নীড় ছোট ক্ষতি নেই, আকাশ তো বড়

নীড় ছোট ক্ষতি নেই, আকাশ তো বড়

রবিউল ইসলাম রবীন:বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হাতে এখন স্বপ্নের ক্রিকেট বিশ্বকাপ। মহান মুক্তিযুদ্ধের পর অনেক অর্জনের মধ্য এই অসামান্য অর্জন আমরা পেলাম যুবাদের হাত ধরে। বিশাল এক বিজয়, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। এই শিরোপা দেশের জন্য গর্বের, অহংকারের অনুষঙ্গ। যেখানে প্রতিপক্ষ ছিল শক্তিশালি ভারত, যারা শুধু যুব বিশ্বকাপের চারবারের চ্যাম্পিয়ন। তাই এই অর্জন বিশাল। আগামী ৫ বছরের জন্য ক্রিকেট ইতিহাসে বাংলাদেশে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে পরিচিতি পাবে। ক্রীড়াক্ষেত্রে আমরাও যে অনেক দূর এগিয়ে গেছি, এই অর্জন তার প্রমাণ। তাই অভিনন্দন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ দলের প্রতিটি সদস্যকে এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে।
বড়দের বিশ্বকাপে যা এখনো কল্পনার সীমায় আসেনি, দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফষ্ট্রুমে যুব বিশ্বকাপের ফাইনালে রবিবার সাফল্যের রঙিন তুলিতে বিজয়ের সেই ছবিটাই এঁকে দেখাল আকবর আলীর দল। বিশ্ব ক্রিকেটে একবারেই অচেনা আমাদের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের প্রতিটি খেলোয়াড় এখন সারা বিশ্বে নতুন তারকা। সারা বিশ্বের প্রথিতযশা ক্রিকেটারদের প্রশংসায় ভাসছে তাঁরা। বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ তাঁদের কল্যাণে অনবদ্য এক জয় দেখলো। অবিশ্বাস্য এই অর্জন! লাল সবুজের জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে আজ গাইতে ইচ্ছে করছে ’ আহা, কি আনন্দ আকাশে বাতাসে’। ভারতের বিপক্ষে বিশ্বকাপ যে বড় পরীক্ষা, জানাই ছিল। যুবাদের বয়স কম তো কী হয়েছে! খেলতে যখন এসেছ, এর সর্বোচ্চ উত্তাপটাই নাও। ১৭৮ রানের লক্ষ্য, শেষদিকে টিপটিপ বৃষ্টিতে ভিজলো ম্যাচ, তবু এই লড়াই থেকেই কি না বেরোল বারুদপোড়া গন্ধ!

সবচেয়ে বড় যেটি বিষয়, খেলায় প্রতিপক্ষ ছিল শক্তিশালি ভারত। যাদের সাফল্যের ঝুড়িতে ছিল যুব বিশ্বকাপের চার চারবারের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সার্টিফিকেট। যারা কোহেলি-রোহিতদের উত্তরসূরি। গত নভেম্বরে দুই টেষ্টেই ভারতীয় পেসারের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের ব্যটসম্যানরা। আর গত রবিবার পচেফষ্টুমে উল্টো বাংলাদেশের যুবা পেসাররা শৃঙ্খলে বাঁধলেন ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের। অনূর্ধ্ব-১৯ যুব বিশ্বকাপের ফাইনালে ভারতের ব্যাটসম্যানদের নাভিশ্বাস তোলা টাইগাররা বীরের মতো লড়াই করেই জিতেছে। টাইগার যুবাদেরও দারুণ এ জয়ে কিংবদন্তি ক্রিকেটার, জনপ্রিয় ধারাভাষ্যকার থেকে শুরু করে কোচরা শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। অধিনায়ক আকবর খেলার চলাকালিন সময়ে নিজ বোনের মৃত্যুর খবর জানার পরও খেলে গেছেন বীরের মতো। নিজের কষ্টকে বুকে চেপে রেখে ইস্পাত কঠিন মনোবল নিয়ে খেলে দলকে চ্যাম্পিয়ন করেছেন।

