বঙ্গবন্ধুর আত্মত্যাগ ও আদর্শে গর্বিত বাঙালি

বঙ্গবন্ধুর আত্মত্যাগ ও আদর্শে গর্বিত বাঙালি

রায়হান আহমেদ তপাদার: বঙ্গবন্ধু মানেই তো বাংলাদেশ। আসলে বঙ্গবন্ধু যা বলেছেন। যা করেছেন। সেটা খুব ভেবে চিন্তে বলেছেন। করেছেন। সাধারণের বঙ্গবন্ধু কথাগুলো বলতেন সাধারণের মত করে। কিন্তু ভাবতেন অনেক গভীরে। যদিও বেশির ভাগ মানুষ বিশ্বাস করেন। আর তাইতো মুজিব বর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আর বাঙালি জাতি। বিশ্বব্যাপী শুরু হয়েছে মুজিব বর্ষ নিয়ে একটা উৎসবের আমেজ। রাজনীতি, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, ইতিহাস, বিজ্ঞান সব ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী এক অন্যরকমভাবে পালিত হবে। হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ, বঙ্গবন্ধু খুব আবেগপ্রবণ ছিলেন। হ্যাঁ, তিনি আবেগপ্রবণ ছিলেন দেশ, আর মানুষের প্রতি। তাঁর সারাটা জীবন কেটেছে দেশ ও দেশের সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। আর তাইতো তিনি আজ বিশ্ব দরবারে শ্রেষ্ঠ বাঙালি। কিন্তু শতবর্ষে বঙ্গবন্ধুর ঠিকানা টুঙ্গিপাড়ার সেই গ্রামে। সেখানেও নগরায়ণের ছোঁয়া লেগেছে। অনেক কিছুরই পরির্বতন হয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে তিনি কোথায় থাকতেন? কেমনভাবে পালিত হতো তাঁর জন্মদিন? তা তিনিই বলে দিতেন। কিন্তু আমরা বড্ড দুর্ভাগা জাতি অকালেই তাঁকে হারাতে হলো। তিনি ছিলেন এক নিঃস্বার্থ মহীয়সী জননীর কোল মহিমান্বিত করে টুঙ্গিপাড়া গ্রামকে আলোর কণায় পরিপূর্ণতা দিয়ে জন্ম নেয়া এ শিশুটির পরম আদরের নাম খোকা। টুঙ্গিপাড়া গ্রামের প্রতিটি পথ-প্রান্তর যেন তাকে চেনে। সে গাঁয়ের মাটির সঙ্গে যেন তার পরম আত্মীয়তার সম্পর্ক। মধুমতি নদীতে সাঁতার কেটেই কেটেছে তার দুরন্ত শৈশব। সে শিশুর পায়ের আলতো স্পর্শে যেন ধন্য হয়েছে এ গাঁয়ের মাটির কণা। মাটিও যেন তাকে ভালোবাসে অকুণ্ঠচিত্তে। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় সম্ভ্রান্ত মুসলিম শেখ পরিবারে শেখ লুৎফর রহমান ও সায়েরা খাতুনের ঘর আলোকিত করে জন্মগ্রহণ করেন। খোকার পুরোনাম শেখ মুজিবুর রহমান। অতঃপর টুঙ্গিপাড়ার শেখ মুজিবুর রহমান দেশের গি  পেরিয়ে হয়ে ওঠেন বিশ্ব ইতিহাসের কিংবদন্তি মহানায়ক ও মহাপুরুষ। শেখ মুজিবুর রহমান একটি আদর্শ, চেতনা ও দর্শনের নাম। তিনি নিজেই একটি ইতিহাস। তার আগমন ঘটেছিল মধুমতি আর ঘাগোর নদীর তীরে অবস্থিত অবারিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। নিভৃত পল্লীর ছায়া ঢাকা গাঁয়ে, কাশফুলের সুভ্রতার মোহমুগ্ধ বাঁকে, পাখির কলতানে মুখরিত নিকুঞ্জ আলোকিত করে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেই শিশু। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু বাঙালির বঙ্গবন্ধু নয়, তিনি বিশ্ববরেণ্য রাজনীতিক ‘বিশ্ববন্ধু’ উপাধিতেও বিশ্বনন্দিত। বঙ্গবন্ধুর শ্রেষ্ঠত্ব হল তিনি শুধু বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের একজন স্বপ্নদ্রষ্টাই ছিলেন না, তিনি বাঙালি জাতিকে অনন্যসাধারণ ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করে হাজার বছরের বাঙালি জাতির স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদান করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দিয়ে জনগণকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করেন। বঙ্গবন্ধুর আগে ও পরে বহু খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ এসেছেন; কিন্তু এমন করে কেউ বাঙালিকে জাগাতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু তার নেতৃত্বের সম্মোহনী শক্তির এক জাদুকরী স্পর্শে ঘুমন্ত ও পদানত বাঙালি জাতিকে জাগিয়ে তুলে স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্দীপ্ত করেছিলেন।
