বিকাল ৪:১০, শুক্রবার, ২৮শে এপ্রিল, ২০১৭ ইং
/ বিশেষ প্রতিবেদন

শেখ তৌফিক হাসান, সুজানগর (পাবনা) : চলতি শুষ্ক মৌসুমে পাবনার সুজানগরের অধিকাংশ খাল-বিল এবং নদী-নালা শুকিয়ে চৌচির হয়ে গেছে। এতে উপজেলার মৎস্যজীবীরা তাদের নৌকা রক্ষা করা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। সেই সাথে খাল-বিল এবং নদী-নালা শুকিয়ে যাওয়ায় মৎস্যজীবীরা বেকার হয়ে পড়েছেন। এদের মধ্যে ২/৪জন স্বচ্ছল মৎস্যজীবী দূর-দূরান্তের মৎস্য খামার বা নদী-নালার মাছ কিনে এনে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করলেও বেশিরভাগ মৎস্যজীবী তা পারছেন না।

উপজেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ঐতিহাসিক গাজনার বিলসহ উপজেলায় ছোট-বড় ২০/২৫টি খাল-বিল এবং নদী-নালা রয়েছে। আর উপজেলার প্রায় ৩হাজার মৎস্যজীবী এসব খাল-বিল এবং নদী-নালায় নৌকা চালিয়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। কিন্তু চলতি শুষ্ক মৌসুমে ঐতিহাসিক গাজনার বিলসহ উপজেলার অধিকাংশ খাল-বিল এবং নদী-নালা শুকিয়ে গেছে। এমনকি গ্রামগঞ্জে ব্যক্তি পর্যায়ে খনন করা বেশিরভাগ পুকুরও পানিশূন্য। ফলে যে সকল মৎস্যজীবী ওই সকল খাল-বিলে নৌকার সাহায্যে মাছ ধরে থাকেন তারা তাদের নৌকা রক্ষা করা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। উপজেলার বাদাই গ্রামের ভুক্তভোগী মৎস্যজীবী সমির কুমার জানান, আমরা মৎস্যজীবীরা নৌকার সাহায্যে খাল-বিলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে থাকি। কিন্তু বর্তমানে উপজেলার খাল-বিল শুকিয়ে যাওয়ায় নৌকা রাখার মত পানি পাচ্ছিনা। ২/৪ জন মৎস্যজীবী আশপাশের পুকুরে তাদের নৌকা ডুবিয়ে রক্ষা করতে পারলেও বেশিরভাগ নৌকা শুকিয়ে যাওয়া খাল-বিলে পড়ে নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি খাল-বিল শুকিয়ে যাওয়ায় মাছ ধরতে না পেরে বেশিরভাগ মৎস্যজীবি তাদের পরিবারপরিজন নিয়ে অত্যন্ত কষ্টে দিনাতিপাত করছে বলেও ভুক্তভোগীরা জানান।

অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়া বগুড়া প্রি-ক্যাডেট হাই স্কুল

স্টাফ রিপোর্টার : অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে বগুড়া প্রি-ক্যাডেট হাই স্কুল। শহরের অভিজাত জলেশ্বরীতলা এলাকায় প্রায় চার দশক আগে প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইতিপূর্বে শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে সুনাম অর্জন করলেও পরিচালনা কমিটির সাবেক এবং বর্তমান সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকের দুর্নীতি এবং অনৈতিক কর্মকান্ডের কারণে এখন প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তিই সংকটে পড়েছে। স্কুলটিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য সরকারি হস্তক্ষেপ চেয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন জানানো হয়েছে।

গত ২৩ এপ্রিল করা ওই আবেদনে বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে সরকারি পর্যায়ে এডহক কমিটি গঠনের পাশাপাশি সাবেক ও বর্তমান সভাপতি এবং প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ এনে এর তদন্তের অনুরোধ জানানো হয়েছে। জলেশ্বরীতলা এলাকাবাসী, প্রি-ক্যাডেট হাইস্কুলের শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের পক্ষে জনৈক তোজাম্মেল হোসেন স্বাক্ষরিত আবেদনের অনুলিপি বগুড়ার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং জেলা শিক্ষা অফিসারের দপ্তরেও পাঠানো হয়েছে। আবেদনের অনুলিপির সঙ্গে ইতিপূর্বে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনও সংযুক্ত করা হয়েছে। প্রি-ক্যাডেট হাই স্কুলের প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালনা কমিটির অন্যতম সদস্য বগুড়া পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান এড. রেজাউল করিম মন্টু অভিযোগ করেছেন, অনিয়ম-দুর্নীতিতে নিমজ্জিত স্কুলটিকে নানা ধরনের অনৈতিক কর্মকান্ডের আখড়ায় পরিণত করা হয়েছে। রাতে সেখানে মাদকসেবী আর সন্ত্রাসীদের আসর বসে। প্রতিষ্ঠাকালীন অপর সদস্য বগুড়া বারের সিনিয়র আইনজীবী এড. রফিকুল ইসলাম লাল জানিয়েছেন, অভিজাত এলাকার স্কুলটিকে সবার চোখের সামনে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কেউ যেন দেখেও দেখছে না।

তারা বলেন, যদি এখনই কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয় তাহলে হয়তো আগামীতে স্কুলটিকে আর কোনভাবেই রক্ষা করা সম্ভব হবে না। অভিযোগকারীদের অনেকের মতে প্রতিষ্ঠানটিতে অনিয়ম ও দুর্নীতি কতটা সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে তা অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক জহুরুল আলমকে স্বপদে বহাল রাখার মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়ে গেছে। এলাকাবাসীর পক্ষে করা লিখিত অভিযোগ এবং ২০১৫ সালের ৪ এপ্রিলে দাখিল করা তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি টাকারও বেশি অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পরেও প্রধান শিক্ষক জহুরুল আলমকে স্বপদে বহাল রাখা হয়েছে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর প্রি-ক্যাডেট হাই স্কুল পরিচালনা কমিটির তৎকালীন সভাপতি তাইজুল ইসলাম রোম অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক জহুরুল আলমকে ২০১৪ সালের ২০ আগস্ট সাময়িক বরখাস্ত করলেও মাত্র ১৬ দিন পর তাকে আবার স্বপদে বহাল করেন।

প্রি-ক্যাডেট হাইস্কুল পরিচালনা কমিটির তৎকালীন সদস্য মোঃ আজিজুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত ৩ সদস্যের কমিটির  প্রতিবেদন অনুযায়ী অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক জহুরুল আলমের বিরুদ্ধে মোট ১ কোটি ৬ লাখ ৮১ হাজার ৩৯৮ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া যায়। তাকে স্বপদে বহাল করার কারণ হিসেবে তদন্ত কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রধান শিক্ষক জহুরুল আলম ২০১৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর স্বপদে বহালের আবেদন করেন। পরে ওই স্কুলের ১৭জন শিক্ষক-শিক্ষিকাও তাকে স্বপদে বহালের আবেদন জানান। তারপরই তাকে স্বপদে বহাল করা হয়। অবশ্য দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার কারণ দেখিয়ে ২০১৫ সালের ১৮ মার্চ তাকে আর একবার সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু কিছুদিন পর আবারও তিনি স্বপদে বহাল হন। পরবর্তীতে সভাপতির পদ থেকে তাইজুল ইসলাম রোম দায়িত্ব থেকে সরে গেলে ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে নাসিমুল বারী নাসিম নতুন সভাপতি মনোনীত হন।

আগের সভাপতির মত বর্তমান সভাপতিও প্রধান শিক্ষক জহুরুল আলমের দুর্নীতির ব্যাপারে নির্বিকার বলে অভিযোগ। তদন্তে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্থায়ীভাবে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে বরং তাকে বার বার স্বপদে বহাল রাখায় সাবেক সভাপতি তাইজুল ইসলাম রোমের ভূমিকা নিয়ে সে সময় প্রশ্ন উঠেছিল। এমনকি বর্তমান সভাপতি নাসিমুল বারী নাসিম সেই একই পথের যাত্রী হওয়ায় তার ভূমিকাও সমানভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক সভাপতি তাইজুল ইসলাম রোম কোন না কোনভাবে সুবিধা পাওয়ার জন্য প্রধান শিক্ষক জহুরুল আলমের দুর্নীতির বিষয়ে নীরব ছিলেন। আর বর্তমান সভাপতি নাসিমুল বারী নাসিম প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন করে যে অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন তা এলাকাবাসীর পক্ষে করা লিখিত অভিযোগ থেকেই উঠে এসেছে।

দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও প্রধান শিক্ষককে স্বপদে বহাল রাখার কারণ জানতে চাইলে প্রি-ক্যাডেট হাইস্কুলের সাবেক সভাপতি তাইজুল ইসলাম রোম করতোয়া’কে বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে কি রাজনৈতিক চাপের কারণে আমি সে সময় প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নিতে পারিনি। তার বিরুদ্ধে ২০১৪ সালে স্কুল ফান্ডের ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে একটি মামলা করেছি। পরবর্তীতে মামলাটি দুদকে পার করা হয়। বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে’। তার মেয়াদকালে স্কুলের মাঠ সংকুচিত করে দোকান ঘর নির্মাণ করা ঠিক হয়নি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘এসব ক্ষেত্রে যে বোর্ড থেকে অনুমোদন নিতে হয় সেটা আমার জানা ছিল না। সেই হিসেবে বলতে পারেন আমার ওই পদক্ষেপ ভুল ছিল।’ অবশ্য তার সময়ে শিক্ষক নিয়োগে কোন বাণিজ্য হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমার সময়ে যথাযথ নিয়ম মেনেই যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে কোন অনিয়ম হয়নি।’

বর্তমান অবস্থা : এলাকাবাসীর পক্ষে লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, সাবেক সভাপতি তাইজুল ইসলাম রোম, বর্তমান সভাপতি নাসিমুল বারী নাসিম এবং প্রধান শিক্ষক জহুরুল আলম দুর্নীতি, অনিয়ম এবং অনৈতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে স্কুলটিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে বর্তমানে মাদক, সন্ত্রাস ও অসামাজিক কার্যকলাপের একটি স্থানে পরিণত করেছে। ওই স্কুলে গেল পাঁচ বছরে সংঘটিত অনিয়ম, দুর্নীতি এবং নানা ধরনের অনৈতিক কর্মকান্ডের বিবরণ তুলে ধরে বলা হয়েছে, ‘সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরের উদাসীনতা এবং ন্যুনতম নিয়মতান্ত্রিক পর্যবেক্ষণের অভাবে এক সময়ের স্বনামধন্য বিদ্যালয়টি আজ দুর্নীতি অনিয়ম এবং সীমাহীন অনৈতিকতায় বগুড়া জেলা, বিভাগ তথা দেশে উদাহরণ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে।’ শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর দাখিল করা লিখিত অভিযোগে নাসিমুল বারী নাসিমকে একাধিক মামলার আসামী উল্লেখ করে তাকে প্রি-ক্যাডেট হাইস্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব প্রদানের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বলা হয়েছে, সাবেক সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকের অপকর্ম চাপা দিতেই তাকে সভাপতি করা হয়েছে। ওই অভিযোগপত্রে উল্লে­খ করা হয়েছে নতুন সভাপতি যোগদানের পরেই স্কুলের মূল্যবান গাছ ও সীমানা প্রাচীরের ইট বিক্রি এবং তিনতলা বাণিজ্যিক ভবনের অগ্রিম ভাড়া বাবদ ৫ লাখ টাকা ও নতুন চুক্তি সৃষ্টি করে ৭ লাখ টাকা গ্রহণ, ম্যানেজিং কমিটি কর্তৃক নিয়োগ বন্ধের নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ ও আত্মীয়করণের মাধ্যমে কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। স্কুলের প্রধান ফটক ও মাঠ ছোট করে আবারো বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ভাড়া, বৈধ অনুমোদন ছাড়া ৩টি দোকানঘর নির্মাণ শুরু করা হয়েছে। ওই দোকানঘর বাবদ প্রায় ২৪-২৫ লাখ টাকা জামানত গ্রহণ করে যা স্কুলের ফান্ডে জমা দেয়া হয়নি। প্রধান শিক্ষক এসবের অনুমতি দিয়ে আসছে আগের মতই।

এছাড়া ওই অভিযোগপত্রে আরও উল্লে­খ করা হয়েছে বর্তমান সভাপতি কোনো নিয়মনীতি না মেনে ম্যানেজিং কমিটির মিটিং করে পরে উপস্থিতির স্বাক্ষর নেন। শিক্ষকদের বেতন কমিয়ে শিক্ষার্থীদের বেতন বৃদ্ধিরও অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া স্কুলের দ্বিতীয় তলায় সভাপতির অত্যাধুনিক কক্ষ করে তাতে এসি ও সিসি ক্যামেরা বসানোর অভিযোগের উল্লে­খ রয়েছে। বর্তমান সভাপতি নাসিমুল বারী নাসিমের কাছে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো নিয়ে কথা বলতে গেলে তিনি ‘করতোয়া’ কে বলেন, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একটি পবিত্র স্থান। এখানে দুর্নীতি বা কোনো অনিয়ম করা হয়নি। স্কুলের মাঠও সংকোচন করা হয়নি। যা কিছু করা হয়েছে সবই স্কুলের স্বার্থে ও উন্নয়নের জন্য। এই প্রতিষ্ঠানে বাইরে থেকে কোনো অনুদান আসে না। অথচ অর্ধশতাধিকের বেশি রয়েছে শিক্ষক-কর্মচারী। শিক্ষার্থীদের বেতন থেকে যে আয় আসে তা দিয়ে বেতন হয় না। এছাড়া স্কুলের বিদ্যুৎ বিলসহ অন্যান্য খরচ রয়েছে। সে সব খরচ বহনের জন্য দোকানঘর নির্মাণ করা হচ্ছে।

যে জায়গায় দোকানঘর নির্মাণ করা হচ্ছে ওই জায়গাটি খালিই পড়ে ছিল। ওখানে এ্যাসেম্বলী করা হতো না। আগে স্কুলের কোনো নিরাপত্তা ছিল না। যখন-তখন শিক্ষার্থীরা বের হয়ে অযথা ঘোরাফেরা করতো। অভিভাবকদের বসার জায়গা ছিল না। কিন্তু আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর স্কুলের গেটটি ঠিক করেছি। গেটের বাইরে অভিভাবকদের বসার জন্য সুন্দর ব্যবস্থা করেছি। ম্যানেজিং কমিটির সাথে একাধিকবার আলোচনা করেই দোকানঘর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই খাতে যে অগ্রিম টাকা নেওয়া হয়েছে তা স্কুল ফান্ডেও জমা দিয়েছি। বোর্ড থেকে যদি তদন্তে আসে তবেই দেখতে পাবে টাকা কি করা হয়েছে।’ ম্যানেজিং কমিটি কর্তৃক নিয়োগ বন্ধের নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি কোনো শিক্ষক নিয়োগ দেইনি।

তবে প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনেই খন্ডকালীন ২ জন শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে।’ এক্ষেত্রে কোনো রকম বাণিজ্য হয়নি। স্কুলে সন্ধ্যার পর সন্ত্রাসী ও মাদকসেবীদের আড্ডার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করে বলেন, ‘স্কুলের খুঁটিনাটি অনেক কাজ থাকে। দিনের বেলা পাঠদান চলে, সেই সময় মিস্ত্রিরা কাজ করলে শিক্ষার্থীদের মনোযোগের অসুবিধা হয়। এ কারণে স্কুলে প্রায় রাত ১০টা পর্যন্তথেকে এ কাজগুলো করে নেই। আর যেহেতু আমি একটি রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত, তাই আমার দলের কোনো কোনো কর্মী এসে আমার সাথে আলোচনা সেরেই আবার চলে যায়। তারা কেউ সন্ত্রাসী বা মাদকসেবী নয়’। স্কুলের ভিতরে তার জন্য ভিন্ন একটি কক্ষ থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘স্কুলটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্যই অধিকাংশ সময় স্কুলে কাটাতে হয়। এসিসহ ওই কক্ষের বেশকিছু আসবাবপত্র আমার ব্যক্তিগত অর্থে কেনা হয়েছে’। স্কুল থেকে তিনি কোনো বাড়তি সুবিধা নিচ্ছেননা বলেও দাবি করেন। প্রধান শিক্ষকের দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর তার কোনো দুর্নীতি আমার চোখে পড়েনি। আর তাকে দুর্নীতির দায়ে যে দু’বার সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল, দু’বারই আগের সভাপতি অনিয়মতান্ত্রিকভাবে করেছেন।’ বোর্ড থেকে তদন্ত কমিটি এসেও তার কোনো দুর্নীতি প্রমাণ করতে পারেননি উল্লেখ করে বর্তমান সভাপতি বলেন, প্রধান শিক্ষক যদি সত্যিই দুর্নীতি করে থাকেন, সেটা বোর্ড তদন্ত করে তারাই তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।’ তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকার বিষয়ে আনা অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘শত্রুতা করে এসব মামলা করা হয়েছে। কোন মামলাতেই আমি এখনও দোষী সাব্যস্ত হইনি।’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, সব সভাই তিনি নিয়মতান্ত্রিকভাবে করেছেন।

ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক জহুরুল আলমের কাছে তার বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করে বলেন, ‘সাবেক সভাপতি শত্র“তামূলক আমার নামে স্কুল ফান্ডের ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের দায়ে দুদকে মামলা করেছেন। দুই-দুইবার বরখাস্ত করেছেন। আমি ১০ লাখ টাকা নিয়েছিলাম বাড়ি তৈরি করার জন্য, তা শোধও করেছি। তারপরও তিনি আরও টাকা দাবি করছিলেন, আমি দিতে রাজি না হওয়ায় তিনি এসব করেছেন। এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটিও গঠন হয়েছিল, কিন্তু তারাও তো কোনো কিছু পায়নি’। স্কুলের মাঠ সংকোচন করে দোকান ঘর নির্মাণের বিষয়টি তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছুই বলবো না। মাঠের সংকোচন-বিয়োজন যা কিছুই হচ্ছে, সব ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্তেই হচ্ছে। যেহেতু ম্যানেজিং কমিটির হাত ধরেই আমি স্কুলে যোগদান করেছি, তাই এই বিষয়ে কিছু বলার আমার নেই।’ তিনি স্বীকার করেন যে শিক্ষকদের বেতন কিছু কমানো হলেও শিক্ষার্থীদের বেতন বাড়ানো হয়নি। বরং কিছু কমানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। অপরদিকে স্কুলের শিক্ষক প্যাটার্ণ সম্পর্কে জহুরুল আলম বলেন, স্কুলের মোট শিক্ষক কর্মচারী রয়েছে ৫২ জন। এরমধ্যে ৩৮ জনই এমপিওভুক্ত। ২৯ জন পাওনা শিক্ষকের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ২৮ জন। এরমধ্যে ২৬ জনই এমপিওভুক্ত।

লাইব্রেরিয়ান ২ জনের মধ্যে এক জন এমপিওভুক্ত, অফিস সহকারি পদে ২ জনই এমপিওভূক্ত, চতুর্থ শ্রেণীর ১২ জন কর্মচারীর মধ্যে ৯ জন এমপিও ভূক্ত। এছাড়া খন্ডকালীন শিক্ষক রয়েছে ৭ জন এবং খন্ডকালীন অফিস সহকারি রয়েছে ১ জন। প্রতিষ্ঠানটির ফলাফল সম্পর্কে তিনি জানান, দিন দিন ফলাফল ভাল হচ্ছে। ২০১০ সালে এসএসসি পরীক্ষায় যেখানে মাত্র ৫ জন জিপিএ-৫ পেয়েছিল, ২০১২ তে সেখানে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪২ জন এবং সর্বশেষ ২০১৬ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬৩ জন। প্রধান শিক্ষক জহুরুল আলমের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে সাবেক সভাপতি তাইজুল ইসলাম রোম রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে একটি অভিযোগ দাখিল করেছিলেন। ওই অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ২১ মে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড থেকে বগুড়া জেলা শিক্ষা অফিসার গোপাল চন্দ্র সরকারের কাছে একটি চিঠি দেওয়া হয়।

ওই চিঠিতে বগুড়া প্রি-ক্যাডেট স্কুলের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগটি তদন্ত করে জেলা শিক্ষা অফিসারের সুস্পষ্ট মতামত চেয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। এই বিষয়ে গোপাল চন্দ্র সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘বোর্ড থেকে ওই চিঠি পাওয়ার পর আমি অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকসহ ম্যানেজিং কমিটিকে দুই-তিন দফা চিঠি দিয়ে মিটিং আহবান করেছিলাম। প্রতিটি মিটিংয়েই প্রধান শিক্ষক বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে অনুপস্থিত ছিলেন। এক পর্যায়ে সে সময়ের সভাপতি নিজেদের মধ্যে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলবেন আশ্বাস দেন। তাই আর আমি অগ্রসর হইনি। মূলত ম্যানেজিং কমিটির সাথে দুর্নীতি ও অনিয়মের আঁতাত করেই প্রধান শিক্ষক ওখানে টিকে আছেন’। এই বিষয়ে তিনি বোর্ডকে কি মতামত দিয়েছেন, জানতে চাইলে গোপাল চন্দ্র সরকার বলেন, ‘যেহেতু বোর্ড পরবর্তীতে আমাকে আর চিঠি দেয় নি, তাই আমিও কিছু জানাইনি, অর্থাৎ অমিমাংসিত রয়েছে বিষয়টি’।  স্কুলের জায়গা সংকোচন করে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ম্যানেজিং কমিটি করতে পারে কি-না এই বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা শিক্ষা অফিসার বলেন, শিক্ষার্থীদের পাঠদানসহ অন্যান্য বিষয়ে যদি কোনো অসুবিধা না হয় তবে স্কুলের উন্নয়নের জন্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়তে পারেন। তবে তার আগে অবশ্যই বোর্ডকে জানাতে হবে। বোর্ড কর্তৃপক্ষ এসে জায়গা পর্যবেক্ষণ করে অনুমোদন দিলে তবেই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা যাবে। স্কুলে সভাপতির আলাদা কক্ষ থাকার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জেলা শিক্ষা অফিসার বলেন, সভাপতির আলাদা কক্ষ থাকার কোন সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। তবে বিধি মোতাবেক প্রধান শিক্ষকের কক্ষেই ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির  চেয়ার থাকার নিয়ম রয়েছে।

 

তৃণমূলের অন্তর্কোন্দল মেটাতে আওয়ামী লীগের তৎপরতা শুরু

মাহফুজ সাদি: দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের তৃণমূলে অন্তর্কোন্দল বিরাজ করছে। অভ্যন্তরীণ সেই দ্বন্দ্বের জেরে সহিংসতা ও প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটছে। এ নিয়ে প্রায়ই নেতিবাচক সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে আওয়ামী লীগ। আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে দলটি। এজন্য বিরাজমান দ্বন্দ্বের কারণ অনুসন্ধান করে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদকরা। এর সাথে তারা বিরোধ নিষ্পত্তির সুপারিশমালাও দিয়েছেন। সেই আলোকে তৃণমূল নেতাদের কেন্দ্রে ডেকে সমাধানের তৎপরতা আজ রোববার থেকে শুরু হচ্ছে। কোন্দলপূর্ণ জেলার নেতাদের ঢাকায় ডেকে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কথা বলবেন। আওয়ামী লীগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, আজ রোববার থেকে শুরু হচ্ছে ধারাবাহিক বৈঠক। এদিন চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলার নেতাদের সাথে কোন্দল নিরসনের জন্যে বসবেন দলের সাধারণ সম্পাদক। আগামীকাল সোমবার ডাকা হয়েছে যশোর জেলার নেতাদের। মঙ্গলবার সাতক্ষীরা জেলার নেতাদের ডাকা হবে। তারপর নীলফামারীর নেতাদেরকে ডাকা হয়েছে ২৭ এপ্রিল। এরপর ধারাবাহিকভাবে ডাকা হবে কোন্দলপূর্ণ অন্যান্য জেলার নেতাদেরকেও।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক দৈনিক করতোয়াকে বলেন, টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার কারণে কিছু জেলায় দলের নেতাকর্মীদের মতবিরোধ, দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। এর ফলে সহিংস ও প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। দলীয় প্রধানের নির্দেশ মতো দ্বন্দ্বের কারণ অনুসন্ধান করে সমাধান বের করার জন্য আমারা প্রতিবেদন ও সুপারিশ দলের সম্পাদকমন্ডলীর জমা দিয়েছি। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন জেলার নেতাদের কোন্দলের মূলে রয়েছে নেতৃত্বের দ্বন্দ, আধিপত্য বিস্তার, জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত স্বার্থ ইত্যাদি। এর ফলে তারা প্রায়ই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। দলীয় কোন্দলের কারণে বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতাই শুধু নয়, জনপ্রিয়তার লড়াইয়ে হার হয়েছে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের। আওয়ামী লীগের নেতারা জানান, কয়েকটা সাংগঠনিক জেলায় সমস্যা সমাধান করা গেলেও কিছু জায়গায় এখনও সমাধান করা যায়নি। আর বেশি বিরোধপূর্ণ জায়গার সমস্যা সমাধানের জন্য তারা কেন্দ্রীয় কমিটির দ্বারস্থ হয়েছেন। এখন কেন্দ্রীয় কমিটিই তা সমাধান করবে।

