জাতি মেতে উঠবে দেশময়। বাংলাদেশ হবে সব মানুষের। সব ধর্মের, সব শ্রেণি-পেশার। হয অপশক্তিকে পেছনে ফেলে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন প্রেরনায় উদ্ভুদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ তথা অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারন করে এগিয়ে যেতে হবে। বাঙালির এই অসাম্প্রদায়িক চেতনার মধ্যেই নিহিত আছে মূল শক্তি। সেই শক্তিতে বলীয়ান হয়েই অশুভ শক্তিকে পরাজিত করা সম্ভব। পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে আজ সূর্যোদয়ের সাথে সাথে যাত্রা শুরু করেছে ১৪২৪ বঙ্গাব্দ। নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে বাঙালি জাতি নতুন প্রেরণায় পা ফেলবে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে, আজকের দিনে এই কামনা।  

ষোড়শ শতকে সম্রাট আকবর ‘ফসলী সন’ প্রবর্তনের মাধ্যমে যে বাংলা সাল চালু করেছিলেন সময়ের বিবর্তনে সেই দিনটি এখন বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। আকবরের নবরতœসভার আমির ফতেহ উল্ল¬াহ সিরাজি খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য হিজরি চান্দ্রবর্ষকে সৌরবর্ষের সঙ্গে মিলিয়ে ফসলী সালের গণনা শুরু করেন। তিনিই হিজরিকে বাংলা সালের সঙ্গে সমন্বয় করে বৈশাখ থেকে বাংলা নববর্ষ গণনা শুরু করেছিলেন। বৈশাখ নামটি নেওয়া হয়েছিল নক্ষত্র বিশাখা  থেকে। পহেলা বৈশাখে আকবর মিলিত হতেন প্রজাদের সঙ্গে। সবার শুভ কামনা করে চারদিকে বিতরণ হতো মিষ্টি। এরপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে বর্ষবরণ উৎসব চলে আসে জমিদার বাড়ির আঙিনায়। খাজনা আদায়ের মতো একটি রসহীন বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় গান বাজনা, মেলা আর হালখাতার অনুষ্ঠান। আজ আর খাজনা আদায়  নেই, কিন্তু রয়ে গেছে উৎসবের সেই আমেজ। সেটা এখন ছড়িয়ে পড়েছে শহর বন্দর আর গ্রামে, জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সব বাঙালির মাঝে। খাজনা ও ফসল তোলার সন-তারিখের সুবিধার্থে বাংলা সনের যে প্রবর্তন আমরা দেখতে পাই, সে কারণেই পহেলা বৈশাখ ব্যবসায়ীরা ‘হালখাতা’ করেন। দেশ জুড়ে বসবে বৈশাখী মেলা।

ছায়ানটের প্রভাতী অনুষ্ঠান
এবারের ছায়ানটের প্রভাতী অনুষ্ঠানের ৫০ বছর বছর পূর্তি হচ্ছে। পহেলা বৈশাখ রমনা বটমূলে এবারের আয়োজনে সুরে সুরে বলা হবে মানুষে মানুষে সম্প্রীতির কথা। এ আয়োজনের মূল প্রতিপাদ্য ‘আনন্দ, বাঙালির আত্মপরিচয়ের সন্ধান ও অসাম্প্রদায়িকতা’। অনুষ্ঠান শুরু হবে সকাল ৬টা ১০ মিনিটে। সরোদিয়া রাজরূপা চৌধুরীর সরোদের সুরে ভোরের রাগালাপে শুরু হবে অনুষ্ঠান। গাওয়া হবে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুল প্রসাদ ও রজনীকান্ত সেনের গান। সে সঙ্গে মানবিকতার আবাহনে গীত হবে বাউলসাধক লালন সাঁইয়ের গান। ছায়ানটের শিল্পী-শিক্ষক ও শিক্ষার্থী শিল্পীদের কণ্ঠে পরিবেশিত হবে দশটি সম্মেলক গান। একক কণ্ঠে গাওয়া হবে ১৪টি গান। সব মিলিয়ে পরিবেশনায় অংশ নেবেন ১৬০ শিল্পী। ১৯৬৭ সালের প্রথম বর্ষবরণে সম্মেলক কণ্ঠে গীত হয়েছিল ‘আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও’। এবারও সে গানটি থাকছে। সম্মেলক ও একক কণ্ঠে গাওয়া হবে ‘আননধ্বনি জাগাও গগনে’, ‘ওরে বিষম দরিয়ার ঢেউ’, ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’, ‘ভোরের হাওয়ায় এলে ঘুম ভাঙাতে’, ‘একি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল¬ী জননী’ ও ‘উদয় শিখরে জাগে মাভৈ মাভৈ’সহ নানা গান। একক কণ্ঠে গান শোনাবেন চন্দনা মজুমদার, খায়রুল আনাম শাকিল, মিতা হক, ইফ্্ফাত আরা দেওয়ান, মহিউজ্জামান চৌধুরী ময়না, নাসিমা শাহীন ফ্যান্সি প্রমুখ। থাকবে কবিতা আবৃত্তিও। সাংস্কৃতিক পরিবেশনা শেষে শুভেচ্ছা কথনে অংশ নেবেন ছায়ানট সভাপতি ড. সন্জীদা খাতুন। তার শুভেচ্ছা কথন শেষে কিছুটা বিরতি দিয়ে শুরু হবে বর্ষবরণের পঞ্চাশ বছর পূর্তির বিশেষ আয়োজন পালা গান ‘দেওয়ানা মদিনা’। পরিবেশন করবেন নেত্রকোনার দিলু বাউল ও তার দল। এবারও রমনা বটমূলে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের অনন্য অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার। এ ছাড়া অনুষ্ঠানটি সরাসরি দেখা যাবে ছায়ানটের ওয়েবসাইটে।

মঙ্গল শোভাযাত্রা
পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ‘ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ বা অপরিমেয় সংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। গত বছরের ৩০ নভেম্বর ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় ইউনেস্কোর ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজের (আইসিএইচ) আন্তঃদেশীয় কমিটির একাদশ বৈঠকে মঙ্গল শোভাযাত্রাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার আয়োজিত এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার পঙক্তি ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দর’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের নেতৃত্বে সকাল ৯টায় চারুকলা অনুষদ থেকে বের করা হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। এছাড়া সঙ্গীত বিভাগের উদ্যোগে কলাভবনের বটতলায় সকাল ৮টা থেকে শুরু হবে সঙ্গীতানুষ্ঠান। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট পয়লা বৈশাখের দিন বিকাল ৪টায় রাজধানীর মিরপুর, দনিয়া রায়েরবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে একক ও দলীয় লোকসঙ্গীত, নৃত্য ও আবৃত্তিসহ নানা আয়োজন পরিবেশন করবে। এছাড়া রাজধানী জুড়ে অনুষ্ঠিত হবে বৈশাখী মেলা।

