নারী সহিংসতা বাড়ছেই

নারী সহিংসতা বাড়ছেই

আব্দুল হাই রঞ্জু : মানুষের জানমাল সম্ভ্রম রক্ষার গ্যারান্টি রাষ্ট্রের। কোন কারণে রাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে ন্যুনতম শৈথিলতা দেখালে প্রতি পদে পদে মানুষের মানবতা ও মৌলিক অধিকার বিঘিœত হবে- এটাই স্বাভাবিক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারী নির্যাতন, নারী সহিংসতা, যৌন নিপীড়নের মত ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। মূলত বিচারহীনতা, প্রলম্বিত বিচারিক প্রক্রিয়ার কারণে নারী সহিংসতা বাড়ছেই। এ অবস্থা থেকে নিস্তার পেতে হলে রাষ্ট্র যন্ত্রগুলোকে পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে, যার কোন বিকল্প নেই। সাম্প্রতিক সময়ে ব্র্যাক একশন এইড, আইন ও সালিস কেন্দ্র এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদসহ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, অতীতের যে কোন সময়ের চাইতে নারী সহিংসতা অনেক বেড়েছে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ফোরাম ও বিভিন্ন সংস্থার জরিপ ও গবেষণায় উঠে এসেছে, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে আগের বছরের তুলনায় নারী ও শিশু নির্যাতনের পরিমাণ বেড়েছে। রাজধানীতে নারী ও মেয়ে শিশুর প্রতি সহিংসতা বিষয়ক ‘কার শহর’ শীর্ষক অ্যাকশন এইড পরিচালিত এক গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, বাংলাদেশের শহর এলাকায় ৫৪ শতাংশের বেশি নারী সহিংসতার শিকার হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সবুজের অভিযান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মাহমুদা বলেন, নারী সহিংসতার গবেষণায় দেখা গেছে, ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। মূলত দীর্ঘদিন ধরে মামলা চালানোর মত আর্থিক সঙ্গতির অভাবের কারণে অনেক সময়ই মামলার বাদি মামলা মোকাবেলা করতে পারে না। ফলে অপরাধিরা সহসাই পার পেয়ে যায়। আবার নারী নির্যাতনের পরও অনেকেই মামলার ঝামেলা এড়ানোর কারণেও মামলা রুজু করেন না। আবার দেশের আইনী কাঠামোয় ভিকটিমকেই প্রমাণিত করতে হয়, সে নির্যাতনের শিকার। প্রকাশ্য আদালতে মামলা পরিচালনা হওয়ায় অনেকেই লাজ লজ্জার কারণে আদালতকে এড়িয়ে চলতে চান। অর্থাৎ যখন নির্যাতিতকেই সাক্ষী প্রমাণে অপরাধিকে দোষী সাব্যস্ত করতে হয়, তখন ভাবাটাই স্বাভাবিক এ প্রক্রিয়া  জটিল। এরপরও কেউ আইনের আশ্রয় নিলে অনেক ক্ষেত্রেই তদন্তকারী কর্মকর্তাদের খুশি (?) করতে না পারলে তদন্ত প্রতিবেদনে সঠিকভাবে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রেও পক্ষপাতিত্বের নানা অভিযোগও অনেক পুরনো। সবমিলে আমাদের দেশে বিশেষ করে যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে সহসাই ন্যায় বিচার পাওয়া অনেকটাই কঠিন। কারণ মামলার সাক্ষী প্রমাণ ব্যতিত বিচারক কাউকে সাজা দিতে পারেন না। কিন্তু আমাদের দেশে সাক্ষীও অনেক সময় প্রভাবিত হয়ে থাকে। ফলে ন্যায় বিচার পাওয়া অনেকের ভাগ্যেই জোটে না। এরপরও কোন কোন ক্ষেত্রে ন্যায় বিচারের দেখাও মেলে। দুই বছর আগের ঘটনা। ২৫ আগষ্ট নিয়োগ পরীক্ষা শেষে বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ আসার পথে জাকিয়া সুলতানা রুপা নামে জীবন সংগ্রামী এক নারীকে একাকিত্ব পেয়ে বাসের চালকসহ অন্যান্যরা গণর্ধষণের পর তাকে খুন করে টাঙ্গাইলের মধুপুর বন এলাকায় ফেলে রেখে যায়। পুলিশ বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে ময়না তদন্ত শেষে টাঙ্গাইলের কেন্দ্রীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করে। পরে হতভাগী রূপার পরিচয় সনাক্ত হলে লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে পুনরায় নিজ বাড়িতে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় বাসের চালকসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন আদালতে মামলাটি খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি হয় এবং রায়ে ৪ জনের ফাঁসি ও এক জনের সাত বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়। উক্ত রায়ে ছোঁয়া পরিবহনের বাসটি নিহত পরিবারের নামে মালিকানা পরিবর্তন করে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে হস্তান্তর করার জন্য মধুপুর থানা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয় আদালত। এভাবে স্বল্প সময়ের মধ্যে অপরাধিদের আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা হলে নারী সহিংসতার মাত্রা অনেকাংশেই কমে আসবে বলে আমরা মনে করি। যদিও আমাদের আইনে আপিলের সুযোগ রয়েছে। আমরা আশাবাদি, দৃষ্টান্তমুলক এ শাস্তি উচ্চ আদালতেও যেন বহাল থাকে এবং যতদ্রুত সম্ভব মামলাটির রায় দিয়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দেয়া নি¤œ আদালতের রায় যেন কার্যকর হয়। কারণ এ ধরনের মামলায় যে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির রায় হয়েছে, তা উচ্চ আদালতে বহাল থাকলে এটুকু নিশ্চিত করেই বলা যাবে, অপরাধি যেই হোক শাস্তি তাকে পেতেই হবে।