সূত্রমতে, কোন্দলের কারণে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনসহ সিলেটের ওসমানীনগর, সুনামগঞ্জের জগন্নাথগঞ্জ এবং কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হেরেছেন বিএনপির প্রার্থীর কাছে। তিনটি উপজেলাতেই ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ভুগিয়েছে নৌকার প্রার্থীকে। দলের দুই নেতার সম্মিলিত ভোট তিনটি এলাকাতেই বিজয়ী বিএনপি প্রার্থীর দেড়গুণ বা তার চেয়ে বেশি ছিল। এরপর জেলা পর্যায়ের কোন্দলের বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে কাজ শুরু করে আওয়ামী লীগ। সূত্র জানায়, আগামী জাতীয় নির্বাচনের সময় দলে শৃঙ্খলা না থাকলে বিরোধী পক্ষ সুযোগ নেবে-এই আশঙ্কা থেকেই মাঠে নামে ক্ষমতাসীন দল। আর এই প্রক্রিয়ায় সুফলও মিলেছে। সদ্য সমাপ্ত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ১৫২ টি এলাকার মধ্যে অল্প কিছু এলাকা ছাড়া সবগুলোতেই জিতেছে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, দেড়শ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ছিল টেস্ট কেইস। এখানে আওয়ামী লীগের কোন্দল ছিল না। এবং নির্বাচনের ফল প্রমাণ করেছে, আওয়ামী লীগ একাট্টা হলে এই মুহূর্তে নির্বাচনে কোনো দল হারাতে পারবে না। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, বিরোধপূর্ণ সাংগঠনিক জেলার নেতাদের ঢাকায় ডাকা হয়েছে। ঢাকা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, আগামী নির্বাচনের জন্য দলের তৃণমূলকে শক্তিশালী করতে আমরা কাজ করছি। এর অংশ হিসাবে যেসব ইউনিটের কমিটি নেই, সেগুলো দ্রুত সম্পন্ন করতে আমরা সংশ্লিষ্ট জেলা ইউনিটকে তাগাদা দিচ্ছি।

খুলনা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, সংগঠনকে অধিক শক্তিশালী ও গণমুখী করা ছাড়া আগামী নির্বাচনে ভালো ফলাফল করা সম্ভব নয়। তাই দলের কোন্দল নিরসন করেই আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে। সবাই এক সাথে নিয়ে কাজ করতে আমরা চেষ্টা করছি। দলের স্বার্থে সবাই সকল দ্বন্দ্ব ভুলে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন। গত বুধবার আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে সম্পাদকমণ্ডলীর এক সভায় এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন ওবায়দুল কাদের। ওই সভায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকরা দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগের কয়েকটি জেলার উপর সাংগঠনিক প্রতিবেদন তুলে ধরেছেন ওবায়দুল কাদেরের সামনে। এর প্রেক্ষিতে ওবায়দুল কাদের পাঁচ জেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্ট জেলার থানার নেতাদের ঢাকায় ডেকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

 

ঠাকুরগাঁওয়ে লাভবান হন মধ্যস্বত্বভোগীরা

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি : সরকার প্রতিবারই ধান-চাল ও গমের মূল্য নির্ধারণ করে যখন কৃষকের ঘরে ফসল থাকে না। কিন্তু কোন দিনও সরকারি মূল্যে কোথাও ধান ও গম দিতে পারিনি। মাঠ থেকে ফসল কেটেই বাজারে বিক্রি করি। আর যখন সরকারি দাম নির্ধারণ হয় তখন ফসল থাকে না ঘরে। তাই কার্ড বাধ্য হয়েই নেতা ও ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করে দেই। এভাবেই কথাগুলো বলেছিলেন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা রুহিয়া এলাকার কৃষক মিনহাজুল ইসলাম।


চলতি বছরে ১৬ লাখ মেট্টিক টন খাদ্যশস্য ক্রয় করবে সরকার। এর মধ্যে ২৪ টাকা কেজি দরে সাত লাখ মেট্টিক টন ধান, ৩৪ টাকা কেজি দরে সাত লাখ মেট্টিক টন সিদ্ধ চাল, ৩৩ টাকা কেজি দরে এক লাখ মেট্টিক টন আতপ চাল ও ২৮ টাকা কেজি দরে এক লাখ মেট্টিক টন গম কেনা হবে। এই দাম নির্ধারণ করায় উৎপাদন খরচ উঠবে বলে আশায় বুক বাঁধেন কৃষকরা।


 মৌসুমের শুরুতেই সরকারের মূল্য ঘোষণায় খুশির হলেও ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে শঙ্কিত ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষক। তাই ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয়ের সরকারি     ঘোষণা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন এ জেলার কৃষকরা। জেলা খাদ্য বিভাগ জানায়, ঠাকুরগাঁওয়ে জেলায় এবার গমের বরাদ্দ পাওয়া গেছে ১৭ হাজার ৯১৭ মেট্টিক টন। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৫ হাজার ৪শ’ মেট্টিক টন গম। কৃষক ইউসুফ আলী জানান, প্রতিবার সরকার কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান ও গম ক্রয়ের ঘোষণা দিলেও বাস্তবে তা করা হয় না।

 

 এর ফলে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়। আর লাভবান হন মধ্যস্বত্বভোগীরা। রায়পুর এলাকার তৈয়বুর রহমান জানান, বেশ ক’বছর থেকেই কৃষকরা ধানের মূল্য পাচ্ছে না। পাশাপাশি উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ধান আবাদ করে লোকসান গুনতে হয়েছে তাদের।

 

সরকার যখন দাম নির্ধারণ করে তখন নেতারাই সব ভাগাভাগি করে নিয়ে নেয়। এবারও যাতে তাদের লোকসান না হয়, সে জন্য সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে গম ও ধান সংগ্রহের দাবি কৃষকদের। ঠাকুরগাঁও চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হাসান রাজু জানান, সরকারের এ উদ্যোগে কৃষকরা ন্যায্য দাম পাবে। কিন্তু কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ক্রয় না করলে উৎপাদনের খরচও উঠবে না।


ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক মাসুদুদুল হক জানান, সরকার ধান, চাল ও গমের যে মূল্য নির্ধারণ করেছে তা যদি সঠিক ভাবে বাস্তবায়ন হয় কৃষক তার উৎপাদিত মূল্যের নায্য দাম পাবে।জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আশরাফুজ্জামান জানান, আমরা বরাদ্দের কাগজ পাওয়ার পর জেলা খাদ্য কমিটির সভায় আলোচনা করেছি। সম্প্রতি আমরা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান, গম ও চাল ক্রয় অভিযান শুরু করব।

 

ঠাকুরগাঁও জেলা খাদ্য কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক আব্দুল আওয়াল জানান, সরাসরি যেন কৃষকের কাছ থেকে ধান, গম ও চাল ক্রয় করা হয় সে কারণে খাদ্য বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। না হলে সরকারের এই মহৎ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। শিগগিরই ক্রয় অভিযানের উদ্বোধন করা হবে।

আন্দোলন ও নির্বাচন প্রস্তুতিতে তৃণমূলে বিএনপির ৪০ টিম

রাজকুমার নন্দী : দ্বন্দ্ব-কোন্দল নিরসন করে তৃণমূলে সংগঠনকে শক্তিশালীকরণ ও সরকারি মামলা-হামলায় জর্জরিত নেতা-কর্মীদের চাঙ্গা করতে সাংগঠনিক সফরে যাচ্ছে বিএনপি। নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ে প্রয়োজনে ভবিষ্যতে আবারও আন্দোলনে যেতে চায় দলটি। একইসঙ্গে আগামী নির্বাচনের জন্যও প্রস্তুতি নিতে চায় বিএনপি। এ লক্ষ্যে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নির্দেশে কেন্দ্রীয় নেতাদের নেতৃত্বে ইতিমধ্যে ৪০টি দল (টিম) গঠন করা হয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও যুগ্ম-মহাসচিবদের টিম লিডার করা হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের নিজ জেলার বাইরের টিমের প্রধান করা হয়েছে। এসব টিমের নেতারা দেশব্যাপী ৮০টি সাংগঠনিক জেলা সফর করবেন।

গত মঙ্গলবার বিএনপির কেন্দ্রীয় দফতর থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত টিম প্রধানের কাছে এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠি অনুযায়ী আজ শনিবার থেকে এই সাংগঠনিক সফর শুরু হবে, যা আগামী ৭ মে পর্যন্ত চলবে। সফর শেষে টিম লিডাররা বিএনপির কেন্দ্রীয় দফতরে সংশ্লিষ্ট জেলার সার্বিক পরিস্থিতির ওপর সাংগঠনিক প্রতিবেদন জমা দেবেন। পরে সব প্রতিবেদন সমন্বয় করে একটি সার্বিক প্রতিবেদন তৈরি করে দলীয় চেয়ারপারসনের কাছে দেয়া হবে। বিএনপি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।    

সাংগঠনিক সফর প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগরের দায়িত্বপ্রাপ্ত টিমের প্রধান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দৈনিক করতোয়াকে বলেন, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি- সাংগঠনিক ব্যাপারে কাজ করার জন্য বিভিন্ন জেলায় আমাদের দলের নেতারা যাবেন। আর সফর শেষে সংশ্লিষ্ট জেলার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে কেন্দ্রের কাছে জমা দেবেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা ও মহানগরে দ্রুতই কার্যক্রম শুরু করবেন বলে জানান তিনি।

জানা যায়, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে সফরে নেতাদের করণীয় সম্পর্কে বেশকিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এতে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট জেলার নেতাদের নিয়ে কর্মিসভা করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কর্মিসভার দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা এবং বিভাগীয় সাংগঠনিক ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকদের তা অবহিত করতে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট জেলার সব কেন্দ্রীয় নেতাকে টিমে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে চিঠিতে। জেলার উদ্যোগে এসব কর্মিসভায় টিম প্রধানদের দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দলের অবস্থান ও দলের ঐক্য সম্পর্কে বক্তব্য রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

বিএনপির মহাসচিব স্বাক্ষরিত সাংগঠনিক সফর সংক্রান্ত চিঠি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন রাজশাহী জেলা ও মহানগরের দায়িত্বপ্রাপ্ত টিমের প্রধান ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে দ্রুত তার কার্যক্রম শুরু করবেন বলে জানান। ফেনি জেলা টিমের দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালীও দ্রুত সংশ্লিষ্ট এলাকায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান।

ভবিষ্যৎ আন্দোলন ও আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হওয়াই সাংগঠনিক সফরের লক্ষ্য বলে দৈনিক করতোয়াকে জানান যশোর জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত টিমের প্রধান বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। তিনি বলেন, নেতাদের মধ্যে ছোট-খাটো কোনো সমস্যা থাকলে তা নিরসন করে তৃণমূলকে চাঙ্গা করাও এ সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য হবে।

বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু দৈনিক করতোয়াকে বলেন, সরকারবিরোধী বিগত দু’টি আন্দোলনের পর সরকারি মামলা-হামলা ও নির্যাতন-নিপীড়নে আমাদের সারাদেশের নেতা-কর্মীরা জর্জরিত। এই অবস্থা থেকে তাদের সক্রিয়-উজ্জীবিত করার অংশ হিসেবে এই সাংগঠনিক সফর। কারণ, নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ে বিএনপির ভবিষ্যৎ আন্দোলন সফলে আমরা পুনরায় তৃণমূলের নেতাকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ চাই।

সিরাজগঞ্জে যমুনার ভয়াবহ ভাঙন দিশাহারা কয়েকশ’ পরিবার

হেলাল আহমেদ, সিরাজগঞ্জ : ভারতের আসামে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং গত তিনদিন যাবৎ সিরাজগঞ্জসহ উত্তরাঞ্চলে প্রবল বর্ষণে সিরাজগঞ্জের কাছে যমুনা নদীতে পানি বৃদ্ধির সাথে শুরু হয়েছে ভয়াবহ ভাঙন। এরই মধ্যে শুভগাছা, রতনকান্দি এবং ছোনগাছা ইউনিয়নের ৬টি গ্রামের আরও দুইশতাধিক বাড়িঘর ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থাপনাসহ শতাধিক বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে আরও শতাধিক  বাড়িঘর। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার রতনকান্দি ইউনিয়নের বাহুকা গ্রামের টুটুলের মোড়ে ব্রহ্মপুত্র বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধে ফাটল ধরায় এলাকাবাসীর মধ্যে আবার নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ভয়াবহ ভাঙনরোধে বালির বস্তা নিক্ষেপের কাজ শুরু করেছে।

চলতি বছরের শুষ্ক মৌসুমের শুরু থেকেই যমুনা নদী তীরবর্তী সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার রতনকান্দি ইউনিয়নের চরবাহুকা, বাহুকা, টুটলের মোড়, ছোনগাছা ইউনিয়নের পাঁচ ঠাকুরী, ভাটপিয়ারী এবং কাজিপুর উপজেলার শুভগাছা ও চরশুভগাছাসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় নদী ভাঙন শুরু হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ ভয়াবহ ভাঙনে এলাকার পর এলাকা বিলীন হতে থাকলেও তা প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পানি উন্নয়ন বোর্ড। এখন বর্ষা মৌসুম এগিয়ে আসার সাথে সাথে উজান থেকে পানির ঢল নেমে আসছে। একই সাথে প্রবল বর্ষণ শুরু হওয়ায় ভাঙনের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এলাকাবাসী দিশাহারা হয়ে পড়েছে।

রতনকান্দী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা খোকন ও সাবেক চেয়ারম্যান রেজাউল করিম জানান, যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙনের ফলে এলাকার শত শত মানুষ আজ নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার কয়েক দফা ভাঙনের শিকার হয়েছে। বার বার তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙন রোধে কোন কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। বর্তমানে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তাতে আরও বহু বাড়িঘর, ফসলি জমিসহ অন্যান্য স্থাপনা বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভাঙনকবলিত বাহুকা এলাকার কৃষক হযরত আলী, শাহার ভানু, আব্দুল কাদের, শুভগাছা টুটুলের মোড়ের রুস্তোম আলী, রেজাউল করিম, আব্দুল মজিদসহ ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেই জানান, শুভগাছা বাহুকা থেকে পাঁচ ঠাকুরী পর্যন্ত নদী তীরবর্তী অঞ্চলে প্রতিদিনই বড় বড় ফাটল ধরে ধসে পড়ছে। এভাবে ভাঙনে গত দুই মাসের মধ্যে অসংখ্য বাড়িঘর বিলীন হয়ে গেছে। চর বাহুকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ পুরো গ্রাম এখন শুধুই স্মৃতি। এছাড়া একটি মসজিদ ও চোরমারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বাহুকা, শুভগাছাসহ আশপাশের গ্রামগুলো এখন রয়েছে চরম হুমকির মুখে।
স্থানীয়রা জানান, নদীভাঙন প্রতিরোধে শিগগিরই ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে যে কোনো সময় শিমলা-খুদবান্দি বাঁধটি ভেঙে নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে। সেই সাথে অর্ধশত গ্রাম পাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী রনজিত কুমার বলেন, বাহুকা থেকে খুদবান্দি ও কাজিপুরের মেঘাই এলাকা মিলে ৭ কিলোমিটার নদী তীররক্ষা বাঁধের ৬৮৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প ইতিমধ্যে প্রি-একনেকে অনুমোদন পেয়েছে। প্রকল্পটি এখন একনেকের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এছাড়া জরুরিভিত্তিতে ভাঙনরোধের জন্য বালির বস্তা নিক্ষেপের কাজ আজ শুক্রবার সকাল থেকে শুরু হবে।

 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে অবাধে ঢুকছে অস্ত্র ও বিস্ফোরক দ্রব্য

ইমতিয়ার ফেরদৌস সুইট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ : চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে অস্ত্র ব্যবসায়ীরা। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ভারত থেকে দেশে ঢুকছে আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও বিস্ফোরকের চালান। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ওপারে ভারতের সীমান্ত ঘেঁষা এলাকাগুলোতে গড়ে উঠা ছোট ছোট কারখানায় তৈরি হচ্ছে এসব মারণাস্ত্র। বাংলাদেশে পাচার হয়ে আসার পর অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র পৌছে যাচ্ছে জঙ্গিগোষ্ঠী আর সন্ত্রাসীদের হাতে। আর এসব আগ্নেয়াস্ত্রের জোরেই ক্রমেই আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে সন্ত্রাসীরা।

দীর্ঘদিন ধরেই ভারত থেকে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও বিস্ফোরক দ্রব্য পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত এলাকা। সবচেয়ে বেশি অস্ত্রের চালান আসে শিবগঞ্জ উপজেলার সীমান্ত এলাকাগুলো দিয়ে। ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান রে¯োÍরাঁয় জঙ্গি হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়েই ভারত থেকে দেশে আনা হয়েছিলো বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা সূত্রগুলো। গত এক বছরে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১০৩ টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৬৭৮ রাউন্ড গুলি, ১৬১টি ম্যাগজিন ও ৬ কেজি গানপাউডার উদ্ধার করেছে। এসব ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়েছে ৪৭ জনকে। জেলায় সবচেয়ে বড় অস্ত্রের চালানটি ধরা পড়ে গতবছরের অক্টোবর মাসে। ওই দিন চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার শংকরবাটী এলাকা থেকে ২২টি অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গুলি উদ্ধার করে পুলিশ। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকছে অস্ত্রের চালান। এসব অস্ত্র বহন করে নিয়ে যাওয়ার সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে ধরা পড়ছে জেলার অধিবাসীরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশে সরবারহের জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তের ওপারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার বৈষ্ণবনগর, মোয়াজ্জেমপুর, কালিয়াচক, গোলাপগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় গড়ে উঠেছে ছোট ছোট অস্ত্র তৈরির কারখানা। এসব কারখানায় মুলত লেদ মেশিনেই তৈরি করা হচ্ছে এসব অস্ত্র। পরে সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া ডিঙ্গিয়ে আর চোরাচালানকৃত গরুর মাধ্যমে এসব আগ্নেয়াস্ত্র পাচার হচ্ছে বাংলাদেশে। শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা, বিনোদপুর ও শাহাবাজপুর ইউনিয়নে রয়েছে অস্ত্র ব্যবসার একাধিক রাঘববোয়াল। প্রভাবশালী এই অস্ত্র ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের চাহিদা মোতাবেক বিশ্বস্ত বাহকের মাধ্যমে এসব অস্ত্র পৌছে দিচ্ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। মাঝে মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অস্ত্রের চালানসহ এর বাহকদের ধরতে পারলেও তার মূল হোতারা সহজে ধরা পড়েনা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত থেকে একটি অস্ত্রের চালান ঢাকায় পৌছে দিতে পারলে বাহকরা পান মাত্র ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা। আর সামান্য এই টাকার জন্য ঝুঁকি নিয়ে অস্ত্র পৌছে দেয়ার কাজে জড়িয়ে পড়েছেন বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ। তবে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে অস্ত্র ব্যবসার গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তের ওপারে ভারতে ছোট ছোট অস্ত্র কারখানা গড়ে উঠার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা। অস্ত্র চোরাচালানে ব্যবসায়ীরা ঘন ঘন কৌশল পরিবর্তন করায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তা দমনে হিমশিম খাচ্ছে। অস্ত্র চোরাচালান প্রতিরোধে সম্প্রতি নৌ রুটকেও গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহবুব আলম খান জানান, গত আট মাসে ৩১টি অস্ত্র, ২৬১ রাউন্ড গুলি ও ৬ কেজি গানপাওডার উদ্ধার করেছে পুলিশ। অস্ত্র ব্যবসায়ীদের ধরতে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন এসব কারনে এখন আগের চেয়ে বেশি অস্ত্র ধরা পড়ছে।  

চাঁপাইনবাবগঞ্জ র‌্যাব ক্যাম্পের কমান্ডার এএসপি নূরে আলম জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তের অনেক এলাকা দুর্গম চরাঞ্চল হওয়ায় চোরাচালানীরা অবৈধ অস্ত্র পাচারে সুযোগ নিচ্ছে। তিনি বলেন অস্ত্র ব্যবসার লাগাম ধরতে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে র‌্যাব। গত এক বছরে র‌্যাব এই অঞ্চলে ৩৭টি অস্ত্র ও ২৬৯ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করেছে। এই অভিযান আরো জোরদার করা হবে বলে জানান তিনি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৯ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেঃ কর্নেল আবুল এহসান জানান, অস্ত্র চোরাচালান রোধে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছে বিজিবি। সেই সঙ্গে বাড়ানো হয়েছে সমন্বিত গোয়েন্দা নজরদারী। গত এক বছরে ৩৫টি অস্ত্র ও ১৪৮ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ভারতীয় নাগরিকদের ছবিসহ প্রয়োজনীয় তথ্য বিএসএফের কাছে নিয়মিত দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন এব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করছে বিজিবি।

জনস্বার্থ ইস্যুতে মাঠে নামতে চায় বিএনপি

রাজকুমার নন্দী : নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের ইস্যু, সরকারবিরোধী জনমত সৃষ্টি ও তৃণমূলের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করার লক্ষ্যে দ্রুততম সময়ে রাজপথে নামতে চায় বিএনপি। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সর্বশেষ দু’টি বৈঠকে দলটির নেতারা চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে রাজপথে নামার প্রস্তাব দিয়েছেন। ২০ দলীয় জোটের বৈঠকেও নেতারা জোটনেত্রীকে একই প্রস্তাব দেন। এছাড়া দল গুছিয়ে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যু নিয়ে বেগম জিয়াকে মাঠে নামার পরামর্শ দিয়েছেন বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবীরাও। বিএনপি চেয়ারপারসনও সবকিছু গুছিয়ে গ্যাস-বিদ্যুৎ-দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা ইস্যুতে দ্রুততম সময়ে রাজপথে নামার চিন্তাভাবনা করছেন। কর্মসূচি চূড়ান্ত হলে দেশের কয়েকটি বিভাগীয় শহরের পাশাপাশি বড় জেলাগুলোয় সমাবেশ করতে পারেন তিনি। তবে সেটা পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগে সম্ভব নয়। অবশ্য এর আগে আগামী পহেলা মে ঢাকায় শ্রমিক সমাবেশে খালেদা জিয়া অংশ নেবেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শ্রমিক সমাবেশের অনুমতির জন্য শ্রমিক দল ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদনও করেছে।