 

 

 

 

চারুকলায় নববর্ষ উদযাপন প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে

আলী আজম সিদ্দিকী : আগামী শুক্রবার পহেলা বৈশাখ। বাকি মাত্র তিন দিন। বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ কড়া নাড়ছে দুয়ারে। নানা আয়োজনে বাঙালির শত বছরের ঐতিহ্যকে বরণ করে নিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। রবীন্দ্রনাথের ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দর’ স্লোগানে এবারের নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়া হবে। এছাড়াও এবারের পয়লা বৈশাখে ঢাকা শহরসহ সারাদেশব্যাপী ব্যাপক নিরাপত্তা কর্মসূচী নেওয়া হবে।

বাংলা নববর্ষ-১৪২৪ সুষ্ঠুভাবে উদযাপনের লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিবছরের মতো এবারও গঠন করা হয়েছে বিভিন্ন কমিটি। ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সভাপতিত্বে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার উদ্দেশ্যে প্রো-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানকে আহ্বায়ক করে ৩৩ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন এ কমিটির সদস্য-সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন।

সভায় কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়াও সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে নববর্ষ উদযাপনের লক্ষ্যে শৃঙ্খলা ও মঙ্গল শোভাযাত্রা উপ-কমিটি গঠন করা হয়। ৩৯ সদস্যবিশিষ্ট শৃঙ্খলা উপ-কমিটির আহ্বায়ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ এম আমজাদ এবং সদস্য-সচিব সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক মো. ফজলুর রহমান। ২৯ সদস্যবিশিষ্ট মঙ্গল শোভাযাত্রা উপ-কমিটির আহ্বায়ক চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন এবং সদস্য-সচিব মৃৎশিল্প বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. রবিউল ইসলাম। সভায় উপ-কমিটিগুলোকে আগামী ৭ দিনের মধ্যে সব প্রস্তুতি শেষ করে উপাচার্যকে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে।

বাংলা নববর্ষের অন্যতম আকর্ষণ মঙ্গল শোভাযাত্রা। ১৯৯০ সাল থেকে প্রতি বছরই এ শোভাযাত্রার আয়োজন করে আসছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। অতীতের মতো এবারো তার ব্যতিক্রম ঘটেনি; চলছে জোর প্রস্তুতি।

সোমবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চারুকলা করিডোরে মঙ্গলশোভা যাত্রার প্রস্তুতি পর্বের মহাযজ্ঞ চলছে। প্রায় শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী শোভা যাত্রার উপকরণ তৈরি করতে একযোগে কাজ করছেন। শিক্ষার্থীদের নিরলস শ্রম এবং মেধা ও মননের নিখুঁত সংমিশ্রণে তৈরি হচ্ছে নানা শিল্পকর্ম ও চিত্রকর্ম। ভিন্ন ভিন্ন টেবিলের উপর চলছে পটচিত্র, জলরংয়ের চিত্রের কাজ। এ ছাড়া সারিসারি করে রাখা হয়েছে মাটির সরা। সেগুলোর ওপর রঙের প্রলেপ দিয়ে নানা অবয়ব ফুটিয়ে তুলতে বেশি ব্যস্ত দেখা গেলো চারুকলার শিক্ষার্থীদের। আর সে সব সরাচিত্রে উদ্ভাসিত হচ্ছে পল্লীবধুর মুখচ্ছবি, সাপুড়ে, কাকতাড়ুয়া, হরেক রকমের পাখি, হাতি, লক্ষীপেঁচা, বিড়াল, বাঘসহ বৈচিত্রময় নানা লোকজ অনুষঙ্গ। চারুকলা ইনস্টিটিউটের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আহমেদ রনি জলরংয়ের পেইন্ট করছিলেন। তিনি জানান, প্রতিদিন সকাল ১০ টা থেকে রাত ১০/১১ টা পর্যন্ত গ্রুপে গ্রুপে এসে বিভিন্ন কাজ করছেন তারা। তিনি আরও জানান, এবারের আয়োজনকে সফল করতে সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচশ ছাত্র-ছাত্রী নিয়মিত পালা করে কাজ করছেন। এর মধ্যে প্রায় দুইশ শিক্ষার্থী সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছেন। মাটির পুতুল, বাঘ, মাছ, কাঠের তৈরি গহনা, সুতোর তৈরি পুতুল ও কারুকার্যসহ নানাবিধ ভাস্কর্য তৈরি করছেন তারা। এ সব বিক্রি করে উৎসবের খরচের বিরাট একটি অংশের যোগান দেন তারা বলে জানান তিনি। চারুকলার আরেক ছাত্র সুদীপ্ত সিকদার বলেন, তাদের কাছে যে সব জল রংয়ের পেইন্ট আছে তার মধ্যে পাঁচশ থেকে শুরু করে দুই লাখ টাকা মুল্যেরও আছে। ভাস্কর্য বিভাগে কাজ করছিলেন প্রায় ২০/২৫ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে চন্দ্রনাথ পাল জানান, মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্য তারা বিভিন্ন ধরনের ভাস্কর্য তৈরি করছেন। এখন পর্যন্ত আটটি বড় ভাস্কর্যের কাজে হাত দিয়েছেন। প্রায় ৩০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।

এর মধ্যে হাতি, ঘোড়া, টেপা পুতুল, নৌকা, মাছ, হরিণ, পাখি, মা ও শিশু বিষয়ক ভাস্কর্য রয়েছে। দিনাজপুরের পটচিত্রশিল্পী পটুয়া নাজির হোসেন জানান, তিনি মূলত চারুকলার ছাত্র নয়। পড়াশোনা করেছেন দিনাজপুরে। কিন্তু সংস্কৃতির টানে আর ঐতিহ্য লালনের নেশায় তিনি দীর্ঘ ১২ বছর ধরে পটচিত্র আঁকেন। এই ১২ বছরের প্রতিটা নববর্ষে চারুকলায় স্বেচ্ছাশ্রমে পটচিত্র ও সরাচিত্র তৈরির কাজ করেছেন তিনি। তিনি জানান, এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্য তিনি এই কয়দিনে প্রায় ২০টি সরাচিত্র ও ১৫টি পটচিত্র এঁকেছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ৬০ থেকে ৭০ টি চিত্র আঁকার ইচ্ছা আছে তার। পেপার ম্যাশ বিভাগে ব্যস্ত তুহিন দাশ জানান, রাজা-রানীসহ বিভিন্ন আকারের ৫০-৬০টি পেপার ম্যাশ তৈরির কাজ চলছে। এর মধ্যে রাজা-রানীর পেপার ম্যাশ জোড়ার মূল্য ধরা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। অন্যগুলো ৪/৫ হাজার টাকা এবং ছোটগুলো পাঁচশ টাকায় বিক্রি হবে। মঙ্গল শোভাযাত্রাকে শুধু বৈশাখ উপলক্ষে আয়োজিত শোভাযাত্রা হিসেবে চিন্তা করা ঠিক হবে না জানিয়ে চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের কৃষিজীবী মানুষদের একটি উৎসব হলো পয়লা বৈশাখ। তাদের এ উৎসব ঘিরে যে সব সংস্কৃতির সৃষ্টি হয়েছে সেটা আমরা মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে উপস্থাপন করি। এ শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয় দেশবাসীর মঙ্গল কামনা করে।

