বই পড়ার একাল-সেকাল

বই পড়ার একাল-সেকাল

এম আতিকুল ইসলাম বুলবুল :১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সিঁড়ি বেয়ে পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে স্বাধীন সার্বভৌমত্ব বাংলাদেশ। তাই ভাষা আন্দোলন আমাদের স্বাধীনতার বীজ বপন করেছিল তা  বলার অপেক্ষা রাখেনা। ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হওয়ায় গর্বে আমাদের বুক ভরে ওঠে। আর ভাষার মাসে শহরে শহরে বই মেলা আমাদের বাংলা সাহিত্যের সম্ভারকে পূর্ণতা দান করে। বইপ্রেমি পাঠকরা বই মেলার জন্য অপেক্ষা করেন মূলতঃ পছন্দের বই কেনার জন্য। বিশেষ করে বর্তমান সময়ের আড্ডায় বয়স্করা অতীতের ফেলে আসা দিন এবং অনেক লেখকের বই নিয়ে নানা গল্প বলে থাকেন। তবে বর্তমান সময়ে তরুণদের  বই পড়া, বই কেনা , সাহিত্য বিষয়ক লেখালেখি নিয়ে অনিহা দেখে  ভিতরে ভিতরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন তারা। আবার ফিরে যেতে চান সেই অতীতের দিনগুলোতে। কিন্তু জীবন আকাশের সূর্যটা যেন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। আর তাই ফিরে যাওয়ার পথ না পেয়ে আবারও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন বই পড়ার অতীত দিনগুলো নিয়ে।

  ‘‘আমার ছেলে বেলা’’- নামে বিশ্বকবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি গল্পই লিখে ছিলেন। সে গল্পে ব্রজেশ্বর’র চরিত্র আমার ছোট বেলায় যখন পড়তাম, তখন ভালো লেগেছিল। আর সেই ভালো লাগা থেকেই বই পড়ার প্রতি আমার একটি নেশা চেপে যায়। বিশেষ করে রবীন্দ্র রচনাবলী, নজরুল রচনাবলী, বঙ্কিম রচনাবলী, কথাশিল্পী শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত, কপাল কুন্ডলা, গৃহদাহ, দেবদাস উপন্যাস পড়তে গিয়ে কত রাত যে নির্ঘুম কাটিয়েছি তার হিসেবে আমার আসলেই জানা  নেই। কিন্ত বর্তমান সময়ে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীরা পাঠ্য বইয়ের বাইরে আর বের হতে চান না। এতে বাংলা ভাষার সাহিত্য সম্পর্কে তাদের জানার পরিমাণ খুব কম । ব্যক্তি জীবনে  আমার কুঁড়ে ঘরের মত বাসায় সংসার চালানোর পর অবশিষ্ট থাকা সঞ্চয় জমিয়ে শখ করে একটি ‘বুকসেলফ’ কিনেছিলাম। আমার মনে আছে আট হাজার টাকায় কেনা সেই ‘বুকসেলফে’ একটা দুইটা করে বই কিনে সেটা ভরার চেষ্টা করে চলেছি। সেখানে শেক্সপিয়ারের গল্পের বই, হ্যারিপটার, কড়ি দিয়ে কিনলাম, বোখারী শরীফ সহ ছেলে-মেয়েদের জন্য ছোটদের পড়ার মত  বই সহ উপন্যাস, গল্পের এক গাঁদা বই সাজিয়ে রেখেছি। কিন্তু আমার ছেলে রিয়ন মেয়ে অরিন পড়ালেখা নিয়ে এতই ব্যস্ত যে তারা আমার শখ করে তাদের জন্য কেনা বই গুলোর পাতাও ছুঁয়ে দেখার সময় নাই তাদের।