গত ডিসেম্বরে বিভাগীয় শহরে সমাবেশ করার চিন্তা-ভাবনা ছিল বিএনপির হাইকমান্ডের। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তের পর আগের সেই অবস্থান থেকে সরে আসে দলটি। বিএনপির সিনিয়র নেতারা মনে করছেন, সরকারবিরোধী বিগত দু’টি আন্দোলন সফল না হওয়ায় নেতাকর্মীরা মানসিকভাবে অনেকটা ভেঙে পড়েছেন। তাছাড়া সরকারের মামলা-হামলা ও নির্যাতনে তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী এখনো এলাকাছাড়া। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন থেকেই নেতাকর্মীদের মানসিকভাবে চাঙ্গা করা প্রয়োজন। জেলায় জেলায় সম্ভব না হলেও অন্তত বিভাগীয় সমাবেশের মাধ্যমে ওই এলাকার নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করা যাবে। তবে খালেদা জিয়া ছাড়া তৃণমূলকে চাঙ্গা-উজ্জীবিত করা কঠিন হবে। নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচনসহ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে চেয়ারপারসনের দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও চাঙ্গা করা সম্ভব হবে। সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি নেতাকর্মীরা মানসিকভাবে উজ্জীবিত হলে তা দলের জন্য ইতিবাচক হবে।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, খালেদা জিয়া ঢাকার বাইরে সফরে যাওয়ার আগে দলের তৃণমূল পুনর্গঠন কাজও শেষ করার প্রক্রিয়া চলছে। এরই মধ্যে অনেক জেলার নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি কমিটিগুলোও দ্রুততম সময়েই দেয়ার কথা জানিয়েছে দলটি।

এদিকে, খালেদা জিয়া সরাসরি মাঠে না নামলেও তার নির্দেশে সরকারবিরোধী জনমত তৈরিতে নতুন কৌশলে পোস্টার ও প্রচারপত্রের মাধ্যমে গত মাস থেকে দেশজুড়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। ‘জাতীয় সম্পদ, জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে খালেদা জিয়ার ডাক’ সংবলিত ওই পোস্টারে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনসহ ১৯টি দাবি তুলে ধরা হয়েছে। দলের ৮০টি সাংগঠনিক জেলা ইউনিটের মাধ্যমে সারাদেশে ইতোমধ্যে প্রচারপত্রটির লক্ষাধিক কপি সাঁটানো হয়েছে। দল ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতারা এই কার্যক্রমে সম্পৃক্ত রয়েছেন।

গত মাসে গুলশান কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে বিএনপিপন্থী পাঁচজন বুদ্ধিজীবী বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে খালেদা জিয়াকে জনসম্পৃক্ত ইস্যু নিয়ে রাজপথে নামার পরামর্শ দেন তারা। কথিত সংস্কারপন্থীদের ফিরিয়ে নেয়াসহ দল গুছিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাকে জনগণের মাঝে যাওয়ার আহ্বান জানান। খালেদা জিয়াও সবকিছু গুছিয়ে দ্রুতই জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুতে কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে বুদ্ধিজীবীদের জানান। জানতে চাইলে ওই বৈঠকে থাকা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী দৈনিক করতোয়াকে বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বেগম খালেদা জিয়ার উচিত জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো, জনগণের সাথে কথা বলা। এ জন্য অবিলম্বে দল গুছিয়ে তার (খালেদা জিয়া) জনগণের মাঝে যাওয়া দরকার।

গত ২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও খালেদা জিয়াকে রাজপথে নামার প্রস্তাব দেন দলটির নেতারা। ওই বৈঠকে নেতারা বলেন, ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জনসভায় প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে নৌকার পক্ষে ভোট চাইতে শুরু করেছেন। এ অবস্থায় আমাদের আর ঘরে বসে থাকার সময় নেই। তাছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসন তৃণমূলে গেলে নেতাকর্মীরাও উজ্জীবিত হবে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে স্বাক্ষরিত বিভিন্ন চুক্তির প্রেক্ষিতে করণীয় ঠিক করতে ১০ এপ্রিল স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে দেশের জনগণ কিছুই পায়নি বলে মনে করে বিএনপি। দলটির দাবি, সফরে দেশের জনগণের স্বার্থকে উপেক্ষা করে বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকে সই করা হয়েছে। বৈঠকে এই ইস্যুতে সরকারবিরোধী জনমত তৈরির সিদ্ধান্ত নেয় দলটির নীতি-নির্ধারকরা। এ লক্ষ্যে বেগম জিয়াকে তারা আবারো রাজপথে নামার তাগিদ দেন। এছাড়া গত ১২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ২০ দলীয় জোটের বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে দেশবাসী কিছুই পায়নি বলে জোটের নেতারা মত দেন। এই ইস্যুতে সরকারবিরোধী জনমত তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। এর অংশ হিসেবে জোট নেতারা খালেদা জিয়াকে বিভাগীয় শহর ও বড় জেলাগুলোতে সমাবেশ করার প্রস্তাব দেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ২০ দলীয় জোটের এক শীর্ষ নেতা জানান, সরকারবিরোধী জনমত সৃষ্টিতে জোটনেত্রীকে আমরা ঢাকার বাইরে একাধিক সমাবেশের প্রস্তাব দিয়েছি। তবে ঈদুল ফিতরের আগে এসব সমাবেশ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দৈনিক করতোয়াকে বলেন, বিএনপি গণমানুষের দল। দলটি সবসময় জনগণের জন্যই কাজ করে থাকে। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে চেয়ারপারসনের ঢাকার বাইরে সফরের চিন্তা-ভাবনা রয়েছে। তবে এখনো তারিখ চূড়ান্ত হয়নি। এ নিয়ে সিদ্ধান্ত হলেই উনি (খালেদা জিয়া) ঢাকার বাইরে সফরে যাবেন।

 

জয়িতা অন্বেষণে মনোনীত পাঁচবিবির ৫ সংগ্রামী নারী

আব্দুল হালিম সাবু, পাঁচবিবি (জয়পুরহাট) : জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ-এর আওতায় মনোনীত হয়েছেন পাঁচবিবির ৫ জন সংগ্রামী সফল নারী। তারা এখন আত্মনির্ভরশীল ও সুখী। জীবনের নানান প্রতিকূলতায় লড়াই করে জয়ী করেছেন নিজেদের। এখন তারা কাজ করে চলেছেন সমাজে নিপীড়িত, নির্যাতিত ও অধিকার বঞ্চিত মানুষের কল্যাণে।

এমন সফল জননী বালিঘাটা ইউনিয়নের বরগোছা গ্রামের মাহমুদা বেগম জানান, তার পিতা একজন প্রতিবন্ধী। সংসারে উপার্জনের কেউ ছিল না। অসহায় পিতা একই গ্রামের দরিদ্র তোতা মিয়ার সাথে তার বিয়ে দেন। অভাব অনটনের সংসারে একটি মেয়ে ও একটি পুত্র সন্তান জন্মের পর আমার স্বামী আমাদের ফেলে রেখে অন্যত্র চলে যান। মাহমুদা অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসারের হাল ধরেছেন। সন্তানদের লেখাপড়া  শেখানোর জন্য তিনি মাঠে ধান কাঁটা, মাড়াই, সিদ্ধ ও শুকানোর কাজ করেছেন বছরের পর বছর। বর্তমানে তার কন্যা বি.এ পাস করে স্থানীয় একটি এনজিও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছে। ছেলে ৩২তম বি.সি.এস ব্যাচে পাস করে বন গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। এখন তার সংসারে অভাব নেই। জীবন যুদ্ধে তিনি একজন সফল ও গর্বিত জননী।

নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করেছেন উপজেলার কাশিয়াবাড়ি গ্রামের শ্রাবন্তী সরকার। মাধ্যমিক পড়াকালীন এক আত্মীয়র সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার। এই সম্পর্কের এক পর্যায়ে স্বামী সুশান্ত নানান অজুহাতে টাকা নিতেন। বিষয়টি পরিবারের কেউ জানত না। বিত্তবান পরিবারের মেয়ে হওয়ায় নানান স্বপ্ন দেখিয়ে সে আমাকে ভারতে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করে। পরে অর্থের জন্য আমাকে চাপ দিতে থাকে। বিয়ের ১৭ দিনের মাথায় আমি জানতে পারি তার আরও একটি স্ত্রী ও সন্তান রয়েছে। তারাও সমাজে নানান অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত। আমি বাধা দিলে তারা আমাকে নির্যাতন চালায়। আমি নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরে এসে এইচ.এস.সি পাসের পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে সহকর্মীদের সাথে বুটিকের কাজ ও টিউশনি দিয়ে নিজের ভরণপোষণ ও পড়াশুনার খরচ চালাই। পরে স্বামী আবারো নিজের অপকর্মের জন্য ক্ষমা চায়। আমি আবারো সরল বিশ্বাসে তার সাথে ভারতে চলে যাই। যাওয়ার পর  থেকেই অর্থের জন্য সে আমাকে চাপ দিতে থাকে।  আবারো দেশে ফিরে বি.বি.এ শেষ করে একটি এনজিওতে কাজ করছি। পাশাপাশি সমাজের নিপীড়িত, প্রান্তিক নারী ও শিশু এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে অধিকার আদায়ের দাবি জানাচ্ছি।

অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী ধরঞ্জী ইউনিয়নের পাবর্তীপুর গ্রামের সুসমা রাণী বলেন, পিতার সংসারে অভাব থাকার কারণে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করি। আমার অন্ধ প্রতিবন্ধী বাবা ১৪ বছর বয়সেই আমার বিয়ে দেন। শুধুমাত্র ভিটা ছাড়া স্বামীর কিছুই নেই। মানুষের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছি। পরে এনজিওতে প্রশিক্ষণের পর ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করি। একসময় অর্থের অভাবে দুই সন্তানের লেখাপড়া বন্ধ হয়েছিল। এখন দুই ছেলে এইচ.এস.সি এবং এস.এস.সি পাস করেছে। বড় ছেলে ব্যবসার হাল ধরেছে। আজ তিনি জীবন সংগ্রামে জয়ী এক অর্থনৈতিকভাবে সফল নারী। তিনি আশা করেন গ্রামের সাধারণ নারী বা তারই মত ব্যবসা ক্ষেত্রে নিজেকে নিয়োজিত করে সফলতা লাভ করুক। ক্ষুদ্র আয়ের মাধ্যমে ও নিরলস পরিশ্রম করলে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

শিক্ষা ও চাকরীর ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী পৌরসভার দানেজপুর গ্রামের মোছাঃ সেলিনা আক্তার বলেন, রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম হওয়ার কারণে একটি মেয়ের যে চাওয়া পাওয়া থাকে তা মূল্যায়ন হয়নি। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে পরিবারের কাছে সাহায্য সহযোগিতা চেয়ে আশাহত হয়েছি। প্রচন্ড ইচ্ছা শক্তির কারণে আজ আমি উচ্চ শিক্ষা অর্জন করেছি। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত আছি। যৌতুকের মত এমন প্রথাকে অস্বীকার করে স্বামীর সংসারে এসেছি শুধুমাত্র শিক্ষাকে অবলম্বন করে। শিক্ষা অর্জন না করলে একটি মেয়ে পরিবার সমাজ এবং রাষ্ট্রের কাছে বোঝা স্বরূপ।

সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন ধাপ গ্রামের মেরিনা। তিনি বলেন, বাবার মৃত্যুর পর পঞ্চম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় পাঁচবিবির রফিকুল ইসলামের সাথে তার বিয়ে হয়। ২ বছর পর তার সংসারে আছে একটি কন্যাসন্তান। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ায় তিনি সংসারে নিয়ম-কানুন বুঝতেন না। এ কারণে স্বামীসহ পরিবারের সকলের দ্বারা শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত হন। পরে সংসারের কাজের পাশাপাশি দর্জি বিদ্যা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন মেরিনা। ২০১৩ সালে পল্লীশ্রীর উদ্যোগে তাদের গ্রামবাসীর সহযোগিতায় তিনি টিয়া নারী নামে একটি দল গঠন করেন। এ দলের মাধ্যমে আলোচিত মুরশিদাসহ ১২টি বাল্য বিবাহ প্রতিরোধে, হিন্দু, মুসলিম, আদিবাসী সম্প্রদায়ের মাঝে ৬৩টি স্বামী-স্ত্রী ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব নিরসন, ২২ জনকে মাতৃকালীন ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, ভিজিডি, ভিজিএফ কার্ড প্রাপ্তিতে সহযোগিতা করেছেন। বর্তমানে মেরিনা উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদফতর থেকে পুঁথির কজের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। প্রশিক্ষণ শেষে এলাকায় ফিরে কিশোরী ও নারীদের বড় আকারে প্রশিক্ষণ দিয়ে আয়মূলক কাজের সাথে সম্পৃক্ত করবেন।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক বাস্তবায়িত জয়িতা অন্বেষনে বাংলাদেশ শীর্ষক কার্যক্রমটি একটি ভালো কার্যক্রম। উপজেলার বিভিন্ন স্তর থেকে উঠে আসা এই ৫ জন শ্রেষ্ঠ জয়িতার জীবন কাহিনী পড়ে আমাদের নারী সমাজ উৎসাহিত হবে এবং এভাবেই নারীর ক্ষমতায়ন হবে বলে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ফারজানা ইয়াসমিন জানান।

এসো হে বৈশাখ, স্বাগত ১৪২৪

সৈয়দ আহমেদ অটল : ‘ওই নূতনের কেতন ওড়ে/ কালবৈশাখীর ঝড়/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর।’ আজকের দিনে এই জয়ধ্বনি দিয়েই কেবল অশুভ শক্তিকে পরাভূত করা সম্ভব। কালবৈশাখীর ঝড় দিয়েই ‘মুছে যাক গ্ল¬ানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ তবেই সত্য, সুন্দর, মানবতাবোধ ও সামাজিক মুক্তি আসতে পারে। গড়ে উঠতে পারে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। মানুষে মানুষে গড়ে উঠতে পারে ভালোবাস আর প্রীতির বন্ধন। আজ পহেলা বৈশাখ। শুভ নববর্ষ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ। নারী আর পুরুষের মিলিত কন্ঠে আজ ছড়িয়ে যাবে সেই চিরচেনা সুর, চির আহবান- ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’।

জীর্ণ-পুরাতনকে পিছনে ফেলে নতুনকে স্বাগত জানাবার দিন আজ। আজ জয় করবার দিন, বিজয়ী হবার দিন। জয়ধ্বনি করবার দিন।
পহেলা বৈশাখ কেবলই একটি নতুন বছরের শুরুর দিন নয়। নতুন করে যাত্রা শুরুতে যে আনন্দ-উৎসব আয়োজিত হয়, সেটাই বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে ঐতিহ্য বাঙালির হাজার বছরের। যে উৎসব ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক সুতায় গেঁথে আছে অনাদিকাল থেকে। যেখানে সাম্প্রদায়িকতার কোন স্থান নেই। নেই অপসংস্কৃতির। সমাজের সকল প্রকার অশুভ শক্তিকে পরাভূত করবার নতুন শক্তি অর্জনের দিন আজ। বলা হয়, বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাস বা লোকজ ঐতিহ্য ও গৌরব পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ পেয়েছে এই পহেলা বৈশাখে। পহেলা বৈশাখ বাঙালির এক অপার শক্তি। পহেলা বৈশাখের মূল বাণী – উৎসবের মধ্যদিয়ে আনন্দ প্রকাশ। যে উৎসব হবে সার্বজনীন। যে উৎসবে আজ বাঙালি জাতি মেতে উঠবে দেশময়। বাংলাদেশ হবে সব মানুষের। সব ধর্মের, সব শ্রেণি-পেশার। হয অপশক্তিকে পেছনে ফেলে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন প্রেরনায় উদ্ভুদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ তথা অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারন করে এগিয়ে যেতে হবে। বাঙালির এই অসাম্প্রদায়িক চেতনার মধ্যেই নিহিত আছে মূল শক্তি। সেই শক্তিতে বলীয়ান হয়েই অশুভ শক্তিকে পরাজিত করা সম্ভব। পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে আজ সূর্যোদয়ের সাথে সাথে যাত্রা শুরু করেছে ১৪২৪ বঙ্গাব্দ। নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে বাঙালি জাতি নতুন প্রেরণায় পা ফেলবে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে, আজকের দিনে এই কামনা।  

ষোড়শ শতকে সম্রাট আকবর ‘ফসলী সন’ প্রবর্তনের মাধ্যমে যে বাংলা সাল চালু করেছিলেন সময়ের বিবর্তনে সেই দিনটি এখন বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। আকবরের নবরতœসভার আমির ফতেহ উল্ল¬াহ সিরাজি খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য হিজরি চান্দ্রবর্ষকে সৌরবর্ষের সঙ্গে মিলিয়ে ফসলী সালের গণনা শুরু করেন। তিনিই হিজরিকে বাংলা সালের সঙ্গে সমন্বয় করে বৈশাখ থেকে বাংলা নববর্ষ গণনা শুরু করেছিলেন। বৈশাখ নামটি নেওয়া হয়েছিল নক্ষত্র বিশাখা  থেকে। পহেলা বৈশাখে আকবর মিলিত হতেন প্রজাদের সঙ্গে। সবার শুভ কামনা করে চারদিকে বিতরণ হতো মিষ্টি। এরপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে বর্ষবরণ উৎসব চলে আসে জমিদার বাড়ির আঙিনায়। খাজনা আদায়ের মতো একটি রসহীন বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় গান বাজনা, মেলা আর হালখাতার অনুষ্ঠান। আজ আর খাজনা আদায়  নেই, কিন্তু রয়ে গেছে উৎসবের সেই আমেজ। সেটা এখন ছড়িয়ে পড়েছে শহর বন্দর আর গ্রামে, জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সব বাঙালির মাঝে। খাজনা ও ফসল তোলার সন-তারিখের সুবিধার্থে বাংলা সনের যে প্রবর্তন আমরা দেখতে পাই, সে কারণেই পহেলা বৈশাখ ব্যবসায়ীরা ‘হালখাতা’ করেন। দেশ জুড়ে বসবে বৈশাখী মেলা।

ছায়ানটের প্রভাতী অনুষ্ঠান
এবারের ছায়ানটের প্রভাতী অনুষ্ঠানের ৫০ বছর বছর পূর্তি হচ্ছে। পহেলা বৈশাখ রমনা বটমূলে এবারের আয়োজনে সুরে সুরে বলা হবে মানুষে মানুষে সম্প্রীতির কথা। এ আয়োজনের মূল প্রতিপাদ্য ‘আনন্দ, বাঙালির আত্মপরিচয়ের সন্ধান ও অসাম্প্রদায়িকতা’। অনুষ্ঠান শুরু হবে সকাল ৬টা ১০ মিনিটে। সরোদিয়া রাজরূপা চৌধুরীর সরোদের সুরে ভোরের রাগালাপে শুরু হবে অনুষ্ঠান। গাওয়া হবে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুল প্রসাদ ও রজনীকান্ত সেনের গান। সে সঙ্গে মানবিকতার আবাহনে গীত হবে বাউলসাধক লালন সাঁইয়ের গান। ছায়ানটের শিল্পী-শিক্ষক ও শিক্ষার্থী শিল্পীদের কণ্ঠে পরিবেশিত হবে দশটি সম্মেলক গান। একক কণ্ঠে গাওয়া হবে ১৪টি গান। সব মিলিয়ে পরিবেশনায় অংশ নেবেন ১৬০ শিল্পী। ১৯৬৭ সালের প্রথম বর্ষবরণে সম্মেলক কণ্ঠে গীত হয়েছিল ‘আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও’। এবারও সে গানটি থাকছে। সম্মেলক ও একক কণ্ঠে গাওয়া হবে ‘আননধ্বনি জাগাও গগনে’, ‘ওরে বিষম দরিয়ার ঢেউ’, ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’, ‘ভোরের হাওয়ায় এলে ঘুম ভাঙাতে’, ‘একি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল¬ী জননী’ ও ‘উদয় শিখরে জাগে মাভৈ মাভৈ’সহ নানা গান। একক কণ্ঠে গান শোনাবেন চন্দনা মজুমদার, খায়রুল আনাম শাকিল, মিতা হক, ইফ্্ফাত আরা দেওয়ান, মহিউজ্জামান চৌধুরী ময়না, নাসিমা শাহীন ফ্যান্সি প্রমুখ। থাকবে কবিতা আবৃত্তিও। সাংস্কৃতিক পরিবেশনা শেষে শুভেচ্ছা কথনে অংশ নেবেন ছায়ানট সভাপতি ড. সন্জীদা খাতুন। তার শুভেচ্ছা কথন শেষে কিছুটা বিরতি দিয়ে শুরু হবে বর্ষবরণের পঞ্চাশ বছর পূর্তির বিশেষ আয়োজন পালা গান ‘দেওয়ানা মদিনা’। পরিবেশন করবেন নেত্রকোনার দিলু বাউল ও তার দল। এবারও রমনা বটমূলে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের অনন্য অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার। এ ছাড়া অনুষ্ঠানটি সরাসরি দেখা যাবে ছায়ানটের ওয়েবসাইটে।

মঙ্গল শোভাযাত্রা
পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ‘ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ বা অপরিমেয় সংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। গত বছরের ৩০ নভেম্বর ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় ইউনেস্কোর ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজের (আইসিএইচ) আন্তঃদেশীয় কমিটির একাদশ বৈঠকে মঙ্গল শোভাযাত্রাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার আয়োজিত এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার পঙক্তি ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দর’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের নেতৃত্বে সকাল ৯টায় চারুকলা অনুষদ থেকে বের করা হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। এছাড়া সঙ্গীত বিভাগের উদ্যোগে কলাভবনের বটতলায় সকাল ৮টা থেকে শুরু হবে সঙ্গীতানুষ্ঠান। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট পয়লা বৈশাখের দিন বিকাল ৪টায় রাজধানীর মিরপুর, দনিয়া রায়েরবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে একক ও দলীয় লোকসঙ্গীত, নৃত্য ও আবৃত্তিসহ নানা আয়োজন পরিবেশন করবে। এছাড়া রাজধানী জুড়ে অনুষ্ঠিত হবে বৈশাখী মেলা।

 

 

 

 

চারুকলায় নববর্ষ উদযাপন প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে

আলী আজম সিদ্দিকী : আগামী শুক্রবার পহেলা বৈশাখ। বাকি মাত্র তিন দিন। বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ কড়া নাড়ছে দুয়ারে। নানা আয়োজনে বাঙালির শত বছরের ঐতিহ্যকে বরণ করে নিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। রবীন্দ্রনাথের ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দর’ স্লোগানে এবারের নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়া হবে। এছাড়াও এবারের পয়লা বৈশাখে ঢাকা শহরসহ সারাদেশব্যাপী ব্যাপক নিরাপত্তা কর্মসূচী নেওয়া হবে।

বাংলা নববর্ষ-১৪২৪ সুষ্ঠুভাবে উদযাপনের লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিবছরের মতো এবারও গঠন করা হয়েছে বিভিন্ন কমিটি। ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সভাপতিত্বে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার উদ্দেশ্যে প্রো-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানকে আহ্বায়ক করে ৩৩ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন এ কমিটির সদস্য-সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন।

সভায় কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়াও সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে নববর্ষ উদযাপনের লক্ষ্যে শৃঙ্খলা ও মঙ্গল শোভাযাত্রা উপ-কমিটি গঠন করা হয়। ৩৯ সদস্যবিশিষ্ট শৃঙ্খলা উপ-কমিটির আহ্বায়ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ এম আমজাদ এবং সদস্য-সচিব সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক মো. ফজলুর রহমান। ২৯ সদস্যবিশিষ্ট মঙ্গল শোভাযাত্রা উপ-কমিটির আহ্বায়ক চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন এবং সদস্য-সচিব মৃৎশিল্প বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. রবিউল ইসলাম। সভায় উপ-কমিটিগুলোকে আগামী ৭ দিনের মধ্যে সব প্রস্তুতি শেষ করে উপাচার্যকে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে।

বাংলা নববর্ষের অন্যতম আকর্ষণ মঙ্গল শোভাযাত্রা। ১৯৯০ সাল থেকে প্রতি বছরই এ শোভাযাত্রার আয়োজন করে আসছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। অতীতের মতো এবারো তার ব্যতিক্রম ঘটেনি; চলছে জোর প্রস্তুতি।

সোমবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চারুকলা করিডোরে মঙ্গলশোভা যাত্রার প্রস্তুতি পর্বের মহাযজ্ঞ চলছে। প্রায় শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী শোভা যাত্রার উপকরণ তৈরি করতে একযোগে কাজ করছেন। শিক্ষার্থীদের নিরলস শ্রম এবং মেধা ও মননের নিখুঁত সংমিশ্রণে তৈরি হচ্ছে নানা শিল্পকর্ম ও চিত্রকর্ম। ভিন্ন ভিন্ন টেবিলের উপর চলছে পটচিত্র, জলরংয়ের চিত্রের কাজ। এ ছাড়া সারিসারি করে রাখা হয়েছে মাটির সরা। সেগুলোর ওপর রঙের প্রলেপ দিয়ে নানা অবয়ব ফুটিয়ে তুলতে বেশি ব্যস্ত দেখা গেলো চারুকলার শিক্ষার্থীদের। আর সে সব সরাচিত্রে উদ্ভাসিত হচ্ছে পল্লীবধুর মুখচ্ছবি, সাপুড়ে, কাকতাড়ুয়া, হরেক রকমের পাখি, হাতি, লক্ষীপেঁচা, বিড়াল, বাঘসহ বৈচিত্রময় নানা লোকজ অনুষঙ্গ। চারুকলা ইনস্টিটিউটের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আহমেদ রনি জলরংয়ের পেইন্ট করছিলেন। তিনি জানান, প্রতিদিন সকাল ১০ টা থেকে রাত ১০/১১ টা পর্যন্ত গ্রুপে গ্রুপে এসে বিভিন্ন কাজ করছেন তারা। তিনি আরও জানান, এবারের আয়োজনকে সফল করতে সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচশ ছাত্র-ছাত্রী নিয়মিত পালা করে কাজ করছেন। এর মধ্যে প্রায় দুইশ শিক্ষার্থী সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছেন। মাটির পুতুল, বাঘ, মাছ, কাঠের তৈরি গহনা, সুতোর তৈরি পুতুল ও কারুকার্যসহ নানাবিধ ভাস্কর্য তৈরি করছেন তারা। এ সব বিক্রি করে উৎসবের খরচের বিরাট একটি অংশের যোগান দেন তারা বলে জানান তিনি। চারুকলার আরেক ছাত্র সুদীপ্ত সিকদার বলেন, তাদের কাছে যে সব জল রংয়ের পেইন্ট আছে তার মধ্যে পাঁচশ থেকে শুরু করে দুই লাখ টাকা মুল্যেরও আছে। ভাস্কর্য বিভাগে কাজ করছিলেন প্রায় ২০/২৫ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে চন্দ্রনাথ পাল জানান, মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্য তারা বিভিন্ন ধরনের ভাস্কর্য তৈরি করছেন। এখন পর্যন্ত আটটি বড় ভাস্কর্যের কাজে হাত দিয়েছেন। প্রায় ৩০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।

এর মধ্যে হাতি, ঘোড়া, টেপা পুতুল, নৌকা, মাছ, হরিণ, পাখি, মা ও শিশু বিষয়ক ভাস্কর্য রয়েছে। দিনাজপুরের পটচিত্রশিল্পী পটুয়া নাজির হোসেন জানান, তিনি মূলত চারুকলার ছাত্র নয়। পড়াশোনা করেছেন দিনাজপুরে। কিন্তু সংস্কৃতির টানে আর ঐতিহ্য লালনের নেশায় তিনি দীর্ঘ ১২ বছর ধরে পটচিত্র আঁকেন। এই ১২ বছরের প্রতিটা নববর্ষে চারুকলায় স্বেচ্ছাশ্রমে পটচিত্র ও সরাচিত্র তৈরির কাজ করেছেন তিনি। তিনি জানান, এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্য তিনি এই কয়দিনে প্রায় ২০টি সরাচিত্র ও ১৫টি পটচিত্র এঁকেছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ৬০ থেকে ৭০ টি চিত্র আঁকার ইচ্ছা আছে তার। পেপার ম্যাশ বিভাগে ব্যস্ত তুহিন দাশ জানান, রাজা-রানীসহ বিভিন্ন আকারের ৫০-৬০টি পেপার ম্যাশ তৈরির কাজ চলছে। এর মধ্যে রাজা-রানীর পেপার ম্যাশ জোড়ার মূল্য ধরা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। অন্যগুলো ৪/৫ হাজার টাকা এবং ছোটগুলো পাঁচশ টাকায় বিক্রি হবে। মঙ্গল শোভাযাত্রাকে শুধু বৈশাখ উপলক্ষে আয়োজিত শোভাযাত্রা হিসেবে চিন্তা করা ঠিক হবে না জানিয়ে চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের কৃষিজীবী মানুষদের একটি উৎসব হলো পয়লা বৈশাখ। তাদের এ উৎসব ঘিরে যে সব সংস্কৃতির সৃষ্টি হয়েছে সেটা আমরা মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে উপস্থাপন করি। এ শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয় দেশবাসীর মঙ্গল কামনা করে।

আমরা জানি রাজধানীর জীবনে বাঙালি জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার তেমন সুযোগ থাকে না। আমরা মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে নগরবাসীকে বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করি।’ মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘পয়লা বৈশাখ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা আমাদের লোকসংস্কৃতির উৎসব; সার্বজনীন উৎসব। এখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্ম নিয়ে টানাটানি করলে চলবে না।’

নওগাঁয় অসহনীয় শব্দ দূষণ চলছেই কেউ মানে না বিধিবিধান

নবির উদ্দিন,নওগাঁ : নওগাঁ শহরে প্রতিনিয়ত উচ্চ শব্দে মাইকিংয়ের ফলে রাতের নিদ্রাসহ স্বাভাবিক কর্মকান্ড দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে জনসাধারণের। বিষয়টি যেন দেখার কেউ নেই। জেনে অথবা না জানার কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরবতায় ভোগান্তির সীমা ছাড়িয়ে গেছে জনগণের। সু-খবর সু-খবর, উন্নতজাতের একটি কেংনি মহিষ জবাই করা হইবে, মহিষটির মূল্য ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা, প্রতি কেজি মাংস ৪শ’ টাকা…। রোগীসাধারণের জন্য সু-খবর, এখন থেকে প্রতি শুক্রবার ঢাকা থেকে আগত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ নিয়মিত রোগি দেখছেন, সিরিয়ালের জন্য যোগাযোগ করুণ। ছাত্রÑছাত্রী ও অভিভাবকদের জন্য সু-খবর, অভিজ্ঞ শিক্ষকÑশিক্ষিকামন্ডলি দ্বারা কোচিং দেয়া হচ্ছে। শাড়ির বিরাট মূল্য ছাড়, এই সুযোগ আগামী…। আগামী…তারিখের মধ্যে সমিতির বকেয়া চাঁদা পরিশোধ করার জন্য…। এ ধরনের মাইকিং এখন নওগাঁ শহরের নিত্যদিনের ব্যাপার। নওগাঁ শহরবাসীর জন্য বিষয়টি অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। কখনো লম্বা হর্ণ, আবার কখনো ছোট হর্ণে (মাইকের আকার) চলে উচ্চ শব্দে এধরনের মাইকে প্রচারণা। এখন আর আগের মত ঘোষক লাগেনা। একটি মেমোরি কার্ডে একবার রেকর্ড করে রিকশায় অথবা ইজিবাইকে মাইক বেঁধে চলতে থাকে দিনভর বিরতিহীন ঘোষণা। এতো গেল মাইকের মাধ্যমে শ্রবণ নির্যাতন। এরপর মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইট ও পাথর ভাঙ্গা মেশিন ও কাঠের আসবাবপত্র তৈরিতে ব্যবহৃত বিদ্যুৎচালিত যন্ত্রের বিকট কান ফাটানো শব্দ।  যেন নেই কোন বিধি নিষেধ। নেই দেখভাল করার কোন দপ্তর, এমনই সব অবস্থা। হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ যে সকল স্থানে মাইক বন্ধ রাখার নিয়ম রয়েছে তাও কেউ মানছে না।


নওগাঁ জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ড হারুন-অল-রশিদ বলেন, প্রতিদিন মাইকের শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি। এরা স্কুল, কলেজ. হাসপাতাল, সরকারি অফিস-আদালত কিছুই মানে না। এই শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যে কে পালন করবে তাও বুঝি না। বিষয়টি দিন দিন অত্যাচারের পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে।


এব্যাপারে কথা হয় নওগাঁ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়–য়া ছাত্রীদের অভিভাবকদের সাথে। তাঁরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা অভিভাবকরা প্রতিদিন আমাদের মেয়েদের নিয়ে স্কুলে আসি। তাদের স্কুলে  পৌঁছে দিয়ে বাইরে অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু অসহ্য হয়ে পড়ে যখন একটির পর একটি মাইক উচ্চ শব্দে প্রচার করতে করতে স্কুলের সামনে দিয়ে যায়। অভিভাবিকাই প্রশ্ন করেন, এর কি কোনই প্রতিকার নেই?


অধ্যক্ষ (অবঃ) প্রফেসর শরিফুল ইসলাম খান বলেন রাস্তাসহ যত্রতত্র উচ্চ শব্দে মাইক ও সাউন্ড বক্স বাজানো হচ্ছে। প্রতিদিনই শব্দ দূষণের শিকার হচ্ছে মানুষ। এই সমস্যাটা নিয়ে প্রশাসনিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন। সমাজ কর্মী মো. মুরাদ আলী মৃধা জানান, যত্রতত্র পাথর ভাঙ্গা, ইট ভাঙ্গা ও কাঠ চাঁচা মেশিন চালানো হচ্ছে। মেশিনের বিকট শব্দ মারাতœকভাবে শ্রবনেন্দ্রিয়ের ক্ষতি করছে। এ বিষয়ে শব্দ নিয়ন্ত্রণকারী দপ্তরের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের দাবি জানান তিনি।


৭ সেপ্টেম্বর ২০০৬ সালে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রন বিধিমালা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। যাতে উল্লেখ আছে নিরব এলাকায় দিনে ৫০ রাতে ৪০, আবাসিক এলাকায় দিনে ৫৫ রাতে ৪৫, মিশ্র এলাকা দিনে ৬০ রাতে ৫০, বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭০ রাতে ৬০, শিল্প এলাকায় দিনে ৭৫ রাতে ৭০  ডেসিবল মানমাত্রায় সাইন্ডে মাইকে প্রচার করা যাবে। ভোর ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দিবাকালিন সময় ও রাত ৯টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত রাত্রিকালীন সময় হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যা মানুষের শ্রবণ ইন্দ্রিয়ের সাথে সম্পর্কিত শব্দের গড় মাত্রাকে বোঝাবে। এই বিধি  যেসব স্থান,  ক্ষেত্রে প্রচার প্রচারণায় অনুষ্ঠানে প্রযোজ্য হবে না যেমন রাষ্ট্রীয় কোন দিবসে (স্বাধীনতা, ২১  ফেব্রুয়ারি, বিজয় দিবস, জাতীয় দিবস)। অথবা সরকার কর্তৃক ঘোষিত কোন গুরুত্বপূর্ণ দিবসে অনুষ্ঠান চলাকালে। মৃত্যু সংবাদ,  কোন ব্যক্তি নিখোঁজ থাকলে, গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হারিয়ে গেলে, প্রকৃতিক বিপর্যয় বা অন্যকোন বিপদে বিপদ সংকেত প্রচারকালে, সরকারি বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রাচারকালে, প্রতিরক্ষা-পুলিশ বাহিনী ও আইন শৃংখলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের দাপ্তরিক কাজ সম্পাদনকালে, ইফতার ও শিহরির সময় প্রচারকালে, সরকার কর্তৃক সময় সময় অব্যহতিপ্রাপ্ত অন্যকোন কার্যক্রম সম্পাদনকালে, ধর্মীয় স্থান ও অনুষ্ঠানে।


বিধিমালায় আরও বলা হয়েছে শব্দের মানমাত্রা অতিক্রম করা যন্ত্রপাতি যেমন মাইক, লাউড স্পিকার, এমপ্লিফায়ার, মেগাফোন বা শব্দ বর্ধনের জন্য ব্যবহৃত কোন বা সকল বৈদ্যুতিক যন্ত্র বা অন্যকোন যান্ত্রিক কৌশল ব্যবহারের শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এই বিধিমালার বিধানাবলি প্রধান্য পাবে। তবে শব্দের মানমাত্রা অতিক্রমকারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরব এলাকা ব্যতিত অন্যান্য এলাকায় ব্যবহারের জন্য পূর্বেই কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। যার জন্য ৩ দিন পূর্বে দরখাস্ত করতে হবে। বিশেষ জরুরি ক্ষেত্রে অয়োজনের ১ দিন আগে দরক্ষাস্ত দাখিল করতে হবে। কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি বিবেচনা করে অনুমতি প্রদান করবেন অথবা কারণ উল্লেখপূর্বক দরখাস্ত নামঞ্জুর করবেন। এক্ষেত্রে সহনীয় পর্যায়ের শব্দের মানমাত্রা অতিক্রকারী যে কোন যন্ত্রপাতি দৈনিক ৫ ঘন্টার বেশি ব্যবহারের অনুমতি প্রদান করতে পারবেন না। অনুমোদিত সময়সীমা রাত ১০টা অতিক্রম করতে পারবেনা।


নির্মাণ কাজের ক্ষেত্রে আবাসিক এলাকার শেষ সীমানা হতে ৫০০ মিটারের মধ্যে ইট বা পাথর ভাঙ্গা মেশিন ব্যবহার করা যাবে না। সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত মিকচার মেশিনসহ নির্মান কাজে ব্যবহৃত অন্যান্য যন্ত্র বা যন্ত্রপাতি চালানো যাবেনা। নির্দিষ্ট মানমাত্রার অতিরিক্ত শব্দদূষণের সৃষ্টি হলে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে টেলিফোনে, মৌখিক অথবা লিখিত ভাবে জানানো যাবে। সে ক্ষেত্রে শব্দদূষণ মানমাত্রা অতিক্রমকারীকে ক্ষমাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মৌখিক ভাবে অথবা লিখিত নির্দেশ প্রদান করবেন। বিধান লংঘনকারী ওই নিদের্শ পালনে ব্যর্থ হলে আইনের ধারা ১০ এর উপ-ধারা (১) এর দফা (ক) এবং (ঙ) অধিনে প্রয়োজনীয় সহায়তা সহকারে যে কোন ভবন, স্থান বা আবদ্ধ স্থানে প্রবেশ করবেন। শব্দের মানমাত্রা অতিক্রমকারী যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি আটক করতে পাবেন। কোন ব্যক্তি উপ-বিধি (১) এর অধীন নির্ধারিত অপরাধে দোষি সাব্যস্ত হলে তিনি প্রথম অপরাধের জন্য অনধিক ১ মাসের কারাদন্ডে বা অনধিক ৫হাজার টাকা অর্থ দন্ডে বা উভয় দন্ডে এবং পরবর্তী অপরাধের জন্য অনধিক ৬ মাসের কারাদন্ডে বা অনধিক ১০হাজার টাকা অর্থদন্ডে বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন।

২০০৬ সালে ৭ সেপ্টেম্বর শব্দ দূষন নিয়ন্ত্রন বিধিমালা গেজেট উল্লেখ আছে উপজেলায় এই বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করবেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অথবা তৎকর্তৃক ক্ষমতা প্রাপ্ত কর্মকর্তা। জেলা সদরে নিয়ন্ত্রণ করবেন জেলা প্রশাসক অথবা তৎকর্তৃক ক্ষমতা প্রাপ্ত কর্মকর্তা, সিটি করপোরেশন পুলিশ কমিশনার অথবা তৎকর্তৃক ক্ষমতা প্রাপ্ত কর্মকর্তা, মেট্রোপলিটন এলাকায় পুলিশ কমিশনার অথবা তৎকর্তৃক ক্ষমতা প্রাপ্ত কর্মকর্তা, এছাড়া অন্যান্য এলাকায় জেলা প্রশাসক অথবা তৎকর্তৃক ক্ষমতা প্রাপ্ত কর্মকর্তা।
এ ব্যাপারে নওগাঁর জেলা প্রশাসক ড. মোঃ আমিনুর রহমান বলেন, শব্দদূষণ অবশ্যই একটি বড় ধরনের সমস্যা। এবিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নওগাঁ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ রেজাউল বারী জানান, বিষয়টি তিনিও অনুধাবন করেছেন। যতদ্রুত সম্ভব এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিবেন বলে জানান তিনি।
নওগাঁ সদর হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ডাঃ মোঃ মাহবুব আলম সিদ্দিকী জানান, অতিরিক্ত শব্দদূষণ শিশুসহ সব বয়সের মানুষের জন্য ক্ষতিকর। অতিরিক্ত শব্দে মস্তিস্কে বিরক্তির কারণ ঘটে। ফলে শ্রবণ শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মস্তিস্কে চাপ সৃষ্টি হয়, কর্মক্ষমতা কমে যায়, মেজাজ খিটমিটে হয়ে যায়, বিশ্লেষণ ক্ষমতা কমে যায়, মানুষ যখন ধীরে ধীরে বার্ধক্যে পোঁছে যায় তখন পরিলক্ষিত হয় শব্দদূষণের মারাত্মক প্রভাব।

 

কুসিক জয়ে বিএনপিতে স্বস্তি

রাজকুমার নন্দী : নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে পরাজয়ের পর নিজেদের জনপ্রিয়তা প্রমাণে মরিয়া ছিল বিএনপি। কারণ, ব্যাপক প্রস্তুতি সত্ত্বেও ওই নির্বাচনে পরাজয়ে দলটির নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে পড়েছিল। তাই কুমিল্লায় জয়ের মধ্য দিয়ে সরকারি দমন-পীড়ন, হামলা-মামলা ও হতাশায় নিস্তেজ হয়ে পড়া বিএনপিতে ফিরে এসেছে স্বস্তি। নেতা-কর্মীদের মধ্যেও এক ধরণের উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা গেছে। দলটির নেতাদের দাবি, বিএনপিকে নিয়ে ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের নেতাদের নানা অপপ্রচার সত্ত্বেও বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের প্রতি দেশবাসী যে এখনো আস্থাশীল, তিনি যে এখনো দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী- কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচনে ধানের শীষের বিজয়ের মধ্য দিয়ে সেটা আবারো প্রমাণিত হয়েছে। আর এই জয়ে জাতীয় নির্বাচনের আগে গাজীপুর, খুলনা, রাজশাহী, সিলেটসহ যে কয়েকটি সিটি নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে সেগুলোতেও ভাল করার উৎসাহ তৈরি হবে।

কুমিল্লা সিটি নির্বাচনের মাঠে সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান দৈনিক করতোয়াকে বলেন, কুমিল্লায় ধানের শীষের প্রার্থী জেতায় বিএনপিকে নিয়ে সরকারি দলের নানা অপপ্রচার মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কুমিল্লাবাসী প্রমাণ করেছে- আওয়ামী লীগ নয়, বিএনপিই এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। আগামীতে নির্দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ক্ষমতাসীনদের বিপক্ষে দেশবাসী একই রায় দেবে বলেও দাবি করেন তিনি।

কুমিল্লার মাঠে দায়িত্ব পালন করা দলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বাবুল দৈনিক করতোয়াকে বলেন, বিএনপি গণমানুষের দল। তাই যারা বলে বিএনপি নাই, বিএনপি শেষ, বিএনপি পারবে না-কুমিল্লার বিজয় তাদের জন্য চপেটাঘাত। আগামীতে নির্বাচন মোটামুটি সুষ্ঠু হলেও অধিকাংশ জায়গাতেই বিএনপি জয়লাভ করবে বলে দাবি তার।

বিএনপির সিনিয়র নেতারা বলছেন, আভ্যন্তরীণ কোন্দলে নারায়ণগঞ্জে পরাজয়ের পর কুসিক নির্বাচনে বিএনপির বিজয় নিঃসন্দেহে স্বস্তির। কিন্তু এ নির্বাচনেও ক্ষমতাসীনরা প্রশাসনকে ব্যবহার করে যেভাবে কেন্দ্র দখল, জাল ভোট দেয়াসহ ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছেন, তাতে ভোটে জিততে তাদের বিশেষ কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছে। নির্বাচনে টিকে থাকতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিএনপির নেতাকর্মীরা বুকে নৌকার ব্যাজ লাগিয়ে ধানের শীষে ভোট দিয়েছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কুমিল্লায় প্রথম থেকেই স্থানীয় নেতাদের মধ্যকার গ্রুপিং মেটাতে দল মনোযোগী ছিল, যা ধানের শীষের জয়ের ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রেখেছে। নির্বাচনী মাঠে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকাটাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাই কৌশলে কুসিক নির্বাচনের এই বিজয়কে সামনে রেখে পরবর্তী নির্বাচনগুলোর কৌশল নির্ধারণ করতে চায় বিএনপি।

দলের ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেছেন, নৌকার পক্ষে প্রকাশ্যে সিল মারার পরও যে কৌশলে জেতা যায়, সেটা কুসিক নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে। নৌকার মার্কা বুকে নিয়ে সেখানে ধানের শীষে ভোট দেয়া ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর ছিলো না। এই কৌশলে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জনগণ ধানের শীষের প্রার্থীকে জিতিয়েছে। তিনি আরো বলেন, কুমিল্লার নির্বাচন দেশের মানুষের চোখ খুলে দিয়েছে। তাই কুমিল্লার এই বিজয়কে সামনে রেখে ভবিষ্যতে সেইভাবে কৌশল নির্ধারণ করে আমরা এগিয়ে যাবো।

এদিকে, কুসিক নির্বাচনে বিজয়ের ফলে নবগঠিত নির্বাচন কমিশনের প্রতি বিএনপির আস্থা ‘কিছুটা’ হলেও ফিরেছে। তবে দলটির নেতারা বলছেন, নির্বাচন কমিশন কিছুটা সজাগ থাকলেও নির্বাচনকে পুরোপুরি সরকারি দলের সন্ত্রাস ও অনিয়মমুক্ত রাখতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। তারা এও বলেছেন, স্থানীয় নির্বাচন ও জাতীয় নির্বাচন এক নয়। সরকার পরিবর্তনের কোনো সুযোগ না থাকলেও দলীয় প্রার্থীকে জেতাতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও ক্ষমতাসীনদের দাপট অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ কুসিক নির্বাচনেও সেটা দেখা গেছে। আর এর মধ্য দিয়ে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে বিএনপির জাতীয় নির্বাচনের দাবির যৌক্তিকতা আরো দৃঢ় হয়েছে। তাই জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে হলে অবশ্যই সে নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হতে হবে। ইসির পক্ষে কোনভাবেই সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। সেজন্য কুমিল্লায় জিতলেও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি থেকে মোটেই সরেনি বিএনপি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, প্রয়োজনে কেয়ামত পর্যন্ত অপেক্ষা করব, তবুও শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাবো না।

জানা গেছে, নির্বাচন কমিশন গঠনে রূপরেখা দেয়ার পর বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া শিগগিরই নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের রূপরেখাও জাতির সামনে তুলে ধরবেন। তবে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে সেই রূপরেখাকে ধরে ক্ষমতাসীনরা আলোচনায় এগিয়ে না এলে দাবি আদায়ে প্রয়োজনে রাজপথেও নামতে পারেন খালেদা জিয়া।

এদিকে, কুসিক নির্বাচনে বিজয়ে উচ্ছ্বসিত বিএনপিকে বেদনায় নীল করেছে চট্টগ্রামে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল নেতা নুরুল আলম নুরুর নৃশংস হত্যার ঘটনা। সেজন্য কুমিল্লায় বিজয়ের পরও দলের নেতাকর্মীরা বুকে শোকের প্রতীক ‘কালো ব্যাজ’ ধারণ করেছে। এ প্রসঙ্গে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, কুমিল্লায় ধানের শীষের বিজয় বর্তমান অনির্বাচিত সরকারের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনতার বিজয়। কিন্তু পুলিশী নির্যাতনে চট্টগ্রামে ছাত্রদল নেতা নুরুল আলম নুরুর মৃত্যুতে আমরা সবাই দারুণ ব্যথিত, শোকাহত। তাই কুমিল্লা বিজয়ের আনন্দ আমরা কেউ ভাগ করে নিতে পারিনি।  

 

 

 


 

 

স্বীকৃতি নেই নারী কৃষকের আছে মজুরী বৈষম্য

করতোয় ডেস্ক: পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নানাভাবে নারীকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। বিশ্ব জুড়ে নারী অধিকার রক্ষায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। বিশেষ করে বাংলাদেশে। এখানে প্রতিটি পেশায় ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে ঠকানো হচ্ছে নারীদেরকে।

 

নারী-পুরুষের সমতার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণ কর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’। কবির এ কথা শুধু কবিতাতেই নয়, দেশের অগ্রাত্রায় আজ বাস্তব। কিন্তু অর্ধেক শ্রমের অংশীদার হলেও নারীরা পচ্ছেন না তাদের শ্রমের যথাযথ দাম। মজুরী পান পুরুষের অর্ধেক। নেই তাদের কাজের যথাযথ স্বীকৃতিও।


সম্প্রতি বিভিন্ন এলাকায় আলু চাষে নিয়োজিত নারী শ্রমিকদের খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একজন পুরুষ শ্রমিক যেখানে দৈনিক ২০০ থেকে ২৫০ টাকা মজুরি পায়, সেখানে একজন নারী শ্রমিক পাচ্ছে সর্বোচ্চ ৮০ থেকে ১০০ টাকা। একই কাজ করে পুরুষরা তাদের চেয়ে দ্বিগুণ মজুরি পাচ্ছে।নারীদের কম মজুরী দেয়ার অজুহাতটাও অমানবিক।  এসব নারী শ্রমিক কেউ বিধবা, কেউবা স্বামী পরিত্যক্ত আবার কেউবা অধিক সন্তানের ভারে অসহায়। অভাবে তাড়নায় এক রকম বাধ্য হয়েই অত্যন্ত কম দামে তাদের শ্রম বিক্রি করে চলছে। আর এ নিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজেরও কোনো মাথা ব্যথা নেই, নেই কোনো দায়ও। এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে বরং বলতে চায়; আরও কম দামে নারীশ্রম পেলেও আপত্তি কোথায়।


এদেরই একজন রংপুরের পীরগঞ্জের হালিমা খাতুন। তার সাথে কথা বলে জানা গেল, গরীব ঘরে জন্ম, ছোট বেলা থেকেই মানুষের বাড়িতে বাড়িতে কাজ করে বড় হয়েছে। তখন থেকেই দেখে আসছি এমন; এটাকে নিয়ম বলেই মেনে নিয়েছি। আর আজ হঠাৎ করে বেশি দাম চাইলে কেউ কাজই দিবে না।
কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠে সংসারের কাজ সেরে তারা পৌঁছে যায় তাদের কর্মস্থলে। খাওয়ার সময় নেই, নেই বিশ্রাম। বেঁচে থাকার তাগিদে জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করছে নিরন্তর। নারী শ্রমিকের অধিকাংশই কৃষির বিভিন্ন ক্ষেত্রে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি তাদের কেউ কেউ চাতাল মিলে ধান শুকানো, ভাপানো কিংবা চাল তৈরির কাজ করে থাকেন। আবার কেউ মাটি কাটে, ইট ভাঙে। এত পরিশ্রমের পরেও নারীরা কর্মক্ষেত্রে মজুরী বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।


কৃষকরা বলছে, নারী শ্রমিকরা পুরুষের মত সব কাজ করতে পারে না বিধায় তাদের শ্রমের দাম কিছুটা কম। নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর দাবি, দীর্ঘ দিন ধরে নারীকে কৃষক হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানানো হলেও প্রয়োজনীয় নীতি প্রণয়ন করে নাই। একই সঙ্গে নারীর কৃষক হিসাবে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করার বিষয়টিও আছে। এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করার বিষয়টিও আছে। বিভিন্ন তথ্য মতে, ফসল উৎপাদনে নারীর সক্রিয় অবদান ২৭ ভাগ। অথচ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে পুরুষ কৃষকের জন্য সুনির্দিষ্ট ‘ডাটাবেজ’ তৈরি থাকলেও নারী কৃষকের সেটা নেই। প্রতিদিন সূর্য উদয় থেকে শুরু করে সূর্য অস্তের আগ পর্যন্ত কাজ করে মাত্র ১ ঘণ্টা সময় পাচ্ছে দুপুরের খাবারের জন্য।

 এসব অধিকাংশ নারী শ্রমিকের কাজের জন্য কোনো সুষ্ঠু পরিবেশও নেই। রোদ ও বৃষ্টিতে বসার মতো কোনো জায়গাও নেই তাদের। কৃষিকাজ ও অন্যান্য কাজে নিয়োজিত নারীদের দাবি, নারীকে শ্রম আইনে অর্ন্তভূক্ত করে কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। গ্রামীণ জীবনযাত্রায় স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য প্রচার অভিযান এর ২০১২ সালের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, দেশের মোট নারী শ্রম শক্তির পরিমাণ ১ কোটি ৬২ লাখ। এর মধ্যে ৭৭ শতাংশ গ্রামীণ নারী। যার ৬৮ শতাংশ কৃষি, পোলট্রি, বনায়ন ও মৎস্য খাতের সঙ্গে জড়িত।


বিশ্ব ব্যাংকের ২০০৮ সালের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কৃষি খাতে নিয়োজিত পুরুষের চেয়ে নারীর অবদান শতকরা ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ বেশি। এছাড়া কর্মক্ষম নারীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিয়োজিত আছে কৃষিকাজে। বাংলাদেশ উন্নযন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) এক গবেষণা বলছে,  গ্রামীণ ৪১শতাংশ নারী আলু চাষের সঙ্গে জড়িত।কৃষি কাজে নারীর অবদান থাকা সত্বেও তাদের কৃষক হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে না। এতে এক জন পুরুষ যেসব সুবিধা ভোগ করছে কৃষাণীরা তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের রংপুর জেলার সাধারণ সম্পাদক রুমানা জামান বলেন, স্থানীয়ভাবে যারা এই পেশায় আছে সেই সব নারীদের সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি কৃষকদেরও সচেতন করতে হবে।

দ্রুতই পুনর্গঠন সম্পন্ন করতে চায় বিএনপি

রাজকুমার নন্দী : ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ে ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হলেও এক বছরেও গুছিয়ে উঠতে পারেনি দলটি। কাউন্সিলে অনুমোদিত হলেও প্রকাশ হয়নি বিএনপির গঠনতন্ত্র। পুরোপুরি কার্যকর হয়নি ‘এক নেতার এক পদ’ নীতি। দলের মন্ত্রণালয়ভিত্তিক উপ-কমিটিগুলোও এখনো আলোর মুখ দেখেনি। স্থায়ী কমিটিসহ কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির কয়েকটি পদ এখনো শূন্য রয়েছে। এক বছরেও ডাকা হয়নি বিএনপির নির্বাহী কমিটির বর্ধিত সভা। শেষ হয়নি তৃণমূল পুনর্গঠন প্রক্রিয়াও। কিন্তু তারপরেও কাউন্সিলের এক বছরের অর্জনে সন্তুষ্ট বিএনপি। তবে এসব কমিটি গঠনে ধীরগতির জন্য বিএনপির ওপর ক্ষমতাসীনদের দমন-পীড়ন, হামলা-মামলাকে অনেকাংশেই দায়ী করছে দলটি।

বিএনপির নেতারা বলছেন, দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিসহ ইতোমধ্যে জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল ও জাসাসের কমিটি দেয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগর কমিটিও যেকোনো দিন ঘোষিত হবে। নির্বাচন কমিশন গঠনে একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখাও দেয়া হয়েছে। একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের চেয়ারপারসন শিগগিরই নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের রূপরেখাও দেবেন। এরপর নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে প্রয়োজনে বেগম জিয়া রাজপথেও নামতে পারেন। সেজন্য দ্রুতই পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে চায় বিএনপি।

গত বছর রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে অনুষ্ঠিত বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের দিনই খালেদা জিয়া দলের চেয়ারপারসন এবং তার বড় ছেলে তারেক রহমান সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পুনর্র্নির্বাচিত হন। এরপর ৩০ মার্চ মহাসচিব পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম ঘোষণা করা হয়। কাউন্সিলের সাড়ে চার মাস পর গত ৬ আগস্ট ঘোষণা করা হয় ৫০২ সদস্যের ‘ঢাউস’ জাতীয় কমিটি। তখন ১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটির ১৭ জনের নাম ঘোষণা করে বিএনপি। তবে হান্নান শাহ মারা যাওয়ায় তার পদসহ এখন তিনটি পদ খালি রয়েছে। মৃত্যুজনিত কারণে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের কয়েকটি পদও শূন্য হয়েছে। এছাড়া নির্বাহী কমিটিতে আন্তর্জাতিক সম্পাদকের দুইটি, ছাত্র ও সহ-ছাত্রবিষয়ক দুইটি এবং যুববিষয়ক সম্পাদকের একটি পদ এখনো শূন্য রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দৈনিক করতোয়াকে বলেন, কমিটি গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। সাংগঠনিক এই প্রক্রিয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে না, এটি চলতে থাকে। ইতোমধ্যে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা হয়েছে। কিছু অঙ্গ সংগঠনের কমিটিও হয়েছে, বাকিগুলোও খুব শিগগিরই হবে। জেলা সম্মেলন করছি, কমিটিগুলোও হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে-দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এখন বিএনপির প্রতিকূলে। দলের চেয়ারপারসন থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়া এখনো চলছে। বিএনপিকে যেভাবে নির্যাতন-নিপীড়নের মধ্য দিয়ে নির্মুল করে দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে, সেখানে আমরা যে এখনো সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছি, মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছি, সেটিই বিএনপির সবচেয়ে বড় ভিত্তি, বড় অর্জন। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত যতটুকু কাজ হয়েছে তাতে আমরা সন্তুষ্ট।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনের পর দল পুনর্গঠনে নামে বিএনপি। ওই নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ার পর ৪ ফেব্রুয়ারি বিএনপির চেয়ারপারসন সংবাদ সম্মেলনে দল পুনর্গঠনের ঘোষণা দেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তৃণমূল পুনর্গঠন সম্পন্ন হয়নি। বর্তমানে ৮০টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে এখন পর্যন্ত ৩৪টি জেলায় আংশিক কমিটি হয়েছে। এদিকে, দলে এখন পর্যন্ত এক নেতার এক পদের বিধানও পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। কাউন্সিলের পর নতুন কমিটিতে একাধিক পদধারী ৬১ জন নেতা ছিলেন। তারা কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির পদের পাশাপাশি মহানগর-জেলা-উপজেলা কমিটি অথবা বিএনপির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পদে রয়েছেন। তবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল, ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহানসহ প্রায় অর্ধ-শতাধিক নেতা ইতোমধ্যে একাধিক পদ ছেড়ে দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে বিএনপির তৃণমূূল পুনর্গঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা মো. শাহজাহান দৈনিক করতোয়াকে বলেন, দলে ‘এক নেতার এক পদ নীতি’ কার্যকর শুরু হয়েছে। ১০-১২ জন ছাড়া অন্যরা একটি পদ রেখে বাকিগুলো ছেড়ে দিয়েছেন। শিগগিরই এটি পুরোপুরি কার্যকর হবে।

জানা যায়, কাউন্সিলে গঠনতন্ত্র অনুমোদনের পর তা প্রকাশ করার দায়িত্ব দেয়া হয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানকে। তবে সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকায় তিনি এখন কুমিল্লা সিটি নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত। নির্বাচন শেষে ঢাকায় ফিরলেই দলীয় গঠনতন্ত্র প্রকাশ করা হবে। বিএনপির গঠনতন্ত্র প্রকাশ প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, এটা প্রায় প্রস্তুত হয়ে আছে। কিন্তু একটু সময় লাগছে। আওয়ামী লীগও তো তাদের গঠনতন্ত্র প্রকাশ করেনি। আশা করছি, আমরা শিগগিরই তা প্রকাশ করতে পারব। এদিকে, বিএনপি এখনো মন্ত্রণালয়ভিত্তিক উপ-কমিটিও দিতে পারেনি। গঠনতন্ত্রে ২৬টি উপ-কমিটির কথা রয়েছে। সেখানেও প্রায় ৩০০ নেতার ঠাঁই মিলবে। উপ-কমিটি গঠনের কাজ চলছে জানিয়ে বিএনপির মহাসচিব বলেন, এসব কমিটি গঠনে আমরা ইতোমধ্যে কিছু কাজ করেছি, কিন্তু তা ঘোষণা করা হয়নি। ইতোমধ্যে রিসার্চ সেল গঠিত হয়েছে। বাকি কাজও খুব শিগগিরই সম্পন্ন হবে।

 

 

পঞ্চগড়ের ২০ হাজার নারী পাথর শ্রমিক, জীবনমানের উন্নয়ন হয়নি

সামসউদ্দীন চৌধুরী কালাম, পঞ্চগড় : পাথরের জেলা বলে খ্যাত পঞ্চগড়ে প্রতিদিন কাজ করে অর্ধ লক্ষাধিক পাথর শ্রমিক। এদের মধ্যে প্রায় ২০ হাজার নারী পাথর শ্রমিক রয়েছে। পুরুষ শ্রমিকদের সমান কাজ করে তারা পায় অর্ধেক পারিশ্রমিক। তারপরও এনজিও’র ঋণের কিস্তি আর সংসারের তাগিদে তাদের উদয়াস্ত পরিশ্রম করে যেতে হয়। অথচ নদী ও সমতল ভূমি থেকে পাথর তোলার পর বাছাই করাসহ পাথর ভাঙার কাজের জন্য নারী শ্রমিকরাই একমাত্র ভরসা। কিন্তু এই মজুরিতেই সন্তুষ্ট এখানকার নারী শ্রমিকরা। সারা বছরই তাদের কাজ জোটে। মজুরি একটু কম পেলেও তাদের কোন আপত্তি নেই। এত কিছুর পরও কাজে ফাঁকি দেয়ায় প্রবণতা কম থাকায় পাথর ব্যবসায়ীরা এসকল কাজের জন্য নারী শ্রমিকদেরই বেশি প্রাধান্য দিয়ে আসছে।

পঞ্চগড় জেলার সদর ও তেঁতুলিয়া উপজেলার নদী থেকে পাথর উত্তোলন, সমতল ভূমি থেকে পাথর উত্তোলন, বিভিন্ন সাইজের পাথর বাছাইসহ স্থানীয় ও ভারত থেকে আনা পাথর ভাঙার কাজে নিয়োজিত রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার পাথর শ্রমিক। এদের প্রায় অর্ধেকই নারী শ্রমিক। পুরুষ শ্রমিকরা মূলত পাথর উত্তোলনের কাজ করে থাকে। পাথর বাছাই ও মেশিনে ভাঙানোর কাজ বেশি করে নারী শ্রমিক। পুরুষ শ্রমিক বিভিন্ন অজুহাতে কাজে ফাঁকি দিলেও নারী শ্রমিক শতভাগই তাদের কাজে মনোযোগী। সকাল ৮টার সময় দুপুরের খাবার নিয়ে কাজে আসে তারা। দুপুরের এক ঘন্টার বিরতির মধ্যে বাড়ি থেকে আনা খাবার সেরে সামান্য আয়েশ করেই আবার কাজে লেগে পড়ে। ফাল্গুনের চৈত্রের আগুন ঝরা রোদে তারা কাজ করে চলে অবিচলভাবে। সূর্যাস্তের সামান্য আগে মজুরির টাকা হাতে নিয়ে বাড়িতে ফিরে তারা। প্রতিদিন তাদের কাজ করতে হয় প্রায় ১০ ঘন্টা বা তারও বেশি সময়। অধিকাংশ নারী শ্রমিকের কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ নেই। রোদ-বৃষ্টিতে বসার মত কোন জায়গা নেই, নেই টয়লেটের ব্যবস্থাও। এ যুগে এসেও প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে তাদের যেতে হয় পাশের ঝোপঝাড় বা খানাখন্দকে। অনেক নারী শ্রমিক তাদের শিশু সন্তানকে সাথে করে আনলেও তাদের থাকার মত কোন ব্যবস্থা নেই।

এনিয়ে কথা বললে তেঁতুলিয়ার খয়খাটপাড়া গ্রামের পাথর শ্রমিক আফছানা আক্তার (২৪) বলেন, আমার ১৬ বছর বয়সে বিয়ে হয়। সংসারের অভাবের তাড়নায় বিয়ের দুই বছর পর থেকেই আমি পাথর ভাঙা মেশিনে শ্রমিকের কাজ করে আসছি। সকাল ৮টায় কাজ শুরু করে শেষ করি বিকাল ৬টায়। মাঝখানে এক ঘন্টার খাবার বিরতি দেয় তারা। মেশিন চালু করার পর থেকে বন্ধ করা পর্যন্ত কাজের কোন ফুরসত নেই। এখানে পুরুষদের মজুরি ৪শ’ টাকা করে দেয়া হলেও আমাদের দেয়া হয় ২শ’ ৫০ টাকা।

একই উপজেলার তিরনইহাট গ্রামের পাথর শ্রমিক মর্জিনা বেগম (৪৫) বলেন, আমরা নারী শ্রমিকরা সারাদিন যে কাজ করি পুরুষ শ্রমিকরা তা করে না। অথচ আমরা তাদের চেয়ে মজুরি পাই প্রায় অর্ধেক। আমাদের মালিক আমাদের দিয়ে লাখ লাখ টাকা ইনকাম করলেও আমাদের মজুরি বাড়াতে তাদের কষ্ট হয়। আমি যে মেশিনে কাজ করি সেখানে ১২ জন শ্রমিক রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র দুইজন পুরুষ শ্রমিক। বাকিরা সবই নারী শ্রমিক। পুরুষ শ্রমিকদের চেয়ে আমরা কাজ বেশি করলেও আমাদের পারিশ্রমিক দেয়া হয় তাদের অর্ধেক।
এ প্রসঙ্গে কথা হয় পাথর ভাঙা মেশিনের মালিক সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের সাথে। তিনি বলেন, আমার সাইডে ১৪ জন শ্রমিক কাজ করে। এদের মধ্যে ১০ জনই নারী শ্রমিক। নারীরা পুরুষের সমান কাজ করে স্বীকার করে তিনি বলেন, সবাই নারী শ্রমিকের মজুরি কম দেয়। আমি পুরুষ শ্রমিকদের ৪শ টাকা ও নারী শ্রমিকদের ৩শ টাকা করে মজুরি দেই। তার যদি কৃষি জমিতে কাজ করত তাহলে সর্বোচ্চ একশ ৫০ টাকা মজুরি পেত। আবার জমিতে সারাবছর কাজ থাকে না। আমার সাইডে সারাবছরই কাজ চলে। আমার এখানে তারা কাজের নিশ্চয়তা পায়। 

গহনা তৈরির মাঝেই ওদের স্বপ্ন খোঁজা

আলী আজম সিদ্দিকী : গোপি চন্দ্র সরকার ও ভালো রাণী সরকার দম্পতির পেশা ইমিটেশন গহনা তৈরি করা। সকাল ৯টা হতে সন্ধা ৬টা পর্যন্ত তারা গহনা তৈরি করেন। পরিবারের একমাত্র সন্তান জয় সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। জয়কে তারা ডাক্তার বানাতে চান। গয়না বিক্রি করেই তাদের সংসার চলে। গয়না তৈরির মাঝেই তাদের স্বপ্ন খোঁজা।
সভারের ভাকুর্তা গ্রামে এই গোপি পরিবারের মতো অধিকাংশ বাড়িতেই গহনা তৈরি করা হয়। তামা, পিতল, কাঁসা দিয়ে তারা গহনা তৈরি করেন। গয়না তৈরির মধ্যে তাদের জীবননির্বাহ, গয়না তৈরির মাঝে তাদের স্বপ্ন লুঁকায়িত। ঢাকার গাবতলি থেকে আমিনবাজার পার হলেই হাতের বাম দিকে একটি পুরাতন জরাজীর্ণ বেইলি ব্রিজ চোখে পড়ে। ব্রিজটি পার হয়ে মোগরকান্দা। তারপরের পুরোটাই ভাকুর্তা। গ্রামটি ভাকুর্তা, মধ্য ভাকুর্তা এবং হিন্দু ভাকুর্তার সমন্বয়ে গঠিত।

ভাকুর্তাকে বলা হয় গহনা তৈরির গ্রাম। এখানকার বিভিন্ন নকশার গহনা সারা বাংলাদেশে পরিচিত। সরেজমিনে ভার্কুতা বাজারে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি অনেকগুলো দোকান। এসব দোকানগুলোর কোনটাতে হাতুড়ির ঠুকঠাক শব্দ বাজছে আবার কোনটাতে ক্রেতারা অলংকার দেখছেন। দোকানগুলোতে কানের দুল, চুরি, মনিপুরি বালা, নেকলেস, সিতাহার, গলার চেইন, ঝুমকা, হাতের বালা, চুলের ব্যান্ড, কিপ, আংটি, সিঙ্গারা টায়রা , লহরি সহ ২৫-৩০ ধরনের গয়না পাওয়া যায়। চাইলে নিজের পছন্দমতো ডিজাইন দিয়েও গহনা তৈরি করানো যায়। সুজন সরকার নামে এক দোকানদারের সাথে কথা হয়। তিনি ৮৪ সাল থেকে গয়না তৈরির কাজ করছেন। এই প্রতিবেদককে তিনি জানান, ২০০৩ সালের পর এই ইমিটেশন গয়নার চাহিদা বেড়ে যায়। এখনো বেশ চাহিদা। চাহিদা সম্পর্কে ধনী,মধ্যবিত্ত গরীব সবাই এই গয়না স্বাচ্ছন্দে ব্যবহার করে এবং স্বর্ণ-রৌপ্যের আকাশচুম্বী দামকে তিনি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

একটি দোকানে মৌচাক থেকে আসা রাকিবুল ইসলাম নামে এক ক্রেতার সাথে কথা হয়। তিনি প্রায়ই এসব দোকান থেকে পাইকারি দরে গয়না কিনেন। তিনি বলেন, ‘এখান থেকে গয়না কিনে মৌচাকে আমরা কালার করি। তখন বোঝার সাধ্য থাকে না এটা সোনার গয়না নাকি ইমেটিশেন গয়না।’ বাজারে এসব গহনার বেশ চাহিদা বলে তিনি জানান। দোকান পরিদর্শন শেষে এই প্রতিবেদক গ্রামের দিকে রওনা হন। সেখানে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় গহনা তৈরির বিশাল কর্মযজ্ঞ। ভাকুর্তা গ্রামে প্রায় হাজার তিনেক গহনার কারিগর আছে বলে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়। গ্রামের ভেতরে যেয়ে দেখা যায়, প্রতিটি পরিবারের সদস্যরা গয়না তৈরির কাজে ব্যস্ত। এদের কেউ গয়নার কাঁচামাল জোগান দেন, কেউ ডাইস বানানোর কাজ করেন আবার কেউবা গয়নাগুলো জিংকে ধুয়ে রং বের করেন বলে তারা জানান। গহনা তৈরিতে লাভ সম্পর্কে নারায়ণ কর্মকার নামের একজন জানান, আগে কম লোকজন গয়না তৈরির কাজ করতো। এখন এই কাজে অনেক মানুষ এমনকি মুসলমানেরাও জড়িয়ে পড়েছে। ফলে লাভ কমে গেছে। গয়না বিক্রির অর্থ দিয়ে অনেক কষ্টে তার পরিবারের ৯ সদস্যের জীবননির্বাহ করতে হয় বলে নারায়ণ কর্মকার জানান। কম লাভেও এই পেশা গ্রহণের কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এই পেশা বাপ-দাদার ঐতিহ্য। কষ্ট হলেও মরার আগে এই পেশা ছাড়ুম না।’