আমরা জানি রাজধানীর জীবনে বাঙালি জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার তেমন সুযোগ থাকে না। আমরা মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে নগরবাসীকে বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করি।’ মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘পয়লা বৈশাখ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা আমাদের লোকসংস্কৃতির উৎসব; সার্বজনীন উৎসব। এখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্ম নিয়ে টানাটানি করলে চলবে না।’

নওগাঁয় অসহনীয় শব্দ দূষণ চলছেই কেউ মানে না বিধিবিধান

নবির উদ্দিন,নওগাঁ : নওগাঁ শহরে প্রতিনিয়ত উচ্চ শব্দে মাইকিংয়ের ফলে রাতের নিদ্রাসহ স্বাভাবিক কর্মকান্ড দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে জনসাধারণের। বিষয়টি যেন দেখার কেউ নেই। জেনে অথবা না জানার কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরবতায় ভোগান্তির সীমা ছাড়িয়ে গেছে জনগণের। সু-খবর সু-খবর, উন্নতজাতের একটি কেংনি মহিষ জবাই করা হইবে, মহিষটির মূল্য ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা, প্রতি কেজি মাংস ৪শ’ টাকা…। রোগীসাধারণের জন্য সু-খবর, এখন থেকে প্রতি শুক্রবার ঢাকা থেকে আগত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ নিয়মিত রোগি দেখছেন, সিরিয়ালের জন্য যোগাযোগ করুণ। ছাত্রÑছাত্রী ও অভিভাবকদের জন্য সু-খবর, অভিজ্ঞ শিক্ষকÑশিক্ষিকামন্ডলি দ্বারা কোচিং দেয়া হচ্ছে। শাড়ির বিরাট মূল্য ছাড়, এই সুযোগ আগামী…। আগামী…তারিখের মধ্যে সমিতির বকেয়া চাঁদা পরিশোধ করার জন্য…। এ ধরনের মাইকিং এখন নওগাঁ শহরের নিত্যদিনের ব্যাপার। নওগাঁ শহরবাসীর জন্য বিষয়টি অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। কখনো লম্বা হর্ণ, আবার কখনো ছোট হর্ণে (মাইকের আকার) চলে উচ্চ শব্দে এধরনের মাইকে প্রচারণা। এখন আর আগের মত ঘোষক লাগেনা। একটি মেমোরি কার্ডে একবার রেকর্ড করে রিকশায় অথবা ইজিবাইকে মাইক বেঁধে চলতে থাকে দিনভর বিরতিহীন ঘোষণা। এতো গেল মাইকের মাধ্যমে শ্রবণ নির্যাতন। এরপর মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইট ও পাথর ভাঙ্গা মেশিন ও কাঠের আসবাবপত্র তৈরিতে ব্যবহৃত বিদ্যুৎচালিত যন্ত্রের বিকট কান ফাটানো শব্দ।  যেন নেই কোন বিধি নিষেধ। নেই দেখভাল করার কোন দপ্তর, এমনই সব অবস্থা। হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ যে সকল স্থানে মাইক বন্ধ রাখার নিয়ম রয়েছে তাও কেউ মানছে না।


নওগাঁ জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ড হারুন-অল-রশিদ বলেন, প্রতিদিন মাইকের শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি। এরা স্কুল, কলেজ. হাসপাতাল, সরকারি অফিস-আদালত কিছুই মানে না। এই শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যে কে পালন করবে তাও বুঝি না। বিষয়টি দিন দিন অত্যাচারের পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে।


এব্যাপারে কথা হয় নওগাঁ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়–য়া ছাত্রীদের অভিভাবকদের সাথে। তাঁরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা অভিভাবকরা প্রতিদিন আমাদের মেয়েদের নিয়ে স্কুলে আসি। তাদের স্কুলে  পৌঁছে দিয়ে বাইরে অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু অসহ্য হয়ে পড়ে যখন একটির পর একটি মাইক উচ্চ শব্দে প্রচার করতে করতে স্কুলের সামনে দিয়ে যায়। অভিভাবিকাই প্রশ্ন করেন, এর কি কোনই প্রতিকার নেই?


অধ্যক্ষ (অবঃ) প্রফেসর শরিফুল ইসলাম খান বলেন রাস্তাসহ যত্রতত্র উচ্চ শব্দে মাইক ও সাউন্ড বক্স বাজানো হচ্ছে। প্রতিদিনই শব্দ দূষণের শিকার হচ্ছে মানুষ। এই সমস্যাটা নিয়ে প্রশাসনিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন। সমাজ কর্মী মো. মুরাদ আলী মৃধা জানান, যত্রতত্র পাথর ভাঙ্গা, ইট ভাঙ্গা ও কাঠ চাঁচা মেশিন চালানো হচ্ছে। মেশিনের বিকট শব্দ মারাতœকভাবে শ্রবনেন্দ্রিয়ের ক্ষতি করছে। এ বিষয়ে শব্দ নিয়ন্ত্রণকারী দপ্তরের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের দাবি জানান তিনি।