 আসলে এই অবস্থা শুধু আমার ছেলে-মেয়ের ক্ষেত্রেই নয় অনেকে পরিবারেই পাঠ্য বইয়ের বাহিরে সৃজনশীল বই পড়ার বিষয়টি উপেক্ষিত হচ্ছে।  কি পুরুষ,  কি নারী এখন যাদের মধ্য বয়স বা বৃদ্ধ তারা তাদের জীবনের ছেলে বেলার বই পড়ার, কবিতা গল্প লেখার অসংখ্য আনন্দ বেদনার কথা মনে রেখেছেন বৈকি। দেশে এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলেও জীবন যাপন সহ এখন সকল ক্ষেত্রেই নাগরিক সুযোগ সুবিধা, চাকুরি -বাকুরি বা ব্যবসা-বাণিজ্যে মানুষ যান্ত্রিক হয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে তাদের জীবনের শৈশব-কৈশোরের সাহিত্য, নাটক, কবিতা, গল্পের বই অতীত গল্প এখন ধীরেই সংক্ষিপ্ত হয়ে আসছে কিম্বা উবে যাচ্ছে। বর্তমান সময়ে আমাদের ছেলে-মেয়েদের জীবন যাপনে যেন ছন্দ পতন ঘটছে। ওরা আর মাসুদ রানার মত গল্পের বই, বা শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত পড়েনা, মেঝদিদির কেষ্ট চরিত্র ওদের অজানা আর বড়দিদি নামের গল্পের কথা ওরা অনেকেই জানেই না। দেবদাসের পার্বতীর চরিত্র ওদের জানা নেই। আবার ওরা ওদের জীবনে যেমনটি থাকতে চায়, যেমনটি করতে চায় তা বেশীর ভাগই করতে পারেনা সময়ে পরিক্রমায়। তাদের সামনে পাঠ্য পুস্তক নামের এক গাঁদা বইয়ের স্তুপ, রুটিন অনুসারে ঘুমানো, খাওয়া-দাওয়া, স্কুলে যাওয়া সহ প্রায় সকল কাজেই কেমন যেন  প্রাণহীন অবস্থা।

 যদিও বর্তমানে সময়ে শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে প্রতিযোগিতা অনেক অনেক বেড়েছে। সেই সাথে একই শ্রেণীতে পাঁচ-দশ জনের প্রথম স্থান অধিকার করার বিরল ঘটনাও ঘটছে। কিন্তু সাহিত্য সম্ভার নিয়ে চিন্তার সময়টা তাদের কোথায় ? আবার আমাদের অনেক পরিবারে সৌখিনতার ছোঁয়ায় বুক সেলফ ভর্তি বই থাকলেও তাদের ছেলে-মেয়েদের পড়ার সময় নেই। বই পড়ার মতো অতীতের ফেলে আসা দিনের গল্প তাদের জীবনে আর আসবে না। আসলে বাস্তব অবস্থা হচ্ছে বর্তমান সময়ের ছাত্র-ছাত্রীরা কোচিং আর বিদ্যালয়ের হোমওয়ার্ক শেষ করতেই কেটে যায় চব্বিশ ঘন্টার প্রায় আঠারো ঘন্টা। ওরা সময়, সময় নেতিয়ে পড়ে পড়ার টেবিলে, পড়াশোনার প্রচন্ড মানসিক চাপে। এজন্য বর্তমান সময়ের অতি সচেতন বাবা-মায়েরা নিয়মিত এক গ্লাস হরলিক্স, এক গ্লাস দুধ রেখে দেন পড়ার টেবিলে। সেটাও কি খাবারের সময় আছে তাদের ? তাই পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি জানার জন্য, উপভোগ্য মন ভালো করার মতো বই পড়ার চাহিদা দিন দিন কমে আসছে বৈকি।

 মূলতঃ বর্তমান সময়ের শিক্ষার্থীরা  ক্লাসের বই পড়া নিয়ে , ভাল রেজাল্ট করতে, ম্যারাথন পড়ালেখায় মহাব্যস্ত। ছুটির দিনেও তাদের থাকে সঙ্গীত-নৃত্য চর্চার ক্লাস। কিন্তু অতীতে আমরা কাজও করতাম বইও পড়তাম। আমাদের সময়ে একই ক্লাসে কমপক্ষে  দশ জন ফাষ্ট হওয়ার নজির নেই। তাহলে কি ওরা পুরোনো আমাদের চেয়ে বেশি মেধাবী ? মনে পড়ে ‘‘বই কেনা’’ বইয়ের লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী, ‘‘ বই পড়া’’ বইয়ের লেখক প্রমথ চৌধুরীর সে সকল পুস্তকে পড়েছিলাম তাতে এক জায়গায় লেখা ছিল‘‘ বই ছেলের হাতের মুয়াও নয়, গুরুর হাতের বেতও নয়’’ আবার ‘‘ বই পড়ে কেউ কখনো দেউলিয়া হয়না’’ এসব মহামূল্যবান কথার গুরুত্ব এখনকার শিক্ষার্থীদের তেমনটি আর নেই বললেই চলে। বর্তমান সময়ে ছেলে -মেয়েদের পাঠ্য পুস্তকের বাহিরে অন্যান বই পড়া ও কেনার বিষয়টির অবস্থা দেখে শ্রদ্ধেয় লেখকের একটি লেখার লাইন মনে পড়ে গেল। তা হল -‘‘  বাঙালির বই কেনার বৈরাগ্য দেখে মনে হয়, সে গল্পটি জানে’’।