এদিকে, রাজধানীর নিউমার্কেট স্বর্ণের দোকান গুলোতে গিয়ে সোনার গহনার বর্তমান চাহিদা সম্পর্কে জানবার চেষ্টা করা হয়। স্বর্ণের দোকানদাররা বলেন, স্বর্ণ তো স্বর্ণই। তবে বর্তমানে স্বর্ণালঙ্কারের  অনেক বেশি দাম ও বর্ধিত কর আরোপের কারণে মানুষ ইমিটেশন গয়নার দিকে ঝুঁকছে। বাধ্য না হলে কেউ সোনার গহনা কিনেনা বলে তারা মতপ্রকাশ করেন। স্বর্ণ অলংকারের ওপর যাকাত থাকার কারণে অনেকে অলংকার কিনে রাখতে চান না বলেও তারা মনে করেন। অন্যদিকে, চাঁদনী চক মার্কেটে গিয়ে ইমিটেশন গয়নার দোাকানগুলোতে ক্রেতাদের বেশ উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। মনিরা বেগম নামের মপল ক্রেতা কানের দুল ও চুরি দেখছিলেন। এই অলংকার ব্যবহার সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘স্বর্ণালঙ্কারের অনেক দাম। তাছাড়া এই গহনা সব সময় ব্যবহার করা যায় দামও কম।’ বর্তমানে অনলাইন যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেও ইমিটেশন গহনা বিক্রি হচ্ছে বলে দোকানদাররা জানান।

ছবির ক্যাপশন : সাভারের ভাকুর্তা গ্রামে গোপি পরিবারের সদস্যদের তামা, পিতল, কাঁসা দিয়ে তৈরি গহনা।

 

 

গুরুত্বপূর্ণ ২০টি মামলার নমুনা ফিরিয়ে দিয়েছে ডিএনএ ল্যাব

রুদ্র রাসেল : রাজস্ব খাতে স্থানান্তর না করা এবং দুই মাস ধরে বেতন বন্ধ থাকায় জাতীয় ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গত ১৫ মার্চ থেকে কর্মবিরতি পালন করছেন। এতে গুরুত্বপূর্ণ মামলার ডিএনএ প্রোফাইলিং না হওয়ায় বিপাকে পড়েছে পুলিশ।  সোমবার পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ওই ল্যাবে আসা অন্তত ২০টি মামলার ডিএনএ নমুনা ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা।

জানা গেছে, জাতীয় ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরি এবং ঢাকার বাইরে বিভাগীয় পর্যায়ে ডিএনএ স্ক্রিনিং ল্যাবরেটরিতে (কালেকশন সেন্টার) কর্মরত আছেন ৫৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। একযুগের বেশি সময় ধরে এই প্রকল্পে কাজ করার পরও এখন চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছেন তারা। এ বিষয়ে ডিএনএ ল্যাব প্রকল্পের সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার সাবিনা সুলতানা জানান, ‘প্রকল্প পরিচালক ড. আবুল হোসেন দেশের বাইরে আছেন। তাকে কর্মবিরতির বিষয়টি জানানো হয়েছে।’ ডিএনএ ল্যাব সূত্র জানায়, গত বছরের ৩০ জুন তৃতীয় মেয়াদে প্রকল্পের সময়সীমা শেষ হয়। তবুও জরুরি কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে প্রকল্প পরিচালক স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়, ‘ডানিডা থেকে আর্থিক সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে’। চিঠিতে গতবছরের ১ জুলাই থেকে তৃতীয় পর্বে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চলমান কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। এর প্রেক্ষিতে তারা কাজ চালিয়ে যান। জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তাদের বেতন দেওয়া হলেও শতকরা ২৫ ভাগ বেতন কেটে রাখা হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্র“য়ারির বেতন এখনও হাতে পাননি তারা। এ নিয়ে প্রকল্প পরিচালক ও ল্যাবপ্রধানের কাছে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বারবার ধরনা দিলেও কিছুই করার নেই বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। ডিএনএ ল্যাবের কর্মকর্তারা জানান, ইতোমধ্যে ডিএনএ অধিদফতর বিল পাস হয়েছে। ৯২ জন জনবলেরও অনুমোদন পাওয়া গেছে।

কিন্তু এখন বলা হচ্ছে সেখানে তাদের সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হবে না। তাদের প্রশ্ন- ‘৮-১০ বছর চাকরি করেও এখন কেন তাদের নতুন করে পরীক্ষা দিয়ে চাকরি নিতে হবে?’ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, কর্তৃৃপক্ষ তাদেরকে মৌখিকভাবে আশ্বাস দিয়েছেন যে, তৃতীয় পর্যায় শুরুর প্রথম এক বছরের মধ্যে রাজস্ব খাতে জনবল স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হবে। কিন্তু এখন প্রকল্পের চতুর্থ পর্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। কিন্তু কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। উল্টা তাদের আবার পরীক্ষা দিয়ে প্রকল্পে কাজ পেতে হবে বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু ১০ বছরের বেশি সময় ধরে এখানে কর্মরতরা এখন আর এই শর্ত মানতে রাজি নন। এখানকার জনবলকে সরাসরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের দাবি জানিয়েছেন তারা।

 

কুসিকে জিততে নানা প্রস্তুতি নিয়ে নির্বাচনী মাঠে বিএনপি

রাজকুমার নন্দী : নতুন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অধীনে আগামী ৩০ মার্চ অনুষ্ঠেয় কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের (কুসিক) নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বিএনপি। আগামী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই নির্বাচনে নতুন ইসির ভূমিকা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে দলটি। আর নারায়ণগঞ্জে বিপুল ভোটে পরাজিত হওয়ার পর এবার কুসিক নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে নিজেদের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করতে মরিয়া বিএনপি। সেজন্য কুসিকে দলের মেয়র প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কুর বিজয় নিশ্চিত করতে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে বিএনপি। এর অংশ হিসেবে স্থানীয় নেতাদের সমন্বয়ে ইতোমধ্যে ওয়ার্ডভিত্তিক ২৭টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। দুই-একদিনের মধ্যে ভোটকেন্দ্রভিত্তিক ১০৩টি কমিটিও গঠন করা হবে। ভোটের ফলাফল ঘোষিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা ভোটকেন্দ্রে অবস্থান করবেন। আর সুচারুরূপে প্রচারের স্বার্থে প্রতিটি কমিটির কর্মকান্ড সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড বা ভোটকেন্দ্রেই সীমিত থাকবে। এছাড়া প্রচারণায় দলের কেন্দ্রীয় নেতাদেরও পর্যায়ক্রমে নামানো হচ্ছে। তারা কুমিল্লার স্থানীয় নেতাদের সাথে সমন্বয় করে মেয়র প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাবেন। শিগগিরই কেন্দ্রীয়ভাবে একটি মনিটরিং টিমও গঠন করা হবে। বিএনপি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান নাসিকে সাক্কুর পক্ষে নির্বাচন পরিচালনায় প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করছেন। তাকে সহযোগিতা করছেন দলের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল, মোস্তাক মিয়া, আবদুল আউয়াল খান, নির্বাহী সদস্য শেখ মো. শামীম, চেয়ারপারসনের প্রেস উইংয়ের সদস্য শামসুদ্দিন দিদার। আর নির্বাচনে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিন-উর-রশীদ ইয়াছিনকে প্রধান স্থানীয় সমন্বয়কারী এবং মোস্তাক মিয়া ও আবদুল আউয়াল খানকে সহকারী স্থানীয় সমন্বয়কারী করা হয়েছে। নজরুল ইসলাম তাদেরকে নিয়ে ইতোমধ্যে কুমিল্লায় বৈঠকও করেছেন। ওই বৈঠক থেকে সাক্কুর পক্ষে নির্বাচন পরিচালনার কর্মপদ্ধতি ঠিক করে সেই অনুযায়ী কাজও শুরু হয়েছে। এদিকে, নির্বাচনে ২০ দলীয় জোটের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাদেরও পর্যায়ক্রমে প্রচার কাজে মাঠে নামানো হচ্ছে। বিএনপির মেয়র প্রার্থী সাক্কুকে জোট ইতোমধ্যে তাদের সমর্থনও জানিয়েছে। এলডিপির মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ কুসিক নির্বাচনে জোটের প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করছেন। পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এবং প্রয়োজন হলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে অংশ নিতে পারেন। তবে আপাতত তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই বলে কুসিকে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করা বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতা জানিয়েছেন।

জানা গেছে, নির্বাচনী কর্মকান্ড সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য কুমিল্লার ধর্মসাগরপাড়ে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এমরান সালেহ প্রিন্সের নেতৃত্বে ‘কেন্দ্রীয় নির্বাচনী সেল’ গঠন করা হয়েছে। এছাড়া বিএনপির মেয়রপ্রার্থীসহ তার পক্ষে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাদের প্রতিদিনকার নির্বাচনী প্রচারণার সর্বশেষ খবর গণমাধ্যমের কাছে সরবরাহ করতে দলের ভাইস চেয়ারম্যান শওকত মাহমুদকে প্রধান করে একইস্থানে একটি মিডিয়া সেলও গঠন করা হয়েছে। শামসুদ্দিন দিদারকে এ সেলের সহকারী সমন্বয়কারী করা হয়েছে। এদিকে, নারায়ণগঞ্জে ১০৪জন কেন্দ্রীয় নেতাকে মাঠে নামানো হলেও কুসিক নির্বাচনে এতো বেশি সংখ্যক কেন্দ্রীয় নেতাকে প্রচারণায় নামাতে চায় না বিএনপি। দলটি মনে করছে, বিএনপির মেয়র প্রার্থী সাক্কু পরপর দুইবার মেয়র (পৌর ও সিটি করপোরেশন) ছিলেন। সুতরাং তার নিজস্ব একটা সেটআপ আছে, নিজস্ব ভোটও আছে। এছাড়া তিনি এলাকায় ব্যাপক উন্নয়নও করেছেন। আর নারায়ণগঞ্জে অনেক ভাসমান ভোটার থাকলেও কুসিকে স্থানীয় ভোটারই বেশি। তাছাড়া নারায়ণগঞ্জে প্রচারণায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের কিছুটা সঙ্কট থাকলেও বিএনপি অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় কুমিল্লায় প্রচুর স্থানীয় নেতাকর্মী রয়েছে। এসব কারণে কুসিকে প্রচারণার ক্ষেত্রে স্থানীয় নেতাদের বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলে বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতা জানান।

নারায়ণগঞ্জের মতো কুসিক নির্বাচনেও স্থানীয় বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কোন্দল বিজয়ের পথে কিছুটা বাধার সৃষ্টি করতে পারে, এমন আশঙ্কা থাকলেও বাস্তবে তার প্রভাব নেই। দলের কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী কুমিল্লার স্থানীয় নেতারা ইতোমধ্যে দলীয় মেয়র প্রার্থীর পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ শুরু করেছেন। যাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি শঙ্কা ছিল সেই ইয়াছিন ইতোমধ্যে সাক্কুর পক্ষে প্রচারণায় নেমেছেন। তাই কুসিকে সুষ্ঠু ভোট হলে সাক্কুই মেয়র হবেন বলে আশা তার কর্মী-সমর্থকদের। নির্বাচন সুষ্ঠু ও নির্বিঘœ করতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে বিএনপি এতোদিন সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়ে আসলেও কুসিকে ভিন্ন কথা বলেছেন দলটির মেয়র প্রার্থী সাক্কু। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে ভোটের সময় সেনাবাহিনীর পরিবর্তে কুসিকের প্রতিটি ওয়ার্ডে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ চান তিনি। এর কারণ ব্যাখ্যা করে সাক্কু দৈনিক করতোয়াকে বলেন, সেনাবাহিনী চাওয়া হলেও সহজে তা পাওয়া যায় না।

তাছাড়া অনাকাক্সিক্ষত কিছু ঘটলে পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্য বাহিনী ত্বরিত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। কিন্তু জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এক্ষেত্রে ত্বরিত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। মেয়র থাকাকালে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন দাবি করে তিনি বলেন, ভোট সুষ্ঠু হলে এবং ভোটাররা নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারলে কুসিক নির্বাচনে তিনিই বিজয়ী হবেন।

কুসিকে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী মহিলা হওয়ায় সেখানে মহিলা ভোটারদের মধ্যে ধানের শীষের পক্ষে জোয়ার সৃষ্টি করতে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে চাইছে বিএনপি। বিশেষ করে গত ঢাকা দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে মেয়রপ্রার্থী ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য স্বামী মির্জা আব্বাসের পক্ষে গণসংযোগ করে সাড়া ফেলে দেয়া মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাসকে সামনে রেখে এ দায়িত্ব দেয়া হতে পারে। বিএনপির মেয়র প্রার্থীকে জেতাতে দলটির অন্য অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোও অনুরূপভাবে তাদের কর্মকান্ড পরিচালনা করবে। কুমিল্লাবাসীর কাছ থেকে ধানের শীষের পক্ষে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন জানিয়ে নির্বাচনে বিএনপির প্রধান সমন্বয়কারী নজরুল ইসলাম খান দৈনিক করতোয়াকে বলেন, বিএনপির মেয়র প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু কুমিল্লায় অত্যন্ত জনপ্রিয়। দুইবার মেয়র থাকাকালে তিনি এলাকায় ব্যাপক উন্নয়নও করেছেন। তাছাড়া সরকারের দুঃশাসনে সারাদেশের সঙ্গে কুমিল্লাবাসীও অতিষ্ঠ। তাই সুষ্ঠু ভোট হলে ও কুমিল্লাবাসী নির্বিঘেœ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ পেলে বিপুল ভোটে সাক্কুই বিজয়ী হবেন।

আদমদীঘির বাজারে আলুর ব্যাপক সরবরাহ চড়া মূল্য পাওয়ায় চাষিরা খুশি

হাফিজার রহমান, আদমদীঘি (বগুড়া) : বৈরী আবহাওয়া সত্ত্বেও বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলায় এবার আলুর ফলন ভাল হয়েছে। বর্তমানে আদমদীঘি উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে আলুর প্রচুর সরবরাহ হচ্ছে। এদিকে বাজারে পাইকারদের আগমনে আলুচাষিরা তাদের ক্ষতি পুষিয়ে আলুর চড়া দাম পাওয়ায় বেশ খুশিই হয়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি রবি মৌসুমে বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার একটি পৌরসভাসহ ৬টি ইউনিয়ন মিলে ৪ হাজার ১ হেক্টর জমিতে লালপাকড়ি, রুমানা, তেলপাকড়িসহ বিভিন্ন জাতের আলু আবাদ করা হয়। বৈরী আবহাওয়ার কারণে আলু আবাদে কিছুটা প্রভাব পড়লেও ফলন হয়েছে ভাল। প্রতি বিঘায় ৩৫ থেকে প্রায় ৫০ মণ ফলন হয়েছে বলে আলুচাষিরা জানান।

বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে আলুর ব্যাপক আমদানি হচ্ছে। পাইকার সাহাদত হোসেন, শ্রী অমূল্য জানান, তারা প্রতিটি হাটে ৫/৬শত মণ করে আলু কিনে ট্রাক যোগে ঢাকার কাওরান বাজার চট্টগ্রাম সিলেটসহ অন্যান্য বাজারে সরবরাহ করেন। প্রতিমণ আলু প্রকার ভেদে পাইকারি মূল্যে বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত।

আলুচাষি দুলাল, জিল্লুর, ফরিদুল জানান, তারা ৪ বিঘা করে জমিতে আলু আবাদ করেছেন। বৈরী আবহাওয়ার কারণে ফলন কিছুটা কম হলেও বাজারে চড়া দাম পেয়ে খুশি। গত মঙ্গলবার সকালে অতিরিক্ত উপপরিচালক উদ্ভিদ সংরক্ষণ ওবাইদুর রহমান, আদমদীঘি উপজেলা কৃষি অফিসার কামারুজ্জামান ও উপসহকারী কৃষি অফিসার একেএম মনজুরুল ইসলাম আদমদীঘি আলুর হাট পরিদর্শন করে আলু বিক্রেতা ও চাষিদের সাথে মতবিনিমিয় করেন। আলুচাষিরা চড়া দাম পাওয়ায় অনেক আনন্দিত বলে জানান।

খালেদা জিয়ার ডাকের অপেক্ষায় সংস্কারপন্থীরা

রাজকুমার নন্দী : দীর্ঘ দশ বছর প্রতীক্ষার পর গত মাসে সংস্কারপন্থী দুই নেতার ভাগ্য ফেরায় এখন বাকি নেতারা বিএনপিতে ফিরতে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ডাকের অপেক্ষায় রয়েছেন। ওয়ান-ইলেভেনের চরম দুর্দিনে বিএনপির পাশে থাকতে না পারায় এখন দারুণ অনুতপ্ত দলটির সাবেক এই নেতারা। অতীতের ভুল-ভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে দলের পক্ষে এখন ভূমিকা রাখতে চান তারা। তাই মাতৃসম নেত্রীর কাছে মাফ চেয়ে বিএনপিতে ফিরতে তারা এখন মানসিক প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। তবে ধাপে ধাপে তাদের অধিকাংশকে দলে ফেরানো হবে। এবার ডাক পড়তে পারে বিএনপির সাবেক কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তিসহ আরও কয়েকজনের। খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের পর তৃপ্তির বহিষ্কারাদেশও প্রত্যাহার করা হতে পারে বলে জানা গেছে।

সংস্কারপন্থী নেতাদের বিএনপিতে ফিরিয়ে নেয়ার পক্ষে দলটির রাজনীতির পরামর্শক ও সমালোচক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি দৈনিক করতোয়াকে বলেন, সামনে জাতীয় নির্বাচন আসছে। হাতে খুব বেশি সময় নেই। দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে অতীত ভুল-ভ্রান্তি ক্ষমা করে দিয়ে খুব দ্রুতই সংস্কারপন্থিদের ফিরিয়ে নিয়ে বিএনপির এখনই মাঠে নামা উচিত।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, আগামী নির্বাচনের আগে দলকে একটি প্লাটফর্মে দাঁড় করাতে চান খালেদা জিয়া। কারণ, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের দাবিতে প্রয়োজনে রাজপথেও নামতে চান বিএনপি প্রধান। এ কারণেই সাংগঠনিক ঐক্যের প্রতি জোর দিয়েছেন তিনি। তাই দলের বাইরে থাকা সংস্কারপন্থিদেরও কাছে টানার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বেগম জিয়া। এর অংশ হিসেবে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি দলের সাবেক তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক জহিরউদ্দিন স্বপন এবং সাবেক সংসদ সদস্য সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলকে গুলশান কার্যালয়ে ডেকে পাঠান খালেদা জিয়া। অতীত কর্মকান্ডের জন্য ক্ষমা চাইলে বেগম জিয়া তাদের দলে সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেন।

এদিকে, স্বপন ও বকুল বিএনপিতে ফেরায় বাকি সংস্কারপন্থী নেতা ও তাদের অনুসারী কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে নতুন করে আশার আলোর সঞ্চার হয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, অতীত কর্মকান্ড ক্ষমা করে দিয়ে খালেদা জিয়া তাদেরকেও দলে পুনরায় কাজ করার সুযোগ দিবেন। তবে সংস্কারপন্থী বাকি নেতারা যাতে বিএনপিতে ফিরতে না পারেন, সেজন্য তাদের দুই-একজনের বিরুদ্ধে দলীয় বিরোধিতাও হচ্ছে। তৃপ্তি যাতে দলে ফিরতে না পারেন, সেজন্য সম্প্রতি যশোর প্রেসক্লাবে তার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। তবে এর পেছনে দলের এক সিনিয়র কেন্দ্রীয় নেতার ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ তৃপ্তির কর্মী-সমর্থকদের। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংস্কারপন্থী অভিযোগে ২০০৭ সালে তৃপ্তিকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও কর্মীবান্ধব ও জনপ্রিয় হওয়ায় তার নিজের এলাকা শার্শা থানা বিএনপির নেতাকর্মীরা তৃপ্তির সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। তৃপ্তি দীর্ঘদিনেও দলে ফিরতে না পারলেও হতাশ নন তারা। সম্প্রতি তৃপ্তির ঢাকার বাসায় গিয়ে দেখা যায়, শার্শার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়ন থেকেই বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা এসে তৃপ্তির সঙ্গে কথা বলছেন। তৃপ্তির বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সেখানে উপস্থিত শার্শা বিএনপির কয়েকজন নেতা বলেন, তৃপ্তি ভাই যাতে বিএনপিতে ফিরতে না পারেন, সেজন্য দলের এক সিনিয়র কেন্দ্রীয় নেতার ইন্ধনে ওই সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। যেখানে শার্শার ১১টি ইউনিয়নের মধ্যে মাত্র একটি ইউনিয়নের হাতেগোনা দুই-চারজন নেতা উপস্থিত ছিলেন, যা সমগ্র থানা বিএনপির প্রতিনিধিত্ব করে না। শার্শার অধিকাংশ নেতাকর্মী তৃপ্তি ভাইয়ের সঙ্গেই রয়েছেন। তারা মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে দলে স্বাগত জানাতে উদগ্রীব হয়ে আছেন। জানতে চাইলে মফিকুল হাসান তৃপ্তি দৈনিক করতোয়াকে বলেন, ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) আমাকে যেখানে যেভাবে সক্রিয় করবেন, সেখানে থেকেই কাজ করব। অনেক সুযোগ ও প্রলোভন এসেছে, আমি যাইনি। বিএনপিতে ছিলাম, বিএনপিতেই থাকতে চাই। শার্শার মানুষ আমাকে ভালোবাসে। আমি সবাইকে নিয়েই কাজ করব।

ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সেনাসমর্থিত সরকারের সময়ে ২০০৭ সালের জুনে ১৫ দফা সংস্কার প্রস্তাব দিয়ে তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া এবং তাকে সমর্থনকারী শতাধিক সাবেক এমপি ও সিনিয়র নেতা সংস্কারপন্থী বলে বিএনপিতে পরিচিতি পান। খালেদা জিয়া সে সময় মান্নান ভূঁইয়াসহ কয়েকজনকে দল থেকে বহিষ্কার করেছিলেন। এরপর অবশ্য অনেককে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদেও বসানো হয়। বাকিরা ক্ষমা চেয়ে দলে ফিরতে বিএনপি চেয়ারপারসনের কাছে বিভিন্ন মাধ্যমে বার্তা পাঠান। এ ধারা অব্যাহত থাকায় সংস্কারপন্থিদের দলে ফেরাতে ২০১৫ সালের দিকে বিএনপির কয়েকজন নেতাকে দায়িত্ব দেয়া হয়। দায়িত্বপ্রাপ্তরা সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকও করেন। সর্বশেষ গত বছরের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তাদের ফিরিয়ে আনার কথা ছিল। কিন্তু ওয়ান-ইলেভেনে খালেদা জিয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়া নেতাকর্মীরা আপত্তি জানানোয় তাদের আর দলে ফেরা সম্ভব হয়নি। এতে কিছুটা অসন্তুষ্ট হলেও হাল ছাড়েননি তারা। কোনো পদ-পদবি না থাকলেও দলের পক্ষে নানা মাধ্যমে সোচ্চার ছিলেন। এমনকি তারা অন্য কোনো দলেও যাননি, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দশম সংসদ নির্বাচনেও অংশ নেননি।

জানা যায়, সংস্কারপন্থি অভিযোগে এখনো প্রায় অর্ধশত সাবেক এমপি ও নেতা বিএনপির বাইরে রয়েছেন। দু-একজন বাদে দলের বাইরে থাকা সব নেতাকেই পর্যায়ক্রমে দলে নেওয়া হবে। সাংগঠনিক দায়িত্বও পাবেন কেউ কেউ। দলের বেশ কয়েকটি শূন্যপদসহ বিষয়ভিত্তিক উপ-কমিটিতেও এই নেতাদের জায়গা করে দেয়া হতে পারে। জনপ্রিয়তাভেদে এদের কয়েকজন আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগও পেতে পারেন। বিএনপির কয়েকজন নেতা এ নিয়ে কাজও করে যাচ্ছেন। তবে এ ব্যাপারে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি দলের হাইকমান্ড।