৭ সেপ্টেম্বর ২০০৬ সালে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রন বিধিমালা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। যাতে উল্লেখ আছে নিরব এলাকায় দিনে ৫০ রাতে ৪০, আবাসিক এলাকায় দিনে ৫৫ রাতে ৪৫, মিশ্র এলাকা দিনে ৬০ রাতে ৫০, বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭০ রাতে ৬০, শিল্প এলাকায় দিনে ৭৫ রাতে ৭০  ডেসিবল মানমাত্রায় সাইন্ডে মাইকে প্রচার করা যাবে। ভোর ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দিবাকালিন সময় ও রাত ৯টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত রাত্রিকালীন সময় হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যা মানুষের শ্রবণ ইন্দ্রিয়ের সাথে সম্পর্কিত শব্দের গড় মাত্রাকে বোঝাবে। এই বিধি  যেসব স্থান,  ক্ষেত্রে প্রচার প্রচারণায় অনুষ্ঠানে প্রযোজ্য হবে না যেমন রাষ্ট্রীয় কোন দিবসে (স্বাধীনতা, ২১  ফেব্রুয়ারি, বিজয় দিবস, জাতীয় দিবস)। অথবা সরকার কর্তৃক ঘোষিত কোন গুরুত্বপূর্ণ দিবসে অনুষ্ঠান চলাকালে। মৃত্যু সংবাদ,  কোন ব্যক্তি নিখোঁজ থাকলে, গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হারিয়ে গেলে, প্রকৃতিক বিপর্যয় বা অন্যকোন বিপদে বিপদ সংকেত প্রচারকালে, সরকারি বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রাচারকালে, প্রতিরক্ষা-পুলিশ বাহিনী ও আইন শৃংখলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের দাপ্তরিক কাজ সম্পাদনকালে, ইফতার ও শিহরির সময় প্রচারকালে, সরকার কর্তৃক সময় সময় অব্যহতিপ্রাপ্ত অন্যকোন কার্যক্রম সম্পাদনকালে, ধর্মীয় স্থান ও অনুষ্ঠানে।


বিধিমালায় আরও বলা হয়েছে শব্দের মানমাত্রা অতিক্রম করা যন্ত্রপাতি যেমন মাইক, লাউড স্পিকার, এমপ্লিফায়ার, মেগাফোন বা শব্দ বর্ধনের জন্য ব্যবহৃত কোন বা সকল বৈদ্যুতিক যন্ত্র বা অন্যকোন যান্ত্রিক কৌশল ব্যবহারের শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এই বিধিমালার বিধানাবলি প্রধান্য পাবে। তবে শব্দের মানমাত্রা অতিক্রমকারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরব এলাকা ব্যতিত অন্যান্য এলাকায় ব্যবহারের জন্য পূর্বেই কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। যার জন্য ৩ দিন পূর্বে দরখাস্ত করতে হবে। বিশেষ জরুরি ক্ষেত্রে অয়োজনের ১ দিন আগে দরক্ষাস্ত দাখিল করতে হবে। কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি বিবেচনা করে অনুমতি প্রদান করবেন অথবা কারণ উল্লেখপূর্বক দরখাস্ত নামঞ্জুর করবেন। এক্ষেত্রে সহনীয় পর্যায়ের শব্দের মানমাত্রা অতিক্রকারী যে কোন যন্ত্রপাতি দৈনিক ৫ ঘন্টার বেশি ব্যবহারের অনুমতি প্রদান করতে পারবেন না। অনুমোদিত সময়সীমা রাত ১০টা অতিক্রম করতে পারবেনা।


নির্মাণ কাজের ক্ষেত্রে আবাসিক এলাকার শেষ সীমানা হতে ৫০০ মিটারের মধ্যে ইট বা পাথর ভাঙ্গা মেশিন ব্যবহার করা যাবে না। সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত মিকচার মেশিনসহ নির্মান কাজে ব্যবহৃত অন্যান্য যন্ত্র বা যন্ত্রপাতি চালানো যাবেনা। নির্দিষ্ট মানমাত্রার অতিরিক্ত শব্দদূষণের সৃষ্টি হলে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে টেলিফোনে, মৌখিক অথবা লিখিত ভাবে জানানো যাবে। সে ক্ষেত্রে শব্দদূষণ মানমাত্রা অতিক্রমকারীকে ক্ষমাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মৌখিক ভাবে অথবা লিখিত নির্দেশ প্রদান করবেন। বিধান লংঘনকারী ওই নিদের্শ পালনে ব্যর্থ হলে আইনের ধারা ১০ এর উপ-ধারা (১) এর দফা (ক) এবং (ঙ) অধিনে প্রয়োজনীয় সহায়তা সহকারে যে কোন ভবন, স্থান বা আবদ্ধ স্থানে প্রবেশ করবেন। শব্দের মানমাত্রা অতিক্রমকারী যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি আটক করতে পাবেন। কোন ব্যক্তি উপ-বিধি (১) এর অধীন নির্ধারিত অপরাধে দোষি সাব্যস্ত হলে তিনি প্রথম অপরাধের জন্য অনধিক ১ মাসের কারাদন্ডে বা অনধিক ৫হাজার টাকা অর্থ দন্ডে বা উভয় দন্ডে এবং পরবর্তী অপরাধের জন্য অনধিক ৬ মাসের কারাদন্ডে বা অনধিক ১০হাজার টাকা অর্থদন্ডে বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন।

২০০৬ সালে ৭ সেপ্টেম্বর শব্দ দূষন নিয়ন্ত্রন বিধিমালা গেজেট উল্লেখ আছে উপজেলায় এই বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করবেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অথবা তৎকর্তৃক ক্ষমতা প্রাপ্ত কর্মকর্তা। জেলা সদরে নিয়ন্ত্রণ করবেন জেলা প্রশাসক অথবা তৎকর্তৃক ক্ষমতা প্রাপ্ত কর্মকর্তা, সিটি করপোরেশন পুলিশ কমিশনার অথবা তৎকর্তৃক ক্ষমতা প্রাপ্ত কর্মকর্তা, মেট্রোপলিটন এলাকায় পুলিশ কমিশনার অথবা তৎকর্তৃক ক্ষমতা প্রাপ্ত কর্মকর্তা, এছাড়া অন্যান্য এলাকায় জেলা প্রশাসক অথবা তৎকর্তৃক ক্ষমতা প্রাপ্ত কর্মকর্তা।
এ ব্যাপারে নওগাঁর জেলা প্রশাসক ড. মোঃ আমিনুর রহমান বলেন, শব্দদূষণ অবশ্যই একটি বড় ধরনের সমস্যা। এবিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নওগাঁ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ রেজাউল বারী জানান, বিষয়টি তিনিও অনুধাবন করেছেন। যতদ্রুত সম্ভব এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিবেন বলে জানান তিনি।
নওগাঁ সদর হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ডাঃ মোঃ মাহবুব আলম সিদ্দিকী জানান, অতিরিক্ত শব্দদূষণ শিশুসহ সব বয়সের মানুষের জন্য ক্ষতিকর। অতিরিক্ত শব্দে মস্তিস্কে বিরক্তির কারণ ঘটে। ফলে শ্রবণ শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মস্তিস্কে চাপ সৃষ্টি হয়, কর্মক্ষমতা কমে যায়, মেজাজ খিটমিটে হয়ে যায়, বিশ্লেষণ ক্ষমতা কমে যায়, মানুষ যখন ধীরে ধীরে বার্ধক্যে পোঁছে যায় তখন পরিলক্ষিত হয় শব্দদূষণের মারাত্মক প্রভাব।

