বিস্ময়কর ঐতিহাসিক মি’রাজুন্নবী (সাঃ)

বিস্ময়কর ঐতিহাসিক মি’রাজুন্নবী (সাঃ)

আলহাজ¦ হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ আজিজুল হক:আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দা মুহাম্মাদ (সাঃ) কে রাত্রি বেলায় সফর করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম (কাবার মসজিদ) থেকে মসজিদে আকসা (বায়তুল মুকাদ্দাস) পর্যন্ত যার চারদিকে (এ ফিলিস্তিনে) আমি পর্যাপ্ত ধর্মীয় ও পার্থিব বরকত দান করেছি। (ধর্মীয় বরকত এই যে, সেখানে বহু সংখ্যক পয়গাম্বর সমাহিত রয়েছেন এবং পার্থিব বরকত এই যে, সেখানে বাগ-বাগিচা, নদ-নদী, ঝর্ণা ও ফসলের প্রাচুর্য রয়েছে। মোটকথা, সে মসজিদ পর্যন্ত বিস্ময়করভাবে এজন্য নিয়ে গেছি যাতে আমি তাকে (স্বীয়) কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দিই। যেমন ঃ এত দীর্ঘ পথ খুব অল্প সময়ে অতিক্রম করা, সব পয়গম্বরের সাথে সাক্ষাৎ করা এবং তাদের সাথে কথাবার্তা বলা, আকাশে যাওয়া এবং সেখানকার অতি আশ্চর্যকর বস্তুসমূহ পরিদর্শন করা ইত্যাদি। নিশ্চয়ই তিনি (আল্লাহ) পরম শ্রবণকারী দর্শনশীল। (সূরাঃ বনী ইসরাঈল, আয়াতঃ ১) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কর্তৃক কাবার হাতীম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত বোরাকযোগে রাত্রিকালীন ভ্রমণকে ‘ইসরা’ বলে আর মসজিদুল আকসা থেকে সপ্তমাকাশের ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ পেরিয়ে সরাসরি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করাকে বলে ‘মিরাজ’।

 নবীজির ইসরা ও মি’রাজের সমগ্র সফর শুধু আত্মিক ছিল না, বরং সাধারণ মানুষের সফরের মতো দৈহিকও ছিল। মি’রাজ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর জীবনের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মু’জিযা। যা প্রসিদ্ধ মতে হিজরতের পূর্বে রজব মাসের ২৭তম রাত্রিতে সংঘটিত হয়। মি’রাজের সংক্ষিপ্ত ঘটনা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ঐ রাত্রে আপন চাচাতো বোন উম্মে হানীর ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে তাঁকে আদবের সাথে জাগ্রত করেন। অতঃপর মসজিদে হারামে নিয়ে গিয়ে নবীজির সীনা চাক করা হয় এবং জমজমের পানি দিয়ে কলবটা পরিষ্কার করা হয়। তারপর জিবরাঈল (আঃ) সাথে করে নিয়ে আসা বোরাক নামক সাদা রঙের একটি জানোয়ারে আরোহণ করিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাসে নিয়ে যান। তার গতি ছিল, দৃৃষ্টির শেষ সীমা যতদূরে যায় তত দূরে সে এক এক কদম রাখত।

 সেখানে পৌঁছে রাসূল (সাঃ) বোরাকটি অদূরে বেঁধে বায়তুল মুকাদ্দাস মসজিদে প্রবেশ করে কেবলার দিকে মুখ করে দু’রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ নামাজ পড়েন। অতঃপর সিঁড়ি আনা হয়, যাতে নিচ থেকে উপরে যাওয়ার জন্য ধাপ বানানো ছিল। তিনি সেই অলৌকিক সিঁড়িযোগে প্রথমে প্রথম আসমানে অতঃপর অবশিষ্ট আসমানসমূহে গমন করেন। প্রত্যেক আসমানে সেখানকার ফিরিশতারা তাকে অভ্যর্থনা জানান এবং প্রথম আসমানে আদম (আঃ) দ্বিতীয় আসমানে ঈসা (আঃ) তৃতীয় আসমানে ইউসুফ (আঃ) চতুর্থ আসমানে ইদরীস (আঃ) পঞ্চম আসমানে হারুন (আঃ) ষষ্ঠ আসমানে মুসা (আঃ) এবং সপ্তম আসমানে ইবরাহীম (আঃ) এর সাথে নবীজির সাক্ষাত হয়। তারা সবাই রাসূল (সাঃ) কে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। অতঃপর এক ময়দানে পৌঁছেন, যেখানে ভাগ্যলিপি লেখার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। তিনি সিদরাতুল মুনতাহা দেখেন, যেখানে আল্লাহর নির্দেশে স্বর্ণের প্রজাপতি ছোটাছুটি করছিল। ফিরিশতারা স্থানটিকে ঘিরে রেখেছিল। এখানে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) জিবরাঈল (আঃ) কে তাঁর স্বরূপে দেখেন। তাঁর ছয় শত পাখা ছিল এবং তিনি এত বড় যেন মহাকাশের দুই প্রান্ত ভরে গেছে। সেখানেই তিনি একটি দিগন্তবেষ্টিত সবুজ রঙের গদিবিশিষ্ট পালকি তথা রফরফ দেখতে পান।

 তিনি রফরফে করে মহান আল্লাহর দরবারের উদ্দেশ্যে মহাশূন্যে অগ্রসর হতে থাকেন। তিনি বায়তুল মা’মুরও দেখেন। এই বায়তুল মা’মুর দৈনিক সত্তর হাজার ফিরিশতারা তাওয়াফ করেন। যাদের কিয়ামত পর্যন্ত আবার তাওয়াফ করার পালা আসবে না। বায়তুল মা’মুরের নিকটেই কা’বার প্রতিষ্ঠাতা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) প্রাচীরের সাথে হেলান দিয়ে উপবিষ্ট ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) স্বচক্ষে জান্নাত ও জাহান্নাম পরিদর্শন করেন। সে সময় তাঁর উম্মতের জন্য প্রথম পঞ্চাশ ওয়াক্ত পরে তা কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়। এ দ্বারা সব ইবাদতের মধ্যে নামাজের বিশেষ গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়। অতঃপর তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসে ফিরে আসেন এবং বিভিন্ন আকাশে যেসব পয়গম্বরের সাথে সাক্ষাত হয়েছিল তাঁরাও তাঁর সাথে বায়তুল মুকাদ্দাসে অবতরণ করেন। তাঁরা যেন তাকে বিদায় সংবর্ধনা জানাবার জন্য বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত আগমন করেন। এছাড়াও অন্যান্য পয়গম্বরদের সেখানে উপস্থিত করা হয়। তখন নামাজের সময় হয়ে যায় এবং নবীজির ইমামতিতে পয়গম্বরগণ নামাজ আদায় করেন। তারপর সেখানে রেখে যাওয়া বোরাকে করে রাত্রের অন্ধকার থাকতেই তিনি মক্কা নগরীতে ফিরে আসেন। এতকিছু সংঘটিত হয় রাত্রির মাত্র কিয়দাংশ সময়ে মহান আল্লাহর অসীম কুদরতে।
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক-ইসলামী গবেষক
০১৭৩৪-৭১৮৩৬০