সংস্কারপন্থিদের দলে ফেরানোর উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন বিগত ওয়ান-ইলেভেনে খালেদা জিয়ার পক্ষে অবস্থান নেওয়া বর্তমানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি দৈনিক করতোয়াকে বলেন, বিএনপিতে খ্যাতনামা সংস্কারপন্থী যারা ছিল তারা অনেক আগেই দলে ফিরেছে। তাহলে ছোটো-খাটোরা দলের বাইরে থাকবে কেন? সবাই তো একই অপরাধে অপরাধী। ম্যাডাম বড়দের ক্ষমা করতে পারলে ছোটদের কেন ক্ষমা করতে পারবেন না? তাই একজন-দু’জন করে নয়, বাকি সবাইকে একসঙ্গে ফিরিয়ে নিয়ে একই প্রক্রিয়ায় সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেওয়া উচিত। এরপর তাদের কর্মকান্ড দেখে কাকে কোথায় কী অবস্থায় রাখা হবে, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

 

 

 

সাফারি পার্কে মা বাঘিনীর সময় কাটে তিন সন্তান নিয়ে

রেজাউল করিম সোহাগ, শ্রীপুর (গাজীপুর) : গাজীপুরের শ্রীপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে আফ্রিকা থেকে আমদানি করা এক বাঘিনী প্রথমবারের মত তিনটি শাবকের জন্ম দিয়েছে। এ সাফল্যে অন্যরকম আনন্দ বইছে সাফারি পার্কে। এর আগে পার্কে সিংহ, ক্যাঙ্গারু, উট পাখি, গয়ালসহ বেশকিছু প্রাণী বাচ্চা দিয়েছে। তবে বাঘের বাচ্চা প্রসবের ঘটনা এটাই প্রথম। ওই বাঘিনী একটি পুরুষ ও দুটি নারী বাচ্চা প্রসব করে। পার্কে বাঘের বাচ্চা জন্মের ঘটনায় প্রকৃতিতে আবারো অবাধে বেঙ্গল টাইগার (বাঘ) বিচরণ করবে এমন আশাবাদ বাঘ বিষেশজ্ঞদের।

পার্কসূত্রে জানাযায়, ২০১৩ সালে আফ্রিকার জোহানেসবার্গ থেকে ফ্যালকন ট্রের্ডাসের মাধ্যমে প্রথম ধাপে দুটি পুরুষ বাঘ ও চারটি নারী বাঘ কেনা হয়। পরে সব বাঘ অবাধ বিচরণের জন্য একটি বেষ্টনীতে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিছু দিন যাওয়ার পরই চোখে পড়ে বাঘ ও বাঘিনীর সংগমের দৃশ্য। এর পর থেকেই অধিকতর নজরে রাখা হয় বাঘগুলোকে। গত বছরের (২০১৬) অক্টোবরের দিকে একটি বাঘিনী গর্ভবতী হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়। পরে নিয়মিত ওই বাঘিনীকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল। একটা সময় যখন নিশ্চিত হওয়া গেছে বাঘিনী গর্ভবতী হয়েছে তখন থেকেই অন্য বাঘগুলো থেকে আলাদা করে নিরাপত্তার জন্য অন্য একটি বেষ্টনীতে রাখা হয় গর্ভবতী বাঘিনীকে। পরে গত ২৬ জানুয়ারি ভোরে একটি মৃত বাচ্চাসহ ৫টি বাচ্চা প্রসব করে। জন্মের কিছুক্ষণ পরেই আরেকটি বাচ্চা মারা যায়।

পার্কের ওয়ার্ল্ড লাইফ সুপার ভাইজার আনিসুর রহমান জানান, এর আগেও ডুলাহাজরা সাফারি পার্কে বাঘ বাচ্চা দিয়েছে। তবে সেই সব বাঘগুলো আমাদের দেশীয় সুন্দরবনের বাঘ ছিল।  দেশের বাইরে থেকে আনা (আমদানিকৃত) কোন বাঘিনী সাফারি পার্কে বাচ্চা দেওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। বাঘ ১০৪ দিন থেকে ১০৬ দিনে বাচ্চা প্রসব করে। তবে পরিবেশগত কারণে এটা ব্যতিক্রম হতে পারে। বাঘিনী ২-৫ টি বাচ্চা প্রসব করে থাকে। আমরা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের রাখছি শাবকগুলোকে।  

বাঘের বাচ্চা দেখাশুনার দায়িত্বে থাকা অ্যানিমেল কিপার নরুন্নবী মিন্টু বলেন, আগে ডুলাহাজরা সাফারি পার্কে চাকরি করতাম। পরে এখানে আমাকে এই পার্কে আনা হয়েছে। এরি মধ্যে আমার দেখবালের মাধ্যমে একাদিকবার সিংহ বাচ্চা দিয়েছে। তবে বাঘের বাচ্চা দেওয়ার ঘটনায় নিজের মধ্যে অন্যরকম সুখ অনুভব করছি। এ সুসংবাদে পার্কেও অন্যরকম আনন্দ বিরাজ করছে। শাবকগুলোর নামও রাখা হয়েছে। ড. তপন কুমার দে স্যার পুরুষ শাবকের নাম বিজয় ও নারী শাবক দুটির নাম মাধুবী ও বিলাশী রেখেছেন।  

ওয়াইল্ড লাইফ সুপার ভাইজার সারোয়ার হোসেন খান বলেন, ওই বাঘিনী গর্ভবতী হয়েছে নিশ্চিত হয়েই নিরাপদ পরিবেশ দিতে আলাদা বেষ্টনীতে স্থানান্তর করি। সাধারনত পুরুষ বাঘ ৪-৫ বছরে প্রাপ্তবয়স্ক হয়, আর অন্য দিকে ৩-৪ বছরে নারী বাঘ প্রাপ্তবয়স্ক হয়। প্রসবের সময় বাচ্চার চোখ ফোটেনা ও দাঁত থাকে না। দুই সপ্তাহের মধ্যে বাচ্চার চোখ ফোটে ও ৮-৯ সপ্তাহের মধ্যে স্থায়ী দাঁত গজায়। বাঘ বছরের যে কোন সময়ই বাচ্চা দিতে পারে। তবে নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত বাঘের প্রকৃত গর্ভকালীন সময়। দুই মাস বয়স থেকেই মাংস খাওয়ার আগ্রহ তৈরি হয় বাঘের বাচ্চার। জন্ম থেকে ৬ মাস পর্যন্ত বাঘ শাবক মায়ের দুধ পান করে থাকে। ৩ বছর হলেই মায়ের সঙ্গ ছেড়ে আলাদা হয়ে একা একা চলা ফেরা করে শাবক। প্রকৃতিতে বাঘ ১০ বছর আর ক্যাপটিভে (আবদ্ধ অবস্থায় ) ২৬ বছর পযর্ন্ত বাঘ বাঁচার রেকর্ড রয়েছে। বাঘিনী বাচ্চা নিয়ে আড়াই বছর একত্রে থাকে, তবে যদি বাচ্চা না থাকে সে ক্ষেত্রে পাঁচ মাস পরেই আবার ব্রিডিং করে বাঘিনী।

 ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মো. নিজাম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, গর্ভকালীন সময় মা বাঘিনী নির্জনে চলে যায় অন্য বাঘগুলো থেকে আলাদা হয়ে। বাচ্চার বয়স ৪৫ দিন হয়েছে। তিন মাস পর্যন্ত বাচ্চার ঝুঁকিপূর্ণ সময়। তবে এখানো শাবকগুলো সুস্থ সবল রয়েছে।

প্রাণিবিষেশজ্ঞ ড. তপন কুমার দে বলেন সাফারি পার্কে বাঘ শাবকের জন্ম আমাদের প্রাপ্তি বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রকৃতিতে আবারো বেশি পরিমাণে বাঘ অবাধে বিচরণ করবে এমন স্বপ্ন দেখছি।

সাফারি পার্কে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. সাহাব উদ্দীন জানান, আমরাও বাঘিনীর ভাল পরিবেশ দিতে আলাদা বেষ্টনীতে রেখেছিলাম মা বাঘিনীকে। আমদানি করা বাঘের ক্ষেত্রে এটাই বাচ্চা প্রসবের প্রথম ঘটনা। এমন সাফল্য আমাদের সবাইকে আরও দায়িত্বশীল করে তুলবে।পার্কের সকলের প্রচেষ্টায় এ সাফল্য। এখনো সম্পূর্ণ ঝুকিমুক্ত নয় শাবকগুলো। এমন সাফল্যে যদি ধারাবাহিকতা আসে তাহলে অবশ্যই  বাঘ সংরক্ষণে বড় ভুমিকা রাখা যাবে।

ধুনটে নদী-নালা খাল-বিল এখন পানির কাঙাল

রফিকুল আলম, ধুনট (বগুড়া) : কুল আছে, কিনার আছে। নেই পানি আর উত্তাল ঢেউ। জলজ্যান্ত নদী-নালা, খাল-বিল এখন পানিশূন্য। নদীর পানি শুকিয়ে পরিণত হয়েছে মরা খালে। জলাশয়ের বুকজুড়ে জেগে উঠেছে চর।

সেখানে চাষ হচ্ছে নানা জাতের মৌসুমি ফসল। দেখে বোঝাই যায় না, এখান দিয়ে এক সময় পানি প্রবাহিত হয়েছে। এমন চিত্র বগুড়ার ধুনট উপজেলার নদী-নালা, খাল-বিলসহ অধিকাংশ জলাশয়ের।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ধুনট উপজেলার ২৪৭.৭৫ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের মানচিত্রে পাঁচ নদীর অবস্থান। উপজেলার পূর্ব পাশে যমুনা ও পশ্চিম পাশ দিয়ে বহমান বাঙ্গালী নদী। আর মাঝপথে বয়ে গেছে মানাস, ইছামতি ও বাও নদী। এছাড়া খাল-বিল ও দহ রয়েছে শতাধিক।

এক কালের উত্তাল খরস্রোতা নদীগুলো আজ যৌবন হারা। এখন আর শোনা যায় না পানির কলকল ধ্বনি। কিছু কিছু জায়গায় অবশ্য ডোবার মতো হয়ে আছে। বর্ষা মৌসুম না আসা পর্যন্ত এগুলোর পরিবর্তন হবে না। যেখানে প্রমত্তা নদীর পানিতে উত্তাল-পাতাল ঢেউ থাকার কথা, সেখানে মানুষ বসতি গড়ছে। নদীর বুকজুড়ে এখন দেখা যায় কৃষান-কৃষাণীর চাষাবাদের ব্যস্ততা।

যমুনা পাড়ের শহড়াবাড়ির গ্রামের অশিতপর বৃদ্ধ হযরত আলী বলেন, এক সময় যমুনা নদীর পানি আর প্রবল ঢেউ দেখে ভয় পেতেন। আজ থেকে ৪০-৪২ বছর আগেও গভীর পানি থাকতো নদীতে। কখনো কখনো বালির চর দেখা গেলেও তার মধ্য দিয়েই থাকতো পানির স্রোতধারা। কিন্তু এখন বর্ষা মৌসুম না এলে এমনটি আর দেখা যায় না।
বানিয়াজান গ্রামের জহুরুল ইসলাম বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে একদিন এসব নদী হবে রূপকথার গল্পের মতো। বর্ষা মৌসুমে নদী ভাঙনের তীব্রতা থাকলেও কখনই চরের প্রত্যাশা করেনি। নদীতে পানি না থাকলে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় নলকূপে ঠিক মতো পানি ওঠে না। নদীকেন্দ্রিক যাতায়াত ব্যবস্থাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নদীর বুকে আর দেখা মেলে না অথৈ পানি।

নদীতে এখন মানুষ পায়ে হেঁটে যাতায়াত করছে। নদীর নৈসর্গিক পরিবেশ ও অস্তিত্ব আজ বিলীনের পথে। চলে না আর পাল তোলা নৌকা। এখন আর আগের মত মাঝি মাল্লাদের কণ্ঠে ভেসে আসে না ভাটিয়ালী গানের সুর। বরইতলি গ্রামের সেচ যন্ত্রের মালিক আব্দুল করিম বলেন, প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট হয়। এছাড়া সেচ সংকটে পড়েছে বোর ধানের জমি। পানির অভাবে জমিতে আশানুরূপ ফসল ফলানো সম্ভব হয় না। পানির অভাবে নদী-নালা, খাল-বিলে মাছের আকাল দেখা দিয়েছে।
ফলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতে পারছেন না এলাকায় শত শত জেলে পরিবারের মানুষ। তারা এখন কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। শুধু জেলে নয়, মাছধরার সাথে জড়িত ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের জীবনেও স্থবিরতা নেমে এসেছে। কমে গেছে নিত্যদিনের আয়-রোজগার। তাই ধারদেনা আর সঞ্চয় ভেঙে দিন চলছে জেলে পরিবারের লোকজনের।

বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সহকারি প্রকৌশলী হারুনর রশিদ বলেন, নদী খনন করে পানি প্রবাহ ঠিক রাখার জন্য প্রতি বছরই প্রকল্প তৈরী করে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পত্র পাঠানো হয়। কিন্ত আজও এই প্রকল্পের অনুকূলে অর্থ বরাদ্দ হয়নি বলে জানান তিনি।

ভালো নেই তিস্তাপাড়ের জেলেরা

মিল্লাদুর রহমান মামুন, নীলফামারী : একসময় তিস্তায় মাছ শিকার করে পরিবার পরিজন নিয়ে সুখে থাকলেও এখন ভালো নেই তিস্তা পাড়ের জেলেরা। নদীতে পানি না থাকায় মাছ ধরতে না পারায় বেকার দিন কাটাচ্ছে এখানকার জেলেরা। সারাদিন জাল ফেলে যে মাছ পাওয়া যায় তা বাজারে বিক্রি করে ১৫০ থেকে ২০০ টাকার বেশি আয় হয় না তাদের। অন্য কোনো কাজ করতে না পারায় মাছ না পেলেও তবুও আশায় আশায় জাল ফেলে বসে থাকেন তারা।


কখনও সর্বগ্রাসী আবার কখনও সর্বনাশা বলা হয় তিস্তা নদীকে। উত্তরের জেলা নীলফামারীর ডিমলা ও জলঢাকার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে এই নদী। বর্ষাকালে পানির তোড়ে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেলেও একেবারে উল্টো চিত্র শুষ্ক মৌসুমে। এখন দেখে বোঝার  উপায় নেই যে বর্ষাকালে এই তিস্তা এত খরস্রোতা থাকে। বর্তমানে ডিমলার ডালিয়া ব্যারেজ পয়েন্টেই পানি নেই তিস্তার। ধূ ধূ বালুচরে পরিণত হয়েছে ব্যারেজের ভাটি এলাকা। সরেজমিনে ব্যারেজ পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, অনেকগুলো নৌকা বালুতে নোঙর করা। এসব নৌকার ওপর বসে অলস সময় পার করছেন মোখলেছার, হাফিজুল, সুখ চরণ ও আবুল হোসেনসহ কয়েকজন মাঝি। সেখানেই কথা      হলো তাদের সাথে। জানতে চাওয়া হয় এখন কেমন আছেন তারা। প্রশ্ন শুনেই মলিন মুখে জানালেন ভালো নেই তারা।

 কারণ কি জিজ্ঞেস করতেই জানালেন, নদীতে পানি নেই, তাই মাছ ধরতে না পেরে পরিবার পরিজন নিয়ে নিদারুণ কষ্টে আছেন তারা। তিস্তা তীরবর্তী ডালিয়া বাইশপুকুর গ্রামের মাঝি মোখলেছার রহমান বলেন, নৌকা, জাল তৈরি করতে ১৫ হাজার টাকা খরচ করে আমাদের মাছ ধরতে হয়। কিন্তু নদীতে পানি নেই আমরা মাছ ধরব কোথায়? ১০ জন মিলে একটি নৌকা দিয়ে সারাদিন জাল ফেলে দুইশ’ টাকারও মাছ পাওয়া যায় না। বর্তমান বাজারে এই টাকা দিয়ে আমরা খুব কষ্টে কোনো রকমে দিন কাটাচ্ছি। একই গ্রামের মাঝি হাফিজুল ইসলাম বলেন, আমি আট বছর থেকে তিস্তা নদীতে মাছ ধরি।

 একটা সময় ছিল সারাদিন ১০ থেকে ১৫ কেজির ওপরে মাছ পেতাম। সেই মাছ বাজারে বেচে পরিবার পরিজন নিয়ে সুখেই দিন কাটাতাম। আর এখন নদীতে পানি নেই, মাছও নেই। এখানকার জেলেরা আমরা কেউ ভালো নেই। তিস্তায় পানি না থাকার পরও মিছে আশায় সামান্য পানিতে জাল ফেলে বসে থাকেন এখানকার মাঝিরা। তারা জানিয়েছেন, বংশ পরম্পরায় তিস্তা নদীতে মাছ ধরে আসছেন তারা। মাছ ধরা ছাড়া অন্য কোনো কাজ জানেন না তারা। তাই ইেচ্ছ থাকলেও অন্য কোনো কাজ করতে পারেন না তারা।


কথা হয় মাঝি আবুল হোসেনের সাথে। তিনি বলেন, সারাদিন জাল ফেলে একশ’ থেকে দুইশ’ টাকার মাছ পাওয়া কঠিন। তারপরও আশায় থাকি যদি বেশি মাছ পাই। যদিও এই টাকা দিয়ে আমাদের সংসার চলে না তবুও আমরা নিরুপায়। কারণ আমরা তো আর অন্য কোনো কাজ করতে পারি না। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে মাছ ধরা দেখেছি, মাছ ধরা শিখেছি। অন্য কোনো কিছু করতে পারলে তো আর এই পেশায় থাকতাম না। নদীতে পানি কম থাকার কথা স্বীকার করলেন ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রেকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমানও। তিনি জানান, নদীতে এখন পানির প্রবাহ খুবই কম। নদীতে কিছু পানি দিয়ে বাকি পানি আমরা ব্যারেজের গেইট বন্ধ রেখে সেচের জন্য ক্যানেলে ছেড়ে দিচ্ছি।

৫ সিটিতে আসতে পারে বিএনপির নতুন প্রার্থী

রাজকুমার নন্দী : নতুন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অধীনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিলেও কমিশনের অধীনে স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে বিএনপি। এরই অংশ হিসেবে আসন্ন কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক)সহ কয়েকটি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে দলটি। তবে  এ নির্বাচনে নতুন ইসির কার্যক্রম গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে তারা। চলতি বছরের শেষদিকে রংপুর সিটির নির্বাচন এবং আগামী বছরের মাঝামাঝিতে হবে রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল ও গাজীপুর সিটির নির্বাচন। এরপর ২০২০ সালে হবে ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটির নির্বাচন। বিএনপি এসব সিটি নির্বাচন নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কাজ শুরু না করলেও হাইকমান্ডে চিন্তা-ভাবনা চলছে। খোঁজ-খবর নিচ্ছে সিটি করপোরেশনগুলোর সম্ভাব্য প্রার্থীদের সম্পর্কে। আগামীতে এসব সিটির মধ্যে অন্তত পাঁচটিতে বিএনপির মেয়র প্রার্থী পরিবর্তন হতে পারে। বিএনপি সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।

জানা যায়, নতুন ইসির প্রতি বিএনপির আস্থা না থাকলেও স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা প্রমাণে তাদেরকে সময় দিতে চায় দলটি। সেজন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদাকে জনতার মঞ্চের লোক দাবি করে তার ব্যাপারে বিরোধিতা অব্যাহত রাখলেও পুরো কমিশনকে প্রত্যাখ্যান করেনি তারা। জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে নতুন ইসি কী ভূমিকা পালন করে, তা দেখতে চায় বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বরাবরই অংশ নিয়েছি, আগামীতেও অংশ নিব। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যাব কি যাব না, সেটা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে সেই সময় কোন ধরণের সরকার থাকছে এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কী থাকে, তার উপর।

এদিকে, জাতীয় নির্বাচনের আগে দলীয় প্রতীকে কুসিকসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সাত সিটি করপোরেশনের ভোট নতুন ইসির জন্য ‘এসিড টেস্ট’। এ প্রসঙ্গে ২০ দলীয় জোট শরিক ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ দৈনিক করতোয়াকে বলেন, নতুন ইসির অধীনে জাতীয় নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠেয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোকে আমরা ‘এসিড টেস্ট’ হিসেবে দেখছি। এসব নির্বাচন কেমন হয়, তা দেখে আমরা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যাব কী যাব না, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে চায়। তবে আমরা মনে করি, নির্বাচনকালীন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আগামী ৩০ মার্চ কুসিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নারায়ণগঞ্জে বিপুল ভোটে পরাজিত হওয়ার পর এবার কুমিল্লায় বিজয়ী হয়ে নিজেদের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করতে মরিয়া বিএনপি। সেজন্য বিদায়ী মেয়র মনিরুল হক সাক্কুকে তারা এবারো মনোনয়ন দিয়েছে। আর কুসিক নির্বাচন জোটগতভাবে করতে এবং সাক্কুকে পুনরায় জেতাতে কৌশল নির্ধারণের জন্য আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ২০ দলীয় জোটের মহাসচিবদের বৈঠক ডাকা হয়েছে। যদিও জোট শরিক কল্যাণ পার্টি প্রার্থী না দিয়ে ইতোমধ্যে সাক্কুকে তাদের সমর্থন জানিয়েছে।  

জানা গেছে, চলতি বছরেই রংপুর সিটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত রংপুরের নির্বাচনে প্রার্থী দেয়নি বিএনপি। এরপর ২০১৩ সালের ১৫ জুন একইদিনে অনুষ্ঠিত হয় রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশাল সিটির নির্বাচন। চার সিটিতেই বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী হয়। রাজশাহীর মেয়র হন মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, খুলনায় মনিরুজ্জামান মনির, সিলেটে আরিফুল হক চৌধুরী এবং বরিশাল সিটিতে বিজয়ী হন আহসান হাবিব কামাল। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের ৬ জুলাই অনুষ্ঠিত গাজীপুর সিটি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী অধ্যাপক এমএ মান্নানও বিজয়ী হন। তবে এদের মধ্যে একমাত্র কামাল ছাড়া বাকি সবাইকে সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন মামলায় কারাগারেও যেতে হয়েছে। ফলে মেয়র নির্বাচিত হলেও বেশিরভাগ সময়ই তারা দায়িত্বের বাইরে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটির নির্বাচন হয়। কিন্তু কারচুপির অভিযোগে নির্বাচনের দিন দুপুরে তিন সিটির নির্বাচনই বর্জনের ঘোষণা দেয় বিএনপি। চট্টগ্রাম সিটির মেয়র প্রার্থী এম মনজুর আলম নির্বাচন বর্জনের পাশাপাশি বিএনপির রাজনীতি থেকেও অবসরের ঘোষণা দেন।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, আগামীতে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল ও ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে বিএনপির মেয়র প্রার্থী পরিবর্তন হতে পারে। মনজুর আলম রাজনীতি থেকে অবসর নেয়ায় আগামীতে চট্টগ্রাম সিটিতে বিএনপির মনোনয়ন পেতে পারেন ডা. শাহাদাত হোসেন। বিএনপির নতুন কমিটিতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক করা হলেও কেন্দ্রের এ পদ ছেড়ে দেন তিনি। পরে শাহাদাতকে চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সভাপতি করা হয়। মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি করা হয়েছে। এতে সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনুর সমর্থকরা ক্ষুব্ধ হলেও কেন্দ্রের মধ্যস্থতায় পরে তা প্রশমিত হয়। তাছাড়া মিনুকে কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব থেকে বিএনপির নতুন কমিটিতে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ পদ চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা করা হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে আগামীতে রাজশাহী সিটিতে মিনুর বিএনপি থেকে মেয়র প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল। বরিশাল সিটিতেও আগামীতে পরিবর্তন হতে পারে বিএনপির প্রার্থী। বরিশাল বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বিএনপির সরকারবিরোধী বিগত আন্দোলনে মেয়র কামালের তেমন সম্পৃক্ততা ছিল না। উপরন্তু তিনি মেয়র পদে টিকে থাকতে সরকারি দলের লোকদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন। সেজন্য সারাদেশে বিএনপির অন্যসব মেয়ররা বরখাস্তের পাশাপাশি গ্রেফতার হলেও বরিশালের মেয়র বরখাস্তও হননি, গ্রেফতারও হননি। তবে মুঠোফোন বন্ধ থাকায় এ অভিযোগের ব্যাপারে কামালের মতামত নেওয়া সম্ভব হয়নি। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলায় সিআইডির সম্পূরক চার্জশিটে অভিযুক্ত হিসেবে অন্যদের সঙ্গে আরিফুল হকেরও সিলেট বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে। এ মামলায় যদি শেষ পর্যন্ত তার সাজা হয়, তাহলে সিলেট সিটিতেও আগামীতে বিএনপির মেয়র প্রার্থী পরিবর্তন হতে পারে। ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে মির্জা আব্বাস নির্বাচন করলেও আগামীতে এ সিটিতে পরিবর্তন হতে পারে বিএনপির মেয়র প্রার্থী।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সরকারের রোষানলে পড়ে বরখাস্ত ও গ্রেফতার হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিএনপি আগামী সিটি নির্বাচনগুলোতে বাকিদের পুনরায় মনোনয়ন দিতে পারে। তবে আইনি কোনো জটিলতা থাকলে সেক্ষেত্রে বিএনপির প্রার্থী পরিবর্তন হবে।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দৈনিক করতোয়াকে বলেন, বিএনপি সব সময় নির্বাচনমুখী একটি রাজনৈতিক দল। যেকোনো অবস্থায় যেকোনো সময় নির্বাচনের জন্য আমাদের প্রস্তুতি থাকে। কুমিল্লা ছাড়া অন্য সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচনের এখনো অনেকটা সময় বাকি। যথাসময়ে বিএনপির হাইকমান্ড বিচার-বিশ্লেষণ করে সবচেয়ে উপযুক্ত প্রার্থীদেরই মনোনয়ন দেবে। তবে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হলে সব নির্বাচনেই বিএনপির প্রার্থীরা বিজয়ী হবে।

