জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ : কৃষিতে বিরূপ প্রভাব

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ : কৃষিতে বিরূপ প্রভাব

আব্দুল হাই রঞ্জু : ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত মিলে ছয় ঋতুর বাংলাদেশে প্রকৃতির যে নিয়ম চলে আসছে, তা কিন্তু এখন আর সে অবস্থায় নেই। আষাঢ়-শ্রাবণ দুই মাস বর্ষাকাল পেরিয়ে গেল কিন্তু বর্ষার দেখা মেলেনি। বর্ষার যেরূপ অঝরে ঝরছে বৃষ্টিধারা, খাল বিল, নদী-নালায় থৈ থৈ করা পানির বিরাচরিত সেই দৃশ্য এবারের বর্ষাকালে চোখে পড়েনি। বর্ষাকালে নদ-নদী, খাল-বিল শুকিয়ে কাঠ। চলছে প্রচন্ড তাপদাহ। মনে হয় এ যেন গ্রীষ্মকাল। মূলত বর্ষাকালে প্রকৃতির দেয়া পানিতেই চাষীরা আমন চারা রোপণ করে। এবার বর্ষাকালের শেষ দিনটিতেও পানির দেখা মেলেনি। বিশেষ করে শস্য ভান্ডার খ্যাত উত্তরাঞ্চলের আমন চারা রোপনে শেষ পর্যন্ত চাষীদের সেচ দিয়েই চারা লাগাতে হয়েছে। ধারণা ছিল, হয়তো বৃষ্টির দেখা মিললে আর সেচযন্ত্র চালু করতে হবে না। সব ধারণার অবসান হয়েছে। পানির অভাবে চৈত্র মাসের ন্যায় জমি ফেঁটে চৌচির হয়েছে। বাধ্য হয়েই চাষীদের জমিতে সেচযন্ত্র চালু করে পানি দিতে হচ্ছে। তবুও যেন শেষ রক্ষা হচ্ছে না। প্রচন্ড খরায় মরে যাচ্ছে রোপা আমন চারা। কিন্তু কেন এ অবস্থা?

মূলত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ষড়ঋতুর বাংলাদেশের প্রকৃতির চিরাচরিত রূপ এখন আর নেই। মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের কারণে শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বই এখন উষ্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে অসময়ে বন্যা, বৃষ্টি, খরা, আগাম বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন বাংলাদেশের মানুষের নিত্যসঙ্গী। অথচ বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে নির্বিঘœ খাদ্য শস্য উৎপাদনের কোন বিকল্প নেই। এমনিতেই প্রতিবছর হাট বাজার গ্রাম উন্নয়ন, নগরায়ন, অফিস আদালত, বসতবাড়ি নির্মাণে আবাদি জমির পরিমাণ প্রতিবছরই অন্ততঃ এক শতাংশ করে কমে আসছে অথচ মানুষ বাড়ছে। এমতাবস্থায় কোন বছর ধান উৎপাদন ব্যাহত হলেই খাদ্য শস্য আমদানি করে মানুষের খাদ্য চাহিদা পুরণ করতে হয়। যেমন গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে অসময়ে অতিবৃষ্টি ও উজানের পানির ঢলে হাওড় অঞ্চল খ্যাত কয়েকটি জেলার আধাপাকা ধান পানিতে তলিয়ে যায়। এর ওপর আবার গোটা দেশে অতিবৃষ্টির কবলে পড়ে ‘নেক ব্লাস্ট’ রোগে আক্রান্ত হয়ে ধানের ফলন বিপর্যয় ঘটে। ফলে দেশে দেখা দেয় খাদ্য সংকট ও চালের বাড়তি মূল্য। বাধ্য হয়ে সরকারকে শুল্ক প্রত্যাহার করে শুল্কমুক্ত সুবিধায় সরকারি-বেসরকারিভাবে চাল গম আমদানি করে ভোক্তার চাহিদা পূরণ করতে হয়।

