খাবারে ‘বিষ’ বন্ধে কৃষককে সহায়তা দিন

খাবারে ‘বিষ’ বন্ধে কৃষককে সহায়তা দিন

আতাউর রহমান মিটন:‘যুদ্ধ মানে শত্রু শত্রু খেলা’ - সেটার সাম্প্রতিক বড় প্রমাণ হলো আমেরিকা-ইরান। তাদের প্রতিশোধের আগুনে প্রাণ হারাল ইউক্রেনের বিমানের ১৭৬ আরোহী, যাদের ৫৭ জনই কানাডিয়ান। এই ঘটনায় বেশ বিপাকে পড়েছে ইরান। দাবি উঠেছে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির পদত্যাগের। এই ঘটনায় ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেছেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক এই ভুলের জন্য ইরান গভীরভাবে ব্যথিত।’ যদিও অনেকেই মনে করছেন ইরানের বিক্ষোভে পশ্চিমা শক্তির মদদ রয়েছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল টানাপোড়ন ও রাজনীতির সাপ-লুডু খেলাটা এবার নতুন মোড় নিয়েছে। এই খেলা এত সহজে শেষ হবে না। একবার সাপের কামড়ে নীচে নেমে আসা, আবার মই বেয়ে তরতর করে উপরে উঠে যাওয়ার মতই মধ্যপ্রাচ্যে বিরাজমান এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এত সহজে ঠান্ডা হবে না।

মধ্যপ্রাচ্যে যখন অস্থিরতা বিরাজমান, লক্ষ-কোটি মানুষ যখন নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত তখন বাংলাদেশে আমরা কাতরাচ্ছি শৈত্য প্রবাহে! প্রায় পুরো দেশেই আকাশ ঢেকে রয়েছে মেঘে, আর বেড়েছে শীতের প্রকোপ। উত্তরের জেলাগুলোতে স্বল্প আয়ের মানুষসহ গৃহপালিত প্রাণীকূল অবর্ণনীয় কষ্টে দিনাতিপাত করছে। শীত নিবারণে আগুন পোহানোর চেষ্টা করতে গিয়ে অগ্নিকান্ডে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে দেশের বেশ কয়েকটি এলাকায়। এই অভাবী মানুষগুলোর জন্য গরম কাপড়ের ব্যবস্থা করা এবং শীতজনিত অসুস্থতা মোকাবেলায় সারাদেশের সকল সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে নেবুলাইজার মেশিনসহ অন্যান্য উপকরণের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ঘন কুয়াশা ও তীব্র ঠান্ডা হাওয়ায় কৃষকেরা নতুন করে ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। অনেক এলাকাতেই কৃষকের বোরো বীজতলা নষ্ট হয়েছে। হাওর অঞ্চলে তীব্র শীতের কারণে বোরো চাষ বিঘিœত হচ্ছে, অনেকেই বোরো লাগাতে দেরী করে ফেলছেন। এভাবে হাওর অঞ্চলে বোরো ধান লাগাতে দেরী হলে ধান পাকার মৌসুমে হঠাৎ বৃষ্টি বা আগাম বন্যার কারণে ধানের ক্ষেত তলিয়ে যাবার আশঙ্কা রয়েছে। বোরো ছাড়াও দেশের অনেক এলাকাতেই জমিতে লাগানো রবিশস্যের ছোট ছোট চারাগুলো এই প্রচন্ড শীতে কুঁকড়ে গিয়ে নষ্ট হয়েছে। কোল্ড ইনজুরি থেকে চারা রক্ষার জন্য সরকারের কৃষি বিভাগ থেকে পলিথিন দিয়ে চারার ক্ষেত ঢেকে রাখার পরামর্শ দেয়া হলেও দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের পক্ষে পলিথিন কিনে এনে জমি ঢেকে দেয়া সম্ভব নয়। এরকম পরিস্থিতিতে দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষকদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে সরকারের পক্ষ থেকে নগদ অর্থ অথবা প্লাষ্টিক সহায়তা দেয়া প্রয়োজন। জাপানসহ বিশ্বের অনেক দেশেই সরকারের কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় সরকার বিভাগ কৃষকদের এ ধরনের প্লাষ্টিকের ঘর তৈরী করে দেয়। আমাদের দেশেও এটা শুরু করা প্রয়োজন বলে কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

একথা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না যে আমাদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জীবন জড়িয়ে আছে কৃষিকে ঘিরে। কৃষি ও কৃষকের ভাল থাকা তাই দেশের ভাল থাকার সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। কৃষিকে অবহেলা করে দেশকে এগিয়ে নেয়ার কোন সুযোগ নেই। আমরা এখন মুজিববর্ষের ক্ষণগণনা শুরু করেছি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁর জীবদ্দশায় কৃষিকে এগিয়ে নেয়ার জন্যে অনেকগুলো কাজ করেছিলেন। তিনি কৃষি সমবায় গঠন করতে বলেছিলেন। তিনি কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার উপর জোর দিতে বলেছিলেন। তিনি কৃষি গবেষণাকে এগিয়ে নিতে এবং কৃষি পেশাকে সম্মানীয় পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে কৃষি কর্মকর্তাদের ‘১ম শ্রেণী’তে উন্নীত করেছিলেন। সে কারণে এখনও কৃতজ্ঞ কৃষিজীবীরা শ্লোগানে দিয়ে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু’র অবদান, কৃষিবিদ নাম্বার ওয়ান’।