খেলা শেষে আইসিসি টুর্নামেন্টের সেরা যে একাদশ ঘোষণা করেছেন, সেই দলের অধিনায়ক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে বাংলাদেশে দলের অধিনায়ক আকবর আলীকে। বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দলের কোন খেলোয়াড়ই বিখ্যাত কোন পরিবারের সদস্য নয়। বরং অনেকের বাসস্থান ভাঙাচোরা ঘরে। বিশ্বকাপ জয়ী ৮ ক্রিকেটারই দিনাজপুর বিকেএসপি’র । তামিম নামে এক ক্রিকেটারকে অতিরিক্ত ক্রিকেট অনুরাগী, আর পড়াশোনায় কম মনোযোগী  বলে তার বাবা তিনবার বাড়ি থেকে বের করে দেন। কিন্তু তামিমের মা ছিল তার পক্ষে। তামিম আজ বিশ্বজয়ী ক্রিকেটার। আকবর, তামিম, শরাফুলরা ক্রিকেটে যা অসাধ্য সাধন করে দেখালেন, বড় ক্রিকেটারদেরও সেই পথে হাঁটতে হবে। জয়ের ধারাবাহিকতা দেখাতে হবে।

বাংলাদেশের মানুষদের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের গৌরবে ভাসানোর জন্য আকবর আলী ও তাঁর বিশ্বজয়ী দলকে আমরা আমাদের অন্তরের অন্তস্থল থেকে অভিনন্দন জানাই। তবে তাঁদের যা কীর্তি, তার জন্য শুধু অভিনন্দনই যথেষ্ট নয়। আকবর,শরিফুল,মাহমুদুলরা তাঁদের কাজ করেছেন। তাঁদের ভবিষ্যৎ পথকে মসৃণ করতে এবার আমাদেরও কিছু করার আছে মনে করি। শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়, আজ সময় এসেছে, সারা বাংলাদেশ থেকে খুঁজে খুঁজে বের করতে হবে আরো প্রতিভাবান আকবর আলীদের মতো ক্রিকেটারদের। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আকবর, শরাফুলদের দেখে অনুপ্রাণিত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্রিকেটাররা যেন তাঁদের স্বপ্নকে সত্যি করতে খেলার সুষ্ঠু পরিবেশ পান, নিশ্চিত করতে হবে সেটিও।
এ দেশে ক্রিকেটারদের উঠে আসার পথটা এখনো অনেক সংকীর্ণ। শুরুতেই অনেক ক্রিকেটাররা বাজে অভিজ্ঞতার সম্মুখিন হচ্ছে। মফস্বল অনেক শহরে এখন উন্মুক্ত মাঠ নেই, স্টেডিয়াম থাকলেও তা সচল নেই। ক্লাব সংস্কৃতি ভেঙে পড়েছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা কম। বিকেএসপির মতো প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে খেলোয়াড়দের ভরসাস্থল। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠান তো সব স্থানে নেই। যাঁরা ক্রিকেটকে ভালবেসে খেলে যাচ্ছে, তাঁদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে বড় করে তুলতে হবে। কয়েক বছর ধরে আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেট যেভাবে পেশিশক্তির কাছে পরাস্ত, পাতানো ম্যাচ আর পক্ষপাতমূলক আম্পায়ারিংয়ের বিষে বিষাক্ত, সে রকম নির্মল হাওয়া উঠতি ক্রিকেটাররা কোথায় পাবেন! কিন্তু এসবই শেষ কথা নয়। কথা আরো আছে। থেমে থাকা যাবে না। বিপ্লবী চে গুয়েভারা বলেছেন, ’হাআস্তা লা ভিকতোরিয়া সিয়েম্প্রে’।’ এর মানে হচ্ছে চুড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই করে যাও। নীড় ছোট হলেও আকাশটা বড় হতে হবে। আমাদের ক্রিকেটের আকাশটা এখন অনেক বড়। যেখানে আকবর আলী, তামিমদের নাম লেখা।
লেখক ঃ সহকারী অধ্যাপক-কলামিষ্ট
০১৭২৫-০৪৫১০৫