 

কুসিক জয়ে বিএনপিতে স্বস্তি

রাজকুমার নন্দী : নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে পরাজয়ের পর নিজেদের জনপ্রিয়তা প্রমাণে মরিয়া ছিল বিএনপি। কারণ, ব্যাপক প্রস্তুতি সত্ত্বেও ওই নির্বাচনে পরাজয়ে দলটির নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে পড়েছিল। তাই কুমিল্লায় জয়ের মধ্য দিয়ে সরকারি দমন-পীড়ন, হামলা-মামলা ও হতাশায় নিস্তেজ হয়ে পড়া বিএনপিতে ফিরে এসেছে স্বস্তি। নেতা-কর্মীদের মধ্যেও এক ধরণের উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা গেছে। দলটির নেতাদের দাবি, বিএনপিকে নিয়ে ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের নেতাদের নানা অপপ্রচার সত্ত্বেও বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের প্রতি দেশবাসী যে এখনো আস্থাশীল, তিনি যে এখনো দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী- কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচনে ধানের শীষের বিজয়ের মধ্য দিয়ে সেটা আবারো প্রমাণিত হয়েছে। আর এই জয়ে জাতীয় নির্বাচনের আগে গাজীপুর, খুলনা, রাজশাহী, সিলেটসহ যে কয়েকটি সিটি নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে সেগুলোতেও ভাল করার উৎসাহ তৈরি হবে।

কুমিল্লা সিটি নির্বাচনের মাঠে সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান দৈনিক করতোয়াকে বলেন, কুমিল্লায় ধানের শীষের প্রার্থী জেতায় বিএনপিকে নিয়ে সরকারি দলের নানা অপপ্রচার মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কুমিল্লাবাসী প্রমাণ করেছে- আওয়ামী লীগ নয়, বিএনপিই এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। আগামীতে নির্দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ক্ষমতাসীনদের বিপক্ষে দেশবাসী একই রায় দেবে বলেও দাবি করেন তিনি।

কুমিল্লার মাঠে দায়িত্ব পালন করা দলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বাবুল দৈনিক করতোয়াকে বলেন, বিএনপি গণমানুষের দল। তাই যারা বলে বিএনপি নাই, বিএনপি শেষ, বিএনপি পারবে না-কুমিল্লার বিজয় তাদের জন্য চপেটাঘাত। আগামীতে নির্বাচন মোটামুটি সুষ্ঠু হলেও অধিকাংশ জায়গাতেই বিএনপি জয়লাভ করবে বলে দাবি তার।

বিএনপির সিনিয়র নেতারা বলছেন, আভ্যন্তরীণ কোন্দলে নারায়ণগঞ্জে পরাজয়ের পর কুসিক নির্বাচনে বিএনপির বিজয় নিঃসন্দেহে স্বস্তির। কিন্তু এ নির্বাচনেও ক্ষমতাসীনরা প্রশাসনকে ব্যবহার করে যেভাবে কেন্দ্র দখল, জাল ভোট দেয়াসহ ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছেন, তাতে ভোটে জিততে তাদের বিশেষ কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছে। নির্বাচনে টিকে থাকতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিএনপির নেতাকর্মীরা বুকে নৌকার ব্যাজ লাগিয়ে ধানের শীষে ভোট দিয়েছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কুমিল্লায় প্রথম থেকেই স্থানীয় নেতাদের মধ্যকার গ্রুপিং মেটাতে দল মনোযোগী ছিল, যা ধানের শীষের জয়ের ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রেখেছে। নির্বাচনী মাঠে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকাটাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাই কৌশলে কুসিক নির্বাচনের এই বিজয়কে সামনে রেখে পরবর্তী নির্বাচনগুলোর কৌশল নির্ধারণ করতে চায় বিএনপি।

দলের ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেছেন, নৌকার পক্ষে প্রকাশ্যে সিল মারার পরও যে কৌশলে জেতা যায়, সেটা কুসিক নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে। নৌকার মার্কা বুকে নিয়ে সেখানে ধানের শীষে ভোট দেয়া ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর ছিলো না। এই কৌশলে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জনগণ ধানের শীষের প্রার্থীকে জিতিয়েছে। তিনি আরো বলেন, কুমিল্লার নির্বাচন দেশের মানুষের চোখ খুলে দিয়েছে। তাই কুমিল্লার এই বিজয়কে সামনে রেখে ভবিষ্যতে সেইভাবে কৌশল নির্ধারণ করে আমরা এগিয়ে যাবো।

এদিকে, কুসিক নির্বাচনে বিজয়ের ফলে নবগঠিত নির্বাচন কমিশনের প্রতি বিএনপির আস্থা ‘কিছুটা’ হলেও ফিরেছে। তবে দলটির নেতারা বলছেন, নির্বাচন কমিশন কিছুটা সজাগ থাকলেও নির্বাচনকে পুরোপুরি সরকারি দলের সন্ত্রাস ও অনিয়মমুক্ত রাখতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। তারা এও বলেছেন, স্থানীয় নির্বাচন ও জাতীয় নির্বাচন এক নয়। সরকার পরিবর্তনের কোনো সুযোগ না থাকলেও দলীয় প্রার্থীকে জেতাতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও ক্ষমতাসীনদের দাপট অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ কুসিক নির্বাচনেও সেটা দেখা গেছে। আর এর মধ্য দিয়ে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে বিএনপির জাতীয় নির্বাচনের দাবির যৌক্তিকতা আরো দৃঢ় হয়েছে। তাই জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে হলে অবশ্যই সে নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হতে হবে। ইসির পক্ষে কোনভাবেই সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। সেজন্য কুমিল্লায় জিতলেও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি থেকে মোটেই সরেনি বিএনপি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, প্রয়োজনে কেয়ামত পর্যন্ত অপেক্ষা করব, তবুও শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাবো না।

জানা গেছে, নির্বাচন কমিশন গঠনে রূপরেখা দেয়ার পর বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া শিগগিরই নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের রূপরেখাও জাতির সামনে তুলে ধরবেন। তবে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে সেই রূপরেখাকে ধরে ক্ষমতাসীনরা আলোচনায় এগিয়ে না এলে দাবি আদায়ে প্রয়োজনে রাজপথেও নামতে পারেন খালেদা জিয়া।

এদিকে, কুসিক নির্বাচনে বিজয়ে উচ্ছ্বসিত বিএনপিকে বেদনায় নীল করেছে চট্টগ্রামে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল নেতা নুরুল আলম নুরুর নৃশংস হত্যার ঘটনা। সেজন্য কুমিল্লায় বিজয়ের পরও দলের নেতাকর্মীরা বুকে শোকের প্রতীক ‘কালো ব্যাজ’ ধারণ করেছে। এ প্রসঙ্গে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, কুমিল্লায় ধানের শীষের বিজয় বর্তমান অনির্বাচিত সরকারের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনতার বিজয়। কিন্তু পুলিশী নির্যাতনে চট্টগ্রামে ছাত্রদল নেতা নুরুল আলম নুরুর মৃত্যুতে আমরা সবাই দারুণ ব্যথিত, শোকাহত। তাই কুমিল্লা বিজয়ের আনন্দ আমরা কেউ ভাগ করে নিতে পারিনি।  

 

 

 


 

 

স্বীকৃতি নেই নারী কৃষকের আছে মজুরী বৈষম্য

করতোয় ডেস্ক: পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নানাভাবে নারীকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। বিশ্ব জুড়ে নারী অধিকার রক্ষায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। বিশেষ করে বাংলাদেশে। এখানে প্রতিটি পেশায় ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে ঠকানো হচ্ছে নারীদেরকে।

 

নারী-পুরুষের সমতার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণ কর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’। কবির এ কথা শুধু কবিতাতেই নয়, দেশের অগ্রাত্রায় আজ বাস্তব। কিন্তু অর্ধেক শ্রমের অংশীদার হলেও নারীরা পচ্ছেন না তাদের শ্রমের যথাযথ দাম। মজুরী পান পুরুষের অর্ধেক। নেই তাদের কাজের যথাযথ স্বীকৃতিও।


সম্প্রতি বিভিন্ন এলাকায় আলু চাষে নিয়োজিত নারী শ্রমিকদের খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একজন পুরুষ শ্রমিক যেখানে দৈনিক ২০০ থেকে ২৫০ টাকা মজুরি পায়, সেখানে একজন নারী শ্রমিক পাচ্ছে সর্বোচ্চ ৮০ থেকে ১০০ টাকা। একই কাজ করে পুরুষরা তাদের চেয়ে দ্বিগুণ মজুরি পাচ্ছে।নারীদের কম মজুরী দেয়ার অজুহাতটাও অমানবিক।  এসব নারী শ্রমিক কেউ বিধবা, কেউবা স্বামী পরিত্যক্ত আবার কেউবা অধিক সন্তানের ভারে অসহায়। অভাবে তাড়নায় এক রকম বাধ্য হয়েই অত্যন্ত কম দামে তাদের শ্রম বিক্রি করে চলছে। আর এ নিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজেরও কোনো মাথা ব্যথা নেই, নেই কোনো দায়ও। এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে বরং বলতে চায়; আরও কম দামে নারীশ্রম পেলেও আপত্তি কোথায়।


এদেরই একজন রংপুরের পীরগঞ্জের হালিমা খাতুন। তার সাথে কথা বলে জানা গেল, গরীব ঘরে জন্ম, ছোট বেলা থেকেই মানুষের বাড়িতে বাড়িতে কাজ করে বড় হয়েছে। তখন থেকেই দেখে আসছি এমন; এটাকে নিয়ম বলেই মেনে নিয়েছি। আর আজ হঠাৎ করে বেশি দাম চাইলে কেউ কাজই দিবে না।
কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠে সংসারের কাজ সেরে তারা পৌঁছে যায় তাদের কর্মস্থলে। খাওয়ার সময় নেই, নেই বিশ্রাম। বেঁচে থাকার তাগিদে জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করছে নিরন্তর। নারী শ্রমিকের অধিকাংশই কৃষির বিভিন্ন ক্ষেত্রে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি তাদের কেউ কেউ চাতাল মিলে ধান শুকানো, ভাপানো কিংবা চাল তৈরির কাজ করে থাকেন। আবার কেউ মাটি কাটে, ইট ভাঙে। এত পরিশ্রমের পরেও নারীরা কর্মক্ষেত্রে মজুরী বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।


কৃষকরা বলছে, নারী শ্রমিকরা পুরুষের মত সব কাজ করতে পারে না বিধায় তাদের শ্রমের দাম কিছুটা কম। নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর দাবি, দীর্ঘ দিন ধরে নারীকে কৃষক হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানানো হলেও প্রয়োজনীয় নীতি প্রণয়ন করে নাই। একই সঙ্গে নারীর কৃষক হিসাবে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করার বিষয়টিও আছে। এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করার বিষয়টিও আছে। বিভিন্ন তথ্য মতে, ফসল উৎপাদনে নারীর সক্রিয় অবদান ২৭ ভাগ। অথচ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে পুরুষ কৃষকের জন্য সুনির্দিষ্ট ‘ডাটাবেজ’ তৈরি থাকলেও নারী কৃষকের সেটা নেই। প্রতিদিন সূর্য উদয় থেকে শুরু করে সূর্য অস্তের আগ পর্যন্ত কাজ করে মাত্র ১ ঘণ্টা সময় পাচ্ছে দুপুরের খাবারের জন্য।

 এসব অধিকাংশ নারী শ্রমিকের কাজের জন্য কোনো সুষ্ঠু পরিবেশও নেই। রোদ ও বৃষ্টিতে বসার মতো কোনো জায়গাও নেই তাদের। কৃষিকাজ ও অন্যান্য কাজে নিয়োজিত নারীদের দাবি, নারীকে শ্রম আইনে অর্ন্তভূক্ত করে কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। গ্রামীণ জীবনযাত্রায় স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য প্রচার অভিযান এর ২০১২ সালের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, দেশের মোট নারী শ্রম শক্তির পরিমাণ ১ কোটি ৬২ লাখ। এর মধ্যে ৭৭ শতাংশ গ্রামীণ নারী। যার ৬৮ শতাংশ কৃষি, পোলট্রি, বনায়ন ও মৎস্য খাতের সঙ্গে জড়িত।


বিশ্ব ব্যাংকের ২০০৮ সালের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কৃষি খাতে নিয়োজিত পুরুষের চেয়ে নারীর অবদান শতকরা ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ বেশি। এছাড়া কর্মক্ষম নারীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিয়োজিত আছে কৃষিকাজে। বাংলাদেশ উন্নযন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) এক গবেষণা বলছে,  গ্রামীণ ৪১শতাংশ নারী আলু চাষের সঙ্গে জড়িত।কৃষি কাজে নারীর অবদান থাকা সত্বেও তাদের কৃষক হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে না। এতে এক জন পুরুষ যেসব সুবিধা ভোগ করছে কৃষাণীরা তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের রংপুর জেলার সাধারণ সম্পাদক রুমানা জামান বলেন, স্থানীয়ভাবে যারা এই পেশায় আছে সেই সব নারীদের সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি কৃষকদেরও সচেতন করতে হবে।