সরকারের বর্তমান কৃষি মন্ত্রী ডঃ আব্দুর রাজ্জাক এমপি একজন উচ্চশিক্ষিত কৃষিবিদ। এর আগে তিনি খাদ্য মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। খাদ্যের কথা ভাবলে কৃষির কথাই ভাবতে হয়। তাই খাদ্য মন্ত্রী হিসেবে তাঁর অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে তাঁকে কৃষির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সবার জন্য পুষ্টিসম্পন্ন ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে সরকার কৃষির আধুনিকীকরণ এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দিয়েছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে সরকারের ঘোষিত অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কৃষি মন্ত্রণালয় সারাদেশে ‘বিষমুক্ত’ সব্জি চাষে গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকারের এই শুভ উদ্যোগ সফল হোক। তবে সারাদেশে বিষমুক্ত সব্জি চাষ নিশ্চিত করতে হলে ফসলে ‘বিষ’ ব্যবহারের কুফল সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। পোকামাকড়ের হাত থেকে কষ্টের ফসলকে রক্ষায় স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। কৃষক যদি ‘বিষমুক্ত সব্জি’ উৎপাদনে সরকারি সহায়তা পায় তাহলে মানুষের খাবারে বিষ মিশিয়ে নীরব গণহত্যায় সহযোগী হওয়ার কোন কারণ থাকতে পারে না।

নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করতে হলে কৃষকদের বিষমুক্ত ফসল উৎপাদনে প্রশিক্ষণ প্রদান ও কারিগরি সহায়তা দিতে হবে। সারাদেশে আইপিএম ক্লাবগুলোকে সক্রিয় রাখার জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। প্রকল্পভিত্তিক প্রচেষ্টা দিয়ে এটা হবে না। এর জন্য মানুষের ‘উদ্যোক্তা মনোভাব’কে প্রণোদিত করতে হবে। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের ধাপগুলিতে সহজ শর্তে বা রেয়াতি সুদে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের গুটিকয়েক ধনী ব্যক্তি হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা শোধ না করে বরং মওকুফ পায় অথচ সাধারণ কৃষককে সহজ শর্তে ঋণ দিতে সরকারের হাতকচলানি আর টাকার অভাব শেষ হয় না! এটা দুঃখজনক! কোন কৃষকই মানুষের খাবারে ‘বিষ’ মেশাতে চায় না কিন্তু পোকায় ফসল খেয়ে যাচ্ছে এটা দেখেও কারও পক্ষেই নিরুত্তাপ বসে থাকা সম্ভব নয়। কৃষকের কাছে যখন বালাই দমনের নিরাপদ কোন ব্যবস্থা থাকে না তখন সে অসহায় অবস্থায় বাধ্য হয়ে ছুটে যায় বাজার-হাটগুলোর বিষ বিক্রেতাদের কাছে। সেখানে গিয়ে তারা দোকানদারদের পরামর্শ অনুযায়ী ‘বিষ’ কিনে ফসলে ছেটায়। মুনাফার লোভে বিক্রেতা বেশি বেশি বিষ ছেটানোর পরামর্শ দেয়। এই প্রক্রিয়ায় কৃষক একদিকে যেমন অসচেতনতা ও অজ্ঞতায় নিজের স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তেমনি বিষাক্ত করে ফেলে মানুষের খাবার ফসল। না জেনে না বুঝে এই নীরব বিষক্রিয়ায় দেশের প্রায় সকল মানুষই আজ নানা ধরনের রোগ-ব্যাধি ও স্বাস্থ্য জটিলতায় দিনাতিপাত করছে।

বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি বাজারে, দেশের প্রতিটি কোণায় কোণায় এখন ‘বিষ’ কেনাবেচা হয়। যে কেউ চাইলেই বিষ বেচার দোকান দিতে পারে, এটা কিভাবে সম্ভব? প্রশিক্ষণ নেই, লাইসেন্স নেই এমন দোকানগুলো কিভাবে টিকে আছে? যে জিনিস মানুষের মৃত্যু ঘটায় সেই জিনিস অর্থাৎ ‘বিষ’ বেচাকেনা এত সহজে সরকার করতে দিচ্ছেন কেন? এই স্বাধীনতা, এই নিয়ন্ত্রণহীনতা জাতিকে কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে? এটা কিসের ইঙ্গিত? সরকারকে তাই এগিয়ে আসতে হবে। অবিলম্বে ‘ফসলে বিষ’ ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। বিষ ব্যবহারের স্বাস্থ্য ঝুঁকি সম্পর্কে সর্বস্তরে প্রচারণা চালাতে হবে। গণমাধ্যমে যেভাবে সিগারেটের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করা হয়েছে ঠিক তেমনিভাবে তথাকথিত ‘এনার্জি ড্রিঙ্কস’ এর বিজ্ঞাপন বন্ধ করা প্রয়োজন। প্রয়োজন ফসলে বিষ, টেষ্টিং সল্ট, ঘন চিনি, ক্ষতিকারক রং ও প্রিজারভেটিভ, ইত্যাদির ব্যবহার এবং এর ফলে সম্ভাব্য স্বাস্থ্য ঝুঁকি সম্পর্কে গণসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া।‘বিষ’ বেচকেনা নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি কৃষক পর্যায়ে বালাইনাশক তৈরি ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। সরকার যদি সত্যিই দেশের কৃষি ও কৃষককে এগিয়ে নিতে চায় তাহলে প্রত্যেক ইউনিয়নে কৃষক সমবায়/সমিতি/সংগঠন গড়ে তুলে তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে মনযোগ দিতে হবে। বঙ্গবন্ধু এই কৃষক সমবায় গঠনকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এখনও কৃষক সমবায় গঠনে কোন আইনগত বাধা নাই। কিন্তু বর্তমানের সমবায় আইনটি কৃষক বান্ধব না হওয়ায় এবং এই আইনে কৃষক সমবায়ের জন্য কোন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বা প্রণোদনা না থাকায় কৃষকেরা সমবায় গড়তে উৎসাহিত হচ্ছেন না। কৃষকদের সহায়তা দিতে হবে কৃষক সংগঠনের মাধ্যমে। আর কৃষক সংগঠনের রেজিঃ দেয়ার দায়িত্ব ন্যস্ত করতে হবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বা কৃষি মন্ত্রণালয়ে। যুব সংগঠনের রেজিষ্ট্রেশন দেয় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, মহিলাদের সংগঠনের রেজিষ্ট্রেশন দেয় মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর তাহলে কৃষক সংগঠনের রেজিষ্ট্রেশন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দিতে সমস্যা কোথায়?

এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কৃষিকে এগিয়ে নিতে হলে কৃষক, কৃষি বিজ্ঞানী, সম্প্রসারণ কর্মি, কৃষি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিভাগের মধ্যে যে সমন্বয় প্রয়োজন তা নিশ্চিত করতে হলে কৃষক সংগঠনগুলিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বা কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে রেজিষ্ট্রেশন এর বিধান চালু করতে হবে। প্রয়োজনে ছোট ছোট কৃষক উদ্যোক্তদের জন্য ‘বিশেষায়িত কোম্পানি আইন’ বা ‘কমিউনিটি এন্টারপ্রাইজ আইন’ চালু করা যায়।  বর্তমানের কোম্পানী আইন ক্ষুদ্র কৃষক বা উদ্যোক্তা বান্ধব নয়। বর্তমানের কোম্পানি আইন বড় পুঁজির শিল্প কলকারখানা চালু’র স্বার্থে প্রণীত, এটা প্রান্তিক কৃষক ও ক্ষুদ্র উৎপাদকের স্বার্থকে ধারণ করে না। তাই ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী অঙ্গীকার ও জাতীয় কৃষি নীতির পূর্ণ বাস্তবায়নে অবিলম্বে খোলামনে কার্যকর আলোচনা শুরু করতে হবে।

কেবল টেলিভিশন ক্যামেরা নির্ভর লোক দেখানো আলোচনা দিয়ে সামগ্রিক কৃষি সংস্কার করা সম্ভব হবে না। কৃষিকে এগিয়ে নিতে হলে প্রান্তিক কৃষকের স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে প্রথম। বড় বড় ধনী কৃষকদের স্বার্থ ও নীতিকে সহায়তা দেয়ার অতীতের কর্মসূচিগুলি যে ফলপ্রসু হয়নি সেটা স্বীকার করলে ক্ষতি নেই। ভুল স্বীকার করতে হয়, সংশোধনের আগ্রহ প্রমাণের জন্য। আশাকরি বর্তমান কৃষি মন্ত্রী সেটা অনুধাবন করবেন এবং যথাযথ পদক্ষেপ নিবেন। দলবাজ, স্বার্থান্বেষী, মুখচেনাদের নিয়ে নয়, দেশের খেটে খাওয়া প্রান্তজনের কৃষকদের নিয়ে বসুন, তাদের কথা শুনুন, হৃদয় দিয়ে ভাবুন তাদের দুঃখ-দুর্দশা কিভাবে কমাবেন সেটা চিহ্নিত করুন। যে প্রান্তজনদের বঙ্গবন্ধু হৃদয় দিয়ে ভালবাসতেন সেই প্রান্তজনদের ভবিষ্যৎ, তাদের খাওয়া ও বেঁচে থাকার টেকসই উপায় খোঁজাকে অগ্রাধিকার দিলে সরকারের লাভই হবে, ক্ষতির কিছু নেই। মুষ্টিমেয় দালালদের কথা না শুনে প্রান্তজনের কথা শুনুন! অনুরোধ রইল!
লেখক : সংগঠক-প্রাবন্ধিক
miton2021@gmail.com
০১৭১১-৫২৬৯৭৯