অতঃপর বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে পরাধীনতার গ্লানি থেকে জাতিকে মুক্ত করে তিনি এনে দিয়েছেন রক্তিম লাল-সবুজের পতাকা খচিত স্বাধীন সার্বভৌম এক বাংলাদেশ। তাঁর আগমনে বায়ুর কোমল পরশ শরীর ভেদ করে মর্মে জাগিয়েছে পরম দেশপ্রেম, দেশের মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, হৃদয়ে জাগিয়েছে বলিষ্ঠ শপথে শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হওয়ার ঐকান্তিক চেতনা ও প্রেরণা। তাই তো নিজের জীবন বিপন্ন করে বাঙালি জাতির জন্য এনে দিয়েছেন মহান স্বাধীনতার ঐতিহাসিক সফলতা। কেই বা জানত এ শিশুটি একদিন হয়ে উঠবেন বিশ্ব ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক সুমহান অংশ! জন্মভূমির মানুষের কাছে অতি আদরের খোকা ছিলেন সদাচঞ্চল ও দুরন্ত এক তরুণ। কালের পরিক্রমায় তিনিই হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু ও ‘বিশ্ববন্ধু’। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্ম নেয়া খোকার বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে অদম্য ত্যাগ, অকুতোভয় নেতৃত্ব আর গভীর দেশপ্রেম। পিছিয়ে পড়া বাঙালি জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব নেয়ার মতো মহৎ গুণ হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন শৈশব থেকেই। মুষ্টির চাল উঠিয়ে গরিব ছেলেদের বই এবং পরীক্ষার খরচ বহন করা, সর্বোপরি আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন তিনি। সেদিনের ছোট্ট খোকা বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছিলেন অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে। স্বাধীনতার জন্য তিনি এ বাংলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন। প্রতিটি বাঙালির কাছে পৌঁছে দিয়েছেন পরাধীনতার নিগড় থেকে মুক্ত হওয়ার মর্মবাণী। শেখ মুজিবুর রহমানের                 (এরপর ৭-এর পাতায়)

বঙ্গবন্ধুর আত্মত্যাগ ও আদর্শে
রাজনৈতিক জীবন ১৯৩৯ সালে শুরু হলেও ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজন-পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে তিনি একজন প্রখ্যাত তরুণ ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৮-এর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ৬৬-এর ছয় দফা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানসহ প্রতিটি স্বাধিকার আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদান করেছেন এই বঙ্গবন্ধু। উল্লেখ্য যে, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি পাওয়ার পরদিন ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় তৎকালীন ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তাই তো ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট (১৯৭২ সালের এক সাক্ষাৎকারে) বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আপনার শক্তি কোথায়? তিনি অকপটে সে প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, ‘আমি আমার জনগণকে ভালোবাসি।’ সাংবাদিক আবারও জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার দুর্বল দিকটা কী? বঙ্গবন্ধু সে প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, আমি আমার জনগণকে খুব বেশি ভালোবাসি।’ তাই তিনি কখনই মনে করেননি যে, এ বাঙালিই একদিন তাকে হত্যা করবে। তিনি চেয়েছিলেন তার এ বাংলাদেশকে সোনার বাংলা হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত করবেন। কিন্তু ঘাতকের সেই নির্মম বুলেটের আঘাত তার স্বপ্নকে নস্যাৎ করে দিয়েছিল। ১৯৭৫-পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে স্বৈরশাসক ও স্বাধীনতাবিরোধীদের দ্বারা এ দেশ শাসিত হওয়ায় সেই সময় বাংলাদেশের অগ্রগতি তো দূরের কথা, তারা সমগ্র বাংলাদেশকে ভয়াবহ সংকট ও ঝুঁকির মধ্যে নিমজ্জিত করে রেখেছিল। ফলে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন বিঘিœত হয়েছে বারবার। তারই ফলে জাতির পিতার স্বপ্নের সেই সোনার বাংলাদেশ গড়তেই তার সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের হাল ধরেছেন শক্ত হাতে।