 যেনতেন ভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটলে এটাই যেন এ দেশের মানুষের নিয়তি! মূলত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে খাদ্য শস্য উৎপাদনে ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেও আমাদের খাদ্য সংকট মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এর বাইরে আবার কৃষি উৎপাদনে সরকারিভাবে প্রত্যক্ষ ভর্তুকীর পরিমাণও কম। যখন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ সে দেশে প্রতিবছরই কৃষি ভর্তুকীর পরিমাণ বৃদ্ধি করছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আমাদের দেশের কৃষি ভর্তুকী বাড়ানোর বিরোধিতা করে। ফলে মহাজোট সরকার প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় এসে জাতীয় বাজেটে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ৯ হাজার কোটি টাকার কৃষি ভর্তুকী বরাদ্দ রাখে। সে সময় থেকে সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের সর্বশেষ জাতীয় বাজেটে বাজেটের আকার দ্বিগুণ হলেও কৃষি ভর্তুকীর পরিমাণ বাড়ানো হয়নি। মাত্র পাঁচশত কোটি টাকা বৃদ্ধি করে এ বছর কৃষি ভর্তুকীর পরিমাণ রাখা হয়েছে মাত্র সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা। অথচ যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণের মাত্রা প্রতিবছরই বেড়েই চলছে। যাদের পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকান্ডের খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশগুলোকে। যাদের কর্মকান্ডের কারণে বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত জলবায়ুর অভিঘাতে মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম নিয়ামক খাদ্য উৎপাদনে বিপর্যয় ঘটছে। মূলত মনুষ্যসৃষ্ট এই প্রভাবের কারণে দিনদিন প্রকৃতি তার নিজস্ব গতি প্রকৃতি হারিয়ে ফেলছে।

অতি সম্প্রতি জাতীয় এক দৈনিকে ‘পঞ্চগড়সহ উত্তরের জেলাগুলো থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ষড়ঋতু’ শিরোনামে একটি খবর প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত খবরের সূত্রমতে, দেশের সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে প্রকৃতির বিরূপ প্রভাব একটু বেশিই দৃশ্যমান হচ্ছে। বৈশাখের শুরু থেকে ঝড়, শিলাবৃষ্টিসহ অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে ধান, পাট, টমেটো, ভুট্টা, ডাল, মরিচসহ শাক সবজি চাষ করে চাষীদের অনেকেই পথে বসেছে। সময়মত বৃষ্টিপাত ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে অত্র জেলার সবজি চাষীরা নাবি হাইব্রিড জাতের টমেটো চাষাবাদ করে লাভবান হয়ে আসছিলেন। কিন্তু প্রাকৃতিক পরিবর্তনজনিত অভিঘাতের কারণে গত বছর থেকে টমেটো চাষীরা মহা বিপদে পড়েছে। তুলনামূলক টমেটোর বাজার মূল্য বেশি থাকায় এ জেলাসহ উত্তরের অন্যান্য জেলায় টমেটো চাষের দিকে ঝুঁকেছে চাষীরা। ফলে অন্যান্য সবজি চাষের পরিমাণ কিছুটা হলেও কমেছে। গত বছরও আগাম বৃষ্টির কারণে এবং এ বছরও অসময়ে বাড়তি বৃষ্টির কারণে টমেটো চাষ করলেও সবজি চাষীরা ভাল ফলন পায়নি। আর ভাল ফলন না পাওয়ার অর্থই হলো বাড়তি খরচে টমেটো চাষ করে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হওয়া। হয়েছেও তাই। এ বছর টমেটো চাষীরা দারুণভাবে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

কারণ টমেটো গাছের গোড়ায় পানি জমলে পচন ধরে গাছ মরে যায়। এ জন্য এখন কৃষি বিজ্ঞানীদের পানি সহনশীল জাতের টমেটো সহ অন্যান্য সবজির বীজ উদ্ভাবন করতে হবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত অসময়ে অতি বৃষ্টি এবং বৃষ্টির যখন প্রয়োজন, তখন অতি খরার কারণে সবজি চাষের ক্ষতি রোধ করতে হলে পানি ও খরা সহনীয় জাতের সবজি বীজের উদ্ভাবনের কোন বিকল্প নেই। মানুষের খেয়ে পরে বেঁচে থাকার তাগিদেই প্রকৃতির নিষ্ঠুর খেলায় যেন কৃষকের কপাল না পোড়ে এবং সবজি সংকটে যেন ভোক্তাদের পড়তে না হয়, যা ক্ষমতাসীনদেরকেই নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য এখন বড় বেশি প্রয়োজন, গবেষণা খাতে ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধি করা। যেন প্রাকৃতিক যে কোন দুর্যোগ মোকাবেলা করে এ দেশের চাষীরা কাংখিত পরিমাণ সবজি চাষ করে দেশীয় চাহিদা পুরণ করে বিদেশে রফতানির যে ধারা অব্যাহত রয়েছে, তা আরো বৃদ্ধি করা যায়। সবজি চাষে গোটা বিশ্বের তালিকায় এখন বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। যদি এ দেশের চাষীদের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত মোকাবেলা করার মতো বীজ উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়, তাহলে সবজি উৎপাদনে শীর্ষ স্থানে অবস্থান নেয়া আমাদের জন্য কঠিন হবে না।

জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা ক্রমান্বয়েই বাড়ছে। প্রতিবছরই জীবন জীবিকার টানে গ্রাম ছেড়ে মানুষ আশ্রয় নিচ্ছে নগর মহানগরের বস্তিগুলোতে। ফলে বস্তির সংখ্যাও যেমন বাড়ছে, তেমনি বস্তিতে মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। অতি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছেন, আবার যদি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যায়, তাহলে বস্তিগুলোয় ২০ তলা ভবন নির্মাণ করে বস্তিবাসীদের থাকার ব্যবস্থা করে দিবেন। নির্বাচন আসলে প্রতিশ্রুতির শেষ থাকে না, যার বাস্তবায়ন দেখতে হয়ত আমাদের কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। বাস্তবতা হচ্ছে, দু’চারটি বহুতল ভবন নির্মাণ করে তো আর সকল বস্তির মানুষের আশ্রয়স্থল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। তবে, জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবেলা করে গ্রামাঞ্চলের মানুষের জীবন মানের উন্নতি ঘটাতে হবে, যেন মানুষ বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে নগর-মহানগরের বস্তিতে যেতে বাধ্য না হয়। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে হু হু করে। মানুষের বেঁচে থাকার কারণে খরার কবলে পড়ে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে। ফলে পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পানির দেশ বাংলাদেশ। অথচ সে দেশে মানুষের সুপেয় পানির কোন নিশ্চয়তা নেই। মানুষ আর্সেনিক যুক্ত পানি পান করে চর্মরোগ সহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। দেশের কোন কোন স্থানে আর্সেনিকের কারণে খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এ জন্য পানি নীতি প্রণয়ন করে প্রতিটি মানুষের সুপেয় পানি প্রাপ্তিকে নিশ্চিত করতে হবে ভুগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে এনে ভু-উপরস্থ পানির ব্যবহারকে বৃদ্ধি করতে হবে। এ জন্য নদ-নদী, খাল-বিলগুলোকে সংস্কার করে বৃষ্টি ও বন্যার পানি ধরে রেখে চাষাবাদ করতে হবে। তানা হলে ভুগর্ভস্থ পানির ব্যবহারকে রোধ করা কঠিন হবে।

শুধু পানিতে আর্সেনিকের সমস্যায় নয় এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে পানিতে লবণাক্ততা। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সমুদ্রের লোনাপানি উপকূল ছেড়ে মিঠা পানির স্তরের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে লবণাক্ত পানি মিঠা পানির সঙ্গে মিশে গিয়ে মানুষের খাবার পানির সংকট সৃষ্টি করবে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর এভাবে নিচে নামা অব্যাহত থাকলে লবণাক্ত পানি ভবিষ্যতে রাজধানী ঢাকায় ঢুকে পড়বে। তখন মেগা সিটি ঢাকায় বসবাসরত মানুষের খাবার উপযোগী সুপেয় পানি নিশ্চিত করা অনেকাংশেই কঠিন হবে। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে কৃষির সমৃদ্ধিতে যেমন অন্তরায় সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যাও বাড়ছে। এমন ভয়ানক পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে সরকারকে প্রতিবছরের জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ রেখে তা মোকাবেলা করার উদ্যোগ নিতে হবে।

মোদ্দা কথা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাতকে ঘিরে গোটা বিশ্বই এখন চরমভাবে সংকটাপন্ন। এ সংকট নিরসনে জাতিসংঘের উদ্যোগে জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। মূলত বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের কারণে পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে জলবায়ু সংকট সৃষ্টি হচ্ছে ও তাদের দেয়া ক্ষতিপুরণের প্রতিশ্রুতির অর্থও ছাড় না করায় বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশ ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সংকট দিনে দিনে আরো ঘনিভুত হচ্ছে। যা মোকাবেলায় এখনই ক্ষমতাসীনদের উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, নইলে মানুষের বাসোপযোগী দেশের অস্থিত্ব বিপন্ন হবে, এবং মানুষের টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অনেকাংশেই কঠিন হবে।
  লেখক: প্রাবন্ধিক
ahairanju@gmail.com
-০১৭১২৭১৬৯৭২