দ্রুতই পুনর্গঠন সম্পন্ন করতে চায় বিএনপি

রাজকুমার নন্দী : ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ে ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হলেও এক বছরেও গুছিয়ে উঠতে পারেনি দলটি। কাউন্সিলে অনুমোদিত হলেও প্রকাশ হয়নি বিএনপির গঠনতন্ত্র। পুরোপুরি কার্যকর হয়নি ‘এক নেতার এক পদ’ নীতি। দলের মন্ত্রণালয়ভিত্তিক উপ-কমিটিগুলোও এখনো আলোর মুখ দেখেনি। স্থায়ী কমিটিসহ কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির কয়েকটি পদ এখনো শূন্য রয়েছে। এক বছরেও ডাকা হয়নি বিএনপির নির্বাহী কমিটির বর্ধিত সভা। শেষ হয়নি তৃণমূল পুনর্গঠন প্রক্রিয়াও। কিন্তু তারপরেও কাউন্সিলের এক বছরের অর্জনে সন্তুষ্ট বিএনপি। তবে এসব কমিটি গঠনে ধীরগতির জন্য বিএনপির ওপর ক্ষমতাসীনদের দমন-পীড়ন, হামলা-মামলাকে অনেকাংশেই দায়ী করছে দলটি।

বিএনপির নেতারা বলছেন, দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিসহ ইতোমধ্যে জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল ও জাসাসের কমিটি দেয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগর কমিটিও যেকোনো দিন ঘোষিত হবে। নির্বাচন কমিশন গঠনে একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখাও দেয়া হয়েছে। একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের চেয়ারপারসন শিগগিরই নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের রূপরেখাও দেবেন। এরপর নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে প্রয়োজনে বেগম জিয়া রাজপথেও নামতে পারেন। সেজন্য দ্রুতই পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে চায় বিএনপি।

গত বছর রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে অনুষ্ঠিত বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের দিনই খালেদা জিয়া দলের চেয়ারপারসন এবং তার বড় ছেলে তারেক রহমান সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পুনর্র্নির্বাচিত হন। এরপর ৩০ মার্চ মহাসচিব পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম ঘোষণা করা হয়। কাউন্সিলের সাড়ে চার মাস পর গত ৬ আগস্ট ঘোষণা করা হয় ৫০২ সদস্যের ‘ঢাউস’ জাতীয় কমিটি। তখন ১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটির ১৭ জনের নাম ঘোষণা করে বিএনপি। তবে হান্নান শাহ মারা যাওয়ায় তার পদসহ এখন তিনটি পদ খালি রয়েছে। মৃত্যুজনিত কারণে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের কয়েকটি পদও শূন্য হয়েছে। এছাড়া নির্বাহী কমিটিতে আন্তর্জাতিক সম্পাদকের দুইটি, ছাত্র ও সহ-ছাত্রবিষয়ক দুইটি এবং যুববিষয়ক সম্পাদকের একটি পদ এখনো শূন্য রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দৈনিক করতোয়াকে বলেন, কমিটি গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। সাংগঠনিক এই প্রক্রিয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে না, এটি চলতে থাকে। ইতোমধ্যে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা হয়েছে। কিছু অঙ্গ সংগঠনের কমিটিও হয়েছে, বাকিগুলোও খুব শিগগিরই হবে। জেলা সম্মেলন করছি, কমিটিগুলোও হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে-দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এখন বিএনপির প্রতিকূলে। দলের চেয়ারপারসন থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়া এখনো চলছে। বিএনপিকে যেভাবে নির্যাতন-নিপীড়নের মধ্য দিয়ে নির্মুল করে দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে, সেখানে আমরা যে এখনো সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছি, মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছি, সেটিই বিএনপির সবচেয়ে বড় ভিত্তি, বড় অর্জন। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত যতটুকু কাজ হয়েছে তাতে আমরা সন্তুষ্ট।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনের পর দল পুনর্গঠনে নামে বিএনপি। ওই নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ার পর ৪ ফেব্রুয়ারি বিএনপির চেয়ারপারসন সংবাদ সম্মেলনে দল পুনর্গঠনের ঘোষণা দেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তৃণমূল পুনর্গঠন সম্পন্ন হয়নি। বর্তমানে ৮০টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে এখন পর্যন্ত ৩৪টি জেলায় আংশিক কমিটি হয়েছে। এদিকে, দলে এখন পর্যন্ত এক নেতার এক পদের বিধানও পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। কাউন্সিলের পর নতুন কমিটিতে একাধিক পদধারী ৬১ জন নেতা ছিলেন। তারা কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির পদের পাশাপাশি মহানগর-জেলা-উপজেলা কমিটি অথবা বিএনপির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পদে রয়েছেন। তবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল, ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহানসহ প্রায় অর্ধ-শতাধিক নেতা ইতোমধ্যে একাধিক পদ ছেড়ে দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে বিএনপির তৃণমূূল পুনর্গঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা মো. শাহজাহান দৈনিক করতোয়াকে বলেন, দলে ‘এক নেতার এক পদ নীতি’ কার্যকর শুরু হয়েছে। ১০-১২ জন ছাড়া অন্যরা একটি পদ রেখে বাকিগুলো ছেড়ে দিয়েছেন। শিগগিরই এটি পুরোপুরি কার্যকর হবে।

জানা যায়, কাউন্সিলে গঠনতন্ত্র অনুমোদনের পর তা প্রকাশ করার দায়িত্ব দেয়া হয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানকে। তবে সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকায় তিনি এখন কুমিল্লা সিটি নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত। নির্বাচন শেষে ঢাকায় ফিরলেই দলীয় গঠনতন্ত্র প্রকাশ করা হবে। বিএনপির গঠনতন্ত্র প্রকাশ প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, এটা প্রায় প্রস্তুত হয়ে আছে। কিন্তু একটু সময় লাগছে। আওয়ামী লীগও তো তাদের গঠনতন্ত্র প্রকাশ করেনি। আশা করছি, আমরা শিগগিরই তা প্রকাশ করতে পারব। এদিকে, বিএনপি এখনো মন্ত্রণালয়ভিত্তিক উপ-কমিটিও দিতে পারেনি। গঠনতন্ত্রে ২৬টি উপ-কমিটির কথা রয়েছে। সেখানেও প্রায় ৩০০ নেতার ঠাঁই মিলবে। উপ-কমিটি গঠনের কাজ চলছে জানিয়ে বিএনপির মহাসচিব বলেন, এসব কমিটি গঠনে আমরা ইতোমধ্যে কিছু কাজ করেছি, কিন্তু তা ঘোষণা করা হয়নি। ইতোমধ্যে রিসার্চ সেল গঠিত হয়েছে। বাকি কাজও খুব শিগগিরই সম্পন্ন হবে।