মুলত আমাদের দেশটিতে মাদক, অশ্লিলতা, বেহেল্লাপনার মাত্রা এত বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যার বিরূপ প্রভাবে তরুণ থেকে যুব সম্প্রদায় এখন ধ্বংসের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। ফলে মাদকের টাকার জন্য খুন, খারাপি, ছিনতাই থেকে শুরু করে এমন কোন হীন কাজ নেই, যা করতে সামান্য দ্বি-ধা করে। সংগত কারণেই প্রতিদিন খুন, খারাপি, চুরি, ডাকাতি ছিনতাই সর্বোপরী নারী ধর্ষণ বেড়েই চলছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারকেও প্রায়শই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। প্রতিকারে প্রতিশ্রুতি আসে, হুমকি আসে ঠিকই কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছুই হয় না। বিশেষ করে পাশ্চাত্যের ধর্ষণের চিত্র এখন নতুন প্রজন্মকে তিলে তিলে ধ্বংস করছে। তথ্য প্রযুক্তির উৎকর্ষের সুবাদে সহজলভ্য মেমোরি কার্ডে যৌন ছবির ছড়াছড়িতে যুব সম্প্রদায় দিনে দিনে হারিয়ে ফেলছে নৈতিক মূল্যবোধ। ফলে স্কুল কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে যুব সম্প্রদায় এখন রুচিহীন যৌনতার শিকার হচ্ছে। ফলে নারী ধর্ষণ, শিশু ধর্ষণের মতো জঘন্য কর্মকান্ড সমাজটিকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। এ অবস্থা রোধ করা সম্ভব না হলে সামাজিক অবক্ষয়, মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের অপমৃত্যু ঘটবে। এজন্য সামাজিক আন্দোলনকে যেমন জোরদার করা জরুরি, তেমনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারিত্বকে নিশ্চিত করতে হবে। ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিতে হবে মাদক নামক ইয়াবার আস্তানাগুলোকে। পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে খোদ রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে নিভৃত পল্লীর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত ইয়াবার আগ্রাসন মহামারিতে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে কোমলমতি তরুণ-তরুণীরাও সহজলভ্য হওয়ায় ইয়াবার ছোবলে এখন দিশেহারা। মাঝে মধ্যে মাদকের চালান ধরা পড়ে সত্য, কিন্তু চুনোপুটিরা ছাড়া রাঘব বোয়ালরা থেকে যায় পর্দার আড়ালে। যারা নিজেদের নিরাপদ দূরত্বে রেখে সমানেই অনৈতিক পথে বিত্ত বৈভবে সমৃদ্ধ হওয়ার নিরব প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেছে। জনশ্রুতি আছে, অনেক সময়ই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ কেউ অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে সমাজ বিধ্বংসী ন্যক্কারজনক কাজে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে মদদ দিচ্ছে। তাহলে এর কি কোন শেষ হবে না? এর সঠিক জবাব পাওয়াও ভার! কারণ যখন প্রভাবশালী ক্ষমতাধর রাঘব বোয়ালরা এ ধরনের অনৈতিক বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ে, তখন তাদেরকে আইনের আওতায় আনাও কঠিন। তা না হলে প্রকৃত অপরাধীরা ধরা পড়ে না কেন?
অতিসম্প্রতি রাজধানীর কুর্মিটোলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে রাস্তার পাশ থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়। ইতিমধ্যে ধর্ষক মজনু র‌্যাবের হাতে আটকও হয়েছে। সচিত্র প্রতিবেদন এবং তদন্তকারী সংস্থার তরফে বলা হয়েছে, সিরিয়াল রিপিষ্ট মজনু মাদকাসক্ত কু-রুচিপূর্ণ একজন মাতাল। যখন একজন মানুষ মাদকাসক্ত হয়ে যায়, তখন তার মধ্যে বিবেক বিবেচনা কোন কিছুরই মূল্য থাকে না। এ ভাবেই দেশটি যেন অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হচ্ছে! আমরা চাই, এ ধরনের অনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত অপরাধীদের দ্রুত বিচার ট্রাইবু্যুনালে বিচার করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। একমাত্র আইনের শাসনকে নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে এ ধরনের অপরাধকে নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে।
সামাজিক অবক্ষয় চরম পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। ফলে ধর্ষণ, অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতির মতো ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। এজন্য সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে সামাজিক আন্দোলনকে বেগবান করতে হবে এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো দায়িত্ব্শীল ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে দ্রুুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্বল্প সময়ের মধ্যে মামলার রায় দিয়ে তা কার্যকর করতে হবে। অর্থাৎ জনগণ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ ব্যতিত নারী ধর্ষণ, নারী সহিংসতা রোধ করা অনেকাংশেই কঠিন হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক
ahairanju@gmail.com
০১৯২২-৬৯৮৮২৮