জাতীয় নির্বাচনের আগে ৭ সিটিতে অগ্নিপরীক্ষায় আওয়ামী লীগ

মাহফুজ সাদি : নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের পর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে সর্বমহলে। কিন্তু এর আগেই দলীয় প্রতীকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সাত সিটি করপোরেশনে ভোটে জাতীয় নির্বাচনের এসিড টেস্ট হবে। এই ভোট ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এবং হুদার নেতৃত্বাধীন নতুন ইসির জন্য অগ্নিপরীক্ষা। নির্বাচনী যুদ্ধ হবে নৌকা আর ধানের শীষে, রেফারি থাকবে ইসি। সিটি নির্বাচন নিয়ে সব পক্ষেই প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ফলে অনেকটা সময় থাকতেই ৭ মহানগরে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। রাজনীতির অন্ধরমহলে জমে উঠছে নানা হিসাব নিকাস।

কুমিল্লা সিটি নির্বাচনের তফসিল এরই মধ্যে ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তফসিল অনুযায়ী এ সিটিতে আগামী ৩০ মার্চ ভোট হবে। চলতি বছরেই রংপুর সিটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল এবং গাজীপুর সিটির নির্বাচন আগামী বছরের মাঝামাঝিতে অনুষ্ঠিত হবে।

আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সর্বশেষ সভায় আগামী জাতীয় ও সিটি নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিবে এবং এই দলটির সঙ্গেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে এমন বার্তা দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। একই দিন দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কুমিল্ল¬ায় গিয়ে বলেছেন, যে সব এমপির বিরুদ্ধে নেতিবাচক নানা অভিযোগ রয়েছে তাদেরকে আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে না। আসন্ন কুমিল্লা সিটি নির্বাচন সামনে রেখে এই সফর তাৎপর্যপূর্ণ। ইসির আরপিও অনুযায়ী নির্বাচনী এলাকায় মন্ত্রী-এমপিদের প্রবেশে বিধি-নিষেধ আরোপের আগেই কুমিল্লা সফর করেছেন তিনি। সূত্রমতে, আগামী সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গেলবারের মতো এবারও সাতটি সিটির নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য এসিড টেস্ট বা অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে নিয়েছে আওয়ামী লীগ। এ জন্য এখন থেকেই দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদকরা ‘রুটিন ওয়ার্ক’ শুরু করেছেন।

ভোটে দলীয় প্রার্থীর জয় নিশ্চিত করতে অন্যান্য নেতাদের সমন্বয়ে কৌশল নির্ধারণ করছেন তারা।আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছেন, সার্বিক বিবেচনায় রাজনীতি এবং ভোটের মাঠ বর্তমানে তাদের অনুকূলে রয়েছে। সিটি নির্বাচন সামনে রেখে চার কারণে রাজনীতি ও ভোটের মাঠে সুবিধাজনক অবস্থানের বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী আওয়ামী লীগ। তা হলো- এবার নতুন ইসি নিয়ে বিতর্ক আগের চেয়ে কমে যাওয়া, বিদেশি আদালতে পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র মিথ্যে প্রমাণিত হওয়া, কানাডার আদালত কর্তৃক বিএনপির গায়ে ‘সন্ত্রাসের কালিমা’ পড়া এবং সাত সিটির ছয়টিতেই বিএনপি সমর্থিত মেয়ররা বেশিরভাগ সময়ই দায়িত্বের বাইরে থাকা ও আওয়ামী লীগের প্যানেল মেয়ররা দায়িত্ব পালন করা। কারণ গেলবারে জাতীয় ইস্যুগুলোর প্রভাব এবং দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দোলের কারণে এ সাতটি সিটির মধ্যে ছয়টিতেই হেরেছিল আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা। এবার সেই প্রতিকূল অবস্থানে রয়েছে বিএনপির মেয়র প্রার্থীরা।

ফলে এবার ভোটের ফলাফল গেলবারের ঠিক বিপরীত হওয়ার আশায় বুক বাধছেন ক্ষমতাসীনরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের একজন যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক দৈনিক করতোয়াকে বলেন, গেলবার সাত সিটির ছয়টিতে হারের কারণে দশম সংসদ নির্বাচনে তার প্রভাব পড়েছিল। তবে বিএনপি জাতীয় ভোটে অংশ না নেয়ায় তা স্পষ্ট বোঝা যায়নি।

এবার সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে। আমরা জাতীয় নির্বাচনের এসিড টেস্ট হিসেবে নিয়েছি সাত সিটি নির্বাচন। সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের জেতার কোন বিকল্প নেই। এজন্য নতুন কৌশল নিয়ে আগাচ্ছি আমরা। আওয়ামী লীগের অন্যতম সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি দৈনিক করতোয়াকে বলেন, আওয়ামী লীগ একটি নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক দল। আমরা যে কোন অবস্থায় যে কোন সময় যে কোন নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত থাকি। আমরা জনগণের রায়ে বিশ্বাস করি বলে সেই রায় মেনে নেই। নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনের মতোই অন্য সাত সিটি নির্বাচনও অবাধ, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ হবে। আশা করি দেশের জনগণ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের উন্নয়নের পক্ষে রায় দেবে।

ইসি সূত্রে জানা যায়, দশম সংসদ নির্বাচনের কয়েকমাস আগে ২০১৩ সালের ১৫ জুন একই দিনে রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট সিটির নির্বাচন হয়। একই বছরের ৬ জুলাই নির্বাচন হয় গাজীপুর সিটির। সবগুলোতেই মেয়র পদে জয়ী হন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা। আওয়ামী লীগের দূর্গ হিসেবে পরিচিত গাজীপুর সিটিতে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী অধ্যাপক আব্দুল মান্নান পান ২ লাখ ৩০০ ভোট। আওয়ামী লীগের এ্যাডভোকেট আজমতউল¬াহ খান পান ১ লাখ ২৫ হাজার। ১৫ জুন ২০১৩ অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি নির্বাচনে বিএনপির আরিফুল হক পান ১ লাখ ৭ হাজার ৩৩০ ভোট, আওয়ামী লীগ প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমেদ কামরান পান ৭২ হাজার ২৩০ ভোট। বরিশাল সিটিতে বিএনপির আহসান হাবিব পান ৮৩ হাজার ৭৫১ ভোট, আওয়ামী লীগ প্রার্থী শওকত হোসেন হিরন পান ৬৬ হাজার ৭৪১ ভোট। রাজশাহীতে বিএনপি প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল পান ১ লাখ ৩১ হাজার ৫৮ ভোট, আওয়ামী লীগের খায়রুজ্জামান লিটন পান ৮৩ হাজার ৭২৬ ভোট। খুলনা সিটিতে বিএনপির মনিরুজ্জামান বিজয়ী হন ১ লাখ ৮০ হাজার ৯৩ ভোট পেয়ে।

আওয়ামী লীগের তালুকদার আব্দুল খালেক পান ১ লাখ ১৯ হাজার ৪২২ ভোট। ২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বর রংপুর সিটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগের শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু মেয়র নির্বাচিত হন। তবে সেই নির্বাচনে জাতীয় পার্টির কোনো প্রার্থী ছিল না। ঝন্টু পান ১ লাখ ৬ হাজার ২৫৫ ভোট। জেপির মোস্তাফিজুর রহমান পান ৭৭ হাজার ৮০৫ ভোট। জেপির অপর প্রার্থীসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রায় ৬০ হাজার ভোট পান। কুমিল্ল¬া সিটিতে আওয়ামী লীগ প্রাথী পরাজিত হন বিএনপি প্রার্থীর কাছে। সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সকল নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করার আইন করা হয়েছে। কিছুদিন আগে নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিএনপির প্রার্থীকে পরাজিত করে বিশাল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন আওয়ামী লীগের ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। কুমিল্ল¬াসহ আগামীতে সংসদ নির্বাচনের আগে যেসব সিটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সেখানে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীদের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মূখে পড়তে হবে। এমনটি মনে করছেন রাজনৈতিক মহল। সবগুলো সিটিতে আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দল অনেক বেড়ে গেছে।

তাছাড়া ‘ক্লিন ইমেজের’ প্রার্থী সংকটও রয়েছে দলটিতে। বরিশালের গতবারের প্রার্থী শওকত হোসেন হিরণ মারা গেছেন। সিটিতে পরাজিত হওয়ার পর অবশ্য তিনি এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। খুলনাতে সাবেক মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক এখন এমপি। সিলেটে বদরুদ্দিন কামরান এবং রাজশাহীতে খায়রুজ্জামান লিটন দলীয় কোন্দল নিয়ে অস্বস্তিতে রয়েছেন। কুমিল্ল¬াতে ভাল প্রার্থীর সন্ধানে আওয়ামী লীগ। রংপুরে আগামীতে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদলের সম্ভবনা বেশি। বর্তমান মেয়র ঝন্টু অসুস্থতার কারনে প্রার্থী বদল করতে পারে আওয়ামী লীগ।

বিদায়ের সুর অমর একুশের বইমেলায়

আলী আজম সিদ্দিকী :  ‘যেতে নাহি দেবো হায়, তবু যেতে দিতে হয়’। কবিগুরুর এই চিরন্তন বাণীর মতো অমর একুশে বইমেলায় ও বেজে উঠেছে বিদায়ের সুর। রোববার ছিলো অমর একুশে গ্রন্থমেলার ২৬ তম দিন। মেলায় প্রবেশ করলেই বিচ্ছেদের আমেজ পাওয়া যায়; ক্রেতা-বিক্রেতাদের চোখেমুখে ফুটে ওঠা আকুতি দেখলে মনে হয় বইমেলা সারাবছর জুড়ে থাকলে বোধ হয় ভালো হতো।

 বইমেলায় ১০৩টি নতুন বই এসেছে এবং ৪৬টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। বিকেল ৪:০০টায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় আত্মজীবনীমূলক সাহিত্য শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. রাশিদ আসকারী। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী, ড. এ. এস. এম. বোরহান উদ্দীন প্রমূখ। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান। অমর একুশে বইমেলায় এসেছে সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানের দুটি বই। একটি বাংলায় আরেকটি ইংরেজিতে। বাংলা বইটির প্রকাশক অন্যপ্রকাশ। নাম ‘বুনে গেলাম আশার স্বপন: গভর্নরের দিনলিপি’। এবারের গ্রন্থমেলায় নতুন চারটি বই বেরিয়েছে পিয়াস মজিদের। এর মধ্যে কবিতার বই ‘নিঝুম মল্লার’; প্রকাশ করেছে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স প্রচ্ছদে ছিলেন ধ্রুব এষ। তার আরও তিনটি বইয়ের মধ্যে অন্যপ্রকাশ থেকে বেরিয়েছে স্মৃতিকথা নিয়ে ‘স্মৃতিসত্তার সৈয়দ হক’; প্রচ্ছদ এঁকেছেন চারু পিন্টু। মাওলা ব্রাদার্স বের করেছে ‘মনীষার মুখরেখা’।

এটি প্রবন্ধগ্রন্থ। এছাড়া তার চতুর্থ বইটি হলো ‘প্রাণের পত্রাবলি’; যা তারিক সুজাতের সঙ্গে তার যৌথ সম্পাদনার বই। বের করেছে জার্নিম্যান। মেলায় আসা ঢাবির মার্কেটিং বিভাগের  শিক্ষার্থী মারুফ হোসেন স্বপন বলেন, ‘এতোদিন ব্য¯ততার কারণে আসার সুযোগ হয় নাই। মেলার শেষ ভাগে আমার পছন্দের কিছু লেখকের বই কিনবো বলে আসা।’ এসময় কথা হয় বন্ধুর সাথে ঘুরতে আসা অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী সঞ্জয় দাশের সাথে। তিনি বলেন, ‘আমার প্রিয় লেখক বঙ্কিম চন্দ্র। মূলত তার বই কিনতেই মেলায় আসা। কিন্তু তার বই পাওয়ার জন্য আমাকে সমস্ত বইমেলা ঘুরতে হয়েছে। সবশেষে সালমা বুক ডিপোতে উনার কিছু বই পেয়েছি। তার থেকে দুটো বই কিনলাম।’ এসময় তিনি গতানুগতিক বইতে মেলা ভরে গেছে বলে আফসোস করেন। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন ফেরদৌস আরা, ইয়াকুব আলী খান, লীনা তাপসী খান, শারমিন সাথী ইসলাম, প্রদীপ কুমার নন্দী, সুমন মজুমদার, মাহবুবা রহমান, ফারহানা শিরিন। যন্ত্রাণুষঙ্গে ছিলেন কাজী ইমতিয়াজ সুলতান (তবলা), গাজী আবদুল হাকিম (বাঁশি), ডালিম কুমার বড়–য়া (কী-বোর্ড) এবং ফিরোজ খান (সেতার)।

 

পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে চায় ২০ দল

রাজকুমার নন্দী : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক সমীকরণ মেলাতে শুরু করেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। জিয়া অরফানেজ ও চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজার শঙ্কার বাস্তবতায় পরিস্থিতি বুঝে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে চায় তারা। খালেদা জিয়ার সাজা হলে বিএনপি তাকে ছাড়া আগামী নির্বাচনে না যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিলেও জোটের অধিকাংশ নিবন্ধিত দল এক্ষেত্রে কৌশলী অবস্থান গ্রহণের পক্ষে। নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়ার ব্যাপার নিয়ে তারা তড়িঘড়ি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চান না। চোখ-কান খোলা রেখে সবকিছু বুঝে-শুনে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করতে চান। তবে দলের নিবন্ধন ধরে রাখাও তাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০ দল সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপির নেতৃত্বাধীন তৎকালীন ১৮ দলীয় জোট। তারা ভেবেছিল, নিবন্ধিত অধিকাংশ রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জন করায় ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের মতো দশম সংসদের স্থায়িত্বও দীর্ঘায়িত হবে না। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বর্তমান মহাজোট সরকার ইতোমধ্যে তিন বছর অতিবাহিত করেছে। ক্ষমতাসীন দলটির নেতারা বলছেন, নির্ধারিত সময়েই পরবর্তী সংসদ নির্বাচন হবে। তাছাড়া বিএনপি জোটের অনেক নেতার অভিযোগ, একাদশ সংসদ নির্বাচনের দুই বছরেরও কম সময় বাকি থাকলেও নিবন্ধিত দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের আসনও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করা হয়নি। আগামী নির্বাচন বর্জন করলে নিবন্ধন হারানোর ঝুঁকিও থাকছে। তাই জোটের অধিকাংশ নেতাই আর আগের ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চান না বলে জানা যায়।

২০ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি রাজধানীতে জোট শরিক এনপিপির এক অনুষ্ঠানে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে জেলে পাঠানো হলে দেশে কোনো নির্বাচন হবে না। তিনি দাবি করে বলেন, বেগম জিয়াকে সাজা দিয়ে নির্বাচন দেওয়া হলে দেশের মানুষ সে নির্বাচন মেনে নেবে না এবং দেশপ্রেমিক কোনো ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দলও সেই নির্বাচনে অংশ নেবে না। মির্জা ফখরুলের এমন বক্তব্যের প্রেক্ষিতে আগামী নির্বাচন নিয়ে বিএনপি জোটের নিবন্ধিত দলগুলোর অবস্থান জানতে গিয়ে এ ব্যাপারে তাদের কৌশলী অবস্থান বেরিয়ে আসে। মাত্র একটি দল খালেদা জিয়াকে ছাড়া কোনো প্রহসনের নির্বাচনে অংশ না নেয়ার কথা জানায়। আরেকটি দল বলেছে, নিবন্ধন নিয়ে তারা চিন্তিত নয়। বিএনপি জোটে বর্তমানে ৯টি নিবন্ধিত দল রয়েছে। ২০১৩ সালে নিবন্ধন ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে হাইকার্টের দেয়া রায়ের প্রেক্ষিতে ২০১৫ সালে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করে নির্বাচন কমিশন। তবে হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে দলটির করা আপিল বিচারাধীন রয়েছে।

খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক বলেন, নির্বাচন এখনো অনেক দূরে। তবে এমন পরিস্থিতির (খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচন) সৃষ্টি হলে তখন নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়ার ব্যাপারে দলীয় ফোরামে সিদ্ধান্ত হবে। তবে নিবন্ধন বাঁচাতে আমাদের আগামী নির্বাচনে যেতেই হবে।

জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার মতো একজন অবিসংবাদিত নেত্রীকে বাদ দিয়ে এবং নির্বাচনকালীন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া দেশে নির্বাচনের নামে কোনো প্রহসন হলে গণতান্ত্রিক শক্তির প্রতিনিধি হিসেবে জাগপা তার অংশীদার হবে না।

কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক বলেন, নির্বাচনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার পাবে জনগণের স্বার্থ, দ্বিতীয় গণতন্ত্র, তৃতীয় জোট, চতুর্থ নিজের দল এবং সর্বশেষ আমি নিজে। যেহেতু রাজনৈতিক অঙ্গনে আছি এবং নির্বাচন রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, সুতরাং সরকারি অপকৌশলগুলোকে ঠেকিয়ে রাখা এবং ২০ দলের কৌশলগুলোকে এগিয়ে দেয়াই হবে আমাদের লক্ষ্য। আদালত বা কোনো সংস্থার প্রভাব যেন আগামী নির্বাচনের ওপরে না পড়ে, তার জন্য আমাদের কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। কল্যাণ পার্টি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে সকলের সঙ্গে নির্বাচনী খেলায় অংশগ্রহণের আশা করে।

বিজেপির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলের রাজনীতি, রাজনৈতিক ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ আদালত কিংবা সরকারি মদদপ্রাপ্ত কোনো সংগঠন-সংস্থা দ্বারা নির্ধারিত হয় না। সেটা ঠিক করবেন বাংলাদেশের জনগণ। দলের নিবন্ধন নিয়ে কিঞ্চিৎ চিন্তিত নন বলেও জানান তিনি।

জমিয়তের নির্বাহী সভাপতি মুফতি মোহাম্মদ ওয়াক্কাস বলেন, নির্বাচন যখন আসবে তখন দেখা যাবে। তবে রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। বিএনপির নেতারা এখন যেসব কথা বলছেন, সেটা একটা রাজনৈতিক কৌশল, যাতে সরকার একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। সুষ্ঠু নির্বাচনই বিএনপির চাওয়া।

বাংলাদেশ ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গাণি বলেন, বাংলাদেশ ন্যাপ সকল সময়ই নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক দল। তবে এই দলের কাছে দেশ ও দেশের জনগণের স্বার্থই মুখ্য। একটি নিরপেক্ষ ও সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা হলে আমরা সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব। আর সেই ক্ষেত্রে জোটগত ও একক দুইভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে আমাদের দলের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশ মুসলিম লীগের (বিএমএল) সভাপতি এএইচএম কামরুজ্জামান খান বলেন, আমরা ২০ দলীয় জোটে আছি। যদি এমন পরিস্থিতির (খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচন) সৃষ্টি হয়, তাহলে এটা (নির্বাচন) নিয়ে তখন জোটে নিশ্চয় সিদ্ধান্ত হবে। আমরা তখন পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা নেব।

ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করতে চান এনপিপির চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ। তিনি বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়াকে ছাড়া বাংলাদেশে কোনো নির্বাচন হবে না। আমরা বেগম জিয়াকে নিয়েই নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চাই। তবে মুঠোফোন বন্ধ থাকায় এলডিপির শীর্ষ কোনো নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

 

ড. এনামুল হক ডিগ্রি কলেজে খেলার মাঠ নেই

বদিউদ-জ্জামান মুকুল (সোনাতলা) বগুড়া : বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংলগ্ন ১৫১ শতকের একটি পুকুর থাকায় প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ভেলুরপাড়াস্থ ড. এনামুল হক ডিগ্রি কলেজের চতুর্থতলা বিশিষ্ট একটি ভবনসহ ওই পুকুরের পূর্বপার্শ্বে থাকা এনায়েত আলী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের কয়েকটি ভবনসহ সীমানা প্রাচীর হুমকির মুখে পড়েছে।
জাতীয় জাদুঘরের সাবেক মহাপরিচালক ড. এনামুল হকের নামানুসারে বগুড়ার সোনাতলা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৬/৭ কিলোমিটার দক্ষিণে ভেলুরপাড়া চারমাথা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থিত ড. এনামুল হক ডিগ্রি কলেজ। ১৯৯৫ সালে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হলেও স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুল মান্নানের প্রচেষ্টায় ১৯৯৯ সালে কলেজটি এমপিওভুক্ত হয়। ফলে দিনদিন ওই কলেজে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। বর্তমানে ওই কলেজে প্রায় ১২শ’ শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। প্রতিবছর পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল উপজেলার অন্যসব প্রতিষ্ঠানের চেয়ে শীর্ষে। ওই প্রতিষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রী থাকলেও খেলার মাঠ না থাকায় শিক্ষার্থীরা বিনোদনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিনিয়ত ওই কলেজের শিক্ষার্থীরা পুকুর পাড় দিয়ে যাওয়া আসা করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হতে হচ্ছে। এমনকি প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পুকুরটির চারপাশে ভাঙনের ফলে ড. এনামুল ডিগ্রি কলেজে নির্মিত চতুর্থতলা ভবনটি হুমকির মুখে পড়েছে। অপরদিকে ওই পুকুরের পূর্ব পাশে থাকা এনায়েত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রায় ১০টি শ্রেণিকক্ষসহ সীমানা প্রাচীর হুমকির মুখে পড়েছে।
এ বিষয়ে ড. এনামুল হক ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ আব্দুল মালেক জানান, ইতিপূর্বে বহুবার পুকুরটির জায়গা স্থানান্তর করতে মালিক পক্ষকে অনুরোধ করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে ওই কলেজের ডিগ্রি ১ম বর্ষের ছাত্রী মৌসুমী আকতার, শাহিনুর বেগম, নজরুল ইসলাম, আলমগীর পারভেজ জানান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এসে বিনোদনের কোন সুযোগ তারা পান না। কলেজের সামনে পুকুরটি ভরাট করা হলে কলেজের শ্রীবৃদ্ধি হবে।
এ বিষয়ে ওই পুকুরের মালিক পক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে তারাও চান পুকুরটি স্থানান্তর করতে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মির্জা শাকিলা দিল হাছিন জানান, তিনি সরেজমিন ওই প্রতিষ্ঠানে এসে পুকুরের অবস্থান পরিদর্শন করেন। তিনি এ সময় পুকুরের মালিক পক্ষকে পুকুরটি অন্যস্থানে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন।



Go Top