বরিশালে রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম!

বরিশালে রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম!

মুক্তিযুদ্ধের ৪৮ বছর পর স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকারদের তালিকা প্রকাশ করেছে সরকার। প্রথম দফায় ১০ হাজার ৭৮৯ রাজাকারের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এ তালিকা প্রকাশের পরদিন থেকেই দেশব্যাপী শুরু হয়েছে বিতর্ক। 


অভিযোগ উঠেছে, তালিকাভুক্ত ও ভাতাপ্রাপ্ত অনেক মুক্তিযোদ্ধার নাম এ তালিকায় উঠে এসেছে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ হিসেবে পরিচিত অনেকের নামও তালিকায় পাওয়া গেছে। এলাকার সহযোদ্ধা ও পরিবারের সদস্যরা এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। 

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত এ তালিকায় আছে বরিশাল বিভাগের ৬টি জেলার প্রায় এক হাজার রাজাকারের নাম। তাদের মধ্যে আলোচিত কয়েকজনের বাবা-দাদার নাম চলে আসায় জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার নামও রাজাকারের তালিকায় আসায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকেই।

তালিকায় ৬ নারী ও ২৬ সনাতন ধর্মাবলম্বীর নামও পাওয়া গেছে।

বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) জেলার সদস্য সচিব ডা. মনীষা চক্রবর্তীর পিতা অ্যাডভোকেট তপন চক্রবর্তী (বরিশালের তালিকাঃ পৃষ্ঠা নম্বর ২০, ক্রমিক নম্বর-৬৩) ও দাদী ঊষা রাণী চক্রবর্তীর (রাজাকারের বরিশালের তালিকাঃ পৃষ্ঠা নম্বর ১৮, ক্রমিক নম্বর-৪৫) নাম রাজাকারের তালিকায় এসেছে। এ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এলাবাসী। 

ক্ষোভ প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের বক্তব্য তুলে ধরে মনীষা চক্রবর্তী জানিয়েছেন, তার পিতা গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা এবং ভাতাও পান। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তার বাবা ও দাদির নাম রাজাকারের তালিকায় প্রকাশ করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেছেন। তিনি এই তালিকা বাতিলের পাশাপাশি যারা তালিকা তৈরিতে সহায়তা করেছে তাদের শাস্তি দাবি জানিয়েছেন। 

মুক্তিযোদ্ধা ও বরিশাল মহানগরের সাবেক কমান্ডার মো. মোখলেসুর রহমান দাবি করেন, বরিশাল থেকে পাঠানো রাজাকারের তালিকায় এই দুজনের নাম ছিলো না। 

আবার প্রকাশিত রাজাকারদের তালিকায় মিহির লাল দত্ত ও জিতেন্দ্র লাল দত্তের নাম এসেছে। যারা মুক্তিযোদ্ধা বলে দাবি পরিবারের।

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মিহির লাল দত্তের ছেলে সাংবাদিক সুভব্রত দত্ত বলেছেন, আমার বাবা ও দাদাসহ পরিবারের ৫ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধে ২ জন শহীদ হয়েছেন। আমার বাবা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। তালিকা দেখে আমরা ভীত সন্ত্রস্ত এবং হতাশ। প্রকৃত রাজাকারদের নাম না এলেও মুক্তিযোদ্ধাদের নাম এসেছে তালিকায়।

ওদিকে বরিশাল-২ আসনের সংসদ সদস্য শাহে আলমের পিতা ডা. সাইয়েদউদ্দিন তালুকদারের নাম তালিকায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মজিবুল হক। তালিকায় (বরিশালের তালিকা: পৃষ্ঠা নম্বর ৬২, ক্রমিক নম্বর-২৮) ডা. সাইয়েদউদ্দিন তালুকদার লেখা থাকলেও সাংসদের ভোটার আইডি কার্ডে শুধু সাইয়েদ উদ্দিন তালুকদার লেখা রয়েছে। তবে ডা. সাইয়েদউদ্দিন তালুকদারের বাবার নাম আবুল ওহাব তালুকদার ঠিকই আছে বলে জানিয়েছেন উপজে‍লা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা গোলাম সালেহ মঞ্জু মোল্লা ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. মাওলাদ হোসেন সানা। 

উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মজিবুল হক জানান, সাইয়েদউদ্দিন তালুকদারের বানারীপাড়া সদরের উত্তরপাড়ে একটি ফার্মেসি ছিলো। যার কারণে তাকে স্থানীয়রা ডাক্তার নামেই জানতো। আর ডা. সাইয়েদউদ্দিন তালুকদারের বাবার নাম আবুল ওহাব তালুকদার এটাও ঠিক। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মুক্তিযোদ্ধারা দাবি করেন, একাত্তরে ডা. সাইয়েদউদ্দিন তালুকদার স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন। রাজাকারের তালিকায় নাম আসায় তা প্রতিষ্ঠিত হলো। 

এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘বানারীপাড়ার রাজাকারের সংগঠকদের নাম তালিকায় আসেনি বলে মুক্তিযোদ্ধারা সংক্ষুব্ধ।’ 

বরিশাল-২ আসনের সংসদ সদস্য শাহে আলম  বলেন, কোন সাইয়েদউদ্দিন তা আমি জানি না। আমার বাবা কোনো রাজাকার ছিলেন না। আমি ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়েছি। সেই থেকে ছাত্রলীগ করি আওয়ামীলীগ করি। আমার পরিবারের সবাই এই দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমি যতটুকু জানি, বাবা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, সমাজে এমন কোনো লোক নেই যার শত্রু নেই, আমাকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করার জন্য এ কর্মকাণ্ড। কিন্তু আমি বলবো এভাবে কাউকে হেয় করা ঠিক নয়।

অপরদিকে তালিকায় দেখা গেছে, সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রয়াত আব্দুর রহমান, সৈয়দ হাতেম আলীসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম রয়েছে। যার সত্যতা নিশ্চিত করে বরিশাল জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার এমজি কবির বুলু জানিয়েছেন, তালিকাটি আরও বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা উচিত ছিল। তালিকায় অনেকেই রয়েছেন যারা পিস কমিটিতে ছিলেন। স্পষ্টভাবে নাম উল্লেখ থাকলে তরুণ প্রজন্মের বুঝতে আরও সহজ হতো। 

সার্বিক বিষয়ে জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান বলছেন ভুল হতে পারে, সংশোধনের সুযোগও থাকবে।

তালিকার বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক গণমাধ্যমকে বলেছেন, একই নামে অনেক লোক থাকতে পারে। নাম দেখে বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই।