আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থীর আপিল * ‘জটিলতা নেই জেনেই তফসিল দেয়া হয়’

গাজীপুরের ভোটাররা ‘আশা’ দেখছেন

গাজীপুরের ভোটাররা ‘আশা’ দেখছেন

গাজীপুর প্রতিনিধি : গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন স্থগিতে হাইকোর্টের রায়ের ওপর আপিল করায় আশার আলো দেখছেন ভোটাররা।  সোমবার নির্বাচন চেয়ে উচ্চ আদালতে আপিল আবেদন করেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার ও আওয়ামীলীগের মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম। এতে করে দেশের অন্যতম বৃহৎ এ সিটিতে নির্বাচন হবে বলে প্রত্যাশা রাখছেন সেখানকার বাসিন্দারা।

গাজীপুরের ভোটাররা বলছেন, গণতান্ত্রিক ধারায় একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক এমনটাই প্রত্যাশা তাদের। এ নির্বাচনে যোগ্য প্রার্থীকে নির্বাচনে তাদের উৎসাহ উদ্দীপনাও ছিল সাড়া জাগানোর মতো। কিন্তু হঠাৎ করে রবিবার হাইকোর্টের এক আদেশে নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় তারা হতাশ হয়ে পড়েন। তবে দুই মেয়রপ্রার্থীই নির্বাচন চেয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করায় তাদের প্রত্যাশা ভোট নিয়ে সংকট কেটে যাবে। মেয়রপ্রার্থী ও কাউন্সিলর প্রার্থীরাও বলছেন, নির্বাচনটি হয়ে গেলেই ভালো হতো। ভোটের জন্যও তারা শতভাগ প্রস্তুত ছিলেন। পোষ্টার, মাইকিংসহ প্রচারণায়  তাদের একটি বিরাট অংকের অর্থ খরচ হয়েছে। স্থগিত হওয়ায় তাদের আর্থিক ও মানসিক ক্ষতি হয়েছে। তবে তারা আদালতের আদেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।

রবিবার দুপুরে হাইকোর্টের নির্দেশে তিন মাসের জন্য স্থগিত গাজীপুর সিটিতে নির্বাচন স্থগিত হলে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন বন্ধে রিটার্নিং কর্মকর্তাকের নির্দেশ দেয়। এরপরই বন্ধ হয়ে যায় শহরের অলিগলিতে প্রচারে থাকা মাইকিংয়ের আওয়াজ। প্রার্থীরা এলাকায় প্রচারণা ও গণসংযোগ বন্ধ করে দেন। মুহুর্তে জমজমাট প্রচাণায় থাকা সিটি এলাকার পরিবেশ পাল্টে যায়। সরেজমিনে দেখা গেছে, সোমবার আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের বাড়িতে লোকজনের আনাগোনা ছিল কম। একই অবস্থা দেখা গেছে বিএনপির মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারের বাড়িতেও। গত কয়েকদিন একটানা নেতাকর্মীদের আনাগোনায় মুখর ছিল এই দুই মেয়র প্রার্থীর বাড়ি। ভোটাররা বলছেন, পুরো গাজীপুর সিটি এলাকায় নির্বাচনে উৎসব মুখর ছিল। নতুন এবং তরুন ভোটাররা ভোট দেবার আকাঙ্খায় মুখিয়ে ছিলেন।

 সীমানা সংক্রান্ত জটিলতায় একজনের দায়ের করা রিটে এত বড় আয়োজন ভেস্তে গেছে দেখে তারা হতাশ এবং সংক্ষুব্ধ। এদিকে জেলা বিএনপির কর্মী সমর্থকরা স্থগিতাদেশের ব্যাপারে সরকারের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করছেন। তাদের দাবি নির্বাচনে পরাজয় জেনেই সরকার নির্বাচন স্থগিত করেছে। তবে আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীরা বলছেন, স্থগিতাদেশের বিষয়টি আদালতের। তাই আদালতের প্রতি সবার সম্মান দেখানো উচিত। আওয়ামীলীগ মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের মিডিয়া সেলের সমন্বয়ক মোহাম্মদ আলম জানান, সকালে আওয়ামীলীগ মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম হায়দরাবাদে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের কবর জিয়ারত এবং স্মরণসভা অনুষ্ঠানে যোগ দেন। পরে সেখান থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন জাহাঙ্গীর। ঢাকায় গিয়ে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করেন তিনি। অপর দিকে বিএনপির মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারের ব্যক্তিগত সহকারী কিবরিয়া খান জনি জানান, সকালে হাসান উদ্দিন সরকার স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করতে ঢাকায় চলে যান। সেখানে তিনি স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার চেয়ে আপিল করেন।

এদিকে এই নির্বাচনে সর্বসাধ্য দিয়ে প্রচারণা চালিয়ে গেছেন এবং ভোটারদের কাছে নানাভাবে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজের বার্তা পৌছে দিয়েছেন কাউন্সিলর প্রার্থীরা। তাই আদালতের আদেশে স্তম্ভিত এবং হতাশ কাউন্সিলর প্রার্থীরাও। তারা জানিয়েছেন, নির্বাচনে প্রচারণায় তারা পোস্টার, লিফলেট ও প্রচার সামগ্রি বিতরণ করেছেন। মাইকিং, নির্বাচনী ক্যাম্প খুলেছিলেন। এতে তাদের নিজেদের আর্থিক বরাদ্দ ছিল। নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় তাদের আর্থিক লোকসানের পাশাপাশি মানসিক ক্ষতি হয়েছে। তবে তারা আদালতের নির্দেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সিটি করপোরেশনের ১৩ নং ওয়ার্ড থেকে স্বতন্ত্র কাউন্সিলর প্রার্থী ফাইজুল আলম দিলীপ জানান, জনগণের জন্য তিনি নির্বাচনের মাঠে ছিলেন এবং এখনো আছেন। স্থগিতের বিষয়টি আইনী পদক্ষেপ। এখানে বলার কিছু নেই, আইনের প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল। নির্বাচন কমিশন যেভাবে সিদ্ধান্ত নেবে তা আমাদের মানতে হবে। ৫৪ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শেখ মোহাম্মদ আলেক জানান, আমরা নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। নির্বাচনটা হয়ে গেলেই ভাল হতো। আমরা আপিলের পক্ষে, মেয়র প্রার্থীরা যা করছেন তাদের প্রতি আমাদের সমর্থন রয়েছে। তবে এ নির্বাচনে প্রচারণায় আমাদের বেশ ব্যয় হয়ে গেছে। প্রতিকূল পরিবেশ থাকায় একাধিকবার পোস্টার লাগাতে হয়েছে। ফলে স্থগিতাদেশের কারণে আমাদের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

জটিলতা নেই জেনেই তফসিল দেয়া হয়: কবিতা খানম
গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন করতে সীমানা সংক্রান্ত কোনো জটিলতা নেই বলে মন্ত্রণালয় দুই বার নিশ্চিত করেছিল বলে জানিয়েছেন একজন নির্বাচন কমিশনার।

সীমানা নিয়ে জটিলতার কারণে একটি রিট আবেদনে ভোটের নয় দিন আগে রাজধানী লাগোয়া জনপদে ভোট স্থগিত হওয়ার পর দিন সোমবার নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম গণমাধ্যম কর্মীদের মুখোমুখি হন। যার রিট আবেদনে গাজীপুর সিটিতে ভোট তিন মাসের জন্য স্থগিত হয়েছে, তিনি এই জেলারই বাসিন্দা নন। তার বাড়ি ঢাকা জেলায়। সাভারের শিমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এ বি এম আজহারুল ইসলাম সুরুজ তার নাম।

সুরুজের আপত্তির কারণ জানিয়েছেন তার সবশেষ রিটের আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান। তিনি জানান, ২০১৩ সালের ১৬ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগ শিমুলিয়া ইউনিয়নের ডোমনা, দক্ষিণ বাড়ৈবাড়ী, পশ্চিম পানিশাইল, দক্ষিণ পানিশাইল, শিবরামপুর ও ডোমনাগ মৌজাকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করে।

তখনই আপত্তি জানান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজহারুল ইসলাম সুরুজ। স্থানীয় সরকার বিভাগ আপত্তি আমলে না নেওয়ায় ২০১৫ সালে হাইকোর্টে রিট করেন তিনি। তখন আদালত তার আপত্তি নিষ্পত্তি করে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করতে বলে। ২০১৬ সালে পুরনো সীমানা অনুযায়ী শিমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হলে আজহারুল আবার জেতেন। চলতি বছরের ৪ মার্চ নির্বাচন কমিশন আরেকটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। সেই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ওই ছয়টি মৌজাকে ফের গাজীপুর সিটির অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আর ৩১ মার্চ ভোটের তফসিল দেয় নির্বাচন কমিশন। গাজীপুরে সীমানা নিয়ে এত বড় একটা জটিলতা রয়েছে, সেটার মীমাংসা না করে কেন তফসিল হলো- এমন প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম বলেন, ‘আমরা স্থানীয় সরকার থেকে ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পরই নির্বচনের তফসিল ঘোষণা করি।’ ‘আমরা গাজীপুর সিটি নির্বাচনের ব্যাপারে স্থানীয় সরকার থেকে দুইবার ক্লিয়ারেন্স নিয়েছি। তারা জানিয়েছে, সেখানে কোনো ধরনের জটিলতা নেই। তারা আমাদের নির্বাচন করতে বলেছে।’ তাহলে সিটি নির্বাচন স্থগিতের দায় কার- এমন প্রশ্নে কবিতা খানম বলেন, ‘দায় কার এটা বলার সুযোগ আমার নেই। তবে আমি বলতে পারি কমিশনের কোন গাফিলতি নেই।’

গাজীপুরের মতো খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনও স্থগিত হওয়ার কোনো আশঙ্কা আছে কি না, এমন প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘কোন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদালতের কাছে যেতে পারে। আইন তাকে সে সুযোগ দিয়েছে। তবে অ্যাডভান্স বলা যাবে না।’ ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন স্থগিতের বিরুদ্ধে আবেদন কোন পর্যায়ে আছে, জানতে চাইলে কবিতা খানম বলেন, ‘যতটুকু জানি লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি হওয়ার জন্য হাইকোর্টে পাঠিয়েছে।’
বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে পুলিশের মামলা : জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী ছাইয়্যেদুল আলম বাবুলসহ শতাধিক নেতাকর্মীকে আসামী করে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। সোমবার দুপুরে পুলিশ বাদি হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। টঙ্গী থানার ওসি কামাল হোসেন জানান, রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি ও গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ এনে শতাধিক বিএনপি নেতাকর্মীর নামে টঙ্গী থানায় মামলা হয়েছে। থানার উপপরিদর্শক আল আমিন বাদি হয়ে মামলাটি দায়ের করেন বলে জানান তিনি।