 

 

পঞ্চগড়ের ২০ হাজার নারী পাথর শ্রমিক, জীবনমানের উন্নয়ন হয়নি

সামসউদ্দীন চৌধুরী কালাম, পঞ্চগড় : পাথরের জেলা বলে খ্যাত পঞ্চগড়ে প্রতিদিন কাজ করে অর্ধ লক্ষাধিক পাথর শ্রমিক। এদের মধ্যে প্রায় ২০ হাজার নারী পাথর শ্রমিক রয়েছে। পুরুষ শ্রমিকদের সমান কাজ করে তারা পায় অর্ধেক পারিশ্রমিক। তারপরও এনজিও’র ঋণের কিস্তি আর সংসারের তাগিদে তাদের উদয়াস্ত পরিশ্রম করে যেতে হয়। অথচ নদী ও সমতল ভূমি থেকে পাথর তোলার পর বাছাই করাসহ পাথর ভাঙার কাজের জন্য নারী শ্রমিকরাই একমাত্র ভরসা। কিন্তু এই মজুরিতেই সন্তুষ্ট এখানকার নারী শ্রমিকরা। সারা বছরই তাদের কাজ জোটে। মজুরি একটু কম পেলেও তাদের কোন আপত্তি নেই। এত কিছুর পরও কাজে ফাঁকি দেয়ায় প্রবণতা কম থাকায় পাথর ব্যবসায়ীরা এসকল কাজের জন্য নারী শ্রমিকদেরই বেশি প্রাধান্য দিয়ে আসছে।

পঞ্চগড় জেলার সদর ও তেঁতুলিয়া উপজেলার নদী থেকে পাথর উত্তোলন, সমতল ভূমি থেকে পাথর উত্তোলন, বিভিন্ন সাইজের পাথর বাছাইসহ স্থানীয় ও ভারত থেকে আনা পাথর ভাঙার কাজে নিয়োজিত রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার পাথর শ্রমিক। এদের প্রায় অর্ধেকই নারী শ্রমিক। পুরুষ শ্রমিকরা মূলত পাথর উত্তোলনের কাজ করে থাকে। পাথর বাছাই ও মেশিনে ভাঙানোর কাজ বেশি করে নারী শ্রমিক। পুরুষ শ্রমিক বিভিন্ন অজুহাতে কাজে ফাঁকি দিলেও নারী শ্রমিক শতভাগই তাদের কাজে মনোযোগী। সকাল ৮টার সময় দুপুরের খাবার নিয়ে কাজে আসে তারা। দুপুরের এক ঘন্টার বিরতির মধ্যে বাড়ি থেকে আনা খাবার সেরে সামান্য আয়েশ করেই আবার কাজে লেগে পড়ে। ফাল্গুনের চৈত্রের আগুন ঝরা রোদে তারা কাজ করে চলে অবিচলভাবে। সূর্যাস্তের সামান্য আগে মজুরির টাকা হাতে নিয়ে বাড়িতে ফিরে তারা। প্রতিদিন তাদের কাজ করতে হয় প্রায় ১০ ঘন্টা বা তারও বেশি সময়। অধিকাংশ নারী শ্রমিকের কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ নেই। রোদ-বৃষ্টিতে বসার মত কোন জায়গা নেই, নেই টয়লেটের ব্যবস্থাও। এ যুগে এসেও প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে তাদের যেতে হয় পাশের ঝোপঝাড় বা খানাখন্দকে। অনেক নারী শ্রমিক তাদের শিশু সন্তানকে সাথে করে আনলেও তাদের থাকার মত কোন ব্যবস্থা নেই।

এনিয়ে কথা বললে তেঁতুলিয়ার খয়খাটপাড়া গ্রামের পাথর শ্রমিক আফছানা আক্তার (২৪) বলেন, আমার ১৬ বছর বয়সে বিয়ে হয়। সংসারের অভাবের তাড়নায় বিয়ের দুই বছর পর থেকেই আমি পাথর ভাঙা মেশিনে শ্রমিকের কাজ করে আসছি। সকাল ৮টায় কাজ শুরু করে শেষ করি বিকাল ৬টায়। মাঝখানে এক ঘন্টার খাবার বিরতি দেয় তারা। মেশিন চালু করার পর থেকে বন্ধ করা পর্যন্ত কাজের কোন ফুরসত নেই। এখানে পুরুষদের মজুরি ৪শ’ টাকা করে দেয়া হলেও আমাদের দেয়া হয় ২শ’ ৫০ টাকা।

একই উপজেলার তিরনইহাট গ্রামের পাথর শ্রমিক মর্জিনা বেগম (৪৫) বলেন, আমরা নারী শ্রমিকরা সারাদিন যে কাজ করি পুরুষ শ্রমিকরা তা করে না। অথচ আমরা তাদের চেয়ে মজুরি পাই প্রায় অর্ধেক। আমাদের মালিক আমাদের দিয়ে লাখ লাখ টাকা ইনকাম করলেও আমাদের মজুরি বাড়াতে তাদের কষ্ট হয়। আমি যে মেশিনে কাজ করি সেখানে ১২ জন শ্রমিক রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র দুইজন পুরুষ শ্রমিক। বাকিরা সবই নারী শ্রমিক। পুরুষ শ্রমিকদের চেয়ে আমরা কাজ বেশি করলেও আমাদের পারিশ্রমিক দেয়া হয় তাদের অর্ধেক।
এ প্রসঙ্গে কথা হয় পাথর ভাঙা মেশিনের মালিক সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের সাথে। তিনি বলেন, আমার সাইডে ১৪ জন শ্রমিক কাজ করে। এদের মধ্যে ১০ জনই নারী শ্রমিক। নারীরা পুরুষের সমান কাজ করে স্বীকার করে তিনি বলেন, সবাই নারী শ্রমিকের মজুরি কম দেয়। আমি পুরুষ শ্রমিকদের ৪শ টাকা ও নারী শ্রমিকদের ৩শ টাকা করে মজুরি দেই। তার যদি কৃষি জমিতে কাজ করত তাহলে সর্বোচ্চ একশ ৫০ টাকা মজুরি পেত। আবার জমিতে সারাবছর কাজ থাকে না। আমার সাইডে সারাবছরই কাজ চলে। আমার এখানে তারা কাজের নিশ্চয়তা পায়। 



Go Top