আসলে ওরা সে সকল বিষয়ে কিছুই জানে না। আর ওরা পড়ার জন্য এখনো যে বই কেনে যাকে বলে গাইড বই। একটি বিষয়ে হাজারও লেখকের লেখা গাইড থাকলেও অভিভাবকরাও তা কিনে দিতে কার্পণ্য করেন না। গাইড কেনার ক্ষেত্রে বর্তমান সময়ের অভিভাবকরা বেশ উদার এমনটি বলেছিলেন আমার এক ছোট ভাই সুজন কুমার মাল। অথচ  যা এক বছর পড়লে পরের বছর আর তা  প্রয়োজন হয়না তেমনটি। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে  আমরা বোর্ড বই পড়েছি। সেখানে সবই থাকে। তাই গাইড বই নিয়ে আমাদের ছেলে বেলায় পড়ালেখার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি একদম ছিলনা বললেই চলে।আমরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপহার হিসাবে গল্পের বই দিতাম। কিন্তু এখন বই না দিয়ে শিক্ষার্থীরা উপহার দেয় নানা ধরনের শোপিস। আসলে বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের অবস্থাটা ‘মিউজিক্যাল চেয়ারের মত’ যে যেভাবে ফাঁকা পাচ্ছে সে সেখানেই বসে পড়ছে। আসলে আমরা চাচ্ছি শিশু, কিশোর শিক্ষার্থীদের পরিচ্ছন্ন ছোটবেলা। যা ছোট বেলার ছোট গল্পের মতো সহজ সরল জীবন। বই শিশু কিশোরদের জীবন গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। বাংলা সাহিত্যের মহা মূল্যবান  বইগুলোর বই পড়ার অভ্যাসটা থাকা চাই সর্বাগ্রে। জীবনের বাস্তবতার তাগিদে সমৃদ্ধিতে ভরে উঠুক মজার মজার বই পড়ার  স্মৃতিগুলো। কেবল বই পড়লেই বিবেক জাগ্রত হবে আর শিশু কিশোররা ভালকে ভাল,  মন্দকে  মন্দ বলার সৎ সাহস অর্জন করতে পারবে। আমাদের বয়স্কদের ছেলে বেলার বই পড়া আর বর্তমান সময়ে ছেলে-মেয়েদের ছেলে বেলার বই পড়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য থাকতে পারে। কিšুÍ দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে যেন আমাদের শত শত বছরের অসংখ্য শ্রদ্বেয় বাঙ্গালি লেখক-লেখিকাদের মহা মূল্যবান বই আমাদের জীবনের পাথেয় হয়।

বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের কাছে সেটাই প্রত্যাশা। আর বাঙ্গালির গর্বের চিরায়িত আচরণ, অনুষ্ঠান যেন ভুলে না যায় আমাদের সন্তানেরা। তারা যেন তা মনে প্রাণে লালন করে বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী লেখার ভাবার্থ। কবিগুরু রবি ঠাকুরের একটি শ্লোক মনে পড়ে তা হল ‘‘ স্মৃতির ভারে জর্জড়িত বিষন্ন মন, যখন সুদূর অতীতের দিকে দৃষ্টি দিতে থাকে তখন  পাওয়া এবং না পাওয়া  থেকে -পেয়ে হারানোর ব্যথা সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে’’। তাই আসুন একুশ এর চেতনাকে ধারণ করে বই পড়ার প্রতি মনোযোগী করে গড়ে তুলি আমাদের সন্তানদের। বই মানুষকে উদার করে যদি সে বুঝে পড়ে। বই মনের খোরাক পূরণে বড় ভুমিকা রাখে। করে তোলে তাকে জ্ঞানী। শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি সাহিত্য বিষয়ক বই তুলে দিয়ে পড়ার পরিবেশ সৃষ্টি করি এটাই হোক - ২০২০ সালের মহান ফেব্রুয়ারি মাসের আমাদের সকল বাঙালির পারিবারিক অঙ্গীকার।
লেখক ঃ প্রভাষক-কলামিস্ট
rewonorin59@gmail.com
০১৭১২-২৩৭৯৩৩