এবং সেই সোনার বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মের শতবর্ষ পূর্ণ হবে ১৭ মার্চ, ২০২০ সালে। তাই বাংলাদেশ সরকার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ২০২০-২১ সালকে ‘মুজিববর্ষ’ হিসেবে পালনের ঘোষণা দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, এই স্বাধীন দেশে মানুষ যখন পেট ভরে খেতে পাবে, পাবে মর্যাদাপূর্ণ জীবন; তখনই শুধু এই লাখো শহীদের আত্মা তৃপ্তি পাবে। ফলে আজ বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকারের উন্নয়ন, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ ও মুজিববর্ষ তথা সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশকে মূল্যায়ন করার সময় এসেছে। বঙ্গবন্ধুর সেই সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে আমরা কতদূর এগিয়েছি তা তার জন্মশতবার্ষিকী তথা মুজিববর্ষে সঠিকভাবে নিরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা জরুরি। তাহলে আমরা আত্মবিশ্লেষণধর্মী, ক্রিয়াশীল, চিন্তাশীল ও অগ্রগামী জাতি হিসেবে আমাদের স্বকীয়তার প্রকাশ ও প্রসার ঘটিয়ে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে আত্মপ্রকাশ করতে পারব। কাঙ্খিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দেশের সার্বিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে আর্থিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতেই সরকার মেগা প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ উন্নত দেশ হিসেবে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে কয়েক ধাপ এগিয়ে যাবে। বেকারত্ব, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হলে এখন নৈতিকতা ও মূল্যবোধ সম্পন্ন সোনার মানুষ গঠনের প্রতি মনোনিবেশ করা একান্ত প্রয়োজন।
কারণ বর্তমানে নৈতিকতা ও মূল্যবোধবিবর্জিত ব্যক্তিরাই দেশ এবং সরকারের অর্জন ও ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করে চলেছে। তাই নৈতিকতা ও মূল্যবোধসম্পন্ন জাতি গঠনের লক্ষ্যে পরিবার, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রকৃত সুশিক্ষা প্রয়োজন, যা মনোজগতের বিকাশ সাধনের মাধ্যমে বিবেকবোধ জাগ্রত করে উন্নত চরিত্র গঠন করতে পারে। নৈতিকতা ও মূল্যবোধসম্পন্ন ব্যক্তিত্বই হল আগামীর সোনার বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। আজকের বাংলাদেশ এখন যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার সাংস্কৃতিক ধারা নিয়ে সবাইকে সঙ্গে করে সামনে এগোতে চাইছে, সে যাত্রায় আমাদের দায়িত্ব কি তা মনে রাখা দরকার। পথ চলতে চলতে আমরা হঠাৎ একে অন্যের হাত ছেড়ে দিতে পারি না। সম্মিলিত হাতের বন্ধনে যদি শেখ হাসিনার পথপরিক্রম আরও সাহস পায় আমাদের তা অটুট রাখতে হবে। সুদীর্ঘ ৩৭ বছর নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের পর দেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছে দেয়ার এখনো কি প্রতিশ্রুতি তার বাকি আছে? নিশ্চয়ই তার মনের কোণে লুকিয়ে থাকা সুকান্তের বাসযোগ্য পৃথিবীর অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আমাদেরও সমান প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে। পরিশেষে বলতে চাই, জাতির জনকের জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করছি বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়। পাশাপাশি জাতির জনক ও তাঁর শহীদ পরিবারবর্গের মাগফেরাত কামনা করছি।
লেখক ঃ কলামিস্ট
raihan567@yahoo.com